ইতিহাস

4 মিনিট লাগবে পড়তে

টিপু সুলতান: ইতিহাসের নায়ক নাকি খলনায়ক

Published

4 মিনিট লাগবে পড়তে to read

Search Icon Search Icon Search Icon

ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ, ভারতবর্ষের মৃত আত্মাকে স্মরণ করে আমি পান করছি

১৭৯৯ সালের ৪ মে। ভারতে ক্রমসম্প্রসারণশীল বৃটিশ সাম্রাজ্যের পরিচালক ব্যক্তি রিচার্ড ওয়েলেসলি যখন ‘মহীশূরের বাঘ’ টিপু সুলতানের মৃত্যু সংবাদ শুনতে পান তখন এমনই একটি মন্তব্য করেন। অন্তত ভগবান এস গিদোয়ানীর তার ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’ বইতে এমনটাই উল্লেখ করেছেন। শুধু তাই নয়, টিপুর মৃত্যুর পর “গোটা ভারতবর্ষই এখন আমাদের” এমন একটি মন্তব্যও ওয়েলেসলি করেন বলে জানা যায়।

টিপুর মৃত্যুসংবাদ শুনে ওয়েলেসলির করা দুটি মন্তব্য শুনেই বোঝা যায়, ভারতে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিলেন টিপু সুলতান। ভারতের বেশিরভাগ অংশেই আজও তাকে সেভাবেই দেখা হয়।

টিপু অ্যান্ড হিস সনস (চিত্রকরঃ হেনরি সিঙ্গলটন) Source: Pinterest

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে টিপুর নাম ছিলো এক বিভীষিকা। ইউরোপে তখন নেপোলিয়নের জয়জয়কার। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের ভয় ছিলো, টিপু সুলতান নেপোলিয়নের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভারতকে ব্রিটিশমুক্ত করবেন। আশঙ্কা একেবারে অমূলকও নয়। অটোমান এবং ফরাসি সাম্রাজ্যের প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেনও টিপু সুলতান। যা-ই হোক, ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তমে টিপুর মৃত্যু ছিলো তাদের কাছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মতো। ভারতের মাটিতে তো বটেই, টিপুর মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর পর ব্রিটেনের মাটিতেও উৎসবের ঢেউ লাগে। টিপু সুলতানের শেষ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় নামকরা চিত্রকরদের কাজগুলো দেখলে তা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। টিপুর মৃত্যুর পর তাঁর রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তমে লুটতরাজের এক মহোৎসব শুরু হয়। উইলিয়াম উইল্কি কলিন্সের লেখা বিখ্যাত ‘দ্য মুনস্টোন’ উপন্যাসের প্রথম দৃশ্যটি শুরু হয় এই লুটতরাজের বর্ণনা দিয়ে।

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথম রকেট প্রযুক্তি ব্যবহার করেন টিপু। সেই যুদ্ধের একটি চিত্র নাসার মেরিল্যান্ড অফিসে সংরক্ষিত আছে। Source: Guruprasad.Net

ভারতীয়দের মধ্যে টিপুকে নিয়ে এই আগ্রহের পেছনে অবশ্য যত না ইতিহাস চর্চার অবদান, তার চেয়েও বেশি অবদান নব্বইয়ের দশকে ডিডি ন্যাশনাল টিভি চ্যানেলে দেখানো ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’ নামের সিরিয়ালটির। এমনকি ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’-এর লেখক ভগবান এস গিদোয়ানীও স্বীকার করেছেন কোনো ভারতীয় নয়, বরং লন্ডনে এক ফরাসী ছাত্রই তাকে টিপু সুলতানের বীরত্বগাথার সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়। ডিডি ন্যাশনালের পরে এই গিদোয়ানীর মাধ্যমেই ‘টিপু ভক্তি’ আবারও ফিরে আসে ভারতে।

কিন্তু কথার পিঠেও কথা থাকে। টিপুকে নিয়ে বর্তমানে এই ‘কথার পিঠের কথা’গুলোই জোরদার হয়ে উঠেছে। বছর দুই আগে ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে দেশটির কর্ণাটক রাজ্য একটি প্যারেড বের করা হয়, যাতে একদম সম্মুখভাগে ছিলো তরবারি হাতে টিপুর একটি চলমান ভাষ্কর্য। প্রজাতন্ত্র দিবসে ভারতীয় জাতীয়তার প্রতীক হিসাবে টিপুকে গ্রহণ করা যেতে পারে কিনা, তাই নিয়েই উত্তপ্ত আলোচনা শুরু হয় টুইটারে। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ২০০ বছরেরও বেশি সময় আগে মারা যাওয়া এই ব্যক্তিকে নিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার টুইট হয়েছে।

টিপু সুলতানের বিখ্যাত তরবারি, Source: PinImg

টুইটগুলোর বেশিরভাগেই টিপুকে ‘বীর’ এবং ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দেয়া হলেও এমন টুইটও কম নয় যেখানে তাকে স্রেফ ‘বর্বর’ এবং ‘খুনী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। টিপু সুলতানঃ দ্য টায়রান্ট অব মহীশুর’ নামের ইতিহাস গ্রন্থের রচয়িতা সন্দীপ বালাকৃষ্ণা টিপুভক্তিকে ‘ইতিহাসের একটি খোলাখুলি বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সন্দীপ এবং অন্যান্য টিপু-সমালোচকদের দাবি, টিপু গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছেন, হিন্দুদের মন্দির, খ্রিস্টানদের চার্চ ধ্বংস করেছেন, অন্তত দশ হাজার ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছেন। বলা হয়ে থাকে, কর্ণাটকের কোদাভা সম্প্রদায়ের হিন্দুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে টিপু বিপুল সংখ্যক যুদ্ধবন্দীকে চাপের মুখে ইসলামে দীক্ষিত করেন। এছাড়া মালাবার ও কালিকূট আক্রমণেও এমন ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটে বলে টিপু-বিরোধীরা দাবি করে থাকে।

প্রাসাদ থেকে উদ্ধারকৃত বন্দুকের হাতল, Source: Dawn

কিন্তু টিপুকে ভারতের স্বাধীনতার রক্ষাকারী বীর হিসেবে যেসব ইতিহাসবিদেরা দাবি করেন, তারা এই সমালোচনাগুলোকে উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের প্রচারণা হিসেবেই আখ্যা দিয়েছেন। ভারতের বিকল্পধারার অনলাইন জার্নাল ‘কাউন্টার কারেন্টস’-এর লেখক সুভাষ গাতাদি টিপুর বিরুদ্ধে আনা ধর্মান্তরের অভিযোগকে ইতিহাসের বিকৃতি উল্লেখ করে জানান, ১৯২৮  সালে ভারতের এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক বি.এন. পাণ্ডের কাছে তার ছাত্ররা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর একটি লেখা নিয়ে আসেন, যেখানে বলা ছিলো টিপুর ধর্মান্তরের চাপের মুখে ৩০০০ ব্রাহ্মণ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। ছাত্রদের আগ্রহের কারণে তথ্যের সূত্র চেয়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীকে চিঠি পাঠান বি.এন পাণ্ডে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী উত্তরে জানান, তিনি মহীশুর গ্যাজেটিয়ার পত্রিকাতে এই তথ্য পেয়েছেন। পরবর্তীতে মহীশুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক শ্রীকান্তিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তথ্যগুলোকে মিথ্যা বলে বি.এন.পাণ্ডেকে জানান। আর পুরো ঘটনাটা ‘সাম্রাজ্যবাদের সেবায় ইতিহাস’ নামে ১৯৭৭ সালে রাজ্যসভায় দেয়া একটি ভাষণে উল্লেখ করেন বি.এন পান্ডে।

টাইগার অব টিপু সুলতান, লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়াম, লন্ডন , Imgur

‘কাউন্টার কারেন্টস’ এ প্রকাশিত এই লেখায় সুভাষ গাতাদি আরো দাবি করেন, কর্ণাটকের উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী সংঘ পরিবারই এ টিপু বিদ্বেষের মূল হোতা। টিপুকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে দিন দিন প্রভাবশালী হয়ে উঠতে থাকা এই উগ্রবাদী শক্তিগুলোর রাজনীতির রূপ আবার নানা রকম। বছর পাঁচেক আগের কথা ধরা যাক। কর্ণাটক রাজ্যের বিজেপি থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর্ণাটক জনতা পক্ষ নামের এক দল খোলেন হিন্দুত্ববাদী নেতা বি.এস. য়েদ্দিউরুপ্পা। যথারীতি এলো নির্বাচন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুসলিম ভোটারদের কাছে নিজেকে তুলে ধরতে অন্য রকম এক পদক্ষেপ নেন য়েদ্দিরুপ্পা। টিপু সুলতানের সেই বিখ্যাত তলোয়ার এবং তাঁর রণকৌশলের অনুকরণে এক সুন্দর মহড়া বা ‘সোর্ড ড্যান্স’-এর আয়োজন করেন তিনি। এরপর গঙ্গায় অনেক জল বয়ে গেছে। নির্বাচনের বৈতরণী পেরিয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন তিনি। ২০১৪ সালে নিজের গড়া দল নিয়ে ফের ভিড়েছেন বিজেপিতে। গদিতে বসার পরপরই রাজ্যের জনপ্রিয় উৎসব ‘টিপু জয়ন্তী’ বন্ধের উদ্যোগ নেন তিনি। এ লক্ষ্যে জোর জনসংযোগও শুরু করেন। ভারতের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক বিভেদ যতই জোরালো হচ্ছে, ততই জোরালো হচ্ছে টিপু বিদ্বেষ। কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও সত্তরের দশকে টিপু সুলতানের নামে এক জীবনী প্রকাশ করে, যেখানে তাঁর নামে কোনো ধরনের নিপীড়নের অভিযোগ আনা হয়নি। টিপু ইস্যুতে আরএসএসের অবস্থান এখন প্রায় উল্টো।

কর্ণাটকে টিপু জয়ন্তী, Image Source: NewsWorldIndia

কর্ণাটকের জনগণের মধ্যে টিপুর গ্রহণযোগ্যতার গভীরতা মাপতে রাজ্যের লোকসাহিত্যের দিকে একটু নজর দেয়া যেতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিকে অর্থাৎ টিপু সুলতানের মৃত্যুর পরপরই অনেকগুলো লোকসংগীত রচিত হয়, যা কালের ধারাবাহিকতায় এখনও জনপ্রিয়। কর্ণাটকের লোকসাহিত্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশবিরোধী হাতেগোনা কিছু গোত্রপতি ছাড়া আর কোনো সম্রাটকে নিয়ে কর্ণাটকে শোকগাথা রচিত হয়নি। আর এই শোকগাথা বা ‘লাভানা’গুলোর জনপ্রিয়তাই এই নেতার গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেয়।

টিপু সুলতানের প্রাসাদ, Source: JourneyMart

সম্প্রতি কর্ণাটকে একটি নির্মিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘টিপু বিশ্ববিদ্যালয়’। এই নামকরণের পক্ষে-বিপক্ষেও চলছে প্রচারণা। টিপুকে নিয়ে এই বিতর্কের মূল কারণ এই যে, তাকে নিয়ে যত তথ্য পাওয়া যায় তার মূল উৎস ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের লেখা বই, যেগুলোর অধিকাংশেরই সত্যতা যাচাই করা এখন আর সম্ভব নয়। তাই টিপু সুলতানকে নিয়ে এই বিতর্ক যে খুব সহজেই থামবে এমন সম্ভাবনাও নেই।

এই লেখা নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?

Fascinated
Informed
Happy
Sad
Angry
Amused

মন্তব্যসমূহ