‘লাকি সেভেন’ বা ‘আনলাকি থার্টিন’, সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের প্রসঙ্গ আলোচনায় আসলেই সর্বপ্রথম উঠে আসে এই দুটি প্রচলিত বিশ্বাস। সংখ্যাতেই শেষ নয়, সৌভাগ্য কিংবা শুভ লক্ষণের আশায় মানুষ সেই সুপ্রাচীন কাল থেকে বিশ্বাস করে এসেছে বিভিন্ন প্রতীক, উপকথা, মাদুলি বা মন্ত্রপূত রক্ষাকবচসহ আরও অনেক কিছু। প্রচলিত বা অপ্রচলিত সব বিশ্বাস গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে, সেই বিশ্বাস আবার ছড়িয়ে পড়েছে এক সমাজ থেকে আরেক সমাজে।

কিছু প্রতীক হয়তো একসময় শুভ লক্ষণের প্রতীক ছিলো, কিন্তু ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তা সম্পূর্ণ বদলে গেছে বা হারিয়ে গেছে সময়ের অতল গহ্বরে। সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে হয়তো প্রায় সবকিছুই ব্যবহৃত হতে পারে, কারণ সৌভাগ্যের বিশ্বাস ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। ইতিহাসে শুভ লক্ষণের বিশ্বাস নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন।

চিমনি ঝাড়ুদার

নব দম্পতির সাথে একজন চিমনি ঝাড়ুদার; Source: chimney-sweep-devon.co.uk

জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠানে আপনি দেখলেন মাথায় লম্বা টুপি, হাতে ঝাড়ু ও মুখে চিমনির কালি মাখানো কোনো এক ঝাড়ুদার উপস্থিত। ঠিক কেমন অনুভূতি হবে আপনার? আপনার চিন্তায় বিরক্তির উদ্রেক হওয়ার পূর্বে জেনে রাখুন- এই চিমনি ঝাড়ুদারকেই হয়তো নবদম্পতি ভাড়া করে নিয়ে এসেছে তাদের সৌভাগ্য কামনায়।

আঠারো শতক থেকে চিমনি ঝাড়ুদারদের শুভ লক্ষণের বাহক হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়, যদিও ঠিক কখন ও কিভাবে এই ধারণার শুরু তা যথেষ্ট পরিষ্কার নয়। প্রচলিত আছে যে, একদা রাজা তৃতীয় জর্জকে ধাওয়াকৃত ঘোড়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিল কোনো এক সাহসী চিমনি ঝাড়ুদার। সেই থেকে হয়তো চিমনি ঝাড়ুদাররা ইংল্যান্ড ও ইউরোপের কিছু অংশে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ভিন্ন এক মর্যাদা পেতে শুরু করে। আরেকটি প্রচলিত উপকথা হলো, কোনো এক কালিঝুলি মাখা শ্রমিক ছাদ থেকে পিছলে পড়ে যায় এবং কোনোরকমে কার্নিশ ধরে ঝুলতে থাকে। শেষপর্যন্ত নিতান্ত ভাগ্যবান লোকটির জীবন যে ভদ্রমহিলা রক্ষা করে, সেই মহিলাকে পরবর্তীতে লোকটি বিয়ে করে।

প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, চিমনি ঝাড়ুদারের সাথে করমর্দন কিংবা যাত্রাপথে এদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াকে শুভ লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের সাথে চিমনি ঝাড়ুদারদের সৌভাগ্য বহনের প্রচলিত বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি সমাদৃত। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে গির্জা থেকে নবদম্পতি বের হওয়ার সময় কোনো চিমনি ঝাড়ুদারের সাথে সাক্ষাৎ হওয়াকে বিশেষ সুপ্রসন্ন ভাগ্যের অগ্রযাত্রা মনে করা হয়। তাই আজও অনেক নবদম্পতি তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে চিমনি ঝাড়ুদার ভাড়া করে নিয়ে আসে, যারা দেখতে ঠিক অতীতের ঝাড়ুদারদের মতো।

ফাঁসির দড়ি

ফাঁসির দড়ি; Source: Shutterstock.com

সবেমাত্র ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো। মৃতদেহটিকে ফাঁসির দড়ি থেকে নামানো মাত্রই কাড়াকাড়ি পড়ে গেলো ফাঁসির দড়িটি নিয়ে। এমন অভিশপ্ত ফাঁসির দড়ি নিয়েও মানুষের মধ্যে এমন আগ্রহ আপনাকে অবাক করতে পারে, কিন্তু মধ্যযুগে এটি বিবেচিত হতো সৌভাগ্যের ও রোগ নিরাময়ের বিশেষ মাধ্যম হিসেবে। মধ্যযুগে তখনো ইউরোপে জনসম্মুখে ফাঁসি কার্যকরের প্রচলন ছিলো, সেই সাথে তখন দারুণ মূল্যবান ছিলো ফাঁসি কার্যকরে ব্যবহৃত দড়ি।

লোকে বিশ্বাস করতো, এই দড়ির বিশেষ ও জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে। সচরাচর যেহেতু ফাঁসি কার্যকর হয় না, তাই এমন দড়ি পাওয়া একটু কষ্টকর ছিলো বটে। অনেক জল্লাদ এই দড়ি টুকরো টুকরো করে আগ্রহীদের মাঝে বিক্রি করতো, এই দড়ি এতটাই মূল্যবান হয়ে উঠেছিলো তখন। মানুষ জ্বর ও মাথা ব্যথার মতো সাধারণ রোগ সারানোর নিমিত্তে গলায় ফাঁসির দড়ি পেঁচিয়ে রাখতো তখন। তবে এটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিলো জুয়াড়িদের মধ্যে, যাদের ভাগ্যের সহায়তা একটু বেশিই দরকার ছিলো। তাছাড়া অনেকেই মনে করতো, নিজের সাথে এই দড়ি বা দড়ির অংশবিশেষ থাকলে তাদের নারী ভাগ্য ভালো হবে।

নবজাতকের অ্যামনিওটিক ঝিল্লী

সদ্য ভূমিষ্ট শিশু; Source: babyology.com.au

পৃথিবীতে নতুন জন্মানো প্রতি ৮০,০০০ বাচ্চার মধ্যে একজনেরও কম শিশুর মাথা বা মুখ কিংবা উভয়ই ঢাকা থাকে একধরনের অ্যামনিওটিক ঝিল্লীর আবরণে। এটি ক্ষতিকর নয় এবং নবজাতকের মুখ বা মাথা থেকে সাথে সাথে অপসারণ করা হয়। যেহেতু এটি একটি বিরল বৈশিষ্ট্য, সেহেতু এটিকে ঘিরে রহস্যময় উপকথা ও কুসংস্কার প্রচলিত থাকবে তা খুবই স্বাভাবিক। ইতিহাস জুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সমাজে এটি নিয়ে নানা রকমের গল্প ও কুসংস্কার প্রচলিত ছিলো।

প্রাচীন রোমে নবজাতকের বিরল এই ঝিল্লীটিকে দেখা হতো বিশেষ নজরে। তারা মনে করতো যার কাছে বিশেষ এই ঝিল্লীটি থাকবে সে হবে বিশেষ সৌভাগ্যের অধিকারী। উকিলদের মধ্যে প্রবল বিশ্বাস ছিলো যে, যদি তাদের কাছে এটি থাকে তাহলে তা মামলা জিততে সহায়তা করবে। রোমের ধাত্রীরা অনেক সময় নবজাতকের জন্মের পর এই ঝিল্লী চুরি করে চড়া দামে বিক্রি করে দিতো। ধীরে ধীরে এই বিশ্বাস প্রাচীন রোম থেকে সম্প্রসারিত হয়েছে আইসল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও ডেনমার্কেও।

অনেকে বিশ্বাস করতেন যে, এই ঝিল্লীটি ম্যালেরিয়া সারানোর ক্ষমতা রাখে, এমনকি মৃত্যু পথযাত্রী রোগীর মাথার নিচে পর্দাটি রাখা হলে তার পরলোকগমন সহজ হবে বলেও মনে করা হতো। নবজাতকের জন্মের সময়ের বিশেষ দুষ্প্রাপ্য ঝিল্লী যে শুভ লক্ষণ ও সৌভাগ্যের প্রতীক তা উনিশ শতকে ইউরোপ জুড়ে বেশ প্রচলিত ছিলো। জাহাজের নাবিকরা এটি নিজেদের কাছে রাখতো, কারণ তারা বিশ্বাস করতো, এটি তাদের ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।

বিজোও

খাদ্যের অপাচ্য অংশের সংমিশ্রণে তৈরি পাথর; Source: hp-lexicon.org

ছাগল, ভেড়া, হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর পাকস্থলীতে খাবারের অপাচ্য অংশের সংমিশ্রণে একধরনের শক্ত পাথর পাওয়া যায়, যা বিজোও হিসেবে পরিচিত। ১০০০ সালে, এই পাথরের উল্লেখ সর্বপ্রথম পাওয়া যায় মধ্যপ্রাচ্যের চিকিৎসকদের বর্ণনায়। অশুভ শক্তি দূরীকরণে ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে এটি এশিয়া ও ইউরোপ জুড়ে বেশ প্রচলিত। কিছু প্রাণী বিষাক্ত সাপ খায়। তাই অনেক মনে করেন, পাথরটির বিষের বিরুদ্ধে কাজ করার ক্ষমতা রয়েছে।

অনেকেই এই পাথর চূর্ণ করে নিজেদের কাছে রাখতো পানীয়তে বিষ আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য। পাথরটি আমাশয়, মৃগীরোগ ও এমনকি প্লেগের বিরুদ্ধে কার্যকর বলেও বিশ্বাস করা হতো। চৌদ্দ শতকে ইংল্যান্ডে আক্রান্ত প্লেগ রোগীর শরীরে এই পাথর রাখা হতো এই আশায় যে এতে রোগীর ক্ষত ভালো হয়ে যাবে এবং প্লেগ নিরাময়ে এটি সাহায্য করবে।

স্বস্তিকা চিহ্ন

স্বস্তিকা প্রতীক খোদাইকৃত একটি হিন্দু মন্দির; Source: knowledgeofindia.com

হিটলারের নাৎসি পার্টি তাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করতো স্বস্তিকা চিহ্নটিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই প্রতীকটির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়। একসময় যা সৌভাগ্যের প্রতীক ছিলো, বর্তমানে বিশাল সংখ্যক মানুষ সেই প্রতীকটিকে দেখে প্রবল ঘৃণার চোখে। এমনকি জার্মানিতে স্বস্তিকা প্রতীকটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যা-ই হোক, স্বস্তিকা চিহ্নটি হিন্দুবৌদ্ধ উভয় ধর্মেরই একটি সুপ্রাচীন পবিত্র প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সংস্কৃত এই শব্দটির অনুবাদ করলে মোটামুটি যে অর্থ দাঁড়ায় তা হলো, ‘মঙ্গল’ বা ‘কল্যাণ’।

নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারে দেখা যায় যে, উনিশ শতকের শুরুর দিকে চিহ্নটি সৌভাগ্যের বা মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে পশ্চিমা দেশগুলোতে বেশ দ্রুত প্রসারিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে স্বস্তিকা চিহ্ন প্রায় সবকিছুতে দৃশ্যমান হয়ে উঠে কল্যাণ বা শুভ লক্ষণের প্রতীক হিসেবে, কোকা-কোলা বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে, খাবারের প্যাকেট, বিমান, প্রসাধনী এবং এমনকি কানাডার হকি দলের জার্সিতেও জায়গা করে নেয় প্রতীকটি। বিশ্বজুড়ে হিটলারের আগ্রাসনের শুরুর পর থেকেই বদলে যেতে থাকে চিহ্নটির সুপ্রাচীন প্রচলিত অর্থ। অবশ্য পবিত্র ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে পৃথিবীর অনেক স্থানে এটি এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফিচার ইমেজ: nydailynews.com