গত বছর সেরা সহ-অভিনেত্রী হিসেবে অস্কারের মতো বিশ্বসেরা পুরস্কার জেতেন সুইডেনের এক ফুল বিক্রেতা। ২০১০ সালে সুইডিশ সিনেমায় অভিনয় শুরু করেন তিনি। তবে তার স্বীকৃতি পেয়েছেন হলিউডের ‘দ্য ড্যানিশ গার্ল’ ছবির জন্য। ‘দ্য ড্যানিশ গার্ল’ ছবির সুবাদে অস্কারের মতো দামি পুরস্কার ঝুলিতে ভরে ফেলেছেন সুইডিশ অভিনেত্রী আলিসিয়া ভিকান্দার। গত বছর ২ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেয়েছিলো তার অভিনীত রোমান্টিক ড্রামা ঘরানার ‘দ্য লাইট বিটুইন ওশানস’ ছবিটি।

বর্তমানে হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তিনি। তবে এই তারকা খ্যাতি হুট করেই পেয়ে যান নি তিনি। আলিসিয়া ভিকান্দার অভিনয়ে আসার আগে একজন ফুল বিক্রেতা ছিলেন। তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে জানান, অভিনয়ের আসার আগে জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন তিনি। বাঁচার তাগিদে একসময় ফুলের দোকানেও কাজ করেছেন। অথচ তিনি অস্কারের মতো বড় সম্মানের মালিক। কিন্তু তবুও তিনি নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চিত জীবন কাটান। এর কারণ আর কিছুই না। তিনি ইংরেজী জানেন খুব কম। আর তা হবেই না কেন! জন্ম থেকে শুরু করে বেড়ে ওঠা সবই তো সুইডেনে।

আলিসিয়া ভিকান্দার

হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার জন্য ভাষাটা তার কাছে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল একটা সময়। তার পরেই লন্ডনে পাকাপাকিভাবে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন, যাতে হলিউডে কাজ পেতে অসুবিধে না হয়। ‘দ্য ড্যানিশ গার্ল’-এর জন্য অস্কার পাওয়ার পর ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে তার। তবে ইংরেজিতে এখনও তেমন সাবলীল নন বলে আরও পরিশ্রম করে রপ্ত করতে চান ভাষাটা। ‘দ্য ড্যানিশ গার্ল’ ছবির পর সর্বশেষ ম্যাট ডেমনের সঙ্গে ‘জেসন বোর্ন’ ছবিতে অভিনয় করেছেন আলিসিয়া। এছাড়াও ‘টম্ব রাইডার’ ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তিনি। জনপ্রিয় ভিডিও গেম চরিত্র লারা ক্রফটের চরিত্র পর্দায় প্রথমবারের মতো তুলে ধরেছিলেন অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি। আবারও ফিরছে ‘টম্ব রাইডার’ ছবিটি, তবে এবার চরিত্রে ঘটেছে পরিবর্তন। জোলিকে সরিয়ে অস্কার জয়ী অভিনেত্রী আলিসিয়া ভিকান্দার অভিনয় করতে যাচ্ছেন রোয়ার উথাউং পরিচালিত এই ছবিতে।

শুধু অভিনয়েই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও প্রেম করছেন আলিসিয়া ভিকান্দার। মাইকেল ফাসবেন্ডার একজন জার্মান বংশোদ্ভূত আইরিশ অভিনেতা। তার সঙ্গেই ২০১৪ সাল থেকে প্রেমের সম্পর্কে আছেন এই সুইডিশ অভিনেত্রী। তাদের প্রথম দেখা ২০১৪ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। প্রথম দেখাতেই উৎসবের ডান্স ফ্লোরে ভিকান্দারের আমন্ত্রণে নাচতে যান ফাসবেন্ডার। সেই ঘটনাটা যে দুজনের মনেই বেশ ভালোভাবে দাগ কেটেছিলো। ডান্স ফ্লোর থেকে তাদের গল্পটা কত দূর এগুতো, জানা নেই। কিন্তু গল্পের পূর্ণতার ব্যবস্থা করে দেন ‘দ্য লাইট বিটুইন ওশানস’-এর কাস্টিং ডিরেক্টররা। নায়ক টম শেরবোর্নের চরিত্রে মাইকেল ফাসবেন্ডারকে পছন্দ করেন পরিচালক ডেরেক সিয়ানফ্রান্স। তার আগেই নায়িকা ইসাবেল গ্রেসমার্ক চরিত্রের জন্য কাস্টিং ডিরেক্টরদের তিনি বেছে নেয়া হয় আলিসিয়া ভিকান্দারকে। এরপর সিনেমার পর্দায় যেমন ফাসবেন্ডার-ভিকান্দারের রসায়ন জমে উঠে, জমে উঠে তাদের সত্যিকার প্রেমকাহিনীও।

এদিকে অস্কার পাওয়ার পর ২০১৬ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে আলিসিয়া ভিকান্দার ‘দ্য টকস’ নামের ওয়েবসাইটে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করে দেয়া হলো-

মিস আলিসিয়া, আপনি কি কখনও সিনেমা দেখতে দেখতে কাঁদেন?

আলিসিয়া: আমাকে যদি একটি দুঃখের টিভি সিরিয়ালের সামনে বসিয়ে রাখা হয়, তাহলে হয়ত আমি কাঁদব (হাসি)। তবে আমি তেমন কান্নাকাটি করি না, কারণ আমি নিজেকে একজন দুঃখী মেয়ে মনে করি। আমি অন্যদের তুলনায় যখন তখন কাঁদতে পারি। কেউ যদি আমার সাথে মিষ্টি ব্যবহার করে, তখনও আমি কাঁদি, আবার যখন দেখি একজন আরেকজনের সঙ্গে সুন্দর করে কিছু বলছে, কিংবা সুন্দর করে ব্যবহার করছে, তাহলেও আমার চোখে পানি এসে যায়। আমি যখন বেড়ে উঠছিলাম, আমি আমার মা’কে প্রায়শই কাঁদতে দেখতাম। আমার মা খুব স্পর্শকাতর মহিলা। আমি যখন স্কুলে গান করতাম কিংবা ভালো কিছু করতাম, তিনি এক কোণায় দাঁড়িয়ে কাঁদতেন। তখন আমি আমার মা’কে ধমক দিয়ে চুপ করাতাম। কিন্তু যখন আমার বয়স কুঁড়ি হলী, তখন আমি বুঝতে পারলাম- আমি আসলে দুঃখ পেয়ে কাঁদি না, যেকোনো সুন্দর জিনিস দেখলেই আমার চোখে পানি চলে আসে

আমি তখনই কাঁদি, যখন আমি কোনো খেলোয়াড়কে তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে দেখি!

আলিসিয়া: (হেসে), আমার বেলায়ও তেমন হয়। এবং আমি মনে করি এটি খুবই চমৎকার একটি বিষয়। তবে এটি নিঃসন্দেহে যে কারো ব্যক্তিগত ব্যাপার। যদি আপনি সবার সামনে কাঁদেন, পরিস্থিতি একটি বিব্রতকর হতে পারে। তাই আপনি এই কাজটি সবার সামনে করতে দ্বিধা করবেন। যদি বাইরে এমন কোন ঘটনা ঘটে, সবার উচিত নিজের বাড়িতে গিয়ে চোখের পানি ফেলা!

সত্যি বলতে, আপনার এই আবেগ আপনাকে মানুষের সামনে দুর্বল করে উপস্থাপন করে।

আলিসিয়া: এবং বিশেষ করে সিনেমার ক্ষেত্রে, শুরু থেকেই নাটকীয়তা থাকতে পারে। যেকোনো সিনেমার আবেগঘন দৃশ্য আপনাকে আলোড়িত করতে পারে, যা আপনার মনের ভেতর অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি করে। তাই আমি মনে করি, আবেগী ঘরনার সিনেমা নির্মাণ করা সবচাইতে কঠিন। সত্যি বলতে, কাউকে আলোড়িত করা কিন্তু কোনো সহজ কাজ নয়। হতে পারে, সামান্য সময় আমার চোখে পানি এল, আমি চোখ মুছে আবারও কাহিনিতে মনোযোগ দিলাম। বড় ধরণের কাহিনীর সিনেমায় সাধারণত এমন হয়।

এই ঘরানার সিনেমার কোন জিনিসটি আপনাকে আকর্ষিত করে?

আলিসিয়া: আমি আসলে এমন কাহিনির মধ্যেই বড় হয়েছি। এবং এই ধরণের সিনেমা দেখতেই আমি পছন্দ করি। আমার মতে, ২০১২ সালে ডেরেক সিয়ানফ্রান্স নির্মিত ‘দ্য প্লেস বিয়ন্ড দ্য পাইনস’ ছবিটি আমার দেখা সেরা ছবি। এই বছর আমি তার সঙ্গে ‘দ্য লাইট বিটুইন ওশানস’ ছবিটিতে কাজ করেছি। এখানেও খুব সাহসিকতার সঙ্গে নাটকীয়তা দেখানো হয়েছে। আমার অংশটি যদিও একটু পুরনো ঘরানার হয়েছে, কিন্তু সেটি হয়েছে খুবই চমৎকারভাবে। মনে হবে, আমি এমন ছবি এর আগে কখনও দেখি নি! আমি এই ছবিটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম, শুধুমাত্র এর অসাধারণ চিত্রনাট্যের জন্য। ছবিটিতে এমন কিছু বিষয় আছে, যা সবাই নিজেদের জীবনের সঙ্গে মেলাতে পারবেন।

আমরা জানতে পেরেছি, আপনি দুঃখ বোঝার জন্য নিজের ব্যালে স্কুলের উপস্থিতির কথা মনে করে থাকেন?

আলিসিয়া: ঠিকই শুনেছেন। যখন আমি ব্যালে স্কুলে পড়তাম, আমি পানি খেতে পারতাম না। কারণ আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হত। ডান্স ক্লাসে দিনে সাত ঘন্টা সময় দিতে হত। এরপর আমি সত্যিকার অর্থে বন্ধু খুঁজতে শুরু করি, যা আমাদের স্কুলের নিয়মের বাইরে। আমার মনে আছে, আমি যখন টেকনো ক্লাবের সন্ধান পাই, আমার মনে হয়েছি, ‘এটা আবার কি! এটি তো খুবই চমৎকার।’আমি সেখানে যেতে শুরু করি কারণ আমি নাচ খুব পছন্দ করতাম। আমি কয়েক বছরের জন্য বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেই। আমি মনে করি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া, পাবে গিয়ে সময় ব্যয় করা, কারও সঙ্গে গল্প করার চেয়ে এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমি এটাও মনে করি, কিশোর বয়সে এই ধরণের অভিজ্ঞতা নেয়ার প্রয়োজন আছে। কখনও কখনও ভোর চারটার দিকে আমাকে স্কুলে যেতে হত। তখন আমি আমার লকার রুমে দুই-তিন ঘন্টা ঘুমিয়ে নিতাম, এরপর ব্যালে ক্লাসে যেতাম।

কী ধরনের স্কুলের জন্য আপনাকে ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠতে হত?

আলিসিয়া: না, আমি ক্লাব থেকে সোজা স্কুলে যেতাম। সেই স্কুল দালান পরিস্কারের জন্য মাঝেমধ্যে ৩-৪টার দিকে খুলত। আমরাও তখন পৌঁছুতাম, কারণ অনেক ব্যালে স্টুডেন্ট অন্যদের আসার আগেই স্কুলে পৌঁছুতে চাইত। তবে যদি ট্রেনিংয়ের জন্য ৬টার মধ্যে পৌঁছুনো যেত, তাহলেও চলত। তাই আমি বাড়ি যাওয়া আসার পরিবর্তে সেখানেই ঘুমিয়ে নিতাম। যদিও এটি খুব অদ্ভুত শোনাচ্ছে! তবে আমি জানি, বেশিরভাগ সময় আমি ক্লান্ত থাকতাম, কিংবা আমার শরীর ব্যথা করত, কিন্তু আমি আমার কাজ এভাবে করেই যেতাম।

টম হুপার বলেছিলেন, সিনেমার জন্য ব্যালে ট্রেনিং খুব জরুরি। কারণ আপনাকে শরীরে অসহনীয় ব্যথা নিয়েও হাসিমুখে থাকতে হয়…

আলিসিয়া: তবে আমি মনে করি, ট্রেনিং বন্ধ করার পরেই আপনার শরীর আগের মত স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই যে পরিমাণ কষ্ট আপনি সইতে পারেন, এটি তেমন নয়।

এই ধরণের মনোবল আপনি কি সিনেমার সেটে ব্যবহার করেন?

আলিসিয়া: হ্যাঁ, তবে আমি বলব, মাঝেমধ্যে। স্বাভাবিকভাবেই সিনেমা নির্মাণ করা এতটা সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। আমি একটি সিনেমা করেছিলাম যেখানে দেখানো হয়েছিল গ্রীষ্মকালীন সময়। তখন আমরা জার্মানিতে ছিলাম, এবং আশ্চর্যজনকভাবে তখন প্রতিদিন তাপমাত্রা ছিল ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা সচরাচর হয়ে থাকে না। আর তাই আমরা সত্যিকার অর্থে গ্রীষ্মকালীন সময়ের অভিনয়টি করতে পেরেছিলাম। শুটিংয়ে দেখা যায়, হয়ত ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। অথচ গরমের সময় আমাদের অনেক পরিশ্রম করে অভিনয়ে সেটি দেখানো হয়। কিন্তু সত্যিকার অর্থে আপনি শীতে জমে যাচ্ছেন! আমার বেশিরভাগ সিনেমাতেই আমি এমন অভিনয় করেছি। এই কষ্টটার কারণে আমি ঠাণ্ডার সময়টা ঘৃণা করতে শুরু করি। আমি সুইডেন থেকে এসেছি, আর তাই মনে হয় আমি এমন করে ভাবছি। আমি মনে করি, আমি যে সমস্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করছি, তা আমার মধ্যে অনেকটা পরাবাস্তব অনুভূতি সৃষ্টি করে।

কেন?

আলিসিয়া: আমি আসলে আমার নিজের সঙ্গে সেই চরিত্রকে মেলাতে চাই না। অভিনয়ের দিন থেকে এই ইন্ডাস্ট্রি সুইডেন থেকে অনেক বড়। সুইডেনে আপনি অভিনয়কে পেশা হিসেবে নিতে পারবেন না। যদি নিজেকে অভিনেতা হিসেবে দেখতে চান, আপনাকে মঞ্চে অভিনয় করতে হবে। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন আমার স্বপ্ন ছিল স্টকহোমের রয়েল ড্রামাটিক মঞ্চে আমি অভিনয় করব। তবে সেই সময়টিতে অনেক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। সবাই জিজ্ঞেস করে, বড় হয়ে তুমি জীবনে কি হতে চাও? আমি থিয়েটারে কাজ করতে চাইতাম, কিন্তু সেটি আমাকে কেউ করতে দেয় নি। মানে, আমি তিনবার থিয়েটারে যোগ দিতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি সফল হই নি।

এই সমস্ত প্রত্যাখ্যানের দুঃখ কিভাবে সহ্য করেছেন?

আলিসিয়া: অনেক কঠিন! আমি জানি না আমি কতগুলো অডিশন দিয়েছি, কিন্তু সেগুলো কেউ দেখে নি। এবং তাদের কাছ থেকে আমি কোনো জবাবও পাই নি, যা কিনা সবচেয়ে দুঃসহ! আসলে এটি অনেক কঠিন জগত।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কি এটাকে এখন সহজ মনে হয়?

আলিসিয়া: আমার মা একজন অভিনেত্রী। তিনি আমাকে সবসময় বলতেন, “তুমি কি সত্যিই এটা করতে চাও? কারণ এটা কিন্তু বাস্তব!” যখন আমি সিদ্ধান্ত নিই আমি এই পথেই এগুবো, আমাকে স্বীকার করে নিতে হবে আমি কিন্তু একটি কাজই পাচ্ছি। এরপরের কাজটি পেতে আমাকে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু যখন আপনি এই ক্ষেত্রে সাফল্য পেতে শুরু করবেন, আমি মনে করি এই ধারণাটি আপনার হৃদয়ের ভেতরটি স্পর্শ করবে। আমি কখনও ভাবি নি, ভবিষ্যতে আমি এমন হব। আমি কখনও ভাবি নি, জীবনে একটি সুযোগও পাবো। কিন্তু এখন আমি কাজের জন্য অসংখ্য প্রস্তাব পাই। অনেক বড় নির্মাতা কিংবা অভিনেতাদের সঙ্গে কাজের সুযোগ পাচ্ছি। আর এই সমস্ত কাজের সঙ্গে জড়িত হতে পারা কিন্তু খুবই চমৎকার অভিজ্ঞতা।

তথ্যসূত্র

১) the-talks.com/interview/alicia-vikander

২) en.wikipedia.org/wiki/Alicia_Vikander