চল্লিশের দশক, শহর কোলকাতা৷ মধ্যরাত, একজন কবি এলোমেলো হেঁটে চলছেন৷ কিছু বিচ্ছিন্ন দৃশ্য একটি কবিতায় সাজাবেন বলে কবির কী বিশাল আয়োজন! রাতের পথে শব্দের সঙ্গ, আচমকা জন্ম এক নতুন কবিতার৷ কবিতার নাম ‘ঘোড়া’, কবি জীবনানন্দ দাশ ৷

“আমরা যাইনি ম’রে আজো-
তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়ঃ
মহীনের ঘোড়াগুলি ঘাস খায়
কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে,
প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেন-
এখনও ঘাসের লোভে চরে
পৃথিবীর কিমাকার ডাইনামোর ’পরে।”

জীবনানন্দ দাশ (ছবিসূত্র: Wikipedia)

তারপর চলে গিয়েছে অনেকদিন৷ সত্তরের দশক ছুঁই ছুঁই সময়ে বাংলা সংগীত জগতে চলছে ক্ল্যাসিক্যালের জয়জয়কার৷ চারদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের মতন প্রমুখ শিল্পীরা৷ মানুষ আটকে আছে চটকদার বাংলা সিনেমার গতানুগতিক সংগীত ধারায়৷ স্থবিরতাটা যেন সবাই টের পাচ্ছিলেন৷ কিন্তু জনপ্রিয়তার কথাটি আমলে নিয়ে কেউই জায়গা থেকে সরতে পারছিলেন না৷

বিশ্ব সংগীত যেখানে সময়কে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে বাংলা সঙ্গীতের এমন হতাশাজনক স্থবিরতা জনৈক তরুণ গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে প্রচন্ড ভাবিয়ে তুলেছিলো৷ গৌতমদের একটি নিজস্ব গানের দল রয়েছে৷ বন্ধুরা মিলে বানিয়েছেন, যার কোনো নাম নেই৷ একবার তো বিব্রতকর অবস্থা; নাকতলার কোনো এক অনুষ্ঠানে তারা গাইতে উঠেছেন, অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের একজন জিজ্ঞেস করলেন- “দলের কী নাম?” থতমত সবাই, তাঁদেরই কেউ একজন কাঁচুমাঁচু স্বরে বললেন- “দলের নাম ‘সপ্তর্ষী’৷”

ব্যান্ড মহীনের ঘোড়াগুলির পরিবেশনা (ছবিসূত্র: Wikipedia)

সে যাত্রায় রক্ষা হলো কোনোমতে৷ তবে তারপরই শিরোনামহীন সেই দলের নাম হয়ে গেলো সপ্তর্ষী৷ অবশ্য তাতে কোনো লাভ হলো না, কয়েকদিন পরেই সে নাম পাল্টিয়ে নতুন নাম দেয়া হলো ‘তীরন্দাজ’৷ তীরন্দাজ নামেও কেউ যেনো সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না৷ রীতিমত অস্বস্তিতে পড়ে আরেকদফা নাম পাল্টাতে হলো৷ এবারের নাম ‘গৌতম চট্টোপাধ্যায় বিএসসি ও সম্প্রদায়’৷

এমন করেই সব চলছিলো৷ এক রাতে দলের সবাই রাস্তায় হাঁটতে বেড়িয়েছেন, দলের এক সদস্য রঞ্জন ঘোষাল আবৃত্তি করছিলেন জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’ কাব্যগ্রন্থ থেকে ‘ঘোড়া’ কবিতাটি৷ কবিতা শেষ হলে রঞ্জন প্রস্তাব করলেন- “দলের নাম মহীনের ঘোড়াগুলি রাখলে কেমন হয়?” গৌতম যেনো সেটির অপেক্ষাতেই ছিলেন৷ একলাফে লুফে নিলেন, উত্তর দিলেন- “এক্ষুনি ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।” সেই ১৯৭৪ সাল থেকেই দলের নাম ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’, যেটি এ যাবৎকালে বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে সবচাইতে জনপ্রিয় ব্যান্ডদের একটি ৷

কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, তৎকালীন সময়ে মহীনের ঘোড়াগুলির জনপ্রিয়তা এখনকার মতন এত তুঙ্গে ছিলো না৷ ষাটের দশকে বব ডিলানের হাত ধরে যে ‘আরবান ফোক’ ধারার প্রচলন ঘটেছিলো, অনেকে মহীনের ঘোড়াগুলিকে বাংলা গানের জগতে সে ধারারই অনুসারী বলে থাকেন৷ রাজনীতি, দারিদ্র্য, অর্থনীতি, অন্যায়-অবিচার, বিপ্লব, ভালোবাসা, একাকীত্ব, স্বাধীনতা, ভিক্ষাবৃত্তি, যৌনপেশাসহ আরো বহুমুখী বিষয় নিয়ে গান রচনা করেছে মহীনের ঘোড়াগুলি।

গৌতমের বাম আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিলো। তিনি বিখ্যাত নকশাল আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন৷ তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তা মহীনের ঘোড়াগুলির গানে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে৷ উল্লেখ্য, তাঁদের গানে তাঁরা নির্দিষ্ট কোনো সংগীত ধারাকে অনুসরণ না করে বরং বিভিন্ন ধারার পরীক্ষামূলক চর্চায় মনোনিবেশ করেছেন৷ সেটিই একসময় তাঁদের ধারা হয়ে ওঠে৷ কিন্তু তখনকার সময়ে শ্রোতারা রোমান্টিক সুরেলা ঘরানার গানগুলোতে এত বেশি সম্মোহিত ছিলেন যে, তাঁদের পক্ষে নতুন কোনো ধারার গান গ্রহণ করা সম্ভবই হয়ে ওঠেনি৷

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়- শ্রোতাদের পক্ষ থেকে প্রায়ই ব্যান্ডের সদস্যদের পোস্টবক্সে বিরক্তিসূচক চিঠি আসতো৷ এর ফলে শুরু করার মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে আশির দশকের গোড়ার দিকে এই ব্যান্ডটি ভেঙ্গে যায়৷ ব্যান্ড বন্ধ হবার পর ব্যান্ডের সকল সদস্য যে যার মতন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন৷ বিভিন্ন কর্মজীবনে মনোনিবেশ করার আগে তাঁদের যে তিনটি অ্যালবাম রেকর্ড হয়েছিলো সেগুলো যথাক্রমে- সংবিগ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক, অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব, দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি৷ শোনা যায়, শুধু গানেই নয়, স্টেজ শো-গুলোতেও তাঁদের উপস্থাপনা ছিলো ব্যতিক্রমধর্মী৷ তাঁদের কনসার্টের টিকিটগুলো ছিলো অন্যরকম৷ কখনো সেগুলো ছিলো ডাকটিকিট সদৃশ, কখনো সেখানে থাকতো সকল সদস্যের আঙুলের ছাঁপ৷

মহীনের ঘোড়াগুলির একটি কনসার্টের টিকেট (ছবিসূত্র: doridro.com)

‘৮১ সালে ভেঙে যাবার পর আশির দশকের শেষ দিকে প্রেসিডেন্সী কলেজের এক তরুণ, নাম সুব্রত ঘোষাল, মহীনের ঘোড়াগুলির ‘ভালো লাগে’ গানটি শুনে এঁদের প্রতি তীব্র আগ্রহবোধ করেন৷ তিনি গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে খুঁজে বের করে দেখা করেন এবং গৌতমের সঙ্গে যাবতীয় আলোচনার পর মহীনের ঘোড়াগুলিকে পুনর্গঠনের প্রস্তাব রাখেন৷ সুব্রতর সঙ্গে জ্যামিং এর পর গৌতম নিজেও যেনো ভেঙে যাওয়া মহীনের ঘোড়াগুলিকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব অনুভব করেছিলেন৷ যে গানগুলোকে লোকে প্রত্যাখ্যান করেছিলো, গৌতম সনাতনীয় সঙ্গীত ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে সে গানগুলোকেই ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে নতুন করে মহীনের ঘোড়াগুলিকে সামনে আনার স্বপ্ন সাজান৷ ১৯৯৫ সালের বইমেলায় তাঁদের অ্যালবাম ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ রিলিজ করে সে স্বপ্ন পূরণ করেন৷ তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি৷ গানগুলো গণজোয়ারকে এতই প্রভাবিত করেছিলো যে, অল্প দিনেই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ কিংবদন্তী ব্যান্ড হিসেবে মানুষের মনে জায়গা করে নেয় এবং সে জোয়ার আজও বহমান৷

জলরঙে মহীনের ঘোড়াগুলি (ছবিসূত্র: dammygraphy.wordpress.com)

নাগরিক অধিকারকে অনুভব করে জীবনের যাবতীয় টানাপোড়ন গান গেয়ে বর্ণনা করার ক্ষমতা ছিলো মহীনের ঘোড়াগুলির৷ একদিকে প্রেম, একদিকে বৈরাগ্য; এক দিকে হতাশা, অন্যদিকে প্রাপ্তির হিসেব সাজানোয় বাংলা গানে মহীনের ঘোড়াগুলির ছিলো যশস্বী ভূমিকা৷ এ জন্যই বুঝি এখনো তাঁদের গ্রহণযোগ্যতা একটুও কমেনি; বরং দিনকে দিন তাঁরা যেনো আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন নাগরিক জীবনযাত্রায়৷

একটি অ্যালবাম কভার (ছবিসূত্র: Wikipedia)

এরপর ১৯৯৬ এবং ১৯৯৭ সালে মহীনের ঘোড়াগুলি সম্পাদিত ৫ম ও ৬ষ্ঠ অ্যালবাম ‘ঝরা সময়ের গান’ ও ‘মায়া বাজারে আসে’৷ ১৯৯৯ সালে, যেবার ‘খ্যাপার গান’ অ্যালবামটি রিলিজ হলো, সে বছরটায় মহীনের ঘোড়াগুলি তথা পুরো বাংলা আধুনিক সংগীতের ইতিহাসের এক অপূরণীয় ক্ষতি ঘটে গেলো৷ গৌতম হার্ট এ্যাটাকে মারা গেলেন ৷

গৌতম চট্টোপাধ্যায় (ছবিসূত্র: Wikipedia)

ব্যান্ডে গৌতম গাইতেন, লীড গিটার ও স্যাক্সোফোন হাতে তাঁকে দেখা যেতো৷ বিশ্বনাথ ড্রামে ছিলেন, প্রদীপ বাজাতেন বাঁশি৷ এব্রাহাম কখনো পিয়ানো, কখনো ভায়োলিন ছিলেন৷ রঞ্জন দেখতেন মিডিয়া সম্পর্কের বিষয়টা৷ রাজার পর তাপস ও তপেশ গীটার ধরেছিলেন, আর এসব নিয়ে গোটা মহীনের ঘোড়াগুলি; যারা গানে গানে স্বপ্ন দেখতেন৷

প্রকৃতিকে কাছাকাছি রেখে নাগরিক গল্পগুলো অকপটে বলে যাবার শক্তি বা সাহস সবার ছিলো না৷ মহীনের ঘোড়াগুলি সেটুকু করেছে, বাংলা গানকে দিয়েছে অন্য মাত্রা৷ এখনো আমরা আমাদের যাবতীয় অনুভূতি বর্ণনায় মহীনের ঘোড়াগুলির কাছে হাত পাততে পারি, এটুকু একটি ব্যান্ডের জন্য কম কিছু কি?

ধন্যবাদ, মহীনের ঘোড়াগুলি৷ পাশে থেকে, আমাদের হয়ে গাইবার জন্য।

তথ্যসূত্র

১. sites.google.com/site/mohaprithibi/Home/sattitarartimir/ghora

২. bn.wikipedia.org/wiki/মহীনের_ঘোড়াগুলি

৩. somewhereinblog.net/mobile/blog/benqt60/29522670

৪. sachalayatan.com/guest_writer/49974