“আয় আয় চাঁদ মামা
টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ
টিপ দিয়ে যা”

পৃথিবীর প্রতিটা কোণে প্রতিটা শিশুর অনেক আকাঙ্ক্ষার, অনেক আনন্দের বস্তু এই চাঁদ। শুধু শিশু কেন, রাতের আকাশে উজ্জ্বল রূপালি ওই বিস্ময়কে ঘিরে যুগে যুগে এই পৃথিবীর সকল মানুষের কতো আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনা, ভালোবাসা গড়ে উঠেছে, গড়ে উঠেছে কতো গল্প, কথা, রূপকথা। পৃথিবী থেকে আনুমানিক ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার দূরে থাকা পৃথিবীর এই একমাত্র উপগ্রহ তার নিজের সমস্ত রহস্য নিয়ে সমগ্র পৃথিবীবাসীর জীবনে ও মনে নিজের একটা স্থান নিয়ে থাকেই, তা সচেতন বা অবচেতন, যেভাবেই হোক না কেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই চাঁদটাই কোথাও না কোথাও পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে। সৃষ্টির সেই শুরু থেকে ওই চাঁদের প্রতি মুগ্ধতা থেকে যুগে যুগে পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হয়েছে হাজারো গল্প-কাহিনী-রূপকথার।

চিরকালের রহস্য এই চাঁদ : liveinternet.ru

আমাদের দেশে সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে এখনো শিশুরা এক চাঁদের বুড়ির গল্প শুনে বড় হয়। কচিকাঁচার দল গোল চাঁদের বুকে আলো-ছায়ায় এখনো খোঁজে বুড়ি আর তার চরকাকে, কম হলেও ইট-কাঠের এই প্রযুক্তির যুগে এখনো দেখা যায় শিশু কোলে মায়েদের চাঁদ দেখিয়ে গল্প বলতে, “ওইখানে থাকে এক চাঁদের বুড়ি…সাদা তার লম্বা চুল.. সাদা তার মুখ.. ওইখানেই বসে সে বোনে সুতা  রাতদিন …।”  কিংবা মায়ের সাথে সাথে শিশুও ছড়া কাটে-

“চাঁদ উঠেছে
ফুল ফুটেছে
কদমতলায় কে?
হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে
খুকুমণির বে।”

এভাবে এই বাংলা সংস্কৃতিতেও বিশাল জায়গা নিয়ে আছে চাঁদ, গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত রয়েছে চাঁদকে নিয়ে অনেক গল্প, প্রচলিত আছে নানা ধারণা, বিশ্বাস।

এই চাঁদকে নিয়ে পৃথিবীর অন্যসব দেশের অন্যরকম সব রূপকথা আর গল্প নিয়ে সাজানো আমাদের আজকের আয়োজন।

পূর্ণচন্দ্র আপনাকে পাগলও করে দিতে পারে

অনেকেই হাসতে পারেন শুনে, কিন্তু সত্যি এরকমই ভাবা হতো আগে পৃথিবীর অনেক জায়গায়। পূর্ণচন্দ্রের প্রভাবেই পূর্ণিমার রাতে মানুষ জড়িয়ে পড়তো বিভিন্ন অদ্ভুত, পাগলাটে এমনকি অপরাধমূলক কর্মকান্ডে- এমন ধারণা ছিলো বিভিন্ন দেশে ও সমাজে। এই কাজগুলোর মধ্যে আছে হঠাৎ অদ্ভুত ব্যবহার করতে শুরু করা, ঘুমের মধ্যে হাঁটা, হিংসাত্মক হয়ে ওঠা, আছে আত্মহত্যা আর বেআইনী কাজের কথাও।

এই অবস্থাকে সাধারণত বলা হয় চন্দ্রগ্রস্থ বা চন্দ্রাহত (lunatic)। এমনকি এই অষ্টাদশ শতকে এসেও ইংল্যান্ডে খুনের বিচারের ক্ষেত্রে অপরাধী অপেক্ষাকৃত কম শাস্তির জন্য আশা করতে পারতো যদি অপরাধটি কোনো পূর্ণচন্দ্রের রাতে ঘটে থাকে তাহলে। আশ্চর্য বৈ কি!

মানব বিশ্বাসে পাগলামীর উপর ছিল চাঁদের প্রভাব : twitter.com

হাজার হাজার বছর ধরে চিকিৎসক এবং মানুষের মন নিয়ে গবেষণাকারীরা বিশ্বাস করতো মানসিক সমস্যা আর চাঁদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক মনে করা হয় যাঁকে, সেই হিপোক্রেটিস খ্রীস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে বলেছিলেন, “পূর্ণচন্দ্রের রাতে যে আতঙ্ক, ভয় আর পাগলামীতে আক্রান্ত হয় তাকে চাঁদের দেবী দেখা দেয়।” উল্লেখ্য, রোমান পুরাণ অনুসারে, চাঁদের দেবী লুনা প্রতি রাতে অন্ধকার আকাশে তাঁর রুপালী বাহন নিয়ে ভ্রমণে বের হন।

আধুনিক বিজ্ঞান এই সমস্ত ধারণা অস্বীকার করে, যদিও অনেকেই এখনো চন্দ্রগ্রস্থ হওয়ার বিষয়টা পুরোপুরি অবিশ্বাস করে না।

সেই যে একটা খরগোশ থাকে চাঁদে

এটা আরেকটা খুব মজার রূপকথা। পৃথিবীর প্রধান সংস্কৃতিগুলোর অনেকগুলোতেই যেমন, বৌদ্ধ সংস্কৃতি এবং আমেরিকার লোকসংস্কৃতিতে আছে চাঁদের বুকে এক বালিকা আর তার খরগোশের বাস করার মজার এক গল্প। আবার এক বুড়ো তার কুকুর নিয়ে চাঁদে থাকে এমন গল্পও আছে পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু খরগোশের গল্পটাই মানুষের মন জয় করে বেশী। এতোটাই জনপ্রিয় এই গল্প যে, অ্যাপোলো-১১ চাঁদে নামার আগে কন্ট্রোল রুম থেকে মজা করে বলা হয়েছিলো-“দেখো তো আছে নাকি ওরকম কিছু।” কলিন্স উত্তর পাঠিয়েছিলেন –“আচ্ছা। আমরা খরগোশওয়ালা মেয়েটার জন্যে জোর অনুসন্ধান চালাবো।

“…জোর অনুসন্ধান চালাবো।” : enterpreneur.com

বিশেষ করে চীনে এই জনপ্রিয় পুরাকথাটি শত শত বছর ধরে প্রচলিত আছে। পুরাকথাটা অনেকটা এরকম যে চ্যাং নামের এক চীনা মেয়ে আর তার স্বামী অমরত্ব লাভ করেছিলো। তারা তাদের অমরত্বের রহস্যকে একটা ওষুধে পরিণত করেছিলো। কিন্তু লোভে পড়ে মেয়েটি নিজে এতো বেশী ওষুধ নিয়েছিল যে তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রূপে সে চাঁদে গিয়ে পড়লো আর তারপর থেকে অনন্তকালের জন্য সেখানে আটকা পড়ে গেল। আর যাওয়ার সময় চ্যাং শুধুমাত্র তার পোষা খরগোশটাকে সাথে নিতে পেরেছিল বলেই খরগোশটা তার সাথে চিরকাল থেকে গেছে।

সেই বুড়ো বা সেই খরগোশ, সবে মিলেমিশে আছে রহস্যময় চাঁদের রুপকথায় : youtube.com

জাপান আর কোরিয়াতেও চাঁদকে নিয়ে অনেকটা একই রকম লোককথার প্রচলন দেখা যায়।

এক ভয়ংকর চাঁদ

আলাস্কা, গ্রীনল্যান্ডের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরের অধিবাসীদের মধ্যে শোনা যায় চাঁদকে নিয়ে ভয়ংকর এক লোককথা। তারা বিশ্বাস করে যে, চাঁদের দেবতা অ্যানিনগান তার বোন সূর্য দেবীর সতীত্ব নাশ করার চেষ্টা করে। আরো ভয়ংকর কথা হল তারা বিশ্বাস করে অ্যানিনগান এখনো তাঁর বোনকে নিজের বশে নিয়ে আসার চেষ্টা করে যাচ্ছে। আর এজন্যেই প্রতিদিন তিনি সূর্যের পিছু পিছু এসে হাজির হন।

রোজ সূর্যের পেছনে চন্দ্রের আগমন : playbuzz.com

মাতৃত্ব ও চাঁদ

খুব সম্ভবত চাঁদের পরিক্রমণ চক্র আর নারীদের শারীরবৃত্তীয় চক্র সময়ের একই সময়ের ব্যবধানে সম্পন্ন হয় বলেই প্রাচীনকালের মানুষদের মধ্যে এই ধারণা প্রচলিত হয় যে চাঁদের সাথে মেয়েদের গর্ভধারণের ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। এমনকি ১৯৫০ সালে চেক ডাক্তার ইউজিন জোনাস প্রাচীন জ্যোতিষবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করে জানান যে চন্দ্র পরিক্রমণের কিছু নির্দিষ্ট সময়ে মেয়েদের গর্ভধারণের ক্ষমতা থাকে সবচেয়ে বেশি এবং এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে তিনি পরিবার গঠনের একটা সম্পূর্ণ পদ্ধতি প্রদান করেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা এই ধারনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক বলে থাকে কিন্তু তবুও এখনো অনেক ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মেয়েদের গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের উপর চাঁদের প্রভাবকে বেশ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়।

চাঁদের সাথে অভিমান

নিউজিল্যান্ডের মাওরি উপজাতিদের মধ্যে এক তরুণীর চাঁদের ওপর অভিমান নিয়ে দারুণ এক গল্প প্রচলিত আছে। এই গল্পে বলা হয় যে, রোনা নামের এক তরুণী একবার চন্দ্রদেবতাকে অসন্তুষ্ট করে এবং রেগে গিয়ে চাঁদের দেবতা তাকে সেই থেকে চাঁদেই আটকে রাখে। এই রূপকথা অনুসারে তাকে নিয়ে যাওয়ার সময় মেয়েটি একটা গাছকে আঁকড়িয়ে ধরেছিলো এবং শেষ পর্যন্ত এই গাছকে মেয়েটি টেনে চাঁদে নিয়ে যায়। মাওরি উপজাতির লোকেরা এটা বিশ্বাস করে যে, এই গাছ মূলত মেয়েদের উর্বরতার প্রতীক। আর এভাবে তাদের মধ্যেও মেয়েদের উর্বরতার সাথে চাঁদের সম্পর্কের ধারণাটা প্রচলিত আছে।

ভালোবাসাময় চাঁদ

চাঁদকে নিয়ে এটাই বোধহয় সবচেয়ে সুন্দর লোককথা যা প্রচলিত আছে আফ্রিকায়। দুজন চিরকালের প্রেমিক-প্রেমিকাকে নিয়ে এই গল্প যাতে বলা হয় ম্যেয়ু হলেন চাঁদের দেবতা এবং তিনি চিরকাল সূর্যের দেবী লিজার সাথে অবিচ্ছিন্ন প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ। ওখানকার মানুষ বিশ্বাস করে যে, আসলে চন্দ্রগ্রহণ আর সূর্যগ্রহণ হলো এই দুই অপার্থিব, বিশুদ্ধ আত্মার মিলনের মূহুর্ত। এই লোককথা আসলে চন্দ্র, সূর্য, এই মহাবিশ্ব আর এর মাঝে বিরাজমান ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষার অসীম শক্তির কথাই বলে।

সবচেয়ে পরিচিত সেই নেকড়েমানব আর চাঁদ

সিনেমা, গল্প-উপন্যাস, লোককথায় এখন সবচেয়ে পরিচিত চাঁদ আর নেকড়েমানবের এই গল্প। এই বিশ্বাস অনুসারে নেকড়েমানব বা ওয়্যারওলফ আসলে একদম মানুষের মতো দেখতে এক প্রাণী যারা সব সময় মানুষের মতো করে জীবনধারণ করলেও পূর্ণচন্দ্রের রাতে তারা হিংস্র নেকড়েতে পরিণত হয়। ভিন্ন ভিন্ন সিনেমা আর বইতে এসব নেকড়েমানবদের ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখানো হয়। তবে সকল ক্ষেত্রেই কোথাও না কোথাও তাদের জীবন চাঁদের সাথে জড়িত।

শুধুই গর্জন নাকি নেকড়ের কান্না? : keywordteam.net

নিঃসন্দেহে বলা যায়, আকাশের ওই এক চিলতে চাঁদ যেমন মনোমুগ্ধকর তেমনি সহজেই মানুষের মন কেড়ে নিতে পারে পৃথিবীর কোণায় কোণায় ছড়িয়ে থাকা চাঁদকে নিয়ে দারুণ এসব লোককথা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কারণে যদিও আস্তে আস্তে মানুষের সংস্কৃতি থেকে হালকা হয়ে যাচ্ছে এসব লোককথার ছাপ, কিন্তু তাই বলে এসব রূপকথার অমলিন সৌন্দর্য ফিঁকে হয়নি সামান্যও।

তথ্যসূত্র

১) history.com/news/history-lists/7-unusual-myths-and-theories-about-the-moon

২) ancient-origins.net/news-general-myths-legends/exploring-ancient-lunar-myths-and-legends-supermoon-set-dazzle-to

৩) exemplore.com/misc/10-Interesting-Myths-and-Legends-About-The-Moon

৪) thoughtco.com/lunar-folklore-2562381

৫) list25.com/25-full-moon-myths-and-facts/7 Unusual Myths and Theories About the Moon – History ListsExplore some of the theories earthlings have entertained about the moon throughout history.history.com