মৃত্যুকে মানবজাতি ভয় পেয়ে আসছে সভ্যতার শুরু থেকেই, করে আসছে হাজার হাজার জল্পনা কল্পনা। সব ধর্মেই মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে স্বীয় ধারণা লিপিবদ্ধ আছে। দর্শনও মৃত্যুকে তাদের ব্যাপ্তির বাইরে রাখেনি, অনেক দার্শনিক অনেক মতামত দিয়ে গেছেন মৃত্যু নিয়ে, বের করার চেষ্টা করেছেন আমাদের মৃত্যুভয়ের স্বরূপ। তাদের মধ্যে অনেক দার্শনিকই বলেছেন, মৃত্যুকে আসলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই কথা বলার পেছনে তাদের যুক্তি কী ছিল? তা-ই দেখব আমরা এই প্রবন্ধে।

সক্রেটিসের নির্ভয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া ; image source: wikimedia commons

সক্রেটিস : মৃত্যুকে হাসিমুখে গ্রহণ করলেন যিনি

খ্রিস্টপূর্ব ৩৯৯ সাল। এথেন্সের সরকারি ঈশ্বরদেরকে অস্বীকার করার জন্য, তরুণ সমাজকে কলুষিত করার জন্য আর উচ্চতর কর্তৃপক্ষকে পরোয়া না করবার জন্য সক্রেটিসকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, মৃত্যু যখন তাঁর সামনে দাঁড়ানো, তখনও সক্রেটিসের মুখে প্রশান্তির ছাপ, ভয়ের ছিটেফোঁটাও নেই। কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব?

সক্রেটিস ছিলেন একজন দার্শনিক, তিনি তার নিজস্ব যুক্তি দিয়ে মৃত্যুভয়কে হার মানিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, মৃত্যুর স্বরূপ আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয় তা সত্য, কিন্তু মৃত্যুর পরে কী হবে তাকে আমরা দুটো সম্ভাবনায় সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারি। তার মতে, এগুলোর কোনোটাই ভীতিকর কিছু নয়।

তিনি বললেন, হয় মৃত্যু একটি স্বপ্নহীন চিরস্থায়ী ঘুম, নয় নতুন আরেকটি জীবনের শুরু। এ দুটো ছাড়া আর কী-ই বা হবে! ঘুম নিয়ে তো আর ভয় পাবার কিছু নেই, বরং এত কর্মবহুল জীবনের পর বিশ্রামটা অনেকটা প্রয়োজনই। আর নতুন আরেকটি জীবনও সক্রেটিসের কাছে ভালোই মনে হয়েছিল, কারণ অবশ্যই পূর্বে গত হওয়া মানুষদের দেখা পাওয়া যাবে সেখানে।

সক্রেটিসের কল্পিত এই পরকালের নাম হেডিস, যে জগতটা অনেকটা এথেন্সের মতই। কিন্তু এথেন্সে যেমন মানুষ তার দৈহিক রূপ নিয়ে বাস করতো, এখানে মানুষ বাস করবে শুধুই মন হিসেবে। কারণ মৃত্যু যদি ঘুম না হয়ে আরেকটি জীবন হয়, সেই জীবনে তো আর আমাদের দেহ থাকা সম্ভব নয়- দেহের তো ইতোমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে, পড়ে আছে পৃথিবীতেই।

সক্রেটিসের কাছে এই ব্যাপারটা বেশ আকর্ষণীয় ছিল, কারণ দেহকে সক্রেটিসের মনে হত উটকো ঝামেলা। একে খাওয়াতে হয়, ঘুম পাড়াতে হয়, কত কিছু দিতে হয়! তাই এই দেহহীন পরকালে এসে সক্রেটিস শুধু ইতিহাসের সেরা সেরা চিন্তাবিদদের সাথে দার্শনিক আড্ডায় মজে থাকবেন সারাদিন, এটাই ছিল তাঁর পরিকল্পনা, আর এ নিয়ে বেশ আনন্দিতই ছিলেন তিনি।

তবে সক্রেটিস এটা বুঝেছিলেন যে তার প্রিয় কাজ দর্শনচর্চা করতে শুধু মন থাকাটাই যথেষ্ট হলেও যাদের দৈহিক কাজকর্ম করতে বেশি ভালো লাগে, তাদের নিশ্চিতভাবেই পরকাল ভালো লাগবে না। তাই তিনি বলেছিলেন, আমাদের পৃথিবীর জীবনে দেহের পেছনে সময় না দিয়ে মনের পেছনেই সময় দেয়া উচিৎ, কারণ মনটাই অবিনশ্বর। আর এটা করতে পারলেই দৈহিক মৃত্যু আর আমাদের কাছে ভয়ংকর মনে হবে না, বরং মৃত্যুর চিন্তা আমাদের আনন্দিত করবে। এই মানসিকতার কারণেই সক্রেটিস মৃত্যুকে ভয় পেতেন না।

স্টইক দার্শনিক এপিকিউরাস; image source: nyafuu.org

এপিকিউরাস : মৃত্যুভয় যার কাছে সময়ের অপচয়

স্টইক দার্শনিক এপিকিউরাসও বলতেন মৃত্যু ভয়ংকর কিছু নয়। তবে তার দর্শনটা আরেকটু অন্যরকম ছিল। এপিকিউরাসের জন্ম সক্রেটিসের সময়ের প্রায় একশ বছর পর।

এপিকিউরাস কোনো পরকালেই বিশ্বাস করতেন না। তিনি ভাবতেন, আমাদের সত্ত্বা শুধু আমাদের দেহটাই, এর বেশি কিছু না। দেহের ইতি মানে আমাদেরও ইতি। এমন চিন্তা তো ভয়ংকরই, তাই না?

এপিকিউরাস বললেন, না। মৃত্যু মানে সকল প্রকার অনুভূতির শেষ। আমাদের সব খারাপ-ভালোর ধারণা আসে আমাদের অনুভূতি থেকে। যেহেতু মৃত্যু হলে আমাদের কোনো অনুভূতি থাকে না, তাই মৃত্যুর ভালোও হওয়া সম্ভব নয়, খারাপও হওয়া সম্ভব নয়।

তিনি বলতেন, শুধু দৈহিকভাবে না, মানসিকভাবে খারাপ অনুভব করতেও আমাদের দেহের দরকার, দেহই আমাদের অনুভূতির মাধ্যম। তাই যখন আমাদের দেহ থাকবে না, সেই সময় নিয়ে খারাপ অনুভব করা শুধু অযৌক্তিকও না, তা সময়েরও অপচয়। বরং যে কয়দিন আমাদের অনুভব করবার ক্ষমতা আছে, সবচেয়ে ভালো অনুভূতিগুলোকে নিজেদের মাঝে নিয়েই আমাদের সময় কাটানো উচিৎ- এটাই ছিল এপিকিউরাসের মত।

চৈনিক দার্শনিক ঝুয়াংজি; image source: deviantart.com

ঝুয়াংজি: আপনজনের মৃত্যুর প্রতিও যার নির্ভীক মনোভাব

এতক্ষণ তো আমরা কথা বলছিলাম নিজেদের মৃত্যু নিয়ে। কিন্তু আমাদের তো অন্যদের মৃত্যুও বিচলিত করে, ভয় পাওয়ায়, কাঁদায়।

আর এ সম্পর্কে কার্যকরী দর্শন দিয়ে গেছেন চৈনিক তাওবাদী দার্শনিক ঝুয়াংজি।

এপিকিউরাসের সমসাময়িক এ দার্শনিকের মতামত ছিল, আসলে আপনজনের মৃত্যুকেও ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। তিনি জিজ্ঞেস করতেন, অনিবার্য অবধারিত একটা ব্যাপারকে আমরা কেন ভয় পাব?

আমরা জানি মৃত্যু সবারই হবে, এটা তো  জীবনচক্রেরই অংশ। জীবনচক্রের অন্য কোনো অংশকে তো আমরা এভাবে ভয় পাই না। এটাকে কেন ভয় পাব? তিনি বললেন, আমাদের শিশুরা যখন কিশোর হয়ে যায়, তখন কি আমরা দুঃখ প্রকাশ করি? জীবনচক্রের প্রতিটা অংশ পার করবার পর বরং আমরা উদযাপন করি, জন্মদিনে অনুষ্ঠান করি, বিয়েকে উদযাপন করি। মৃত্যুও তো এই জীবনচক্রেরই একটা অংশ, শুধুই আরেকটি পরিবর্তন। এটাকে কেন আমরা আলাদাভাবে দেখব? তার মতে, আপনজনের মৃত্যুকেও আমাদের উদযাপন করা উচিত, কারণ এটি জীবনচক্রের একটা অংশের সফল সমাপন। কারো মৃত্যু নিয়ে দুঃখ করা একটি স্বার্থপর কাজ, শুধুমাত্র আমরা আর তাদের সঙ্গ পাব না বলেই আমরা দুঃখ করি। হ্যাঁ, এ চিন্তাটি অদ্ভুত তা সত্য, কিন্তু একেবারে অযৌক্তিক কিন্তু নয়!

আধুনিক সময়ের আমেরিকার দার্শনিক টমাস ন্যাগেল; image source: strangenotions.com

টমাস ন্যাগেল: একুশ শতকে মৃত্যুভয়ের দর্শন

একুশ শতকে এসেও মৃত্যুকে নিয়ে নানান দর্শন আসছে। এক্ষেত্রে এ সময়ের আমেরিকান দার্শনিক টমাস ন্যাগেলের কথা বলা যেতে পারে। তিনি বললেন, মানুষের মৃত্যুকে নিয়ে ভয় পাওয়া বা দুঃখিত হবার অন্যতম কারণ হচ্ছে মৃত্যু হলে অনেক অভিজ্ঞতার সুযোগই মানুষ হারিয়ে ফেলবে এ ব্যাপারটি বুঝতে পারা। একজন পাঠকের মৃত্যু হলে, পাঠক হয়তো ভবিষ্যতে ঘটতে যাওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারই উপভোগ করতে পারবেন না। তিনি দেখতে পারবেন না নতুন পৃথিবীর নতুন ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসগুলো কেমন হবে, তার পরিবারের কার ভবিষ্যৎ কেমন হবে। এই ব্যাপারটা তো আসলেই দুঃখজনক।

এটা নিয়ে ন্যাগেলের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিটা বেশ কার্যকর। ন্যাগেল বলছেন, আমাদের মৃত্যুর পর অনেক ভালো ভালো ব্যাপার ঘটবে তা সত্য। কিন্তু আমাদের মৃত্যুর আগেও কিন্তু অনেক সুন্দর সুন্দর ব্যাপার ঘটেছে, ঘটেছে ইতিহাসের অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। হয়েছে বিশ্বযুদ্ধ, আইনস্টাইন এক সূত্রে বদলে দিয়েছেন পৃথিবী। তার আগে এসেছেন নিউটন, গ্যালিলিও, দা ভিঞ্চি! আমরা কিন্তু এসব কিছুই দেখার জন্য পৃথিবীতে ছিলাম না। আমাদের বাবা-মা, দাদী-নানীদের জীবনও কিন্তু আমরা দেখিনি। কিন্তু এগুলো নিয়ে তো আমাদের তেমন কোনো দু:খ নেই। তবে আমাদের জন্মের আগের ঘটে যাওয়া ব্যাপারগুলো না দেখা নিয়ে যদি আমাদের কোনো খেদ না থাকে, মৃত্যুর পরের ব্যাপার নিয়ে কেন আমরা দুঃখিত হব? কোনোটার সময়ই তো আমরা পৃথিবীতে ছিলাম না।

তবে ন্যাগেল এটাও বলছেন, যদি আমরা মনে করি জীবন মৌলিকভাবে একটি ভালো ব্যাপার, তবে এর ইতিকে আমাদের খারাপ ব্যাপার ধরতেই হবে। মানুষের গড়পরতা জীবন যদি হয় ৮০ বছরের, তবে ২০ বছরে মৃত্যুবরণ করা একজন মানুষের জন্য ব্যাপারটা দুঃখজনকই হবে। কারণ সে ৬০ বছরের সমান ভালো একটি সময় কাটাতে পারলো না।

তবে এই জীবনকে ভালো বা খারাপ ভাবার মাঝেও যুক্তিতর্কের জায়গা আছে। যখন আমরা বলছি, জীবন মৌলিকভাবে একটি ভালো ব্যাপার, তবে আমরা আসলে যা ঘটছে তার মূল্যকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে দিচ্ছি। এখন আর জীবনের ঘটনাগুলো, এর যাপনের মান, এগুলো ব্যাপার না।

তুমি বেঁচে আছো মানেই ব্যাপারটা ভালো! অথচ আমরা কিন্তু এমনটা ভাবি না। জীবনে কী ঘটছে তা আমাদেরকে বিচলিত করে, শঙ্কিত করে, আবার ক্ষণে ক্ষণে আনন্দিত করে। তাই জীবনের ঘটনাগুলো দিয়ে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করলে, শুধু বেঁচে থাকার আসলে নিজস্ব কোনো মূল্য নেই। জীবন আসলে মৌলিকভাবে ভালো বা খারাপ নয়, এটা নির্ভর করবে জীবনে কী ঘটছে তার উপর।

সেদিক থেকে ভাবলে, মৃত্যু অনেক সময়ই ইতিবাচক। কারণ স্বাভাবিক মৃত্যু যেটা বৃদ্ধ বয়সে আসে, সেগুলো সাধারণত একটি বেদনাদায়ক জীবনযাপনেরই ইতি টানে। জরাগ্রস্থ পরনির্ভরশীল জীবন কে-ই বা কাটাতে চায়। তাই ন্যাগেল বলছেন, স্বাভাবিক মৃত্যুকেও ভয় পাবার কিছু নেই।

এভাবে যুগে যুগে অনেক দার্শনিকই মৃত্যুভয়কে অযৌক্তিক প্রমাণ করে গেছেন তাদের নিজস্ব যুক্তিতে। তবে আপনি মৃত্যুকে কীভাবে দেখবেন, সেই সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার নিজের।

ফিচার ইমেজ: walls.com