No dark sarcasm in the classroom

Teacher, leave those kids alone.

Hey, Teacher, leave those kids alone!

বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া প্রথাবিরোধী এই লাইনগুলোর সৃষ্টিকর্তা আর কেউ নয়, ইতিহাসের এক কিংবদন্তী ব্যান্ড ‘পিংক ফ্লয়েড’। পিংক ফ্লয়েডের বিশ্ববিখ্যাত অ্যালবাম ‘দ্য ওয়াল’ এর ‘অ্যানাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল’ গানের দ্বিতীয় অংশে আছে এই লাইন তিনটি।

গোড়াপত্তন

রক সঙ্গীতের জগতে অন্যতম কাণ্ডারির স্থান দখল করে আছে ব্যান্ড ‘পিংক ফ্লয়েড’। ১৯৬৫ সালে লন্ডনে ৪ প্রতিভাবান তরুণের হাত ধরে এর গোড়াপত্তন। এই ব্যান্ডদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যরা হলেন সিড ব্যারেট, রজার ওয়াটার্স, রিচার্ড রাইট ও নিক ম্যাসন। লিড ভোকাল ও গিটারিস্ট ছিলেন ব্যারেট, ওয়াটার্স ছিলেন বেস ও ভোকালে, রাইট ভোকাল ও কিবোর্ড বাদক হিসেবে এবং ম্যাসন ছিলেন ড্রামার।

পিংক ফ্লয়েডের প্রতিষ্ঠাকালীন চার সদস্য- ম্যাসন, ব্যারেট, রাইট ও ওয়াটার্স; Source: gettyimages.com

নামকরণ

পিংক ফ্লয়েড নামটি দেন লিড ভোকালিস্ট সিড ব্যারেট। ব্লুজ গিটারিস্ট ‘ব্লাইন্ড বয় ফুলার’ এর অ্যালবামে ব্লুজ ঐতিহাসিক পল অলিভারের লেখা টীকা থেকে দুজন ব্লুজ গিটারিস্টের নাম ব্যারেটের নজরে আসে। নাম দুটি হলো পিংক অ্যান্ডারসন ও ফ্লয়েড কাউন্সিল। এই দুজনের নামের প্রথমাংশ নিয়েই ব্যারেট ‘পিংক ফ্লয়েড’ নামকরণ করেন। এই নামকরণের আগে ব্যান্ডটির আরো কিছু নাম ছিল। ‘ দ্য স্ক্রিমিং এবডাস’, ‘টি-সেট’, ‘দ্য আর্কিটেকচারাল এবডাস’- এই নামগুলো ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হয়ে অবশেষে ব্যারেটের দেওয়া পিংক ফ্লয়েড নামটিই স্থায়ী হয়!

প্রথম যতকিছু

প্রগতিশীল এবং সাইকেডেলিক সঙ্গীতের মাধ্যমেই ব্যান্ডটির সাফল্যের পথে যাত্রা শুরু হয়। তাদের প্রকাশিত প্রথম গান হলো ‘আর্নল্ড লেন’ (Arnold Layne), যেটি ১০ই মার্চ, ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায়। এটি রেকর্ডের পরপরই ব্যান্ডটি সঙ্গীত প্রতিষ্ঠান ইএমআইএ’র সাথে প্রথম রেকর্ডের চুক্তি করে। বেশ কিছু রেডিও স্টেশন গানটি নিষিদ্ধ করলেও তখন যুক্তরাজ্যের টপচার্টে এটি সেরা বিশের মাঝে চলে আসে।

পিংক ফ্লয়েডের প্রথম গান ‘আর্নল্ড লেন’ এর রেকর্ডের প্রচ্ছদ; Source: Discogs.com

পিংক ফ্লয়েডের প্রথম প্রকাশিত অ্যালবাম হলো ‘দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেটস অব ডন’। এটি ১৯৬৭ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়। গিটারে প্রথম ‘ইকো ডিলে’ ইফেক্ট ব্যারেটের ব্যবহার করা, এই অ্যালবামেই এই ইফেক্ট প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। অ্যালবামটির সর্বাধিক জনপ্রিয় গান দুটি হলো ‘অ্যাস্ট্রোনমি ডোমিন’ এবং ‘ইন্টারস্টেলার ওভারড্রাইভ’। ব্যান্ডের লাইভ প্রচারের তালিকায় এ দুটি গানই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

প্রথম অ্যালবামের ব্যাক কভার আর্ট-ওয়ার্ক; Source: robbierocks.ch

প্রথম এককের পরে, ইএমআই পিংক ফ্লয়েডের দ্বিতীয় একক ‘এমিলি প্লে’ প্রদর্শন করে। এটি যুক্তরাজ্যের টপ চার্টে ৬ নম্বরে চলে আসে। তখনই ব্যান্ডটি প্রথম বিবিসির জনপ্রিয় ‘দ্য লুক অব দ্য উইক’ এবং ‘দ্য টপ অব দ্য পপস’ এর মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। ব্যান্ডটির প্রথম লাইভ কনসার্ট হয়েছিল লন্ডনের হাইড পার্কে। সময় তখন ২৯ জুন, ১৯৬৮।

ব্যারেটের বিদায়!

বলা হতো, পিংক ফ্লয়েডের প্রতিষ্ঠাকালীন চার সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর ছিলেন সিড ব্যারেট। কিন্তু অতিরিক্ত মাদক সেবন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, নিশ্চিত সাফল্যের পথে থেকেও হুমড়ি খেয়ে পড়েন পেশাদার জীবন থেকে। ১৯৬৫ সাল থেকেই তিনি নিয়মিত এলএসডি সেবন শুরু করেন, ১৯৬৭ সালের দিকে এসে এর মাত্রা এতই বেড়ে গেল যে, প্রায় সবসময়ই নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। বেশিরভাগ সময়ই স্টেজে উঠে ঠিকমতো বাজাতেন না বা অদ্ভুত আচরণ শুরু করতেন। তখনই ব্যারেটের স্কুল বন্ধু ডেভিড গিলমোরকে রাখা হয় ব্যাকআপ গিটারিস্ট হিসেবে। যতদিন যেতে থাকল, ব্যারেটের নেশাগ্রস্ততা বাড়তে থাকল, স্টেজে আসাও বন্ধ করে দিলেন একসময়। তখন গিলমোরকে ব্যান্ডের স্থায়ী সদস্য হিসেবে নেওয়া হয়। ১৯৬৮ সালের ৬ এপ্রিল এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববাসী জানতে পারে, সিড ব্যারেট আর পিংক ফ্লয়েডের সদস্য নন।

১৯৬৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে একটি পোর্টেট শ্যুটে পিংক ফ্লয়েডের সদস্যরা- ম্যাসন, গিলমোর, রাইট ও ওয়াটার্স; Source: gettyimages.com

জনপ্রিয় অ্যালবাম ও গানসমূহ

সিড ব্যারেট ব্যান্ডে থাকাকালীনই প্রকাশিত হয় তাদের দুটি জনপ্রিয় অ্যালবাম। ‘দ্য পাইপার অ্যাট দ্য গেটস অব ডন’ (১৯৬৭), ‘অ্যা সসারফুল অব সিক্রেটস’ (১৯৬৮) । সিড-পরবর্তী সময়ে তাদের প্রকাশিত অন্যতম জনপ্রিয় কিছু অ্যালবাম হলো ‘মোর’ (১৯৬৯), ‘আমেগামা’ (১৯৬৯), ‘অ্যাটম হার্ট মাদার’ (১৯৭০), ‘মেডল’ (১৯৭১), ‘অবসকিউর্ড বাই ক্লাউডস’ (১৯৭২)। পিংক ফ্লয়েডকে সাফল্যের শীর্ষে নিয়ে যাওয়া অ্যালবামগুলো হলো ‘দ্য ডার্ক সাইড অব দ্য মুন’ (১৯৭৩), ‘উইশ ইউ ওয়্যার হেয়ার’ (১৯৭৫), ‘অ্যানিম্যালস’ (১৯৭৭), ‘দ্য ওয়াল’ (১৯৭৯) এবং ‘দ্য ফাইনাল কাট’ (১৯৮৩)। এগুলোর মধ্যেই আবার সর্বাধিক আলোচিত দুটি অ্যালবাম হলো ‘দ্য ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন’ এবং ‘দ্য ওয়াল’। এই দুটি অ্যালবাম শুধু পিংক ফ্লয়েডের ইতিহাসেই নয়, রক সঙ্গীতের ইতিহাসের অন্যতম ব্যবসাসফল ও আলোচিত অ্যালবাম। দার্শনিক, প্রগতিশীল ও প্রতিবাদী মনোভাব ফুটে ওঠার কারণেই এগুলো এত বেশি সাড়া ফেলে বিশ্ব জুড়ে।

দ্য ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন

এই অ্যালবামটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালের পহেলা মার্চ। এটি পিংক ফ্লয়েডের অষ্টম অ্যালবাম। ধারণা করা হয়, এর প্রায় ৪৫ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছিল। এই অ্যালবামের সম্পূর্ণ লিরিকস রজার ওয়াটার্সের লেখা। এর লিরিকসের মধ্যে দ্বন্দ্ব, লোভ, উন্মাদনার প্রসঙ্গ তো ছিলই; ধারণা করা হয়, ব্যারেটের মানসিক অবস্থার কিছু কথাও ফুটিয়ে তোলা হয় এখানে।

১৯৮০ সালে লন্ডনে পিংক ফ্লয়েডের লাইভ পারফর্মেন্স; Source: gettyimages.com

দ্য ওয়াল

পিংক ফ্লয়েডের বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী মনোভাবের এক চূড়ান্ত প্রকাশ হলো এই ‘দ্য ওয়াল’ অ্যালবামটি। এই অ্যালবামের সবগুলো গানে ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের ‘পিংক’ নামের এক শিশুর বেড়ে ওঠাকে দেখানো হয়েছে। এর মাধ্যমেই সমাজে প্রচলিত নানা অবিচার ও অসঙ্গতির দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। পিংক জন্মের পর থেকেই দেশের জন্য বাবার মৃত্যু, অন্তর্মুখী মা, দেশের রাজার অবহেলা, স্কুলের শিক্ষকদের নিষ্ঠুর আচরণ ইত্যাদি ঘটনা দেখে বড় হতে থাকে। অবিশ্বাস, দূরে সরে যাওয়া স্ত্রী, পেশাগত জীবনে ব্যর্থতা, মাদকের নেশা, নিষ্ঠুরতা ইত্যাদি ঘটনাকে ধাপে ধাপে প্রতিটি গানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। ‘অ্যানাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল’, ‘রান লাইক হেল’, ‘কমফোর্টেবলি নাম্ব’, ‘দ্য শো মাস্ট গো অন’ ইত্যাদি এই অ্যালবামের অন্যতম জনপ্রিয় গান।

পিংক চিত্রনাট্য

‘দ্য ওয়াল’ অ্যালবাম অনুসারে রজার ওয়াটার্স একটি চিত্রনাট্য রচনা করেন। চিত্র্যনাট্যটির নাম ‘পিংক’। গানগুলোর মতো চিত্রনাট্যও রূপক ও প্রতীকী ভাষায় গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে এটিই অ্যালান পার্কারের পরিচালনায় ১৯৮২ সালে ‘পিংক ফ্লয়েড-দ্য ওয়াল’ নামে মুক্তি পায়। সিনেমাটির অ্যানিমেশনের অংশটুকু করেন জেরাল্ড স্কার্ফ।

পিংক ফ্লয়েড দ্য ওয়াল এর একটি দৃশ্য; Source: David Appleby

অনুপ্রাণিত অন্যান্য ব্যান্ড

পিংক ফ্লয়েড আজ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে কত গানপাগল তরুণকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। ‘৭০ এর দশকের ‘জেনেসিস’ বা ‘ইয়েস’ এর মতো ব্যান্ড সরাসরি পিংক ফ্লয়েডের দ্বারা প্রভাবিত। বর্তমান সময়ের ‘নাইন ইঞ্চ নেইলস’ বা ‘ড্রিম থিয়েটার’ও পিংক ফ্লয়েডের দ্বারা অনুপ্রাণিত। এছাড়াও বাংলাদেশি ব্যান্ড ‘নোভা’, ‘দ্য ওয়াল’ অনুসরণ করে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ‘রাজাকারের তালিকা চাই’ অ্যালবামের টাইটেল সংটি তৈরি করে।

পিংক ফ্লয়েডের শেষের কথা

১৯৯৪ সালে ‘দ্য ডিভিশন বেল’ এর পরেই পিংক ফ্লয়েডের বন্ধন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। ২০০৫ সালে লন্ডনের হাইড পার্কে প্রায় ২ যুগ পরে ‘লাইভ এইট কনসার্ট’ এ পুনরায় মিলিত হন ব্যান্ডটির চার সদস্য। এটি রক সঙ্গীতের ইতিহাসে কালজয়ী এক কনসার্ট।

হাইড পার্কে পিংক ফ্লয়েড; বাম থেকে, ডেভিড গিলমোর, রজার ওয়াটার্স, নিক ম্যাসন ও রিচার্ড রাইট; Source: JOHN D MCHUGH / AFP – Getty Images

২০০৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সিড ব্যারেট। তার কিছুদিন পরেই ২০০৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রিচার্ড রাইটও মারা যান ক্যান্সারেই। ২০১৪ সালে গিলমোর ও ম্যাসন পিংক ফ্লয়েডের শেষ অ্যালবাম ‘দ্য এন্ডলেস রিভার’ প্রকাশ করেন।

এরপরই গিলমোর ঘোষণা দেন, এটিই পিংক ফ্লয়েডের শেষ অ্যালবাম। তাদের কাছে রিচার্ড রাইট ছাড়া পিংক ফ্লয়েড পূর্ণাঙ্গ নয়। এরই সাথে এই ব্যান্ডকে একসাথে দেখার শেষ আশার বিন্দুটিও হারায় পিংক ফ্লয়েডের কোটি কোটি ভক্ত।

তথ্যসূত্র:

  • The rolling stone magazine: April 5, 2007
  • The rolling stone magazine: October 13, 2011
  • ROLLING STONE SPECIAL COLLECTORS EDITION: PINK FLOYD THE ULTIMATE MUSIC GUIDE Single Issue Magazine:2017

ফিচার ইমেজ: guitarnoise.com