সহজ কথা নাকি যায় না বলা সহজে! মানুষের মনের চাইতে জটিল আর কিছু নেই এই মহাবিশ্বে, কিন্তু এর মাঝেও যুগে যুগে এমন কিছু মানুষ থাকেন যারা জীবনের সহজ কথাগুলো সহজভাবেই বলে যান, জটিল ভাষা তারা বোঝেন না। শাহ আবদুল করিম এমনই একজন মানুষ, যার সহজ গানে সহজভাবেই আমরা খুঁজে পাই জীবনের মানে। আজকের এই আধুনিক জীবনে গতি যেখানে সর্বত্র বিরাজ করছে, সেখানে আমাদের শেকড়- ‘লোকজ সংস্কৃতি’ একটি কোণে এখনো সেই চিরাচরিত রূপ নিয়েই বেঁচে আছে। বহু সংস্কৃতি, বহু সভ্যতা ছুঁয়ে দেয় বাঙালি সংস্কৃতিকে, কালক্রমে ঘটে কত পরিবর্তন। তবু শেকড়ের টানে ঘরে সবাই ফিরতে চায় আর নিজের মনেই স্মৃতিচারণ করতে থাকে পুরনো দিনগুলোর-
“আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম / গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু-মুসলমান মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদী গাইতাম…”

সহজ ভাষার মানুষ শাহ আবদুল করিম

মরমী কবি শাহ আবদুল করিম, তার জীবদ্দশায় দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন। এর মধ্যে অনেক গান নিজ কণ্ঠে ধারণ করে সারা দেশে ছড়িয়েও দিয়েছেন তিনি।

কেমন ছিলো এই বাউলের শৈশব?

ভাটি অঞ্চলে অর্থাৎ সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় ১৯১৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি জন্ম নেন তিনি। তার পিতা ইব্রাহিম আলী ও মাতা নাইওরজান বিবি। দারিদ্র্যের সঙ্গে থেকে শৈশব খুব একটা দুধেভাতে কাটেনি তার। জমিদারবাড়িতে ‘বন্ধান’ কাজে বাঁধা থাকতেন, রাখাল হয়ে গরু চড়িয়ে বেড়াতেন মাঠে-ঘাটে সারাদিন ধরেই। নিজের পড়াশোনা বা যত্ন-আত্তি নিয়ে আতিশয্য তো দূরের কথা, সহজ নিশ্চিন্ত একটি শৈশবও পাননি তিনি। পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রাখালজীবনই তার শৈশব-কৈশোরের প্রধান অংশ ছিলো বলে জানান। দু’টো ভাতের জন্য সেই বয়সে যতটুকু পরিশ্রম করা সম্ভব, তা করতে গিয়ে নিজের সবটুকুই নিংড়ে দিয়েছেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত

পড়াশোনা করার ইচ্ছেও প্রবল ছিলো, কিন্তু কীভাবে সময় দেবেন সেটাই মুশকিল হয়ে পড়েছিলো। ইচ্ছাশক্তি প্রবল ছিলো বলেই বোধহয় সবটুকু আশা ছেড়ে দেননি। স্কুলে পড়তে যেতে না পারলে কী হবে, অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাটুকু নিজের জন্য ঠিকই খুঁজে নিয়েছিলেন। কোরআন পড়া শিখেছেন ওস্তাদ ছমরু মিয়া মুন্সির কাছে, বাংলা বর্ণমালায় হাতেখড়ি করিয়েছেন তৈমুর চৌধুরী। দিনের বেলা কাজে আটকে পড়ে থাকায় তৈমুর চৌধুরীর নৈশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন বালক করিম। কিন্তু তার প্রতি ভাগ্যের পরিহাসের কারণেই হয়তো গ্রাম্য একটি গুজবের কারণে মাত্র আটদিনের মাথায় বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। বালক করিম সেই বিদ্যালয়ে পাওয়া বর্ণমালার একটি বইকে পুঁজি করেই কাজের ফাঁকে স্ব-শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। সবকিছু তো আর নিজে শিখতে পারতেন না, প্রায়ই এর-ওর সাহায্য নিতেন অচেনাপ্রায় বর্ণগুলো চিনতে। গরু চড়াতে গিয়ে যখনই সময় পেতেন, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মাটিতে দাগ কেটে কিংবা কলাপাতায় লিখে লিখে বর্ণ শিখতেন এই উদ্যমী বালক। ঠিকভাবে পড়াশোনা করতে না পারার কষ্ট থেকেই ১৯৭২ সালে নিজ গ্রামে তিনি ‘উজানধল প্রাথমিক বিদ্যালয়’ স্থাপন করেন।

আর তার সঙ্গীতশিক্ষা? এর জন্য তিনি গুরু মেনেছিলেন ধল আশ্রম গ্রামের করমউদ্দিন ও নেত্রকোনার সাধক রশিদ উদ্দিনকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট স্থান ছিলো না তার শেখার। খোলা মাঠ, বহমান নদী, নীল আকাশ প্রায়শই হয়ে উঠতো তার পাঠশালা।

শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯)

এভাবেই দিনে রাখাল আর রাতে গানের পাখি হয়ে কেটেছে শাহ আবদুল করিমের শৈশব-কৈশোর-যৌবন। জীবন থেকে গ্রহণ করতেন তার গানের প্রতিটি উপাদান, তাই জীবনকে আলাদা করা যায় না তার গানগুলো থেকে। আজন্মপ্রিয় কালনী নদীর তীরে বসে শিখেছেন মন্দিরা আর খঞ্জনি বাজানো। আপন খেয়ালে যে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন তা শেষপর্যন্ত আর আপন মনে আটকে রয়নি। তার কণ্ঠের দরদী ছোঁয়ায় আশেপাশের সবাই প্রভাবিত হতে থাকে। গ্রামের মধ্যে একটি যাত্রাদলে গান গাইবারও সুযোগ পান তিনি। গান গাইবার প্রতিভাই বলি আর বাসনাই বলি, তার উৎস কিন্তু ছিলো বংশের মধ্যেই।

শোনা যায়, শাহ আবদুল করিমের পিতামহ নসীবউল্লার বাউলসত্ত্বাই নাকি প্রথম প্রভাব ফেলেছিলো তার মধ্যে। পিতামহের মুখে শোনা “ভাবিয়া দেখ তোর মনে/ মাটির সারিন্দারে বাজায় কোন জনে” থেকেই গানের প্রতি দরদ অনুভব করতেন তিনি। একতারাতে সুর তোলার শিক্ষা পেতে দূরে যেতে হয়নি, পিতামহই তাকে সে শিক্ষা দিয়েছেন। এভাবেই পথ চলতে চলতে কিশোর করিম যৌবনে পা দিয়ে হয়ে যান বাউল আবদুল করিম।

কিন্তু সবসময় খুব সহজ ছিলো না তার এই সঙ্গীতজগতে পথচলাটুকুও। অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের সাথে তো সেই ছোটবেলা থেকেই সখ্য গড়েছেন, যৌবনে এসে মুখোমুখি হলেন নতুন প্রতিবন্ধকতার। গ্রামের ধর্মীয় আর সামাজিক প্রথার বেড়াজালে প্রায় নিষিদ্ধ হলো তার গান গাওয়া, গানের বিরোধীতা শুরু করলো গ্রামের মাথাস্বরূপ কিছু লোক। একবার ঈদের জামাতেও তাকে পোহাতে হলো এই বিরোধীতার ভোগান্তি। অভিমানী বাউল দুঃখ পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যান সেইবার। কিন্তু তাকে ছাড়া গ্রামেরও সুর কেটে যায়, শেষে গ্রামের লোকজন তাকে আবার পরের বর্ষাকালেই ফিরিয়ে আনে গানের আসর জমাতে। ধর্ম নিয়ে কখনো কোনো বাড়াবাড়ি তার মধ্যে ছিলো না এবং অন্য কারো মধ্যে থাকলে তিনি তা সমর্থনও করতেন না।

এই নদী, এই হাওড়, এই জলজ জনপদে বেড়ে উঠেছেন শাহ আবদুল করিম। তার জন্ম হয়েছিলো কালনী নদীর তীরে। এই নদীকে বড় ভালবাসতেন তিনি। তার দু’টি গানের বইও নাম পেয়েছে এই নদীর নামে- ‘কালনীর কূলে’‘কালনীর ঢেউ’। সুনামগঞ্জের ভাটি এলাকায় বেড়ে উঠেছেন, ভাটির গান গেয়েছেন, তার পুরোটা জীবন ও কর্ম জুড়ে এই ভাটিরই রাজত্ব। ক্রমেই তাই তিনিও বিকশিত হয়েছেন ভাটির দেশের গানের রাজা হয়ে। ‘ভাটির চিঠি’ তার ভাটি প্রেমেরই আরেকটি নমুনা।

এই বাউলের স্মৃতিতে যে বাউলেরা ছিলেন

মানউল্লা, দূর্ব্বীন শাহ, বারেক মিয়া, অমিয় ঠাকুর, আসকর আলী মাস্টার, কামালউদ্দিন- এই গায়কদের নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণ করেন শাহ আবদুল করিম,

“এই সমস্ত বাউলের সঙ্গে গান গেয়েছি। মানুষের ভালোবাসা ও আনন্দ পেয়েছি, ছিলো না টাকা নিয়ে দর কষাকষি। টাকা নয়, ভালোবাসা পেয়েছি বেশি”।

ঢাকায় গেলে অবশ্যই দেখা করতেন খালেক ও রজব দেওয়ানের সাথে। মুর্শিদ মৌলা বক্স এর মুরীদ হিসেবে ভালো সম্পর্ক ছিলো শাহ আবদুল করিমের।

তিনি ভালোবাসার মূল্য দিতেন সবচেয়ে বেশি। আর তাই হয়তো প্রেমকে তিনি বারবার তার দরদী গলায় প্রকাশ করেছেন। “তোমারও পিরীতে বন্ধু কী হবে না জানি” বলে নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছেন প্রেমের হাতেই। “আমি কূলহারা কলঙ্কিনী” গানে যেন সত্যিই অনুভব করেছেন কূলহারা কলঙ্কিনীর ব্যথা, যে প্রেমের জন্য হারিয়েছে তার কূল আর তার গায়ে বিঁধেছে কলঙ্কের কাঁটা। সবকিছু ভুলে গিয়ে দরাজকন্ঠে সুরে সুরে শাহ আবদুল করিম বলতে পারতেন,

“আমি তরে চাইরে বন্ধু”।

কেমন ছিল এই বাউলের বিবাহিত জীবন?

দু’বার বিয়ে হয় তার; ১৯৪৫ সালে প্রথমবার, মামাতো বোন কাঁচামালা বিবির সাথে। কিন্তু সে বিয়ে টিকলো না। ‘গান অথবা বউ’ এমন একটি শর্তের তোপে দেড় বছরের মাথায় এই বিয়ে ভেঙে যায়। কারণ কারো কথায়ই বাউল তার চিরসঙ্গী গানকে ছাড়তে পারেননি। গানই তার সব ছিলো, ছোটবেলা থেকেই সব অপ্রাপ্তি তিনি গানের সুরে ঢেকে দিয়েছেন,

“গান গাই আমার মনরে বুঝাই, মন তাতে পাগলপারা/ আর কিছু চায় না মনে গান ছাড়া-গান ছাড়া…”

পরে ১৯৫৮ সালে আবার ঘর বাঁধলেন মমজান বিবির সঙ্গে। তিনিই ছিলেন তার প্রকৃত সহধর্মিণী, চলার পথের সত্যিকারের সাথী। ভালোবেসে তার নাম দিলেন ‘সরলা’। বাউলের গান বাঁধার নতুন প্রেরণা হলেন এই সরলা। বেশ সুখেই দিন কাটে দু’জনের, গানের পথে কখনোই বাধা হননি মমজান বিবি কিংবা সরলা। পরবর্তী সময়ে শাহ আবদুল করিম তার পত্নী সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন খানিকটা এভাবে,

“আজকের এই করিম কখনোই করিম হয়ে উঠতে পারতো না যদি কপালের গুণে সরলার মতো বউ না পেতাম”।

বোঝাই যাচ্ছে সরলাকে পেয়ে সুগম হয়েছিলো বাউলের সঙ্গীতযাত্রা। সুরে সুরে আরো দরদে মরমী কবি মরমে প্রবেশ করলেন সরলার সঙ্গ পেয়ে। “বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরীতি শিখাইছে”- বাংলাদেশের অলিতে-গলিতে, গ্রামে-গঞ্জে কিংবা শহুরে হট্টগোল! জোরে জোরে বাজানো ডিজে মিউজিক অথবা গ্রামের জমায়েত আসর! কে না শুনেছে এই গান?

কিন্তু এই সুখও সইলো না তার ভাগ্যে। অসুস্থ হয়ে বিনা চিকিৎসা মারা যান সরলা। এই ঘটনার একটা গাঢ় ছাপ পাই বাউলের মনে ও গানে, আকুল হয়ে বাউল সরলার বিরহে গেয়ে উঠেছেন, “আর জ্বালা সয় নাগো সরলা/ আমি তুমি দু’জন ছিলাম, এখন আমি একেলা”। একাকীত্ব আগেও ছিলো, কিন্তু প্রকৃত সঙ্গ পেয়ে একা হওয়ার বেদনা আগেকার সেই একাকীত্বের চেয়ে বহুগুণ বেশি। হয়তো সরলার জন্যই বাউলমন কেঁদে উঠেছে, “কেন পিরীতি বাড়াইলা রে বন্ধু ছেড়ে যাইবা যদি…” আজো বহু বিরহীর সুর হয়ে ধীর লয়ে বাজতে থাকে এই গানটি।

ভাটি অঞ্চলে তার জনপ্রিয়তা সবসময়ই ছিলো। কিন্তু জাতীয়ভাবে বা সমগ্র দেশের মানুষের কাছে তার গানের জনপ্রিয়তাই বলি আর গ্রহণযোগ্যতাই বলি, তা হয়েছে তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে। এই জনপ্রিয়তারই স্বীকৃতিস্বরূপ বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। বাংলা একাডেমি তার দশটি গানের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। শাকুর মজিদ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন ‘ভাটির পুরুষ’ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। এছাড়াও সুবচন নাট্য সংসদ তাকে নিয়ে শাকুর মজিদের লেখা ‘মহাজনের নাও’ নাটকের ৮৮টি প্রদর্শনী করেছে। এছাড়াও রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরষ্কারসহ আরো বেশ কিছু পুরষ্কার পেয়েছিলেন তিনি।

শাকুর মজিদের দৃষ্টিতে ভাটির পুরুষ তিনি

বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে

  • আফতাব সঙ্গীত (১৯৪৮)
  • গণ সঙ্গীত (১৯৫৭)
  • কালনীর ঢেউ (১৯৮১)
  • ধলমেলা (১৯৯০)
  • ভাটির চিঠি (১৯৯৮)
  • কালনীর কূলে (২০০১)
  • শাহ আব্দুল করিম রচনাসমগ্র (২০০৯)

বার্ধক্যে যখন নুয়ে গিয়েছিলো তার কাঁধ, নিজেই নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করতেন “আগের বাহাদুরি এখন গেলো কই?” বলে। ২০০৯ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর সিলেটের নুরজাহান পলি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

“গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে/ চড়িয়া মানবগাড়ি যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি, আধাপথে থামলো গাড়ি উপায় বুঝি নাই…”

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের দেহগাড়িও একদিন থেমে যায় তার এই গানটির মতোই।

বর্তমানে শাহ আবদুল করিমের বাড়িটি

তথ্য ও ছবিসূত্র

১। বইঃ বাউল সম্রাট- অপূর্ব শর্মা

২। bn.wikipedia.org/wiki/শাহ_আবদুল_করিম

৩। sylhet24.net

৪। annyodesh.in