মন ভালো হোক কিংবা খারাপ, আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যেকোনো সময়ে গান ছাড়া যাদের চলেই না। জ্যামে বসে অলস সময় কাটাতেই হোক কিংবা জিমে গিয়ে প্রচণ্ড শারীরিক কসরত করার মুহূর্তেই হোক, গান আমাদের চিরসঙ্গী। মানুষের অনুভূতির সাথে মিশে গিয়ে একমাত্র গানই পারে চোখের পলকে মনের যত ক্লান্তি সব দূর করে দিতে। কিন্তু সেই গানই যদি হয় মৃত্যুর কারণ তবে কেমন হবে একবার ভাবুন তো!

বলছিলাম ‘গ্লুমি সানডে‘ গানটির কথা। প্রায় শতাধিক জীবন কেড়ে নেয়া এই গানটি বেশ সাড়া জাগানো ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছে। এমনকি গানটির রচয়িতা স্বয়ং শিকার হয়েছেন রহস্যজনক মৃত্যুর। তাই তো গ্লুমি সানডের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘হাঙ্গেরির সুইসাইড সং’।

গ্লুমি সানডের অপর নাম হাঙ্গেরির সুইসাইড সং, youtube.com

গানটি নিয়ে আর কিছু বলার আগে দেখে আসা যাক কি ছিল সেই গানের কথায়

Sunday is gloomy, my hours are slumberless
Dearest the shadows I live with are numberless
Little white flowers will never awaken you
Not where the black coach of sorrow has taken you
Angels have no thought of ever returning you
Would they be angry if I thought of joining you?

Gloomy Sunday

Gloomy is Sunday, with shadows I spend it all
My heart and I have decided to end it all
Soon there’ll be candles and prayers that are sad I know
Let them not weep let them know that I’m glad to go
Death is no dream for in death I’m caressing you
With the last breath of my soul I’ll be blessing you

Gloomy Sunday

Dreaming, I was only dreaming
I wake and I find you asleep in the deep of my heart, here
Darling, I hope that my dream never haunted you
My heart is telling you how much I wanted you

Gloomy Sunday

রেজসো সেরেস, foldvaribooks.com

১৯৩২ সালে প্যারিসে বসে গ্লুমি সানডে গানটি লিখেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান পিয়ানোবাদক এবং সঙ্গীত রচয়িতা রেজসো সেরেস, কারো কারো মতে জায়গাটি প্যারিস নয়, বুদাপেস্টও হতে পারে। ৩৪ বছর বয়সী সেরেস তখন একটুখানি সাফল্যের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিলেন। গান নয়, মূলত কবিতা হিসেবেই প্রথম রচিত হয় গ্লুমি সানডে। পিয়ানোর সি-মাইনর মেলোডির সাথে কম্পোজিশন করা হয় কবিতাটির।

গানটি কে এবং কেন লিখেছিলেন তা নিয়ে আজ অবধি জল কম ঘোলা হয়নি। রেজসো সেরেসকে যদিও গানটির রচয়িতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়, তা সত্ত্বেও গানটির পেছনের কাহিনী হিসেবে একাধিক মতভেদ রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত মত অনুযায়ী জানা যায়, মামলা-মোকদ্দমার ফেরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন সেরেস। তাকে স্বান্তনা দিতে একটি কবিতা লিখে পাঠান ছোটবেলার বন্ধু লাজলো জেভার। সেই কবিতাটি সেরেসের অন্তর ছুঁয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে পিয়ানোর সাহায্যে সুর দিয়ে এটিকে গানে রুপান্তরিত করেন সেরেস। অন্য একটি মত অনুযায়ী, সেরেসের হাত দিয়েই রচিত হয় গ্লুমি সানডে।

অপর একটি ব্যাখ্যা মতে, প্রেমিকা সেরেসকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি এতটাই বিষণ্ণ হয়ে পড়েন যে সুর করে ফেলেন গ্লুমি সানডের মতো মন খারাপ করা গান। কেউ কেউ অবশ্য বলেন, বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পৃথিবীর বর্ণনা এবং তার অন্তিম পরিণতি কঈ হতে পারে সেই চিন্তা-ভাবনারই প্রতিফলন এই গানটি। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল। হাঙ্গেরিতেও চলছিল চরম অর্থনৈতিক মন্দা আর ফ্যাসিবাদ। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ দিন কাটছিল সেরেসের। সেরেস তার অন্তরের সমস্ত বেদনা একত্রিত করে ঢেলে দিয়েছিলেন এই গানটির প্রতিটি সুরে। আর সে কারণেই অচিরেই তার বিষণ্ণতা ছুঁয়ে গিয়েছিল গীতিকার লাজলো জাভোরকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, medium.com

গানটিকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু মিথও। বলা হয়, সুন্দরী এক নারী গানটি প্লেয়ারে চালিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। আবার এক ব্যবসায়ীর পকেট থেকে সুইসাইড নোট হিসেবেও পাওয়া যায় গ্লুমি সানডে। হাঙ্গেরির দুই কিশোরী এই গান গাইতে গাইতেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল নদীতে এমন কথাও শোনা যায়। কেউ দেখেনি, কেউ শোনেনি অথচ এই মিথগুলো দিব্যি প্রচলিত রয়েছে মানুষের মুখে মুখে।

আরেকটি একটি উল্লেখযোগ্য মত হলো গ্লুমি সানডে গানটি শুনে আত্মহত্যা করা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন স্বয়ং জাভোরের প্রেমিকাও। মতান্তরে জাভোরের প্রেমিকা তার সুইসাইড নোটে মাত্র দুইটি শব্দ লিখে গিয়েছিলেন- ‘গ্লুমি সানডে’। কাজেই সেরেসের মতো জাভোরও ছিলেন একাকী। সুতরাং দুজন দুজনের মনের কথা বুঝে ফেলেছিলেন এক নিমিষেই। এবার তাদের প্রয়োজন ছিল একটি সুরেলা কণ্ঠের। সেই অভাব পূরণ করতে ১৯৩৫ সালে এগিয়ে আসেন পল কালমার। গানটির কথার সারমর্ম ছিল অনেকটা এমন- গায়ক তার প্রেমিকার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল হয়ে আত্মহত্যা করতে চান যাতে অন্তত মৃত্যুর পরে হলেও তাদের দুজনের আত্মা একত্রিত হতে পারে। বর্তমানে গানটির যে সংস্করণ সর্বত্র শোনা যায় তা ১৯৪১ সালে বিলি হলিডে রেকর্ড করেন।

বিলি হলিডে, huffingtonpost.com

১৯৩৬ সালে হাঙ্গেরিয়ান এই গানটিকে ইংলিশে রেকর্ড করেন হল ক্যাম্প যেখানে কথাগুলো অনুবাদ করতে সহায়তা করেন স্যাম এম লিউইস। লিউইসের লেখা গানটি এবার সরাসরি প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথে। ধীরে ধীরে গানটির নামই হয়ে গেল হাঙ্গেরিয়ার আত্মঘাতী গান। যথাযথ প্রমাণসহ অসংখ্য ব্যক্তির আত্মহত্যার খবরে নড়েচড়ে বসেন সবাই।

‘৩০ এর দশকে পাওয়া খবর অনুযায়ী এই গানটির জের ধরে আমেরিকা ও হাঙ্গেরিতে আত্মহত্যা করেন ১৯ জন, মতান্তরে সংখ্যাটি ২০০ বলেও শোনা যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো আত্মহত্যাকারীদের সবার সুইসাইড নোটেই পাওয়া গেছে গ্লুমি সানডের লিরিক্স। জনমত প্রচলিত আছে, এই গানটি বারবার শুনতে শুনতে শ্রোতাদের মধ্যে জীবনের প্রতি এক ধরণের বিতৃষ্ণা চলে আসে এবং সেখান থেকেই তারা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। ২ জন তো গানটি শুনতে শুনতে গুলি করে নিজেদের মাথার খুলিই উড়িয়ে দিয়েছেন! এরপরও কি গানটি যে অভিশপ্ত তা মানতে কারো কোনো আপত্তি থাকতে পারে?

শ্রোতাদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকায় হাঙ্গেরিতে গানটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অথচ হাঙ্গেরি কিন্তু এমনিতেও আত্মহত্যার হারের দিক থেকে বিশ্বের প্রথম সারির একটি দেশ। প্রতি বছর লাখে প্রায় ৪৬ জন মানুষ সেখানে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তারপরও অভিশপ্ত গান হিসেবে স্বীকৃতি পায় গ্লুমি সানডে। পরবর্তীতে ৪০ এর দশকে বিবিসিও গানটির লিরিক শোনানো বন্ধ করে শুধুমাত্র ইন্সট্রুমেন্টাল বাজানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের ভাষ্যমতে, আত্মহত্যার প্ররোচনা না থাকলেও এই গানটি কাউকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কাজেই বিলি হলিডের গ্লুমি সানডে সংস্করণটি সব জায়গা থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়। ২০০২ সালে এসে গানটির উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে রেডিও চ্যানেলগুলো।

পত্রিকায় সেরেসের আত্মহত্যার খবর, bp.blogspot.com

গানটির প্রভাবেই কিনা কে জানে, গ্লুমি সানডে রচনার ৩৫ বছর পরে গানটি গাইতে গাইতে সেরেস তার চার তলা অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন ১৯৬৮ সালে। কেন একটি মাত্র গান এত বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো তা আজও এক রহস্য। তবুও গানটিকে ঘিরে সবার কৌতূহলের যেন কোনো শেষ নেই। এলভিস কোস্টেলো, সারাহ ম্যাকল্যাচলান, হেথার নোভা প্রমুখ সংগীত শিল্পী সাম্প্রতিক সময়ে গ্লুমি সানডের নতুন নতুন সংস্করণ রেকর্ড করেছেন।

রলফ সুবলের চলচ্চিত্র ‘গ্লুমি সানডে’, pinimg.com

গ্লুমি সানডে গানটিকে ভিত্তি করে ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচার এবং একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী নিয়ে একই নামে ১৯৯৯ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন পরিচালক রলফ সুবল। এখানে তিনি ইতিহাস এবং ফিকশনের মধ্যে একটি সমন্বয় ঘটিয়েছেন।

তবে গান শুনুন আর চলচ্চিত্রই দেখুন, আত্মহত্যার পথে না হাঁটার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। কারণ আত্মহত্যা কখনোই কোনো পরিস্থিতির সমাধান হতে পারে না। বেঁচে থেকে কঠিন সব সমস্যার মোকাবেলা করে দিন শেষে বিজয়ীর হাসি হাসতে পারাই তো প্রকৃত বীরের কাজ।

ফিচার ইমেজঃ youtube.com