নীলাভ-ছাই রঙের একটি পোষা বিড়াল তাড়া করছে বাদামী রঙের একটি ইঁদুরকে। নানা রকম ফন্দি ফিকির করছে ইঁদুরটাকে পাকড়াও করার জন্য। কিন্তু বারবার মুঠো গলে বেড়িয়ে যাচ্ছে চালাক ইঁদুর। মাঝে মধ্যে বেচারা বিড়ালটাকে বেদম মার খেতে হচ্ছে একটি বিশাল মাথামোটা বুলডগের কাছে। তার উপর সারা বাড়ি দৌড়-ঝাঁপ করে বেড়ানোর জন্য গৃহকর্ত্রীর হুমকি। বলা যায় ছোট্ট একটি ইঁদুরের কাছে রীতিমত নাস্তানাবুদ তুলনামূলক বিশাল সাইজের লম্বা গোঁফওয়ালা বিড়ালটি।

সবার এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলার কথা আমি কিসের কথা বলছি। আমি বলছি টম এবং জেরীর কথা। ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে কার্টুন খুবই প্রিয় একটি বিষয়। কোনো সন্দেহ নেই অনেকের ক্ষেত্রেই এই কার্টুনটি পছন্দের শীর্ষে থাকবে। এত বড় হয়ে গেছি তারপরও এই কার্টুনটি দেখলে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায়। এতগুলো বছর হয়ে গেছে কিন্তু “টম এন্ড জেরি” এতটুকু পুরোনো হয়নি। যে কার্টুনটি বাচ্চা থেকে বুড়ো মানুষজন সবার এত প্রিয় সেই টম এন্ড জেরিকে কিন্তু প্রথম দিকে কেউই তেমন গুরুত্ব দেয়নি। টম এন্ড জেরির নির্মাতারাও ভাবতে পারেননি যে এতটা জনপ্রিয় হবে কার্টুনটি।

টম এবং জেরীর শুরুর গল্পটি তাহলে বলে ফেলা যাক।

১৯৩০ সালের কথা। উইলিয়াম হ্যানা এবং জোসেফ বারবারা তখন হলিউডের মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ার বা সংক্ষেপে এম জি এম (MGM) স্টুডিওতে কর্মরত। হ্যানা ছিলেন একজন গল্পলেখক ও চরিত্র ডিজাইনার, অন্যদিকে বারবারা হলেন অভিজ্ঞ পরিচালক। তারা রুডল্ফ আইসিং (Rudolf Ising) ইউনিটের হয়ে কাজ করতেন।

টম এবং জেরীর সঙ্গে উইলিয়াম হ্যানা এবং জোসেফ বারবারা

সেই সময়ে “ক্যাপ্টেন এন্ড দ্যা কিডস” (Captain and the Kids) নামে বিখ্যাত একটি কমিক স্ট্রিপ ছিল। যার প্রধান চরিত্রে ছিল দুই ভাই হ্যানস এবং ফ্রিটজ, তাদের মা, একজন ক্যাপ্টেন এবং একজন ইনস্পেক্টর। এই চরিত্রগুলোর উপর ভিত্তি করে স্টুডিওটি একটি ধারাবাহিক কার্টুন বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এই কার্টুনটি দর্শকদের মাঝে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি, যা স্টুডিওটিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়।

তখন তারা দুইজন জুটিবদ্ধ হয়ে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুজতে লাগলেন। বারবারা একটি বিড়াল এবং ইঁদুরকে প্রধান চরিত্রে রেখে একটি কার্টুন বানানোর প্রস্তাব করলেন যার নাম ছিল “পুস গেটস দ্য বুট” (Puss Gets the Boot)। যদিও হ্যানা এবং তার অন্যান্য সহকর্মীদের এই আইডিয়াটি তেমন পছন্দ হয়নি, কারণ তাদের কাছে মনে হয়েছিল ব্যাপারটা ঠিক বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্টুডিওটি এই নামে কার্টুন বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

“পুস গেটস দ্য বুট” কার্টুনটির প্রধান চরিত্রে ছিল জ্যাসপার নামক একটি ধূসর ডোরাকাটা পোষা বিড়াল এবং জিনক্স নামের একটি ইঁদুর। পুরো কার্টুনটিতে অবশ্য কোথাও ইঁদুরটিকে এই নামে ডাকা হয়নি। প্রায় সময়েই জ্যাসপার জিনক্সকে ধরতে গিয়ে বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ভেঙে ফেলত। এই কারণে গৃহকর্ত্রী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেয়। জিনক্স এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জ্যাসপারকে বেকায়দায় ফেলতে চেষ্টা করে। বোঝাই যাচ্ছে গল্পের প্লটটা টম এন্ড জেরির মতোই অনেকটা। কিন্তু এই কার্টুনটাতে টম এন্ড জেরির মতো কোনো সূচনা সঙ্গীত ছিল না।

শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী কার্টুনটি থিয়েটারে রিলিজ পায়। কিন্তু এম জি এম স্টুডিওতে এ নিয়ে তেমন কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল না। বিড়াল-ইদুরের যুদ্ধ নিয়ে তারা খুব একটা আশাবাদী ছিলেন না। এম জি এম এর অনেক কর্মীকেই তখন বলতে শোনা যায়, “ইঁদুর-বিড়ালের কার্টুন কি আর কম হলো?”। দর্শকরা যে কার্টুনটিকে একটু ভিন্নভাবে নিবে এমনটা ভাবারও কোনো কারণ ছিল না। হ্যানা এবং জোসেফ তাই অন্যান্য কার্টুনগুলোর দিকে মনোযোগ দিলেন এবং একপর্যায়ে ভুলেই গেলেন “পুস গেটস দ্য বুট” এর কথা।

কিন্তু এদিকে ধীরে ধীরে থিয়েটারে কার্টুনটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। একটা সময়ে এসে দেখা গেল থিয়েটার মালিকদের পছন্দের শীর্ষে চলে এসেছে কার্টুনটি। এরপর শেষ পর্যন্ত এম জি এম স্টুডিওর টনক নড়ে যখন তারা দেখলো একাডেমি অফ মোশন পিকচার আর্টস এন্ড সায়েন্সের পক্ষ থেকে ১৯৪১ সালের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড ফর বেস্ট শর্ট সাবজেক্ট কার্টুনস পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেল “পুস গেটস দ্য বুট”। কার্টুনটি অবশ্য এম জি এম এরই আরেকটি কার্টুনের কাছে চুড়ান্ত পর্বে হেরে যায়। ওই কার্টুনটি ছিল রুডল্ফ আইসিং ইউনিট এর তৈরি করা “দ্য মিল্কি ওয়ে” (The Milky Way)। কিন্তু তারপরও ইঁদুর আর বিড়ালের এই জোড়ার প্রতি সবার নেতিবাচক ধারণার পরিবর্তন ঘটল অবশেষে।

এম জি এম স্টুডিওর প্রযোজক ফ্রেড কুইম্বলি একদিন হ্যানা এবং বারবারাকে জরুরী তলব করলেন তার অফিসে। এরপর তিনি তাদেরকে এক পর্বের কার্টুনগুলো বাদ দিয়ে ইঁদুর আর বিড়ালকে নিয়ে একটি সিরিজের জন্য কাজ করার পরামর্শ দেন। হ্যানা এবং বারবারা দুজনেই রাজি হয়ে যান এই প্রস্তাবে। কিন্তু কার্টুনের বর্তমান নামটি কারোরই তেমন পছন্দ হচ্ছিল না।

সেজন্য স্টুডিওর ভিতরেই নতুন ইঁদুর-বিড়াল জোড়াটির জন্য একটি নতুন নামকরণের প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। প্রতিযোগিতায় অ্যানিমেটর জন কারের প্রস্তাব করা “টম এন্ড জেরি” নামটি গ্রহণ করা হল। তাকে এই নামকরণের জন্য ৫০ ডলার পুরস্কারও দেয়া হয়। ওই বছর থেকেই “টম এন্ড জেরি” স্টুডিওটির প্রোডাকশন তালিকায় যোগ হলো।

“টম এন্ড জেরি” কার্টুনটির জন্য বারবারা গল্প লিখতে শুরু করেন এবং হ্যানা পরিচালনার দায়িত্ব নেন। একটি বিড়াল সারাক্ষণ একটি ইঁদুরকে তাড়া করছে এই ব্যাপারটা প্রথম দিকে একটু একঘেয়েমির মত মনে হতে পারে। কিন্তু বারবারা এই ব্যাপারটির মধ্যেই অনেক ভিন্নতা খুঁজে পেলেন যা তাকে অনেকগুলো শর্ট ফিল্ম তৈরী করার রসদ যোগালো। বারবারার গল্প লেখার দুর্দান্ত ক্ষমতা এবং হ্যানার অসাধারণ ডিরেকশন এই দুইয়ে মিলে তৈরি হল এম জি এম স্টুডিওর ইতিহাসে সবথেকে সফল এবং জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ “টম এন্ড জেরি”। ওই স্টুডিওতে থাকাকালীন সময়ে হ্যানা এবং বারবারা কেউই অন্য কোনো কার্টুন সিরিজের জন্য কাজ করেননি। তার দরকারও হয়নি কখনো। এই একটি কার্টুনই তাদেরকে অমরত্ব এনে দিয়েছে এনিমেটেড সিরিজের জগতে।

তারা দুজন মিলে ১৯৪১ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের মধ্যে মোট ১১৪টি টম এন্ড জেরী শর্টস তৈরী করেন এবং সেই সাথে ধরে রাখেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। পথে বাধা যে আসেনি তা কিন্তু নয়। ১৯৫০ এর দিকে স্টুডিওটি শর্ট ফিল্মের জন্য বাজেট কমিয়ে দেয় যার কারণে টম এন্ড জেরির প্রোডাকশনে কিছুটা ভাটা পড়ে। কিন্তু তারপরও ১৯৫৮ সালে এম জি এম স্টুডিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত “টম এন্ড জেরি” কার্টুন বানানো কখনো থেমে থাকেনি।

তাদের তৈরি শর্ট গুলোতে চরিত্রগুলো খুব কমই কথা বলত, বিশেষ করে টম এবং জেরী। তবে দ্যা মাউস কামস টু ডিনার (The Mouse Comes to Dinner) পর্বটিতে টম তার গার্লফ্রেন্ড টুটসকে অসাবধানতাবশত একটি স্টোভের উপর বসে জিজ্ঞেস করে, “বলো কি রান্না করছি আমি”। টুটস তাকে অবশ্য স্টুপিড বলে ঝাড়ি দেয়।

এই কার্টুনটির বেশিরভাগ ভোকাল ইফেক্ট সহকারী পরিচালক উইলিয়াম হ্যানা করেছিলেন। টমের সেই বিখ্যাত অট্টহাসি আসলে তার হাসি রেকর্ড করেই বানানো হয়েছে।

এরপর ১৯৬১ সালে আবার জেন ডিচের হাতে নতুন করে জীবন ফিরে পায় টম এবং জেরী। তিনি আরও ১৩টি কার্টুন বানান তাদেরকে নিয়ে, যার সবগুলো গল্পই তার লেখা। টমের চেহারারও বদল হয় খানিকটা । ১৯৪০ এর শুরুর দিকে কার্টুনগুলোতে টমের চেহারা ছিল অনেকটি এরকম — রোমশ পশম, মুখে অসংখ্য ভাঁজ, ভ্রু এর অনেক রকম চিহ্ন। এইসব সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্যগুলো বাদ দিয়ে টমকে আরও মসৃণ করে ডিজাইন করা হয়। জেরি অবশ্য পুরো সময়জুড়ে প্রায় অপরিবর্তিতই থাকে।

ডিচ কিন্তু এই কার্টুন সিরিজটিকে মোটেও পছন্দ করতেন না। তার কাছে কার্টুনটিকে অহেতুক ভায়োলেন্ট মনে হত। সত্যি কথা বলতে কি এই অভিযোগটি কিন্তু খুব বেশি নতুন নয়। এই কার্টুনটিতে টম জেরিকে শায়েস্তা করার জন্য যেসব যন্ত্র ব্যবহার বা উদ্ভাবন করেছে সেগুলোকে থিয়েটারিক্যাল এনিমেশনের জগতে সবথেকে ভায়োলেন্ট বলেই গণ্য করা হয়। এর মধ্যে আছে কুড়াল, কামান, বন্দুক, হাতুড়ি, নানা রকম বিস্ফোরক, ফাঁদ থেকে শুরু করে ইঁদুর মারার বিষ। তবে ডিচ একসময় বুঝতে পারলেন যে দর্শকরা চরিত্রগুলোর উগ্রতা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাচ্ছে না, বরং এই ইঁদুর-বিড়াল লড়াই তারা বেশ উপভোগ করছে।

এরপরে চাক জোনস তার নিজের এনিমেশন স্টুডিওর জন্য আরও ৩৪টি টম এন্ড জেরী শর্ট তৈরী করেন। কিন্তু তার গল্পগুলোতে টম এবং জেরী উভয়ের পোশাক এবং আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এগুলো তেমন জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

ওই সময়টাতে টেলিভিশনে হ্যানা-বারবারার টম এন্ড জেরী টেলিভিশনের পর্দায় রাজত্ব করতো। এরপরে অবশ্য হ্যানা-বারবারা জুটি আবার ফিরে আসে। তারা আরও বেশ কিছু “টম এন্ড জেরী” শর্টস তৈরী করেন। সিনেমা বানানোর কাজও শুরু হয়ে যায় টম এবং জেরীকে নিয়ে। বর্তমানে ওয়ার্নার ব্রোস স্টুডিওটি “টম এন্ড জেরী” তৈরীর কাজ করছে।

সবার মনে হতেই পারে টম কেন জেরিকে এত তাড়া করে। মাঝে মধ্যে ক্ষুধা লাগলে টম জেরিকে ধরে খাওয়ার চেষ্টা করে। এ কারণে দুইটা রুটির স্লাইসের মাঝে লেটুস পাতা দিয়ে তার মধ্যে জেরিকে রেখে বার্গার বানানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় তার মাঝে। তাছাড়া টম যে বাড়িতে থাকে সেই বাড়ির মালিকের সুনজর পাওয়ার জন্য জেরীকে পাকড়াও করার চেষ্টা করে সে। কিন্তু সব আক্রমণই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে তার কাছে। প্রায় প্রতিটি পর্বই শেষ হয় জেরীর বিজয় দিয়ে। সাইজে জেরীর চেয়ে বড় হলেও বুদ্ধির দিক দিয়ে বারবার হেরে যায় টম। মাঝে মাঝে টম অবশ্য জয়লাভ করে কিংবা তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও লক্ষ্য করা যায়।

ছোটবেলায় কিন্তু জেরিকে আমার কখনোই ভালো লাগেনি। সবসময় আমি ছিলাম টমের পক্ষে। জেরীকে মনে হত একটা ছিচকে চোর যার কাজ শুধু টমকে বিরক্ত করা। আমি খুব করে চাইতাম টম যেন একদিন জেরিকে ভালভাবে মশলা দিয়ে মাখিয়ে হালকা আঁচে ফ্রাই করে সস দিয়ে মিশিয়ে খেয়ে ফেলে। এতবড় নিষ্ঠুর একটা ইচ্ছা আমার কেমন করে হলো সেটা অবশ্য এখনও আমার কাছে রহস্যের মতো। ভাগ্যিস টম সেটা কখনো করেনি। টম এবং জেরি দুজনই আরও অনেকদিন আমাদের মাঝে থাকুক। শৈশবের দিনগুলোকে অনেকখানি আনন্দময় করে তোলার জন্য টম এবং জেরী দুজনেরই একটা বিশাল ধন্যবাদ প্রাপ্য।

তথ্যসূত্র

১) en.wikipedia.org/wiki/Puss_Gets_the_Boot

২) en.wikipedia.org/wiki/Tom_and_Jerry

৩) britannica.com/topic/Tom-and-Jerry