সেদিন অফিসে পাশের ডেস্কে সহকর্মীদের জটলায় ফিসফাস চলছিলো কিছু একটা নিয়ে। সাকিব গিয়ে দাঁড়াতেই থেমে গেলো সব। আরো আগে একদিন এমনটা হয়েছিলো। সিনথিয়া খুব হাসছিলো শিহাবের সাথে, সাকিবকে দেখে চুপসে গেলো হাসি। আজকেও তাই আবার এরকম হওয়াতে সাকিব সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলো, হাসি-তামাশা চলছে তাকে নিয়েই। এমনিতেও সিনথিয়াদের দলটার সাথে সাকিবের সম্পর্ক আহামরি ভালো নয়। তো নিশ্চয়ই তাকে ছোট করে কথাবার্তা হচ্ছে ওদের ভেতর। তাকে নিয়েই এতো হাসাহাসি। ওদের কিছু ফেসবুক পোস্টেও অফিসের পরিবেশ নিয়ে কেমন যেন ইঙ্গিত ছিলো। না, আর ভাবতে পারছে না সাকিব। এবার জবাব দিতেই হবে! পরদিন থেকে শুরু হলো সরাসরি ওদের দলকে আক্রমণ করে দেয়া সাকিবের ফেসবুক পোস্ট। কখনো সিনথিয়ার পোশাক, এমনকি গায়ের রঙ নিয়ে কটাক্ষ করে, কখনো শিহাবের বেশি হাসিখুশি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে, কখনো আবার কাজের সময় গল্প করার জন্য তিরস্কার করে, স্রেফ নামটুকু গোপন রেখে একের পর এক পোস্টে সাকিব তাদের বিব্রত করার চেষ্টা করে চললো। অথচ শিহাবরা সেদিন গল্প করছিলো কর্মক্ষেত্রে তাদের সাথে ঘটা মজার সব ঘটনা নিয়ে! বসের ঝাড়ি খেয়ে মুখ চুন করে বেরিয়ে আসায় শিহাবকে নিয়ে হেসেছিলো সিনথিয়া। শুরুটা করলো সাকিব, শুরু হলো সাইবার বুলিংয়ের আরেকটা গল্প। সাইবার বুলিং এক প্রকার সাইবার ক্রাইম, অথচ কতো সহজেই না ঘটছে বুলিংয়ের এমন একেকটা ঘটনা যা কিনা অমীমাংসিত রয়ে যায়।

সাইবার বুলিং বিষয়টা আসলে কী?

ইন্টারনেটকে মিডিয়া হিসেবে ব্যবহার করে আপনার স্বস্তি, শান্তি অথবা সম্মান ধুয়ে দেয়ার এক হীনমন্য প্রচেষ্টার নামই ‘সাইবার বুলিং’। এটা এক প্রকার সাইবার ক্রাইম যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এক ভয়াবহ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই সময়ে। আপনাকে ছোট করার নানা রকম  প্রয়াস, যা বাস্তবে করা যাচ্ছে না বা করার কোনো প্রয়োজনও নেই, কিন্তু অনলাইনে আপনাকে একহাত দেখে নিতে খুব শখ হচ্ছে, এমন যেকোনো মানুষ আপনাকে সাইবার বুলিংয়ের মাধ্যমে আক্রমণ করতে পারে। কেউ একজন যে কিনা আপনাকে চেনেও না, হয়তো আপনার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চোখে পড়েছে এবং আপনার ছবি দেখে সে আকৃষ্ট হয়েছে, এবং ব্যক্তি হিসেবে সে মানসিক বিকারগ্রস্ত, আপনি নিজের ইনবক্সে কুরুচিপূর্ণ একটা বার্তা পেতেই পারেন তার থেকে। সাইবার বুলিং এই ইন্টারনেট সভ্যতার যুগের সবচেয়ে বড় অসভ্যতাগুলোর একটা। শুরুর দিকে সাইবার বুলিংকে তরুণ সমাজের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বর্তমান সময়ে এটা সকল স্তরের মানুষের কাছে এক ব্যাধির সমান।

সাইবার বুলিং কারো জন্য হতে পারে চূড়ান্ত হতাশার রূপ; source: LawNoMagazine

সাইবার বুলিংয়ের রকমফের

  • অন্যের নামে যা খুশি তা-ই গুজব রটানো।
  • অনলাইন কোনো গ্রুপ থেকে উপযুক্ত কারণ দর্শানো ছাড়া কাউকে অব্যাহতি দেয়া।
  • ছদ্মবেশী কার্যকলাপ। অন্য কেউ সেজে কাউকে ভয় দেখানো বা উত্যক্ত করা।
  • কাউকে ক্ষতিসাধনের হুমকি দেয়া।
  • কারো সম্মতি ব্যতীত তার সাথে অশ্লীল কথাবার্তার প্রয়াস করা ইত্যাদি সাইবার বুলিংয়ের আওতায় পড়ে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বুলিং- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যাচ্ছেতাই ব্যবহার

এই দেশের তুমুল জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। নানা ধরনের সাইবার ক্রাইমের চাষাবাদ চলছে এই সাইটে। সাইবার বুলিং তো সে তুলনায় নিছকই খেলা! অন্য মাধ্যমগুলোও সাইবার বুলিংয়ের বিষাক্ত থাবার বাইরে নয়। কিছু বিকৃত মানুষের সময় কাটানোর এক উপায় হলো সাইবার বুলিং। অচেনা-অজানা লোকজন তো বটেই, সামান্য মতভেদ হওয়া চেনা মানুষও সাইবার বুলিং করতে ছাড়ে না সুযোগ পেলে, অবস্থা এখন এমন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই অপরাধ চলছে ভয়াবহ মাত্রায়; source: Remake Learning

সামাজিক মাধ্যমে বুলিং কিংবা সোজা বাংলায় গুন্ডামি করার নমুনা কী কী হতে পারে দেখে নেয়া যাক-

  • কারো জন্য বাজে মন্তব্য করা কিংবা কারো কুরুচিপূর্ণ কোনো ছবি পোস্ট করা।
  • কারো সম্পর্কে অবমাননাকর কোনো কথা বা ছবি তার অ্যাকাউন্টের ওয়ালে পোস্ট করা।
  • নির্দিষ্ট কাউকে স্পষ্টত বিদ্রূপ করে ছবি কিংবা ভিডিও পোস্ট বা শেয়ার করা।
  • কাউকে অনবরত উত্যক্ত করে যাওয়া।
  • কারো অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা এবং সেটা থেকে ওই ব্যক্তির মানহানি হতে পারে এমন বিষয়বস্তু পোস্ট করতে থাকা ইত্যাদি।

সাইবার বুলিং ব্যাপক আকারে ঘটছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই অপরাধ ভয়াবহ মাত্রায় সংঘটিত হয় এক ফেসবুকেই। ফেসবুকের জনপ্রিয়তা, বহুল ব্যবহার, ছবি বা ভিডিও শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে এর সুবিধা- এসব কারণেই সাইবার বুলিং করার প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে এই সাইটটিতে। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী দশ জনের মাঝে নয় জন ফেসবুক ব্যবহারকারীই রিপোর্ট করেছে যে তারা এই এখানে কোনোভাবে বুলিংয়ের সাক্ষী হয়েছে। সংখ্যাটা একেবারেই হেলাফেলা করার মতো নয়, তাই না?

কীবোর্ডে রোজ লেখা হয় কতো সাইবার বুলিংয়ের গল্প; source: Tracey Solicitors

বুলিং চলে অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমেও

  • টুইটার: সাইবার বুলিং দেদারসে চলে এখানেও। হাফিংটন পোস্টের পরিসংখ্যান বলে, নিত্যদিন হাজার পনেরো মতন বুলিং টুইট শেয়ার হচ্ছে এই সাইটে।
  • আস্ক এফএম: কিশোরদের মাঝে গুরুতর সমস্যা তৈরি করেছে এই সাইটের বুলিং চর্চা। ২০১৩ সালে একজন ১৪ বছরের কিশোরী আত্মহত্যা করে যার পেছনে কারণ ছিলো এই আস্ক এফএমের বুলিং!
  • স্ন্যাপচ্যাট: এই সাইটেও আস্ক এফএমের মতো ঘটনা ঘটেছে, একজন ভিকটিমের আত্মহত্যার সাক্ষী হয়ে আছে স্ন্যাপচ্যাট।
  • ইন্সটাগ্রাম: ছবি শেয়ার করার অনন্য এক মাধ্যম, এবং এটিও কিছু মানুষের বদৌলতে সাইবার বুলিংয়ের ক্ষেত্র হয়ে গেছে।

বুলিংয়ের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে যেকোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে; source: Affinity Magazine

হালের ট্রেন্ড সারাহাহ্‌- সোশ্যাল মিডিয়া বুলিং যুগের আরেক অধ্যায়

কোনো প্রচারণা ছাড়াই সারাহাহ্‌ ডট কম যুক্তরাষ্ট্রের কিশোরদের কাছে প্রবল জনপ্রিয়তা পেয়ে আইটিউনস অ্যাপ স্টোর ও গুগল প্লে স্টোরের শীর্ষে জায়গা করে নিচ্ছে। যেহেতু এটি বেনামে বার্তা আদান-প্রদানের সুযোগ দিচ্ছে, কাজেই সাইবার বুলিং চর্চা করার এক দারুণ মাধ্যম হয়ে উঠছে সারাহাহ্‌।

ফ্যামিলি থেরাপিস্ট ডক্টর ক্যাথরিন স্মার্লিংয়ের মতে, এই অ্যাপ্লিকেশনের কার্যকলাপ বিষণ্ণতা ও রাগ জাগানিয়া এবং কিশোরদের মাঝে আত্মহত্যার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।

চালু হবার কিছুদিনের মাঝেই সারাহাহ্‌ ডট কম ব্যবহারকারী নারীদের মাঝে এই মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে অসন্তোষ কাজ করছে। সঠিকভাবে বলতে গেলে অ্যাপ্লিকেশনটি নিয়ে নয়, সারাহাহ্‌কে মাধ্যম বানিয়ে নারীদের পাঠানো নোংরামিপূর্ণ বার্তাগুলো জন্ম দিচ্ছে অসন্তোষ ও হতাশার। পরিচয় গোপন থাকবে, কতই না সুবর্ণ সুযোগ এটা অপরাধীদের কাছে! যেই মেয়েটিকে সরাসরি আপু ডেকে মিষ্টি করে কথা বলা হয়, কিন্তু তাকে কয়েকটা নোংরা কথা বলার জন্যেও প্রাণ ছটফট করে, তাকে কি এই সারাহাহ্‌র যুগে ছেড়ে দিতে আছে?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বুলিং করা এতোই সহজ?

হ্যাঁ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাইবার বুলিং নিতান্তই পানিভাত ব্যাপার আজকাল। আপনি মুক্ত নন, আপনার ঘরের আদরের ছোট সদস্যটি মুক্ত নয় এই অপরাধের আওতা থেকে, এমনকি পরিবারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্যকেও সাইবার বুলিংয়ের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে যেকোনো সময়। ভাবছেন, কী কারণে? ওটাই যে অসুবিধাটা, কোনো বিশেষ কারণ তো লাগছে না! একে পছন্দ নয়, তার উপর রাগ হয়েছে; ব্যস, শুরু হয়ে যাচ্ছে বুলিং। খেলায় মেতে উঠতে বাচ্চাদের যেমন সময় লাগে না, লাগে না দিনক্ষণ, সাইবার বুলিং ঠিক তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। হতাশার বিষয়টা এটাই যে, না সাইবার বুলিং আদতে কোনো খেলা, আর না যারা এই কাজ করছে তারা বাচ্চা। সভ্যতার চূড়ান্ত অবক্ষয় ঘটানো একদল লোক মনের আনন্দেই সাইবার বুলিং করে যাচ্ছে সোশ্যাল সাইটগুলোয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন বাড়ছে বুলিং?

যে সমাজে অসভ্যদের হাতের মুঠোয় সভ্যতার প্রযুক্তি, সে সমাজ যেকোনো অনাচারের আদর্শ স্থান হবে, এটাই স্বাভাবিক- আজকাল বেশ প্রচলিত আছে এমন একটা কথা। কথাটা খানিকটা নয়, বেশ অনেকটাই সত্য। সভ্যতার স্বাভাবিক বোধটুকু যাদের ভেতর নেই, তাদের হাতে যখন রাশি রাশি প্রযুক্তি এসে জুটছে, তারা তো সেসবের যা-তা ব্যবহার করবেই। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ফল হিসেবে এটা দেখা যায়, মানসিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি কিংবা নিজেকে ছোট মনে করা ব্যক্তি নিতান্তই নিজের ক্ষোভ মেটাতে অন্যকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে থাকে। নিশ্চিতভাবেই এসব কাজ সরাসরি করার চেয়ে সাইবার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে করাটা তার পক্ষে সহজ ও সুরক্ষিত। বিকৃত মন ও নষ্ট রুচির অধিকারী যারা আপনারই মতন স্বাভাবিক মানুষের বেশ ধরে ঘুরছে আশেপাশে, তাদের কী করে চিনবেন অনলাইনে এই ভিড়ের মধ্যে? নিত্য দশজন মানুষ হয়তো ঢুকছে আপনার ফেসবুকের বন্ধু তালিকায়, কয়জনের খোঁজ নিচ্ছেন ভালো করে? খোঁজ নিয়েও বা কতটুকু সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে নিজের?

কুৎসা রটানো মানুষের আদি এক বদ অভ্যাস, কালের বিবর্তনে তার ছোঁয়া অনলাইনের দুনিয়ায় এসে ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। কেউ একজন ভাবতেই পারে, আপনার নামে বদনাম করে বেড়ালে আপনি শেষ হয়ে যাবেন, বিপর্যয় নেমে আসবে আপনার জীবনে, সে তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে বুলিংকেই বেছে নেবে তার করণীয় হিসেবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেছে নেয়ার কারণ কিন্তু খুব সহজ, এখানে আপনাকে অনেক বেশি মানুষ চিনতে পারে। দেখা না হওয়া লোকজনও আপনার ব্যক্তিগত কিংবা কাজের খবর ইত্যাদি রাখছে। কাজেই আপনাকে হেয় করে কিছু বলা বা আপনার সম্মান ক্ষুণ্ণ করে কোনো ছবি শেয়ার করা হলে সেটা অনেক বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছুবে এবং তাতেই আপনি অপমানে, হতাশায় প্রায় মরে যাবেন!

এই আপদ বিদেয় করার উপায় কী?

বিদেয় করার মতো সহজ আপদ এটা নয়, এই কথা মেনে নিতেই হবে। তবে কমানো সম্ভব অনেকটাই। যার-তার কথা গায়ে না মাখার অভ্যাস করতে হবে পুরোদমে, কেননা আপনার শান্তি আপনার নিজের হাতেই থাকা উচিত! তাছাড়া একদল ভীরু, কাপুরুষ এবং বিকারগ্রস্ত মানসিকতার লোক আপনাকে নিয়ে কী বলছে, কী করছে, সেসবে আপনার মান যেতে যাবেই বা কেন? আর যখন আপনি বিশ্বাস করছেন যে আপনার সম্মানহানি হচ্ছে না মোটেও, তখন এসব কার্যকলাপ আপনি মাথাই বা ঘামাবেন কেন?

রুখে দাঁড়ানো চাই এই সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে, দরকার কেবল একটু সচেতনতা; ছবিসূত্রঃ I Am Stronger

সাইবার সিকিউরিটির জরুরি ধারণাটুকু রাখুন, অস্বস্তি বোধ করার মতন কিছু ঘটলে আগেভাগেই সতর্ক হয়ে যান, প্রয়োজনে উপযুক্ত কারো সহায়তা নিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি স্বাভাবিক এবং নির্বিঘ্ন রাখতে। আপনি সচেতন হলে এবং নিজের অবস্থানে দৃঢ় থাকলে সোশ্যাল মিডিয়া বুলিং আপনার টিকির নাগালও পাবে না, শান্তি নষ্ট করা তো বহু দূরের কথা!

ফিচার ইমেজ সোর্স- youtube