ঢাকার অসহ্য যানজট: দুর্ভোগ কমাতে চাই সাহসী পদক্ষেপ

চারপাশে অসহ্য ও অসহনীয় গরম। সাথে আছে হালকা হাওয়ায় পুরো শরীর শ্রান্তিতে ভরিয়ে নেয়ার পরম আকুতি। এর সাথে যদি যোগ হয় ঘন্টার পর ঘন্টা যানজটের তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করার ঝক্কি, তাহলে তো আর কথাই নেই! তবে সাধারণ মানুষের এই যন্ত্রণা দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না।

তৃতীয় বিশ্বের এই যান্ত্রিক ও কর্মমুখর জীবনে এর চাইতে খুব বেশি কিছু আশা করা বোধ করি বোকামিই বটে। তাই তীব্র গরমে, ঘামে মাখা শরীরে নিজেদের কতটা অসহায়ই না লাগে! বাসে অসংখ্য মানুষের ভিড়ে নিজের জীবনটা পাশের রাস্তার নেড়ি কুকুরটার চাইতে খুব একটা উন্নত বলে মনে হয় না। সেসব অন্য আলোচনা। কিন্তু যানজটের বসে থাকা অসংখ্য ভাবুক মনের মতো মনে হয় নীতি-নির্ধারক কর্মকর্তাদের যদি এই যানজটে কিঞ্চিৎ বসিয়ে রাখা যেত, তাহলে মনে হয় আমাদের কষ্ট তারা কিছুটা হলেও বোঝার ফুরসৎ পেত! অবশ্য সেক্ষেত্রেও ঐ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দামি গাড়ির মধ্যে থেকে বাইরে গ্রীষ্মের দাবদাহের প্রকোপ বোঝানো অনেকেটাই অসম্ভব।

ঢাকার যানজট

অদূরেই উঁকি দিচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত মেট্রো ট্রেন যা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই খুব পরিচিত একটা নাম। দেরিতে হলেও এর প্রচলন আমাদের দেশে সফলভাবে হওয়ার আশায় আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে বসে আছি। মেট্রো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে দেবে সে কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু সে আশা পূরণ হতে এখনও ঢের দেরি।

মাঝের দুই তিন বছর কি তাহলে আমাদের মধ্যম পন্থা বলে আর কিছু নেই? আমাদের কি এভাবেই সহ্য করে যেতে হবে দৈনন্দিন এই সমস্যাগুলো? কেউ কি পারে না আমাদের এই দৈনন্দিন কষ্টের কথা চিন্তা করে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার? আর আমরা এমনই বা কেন ধরে নিচ্ছি যে মেট্রো হলেই ঢাকা শহরের সকল যানজট নিরসন হয়ে যাবে? আজ এখানে কিছু সাধারণ যুক্তি তর্কের কথা তুলে ধরা হচ্ছে যা একজন সাধারণ মানুষেরই সহজ চিন্তাপ্রসূত। যার বাস্তবায়ন করা গেলে হয়তো আমাদের যানজট সমস্যা কিছুটা হলেও নিরসন করা সম্ভব বলে আমাদের বিশ্বাস।

প্রস্তাবিত মেট্রোরেল

নিয়ন্ত্রিতভাবে লোকাল বাসের চলাচল নিশ্চিত করা

ঢাকা শহরের চারপাশে অনেকটা রাস্তা জুড়ে চলছে বিভিন্ন বাস। বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন রুটের বাস প্রতিনিয়ত অনিয়ন্ত্রিতভাবে ঢাকার রাজপথে বেপরোয়া ঢঙে চলছে। তাদের এই খামখেয়ালিপনা আর যথেচ্ছ গাড়ি চালানোর চেষ্টায় বাধা দেওয়ারও তেমন কেউ নেই। বাসে বসে মাঝে মাঝে “সার্জেন্ট” নামক ন্যক্তির ভয়ে কিছুটা ভীত হয়ে গাড়ি একটু তড়িঘড়ি বাসস্টপ অতিক্রম করতে দেখা যাওয়া ছাড়া তেমন কিছুই নেই চোখে পড়ার মতো।

মালয়েশিয়ায় যাত্রী সাধারণের জন্য সুপরিকল্পিত বাসস্টপ

আমরা কি আসলেই পারি না এই পুরো বাসব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়ে যাত্রীদের দৈনন্দিন যাত্রার সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে? প্রতিটি রুটে যে কয়টি বাস আছে তাদের একটি নির্দিষ্ট বিরতিতে চলাচল নিশ্চিত করা এমন কি কোনো কঠিন ব্যাপার? এক বাসকে টেক্কা দিয়ে অন্য বাসের ওভারটেক নামক বিভীষিকা থেকে কি আমরা আর কখনো বেরোতে পারব না? অথচ একটু সদিচ্ছা এবং কিছুটা কঠোরতা অবলম্বন করলেই সকল বাসের লিস্ট করে কোন রুটে কত সময় পর পর কোন বাসে চলাচল করবে তার একটা নিয়ম করে ফেলা যায়। আর নিয়ম শুধু করলেই হবে না, করতে হবে তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতও।

অনিবন্ধিত এবং বেআইনি রিকশা চলাচল বন্ধ করা

ঢাকা শহরে রিকশায় উঠলেই শুনতে হয় তারা একদিন বা দুদিন আগে উত্তরবঙ্গের বা ঢাকার নিকটবর্তী কোনো গ্রাম থেকে এসেই রিকশা নিয়ে আয় শুরু করে দিয়েছে। বেশিরভাগ সময় দেখা যায় সে ঢাকার কোনো জায়গায় চেনে না। খুব অবাক হতে হয়, কী করে একদিনের মধ্যে সে ঢাকা শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় কিছু না জেনেই রিকশা চালানোর অনুমতি পেয়ে যায়? রিকশা চালানো না জেনেই সে কী করে অবাধে অবৈধ রিকশা চালিয়ে বেড়াচ্ছে? নির্দিষ্ট পরিমাণ রিকশা যদি নির্দিষ্ট এলাকায় চালানোর অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে যানজট মোকাবেলায় অনেক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

ঢাকা শহরের অনিয়ন্ত্রিত রিকশা বাড়াচ্ছে যানজট

যাত্রী অধিকার আইন নিশ্চিত করা

বাংলাদেশে ভোক্তা অধিকার আইন যেমন দিন দিন কঠোর হচ্ছে, তেমনি যাত্রীদের জন্যও সুনির্দিষ্ট যাত্রী অধিকার আইন থাকা উচিত। ঢাকার যাত্রীরা বর্তমানে রিকশা আর সিএনজি চালকদের হাতে কুক্ষিগত। তাদের অযৌক্তিক ভাড়া এবং যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে যাত্রীদের আজ চরম দুর্দশার সম্মুখীন হতে হয়। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনারও কোনো নির্দিষ্ট কোনো প্রক্রিয়া নেই। গাড়ি চালক এবং মালিকদের যদি উপযুক্ত আইনের ব্যবস্থায় আনা যায়, তাহলে যানবাহন চলাচল আরও অনেক বেশি নিয়মতান্ত্রিক হবে।

ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প যানবাহনের ব্যবস্থা করা

বাংলাদেশে যানবাহনের অব্যবস্থাপনার কারণে অনেকেই নিজস্ব গাড়ি বা মোটরসাইকেল ব্যবহার করতে অনেক বেশি আগ্রহী থাকে। এই নির্ভরতা কমানো না গেলে যানজট কখনো কমানো সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ব্যক্তিগত গাড়ির উপর চাপ কমাতে আমরা অন্যান্য দেশের দিকে নজর দিতে পারি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ‘উবার’, ‘গ্রেব’ বা এ ধরনের ট্যাক্সি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বাংলাদেশে উবার যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের আরও কিছু ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার অনেকাংশেই কমে আসবে।

ডিজিটাল পদ্ধতিতে ট্যাক্সি নবায়ন

স্কুল এবং অফিসের সময়ের অসামঞ্জস্য তৈরি

‘সময়’ যানজটের জন্য একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্কুল ছুটির সময় দেখা যায় স্কুলগুলোর সামনে বেশ জটলা হয়ে থাকে প্রচুর গাড়ির। ফলে তৈরি হয়ে যায় ব্যাপক যানজট। প্রত্যেকটি স্কুলে যানবাহন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হলে এবং এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে যানজট অনেকাংশেই কমে আসবে। আবার অফিসের সময় এবং স্কুলের সময়ের মধ্যে যদি কিছুটা ব্যবধান রাখা যায় তবে অফিস যাত্রীরা যানজটের ঝামেলা অনেকটা এড়িয়ে চলতে পারবেন।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ করা

ঢাকা শহরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানেরই মূল কার্যালয় রয়েছে। যার ফলে দেশের বিভিন্ন স্থান হতে প্রতিনিয়ত অনেক মানুষকে ব্যবসায়িক এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ঢাকা শহরে ভিড় জমাতে হচ্ছে। পাশাপাশি সকল প্রকার চাকরির পরীক্ষার জন্য আবেদনকারীদের পুরো বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান হতে ঢাকা শহরে আসতে হয়।। হাজার উচ্চারিত এবং বহুল প্রচারিত এই ‘ডিজিটাল’ যুগে এই ব্যবস্থাটি খুব হাস্যকর বলে কি আমাদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মনে হয় না? দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত ঢাকা শহর বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কিন্তু পদক্ষেপটি অনেকটা সময়সাপেক্ষ এবং আলোচনাসাপেক্ষও বটে।

গ্রামে আয়ের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা

যেকোনো উপায়ে গ্রাম্য লোকদের অর্থ উপার্জনের আশায় ঢাকামুখী হওয়া থেকে বিরত করতে হবে। গ্রামে অর্থ উপার্জনের উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ এবং সঠিক ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের গ্রামে থাকতে আগ্রহী করতে হবে। একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, ঢাকা শহরের ধারণক্ষমতার বেশি জনসংখ্যা হলে যানজটের মতো আরও অনেক ধরনের সমস্যার কখনও লাঘব হবে না।

গ্রামে কপি চাষরত একজন কৃষক

পথচারী চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা

গাড়ি চলাচলে চালকদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমাদের সাধারণ মানুষের পথচলায়ও অনেক সচেষ্ট হতে হবে। যেখানে সেখানে হাত তুলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাস্তা পাড় হওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে। ফুটপাত ব্যবহার করার জন্য অবৈধ দোকানগুলো তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে উপযুক্ত পুনর্বাসনের মাধ্যমে। সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে ফুট ওভারব্রিজ তৈরি করতে হবে।

যত্রতত্র রাস্তা পারাপার

যানজট বর্তমানে আমাদের নিত্যসহনীয় একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। “চোখ থাকিতেও অন্ধ” বলে একটা প্রবাদ আছে। সকলেই জানি কী কারণে যানজট হচ্ছে বা এই যানজটে আমাদের ক্ষয়-ক্ষতি কী। তবুও আমরা আজও প্রচন্ড নির্বিকার। এই যানজট কমানোর জন্য আমাদের লেশমাত্র চেষ্টাও চোখে পড়া ভার। তবুও আমরা আশাবাদী। হয়তো খুব অচিরেই এমন কিছু সিদ্ধান্ত আসবে যা এই নিত্যদিনকার যানজটে পড়ে থাকা অব্যবহৃত সময়কে কিছুটা নিজেদের প্রয়োজনে ব্যয় করার সুযোগ এনে দেবে।

তথ্যসূত্র

bbc.com/bengali/news-38441494http://www.bbc.com/bengali/news-38441494

Related Articles