এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

বসে আছেন রেলস্টেশনে ট্রেনের আপেক্ষায়। আপনার মতো আরো অনেক যাত্রীই অপেক্ষা করছে। যাত্রীদের কোলাহল, হকারের দোটানা সুরের হাক আর কিছুক্ষণ পর পর প্লাটফর্মে ঝোলানো মাইকে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা- সব মিলিয়ে বেশ উপভোগ করছেন সময়টা। আশপাশের মানুষজন, ফেরিওয়ালার ঝুড়িতে সাজানো হরেক রকম পণ্য অথবা মোবাইলে কলের ভাইব্রেশন- সবই আপনার কাছে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। সবকিছুই মনে হচ্ছে সমসাময়িক এবং বাস্তব।

কিন্তু আপনার চারপাশে যে স্থাপনাগুলো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার কোনোটিই এ শতকের নয়। প্রতিটি প্লাটফর্ম, মাথার উপর ফুটো হয়ে যাওয়া টিনের চালা, স্টেশন মাস্টারের কক্ষসহ সকল ভবন, রেল পুলিশের কার্যালয়, এমনকি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা কন্ট্রোল টাওয়ারের বয়সও শতকের ঘর পেরিয়েছে অনেক আগেই। শুধু তা-ই নয়, যে ফুট ওভার ব্রিজে ভর করে প্লাটফর্মে এসেছেন, সেটিও এক শতকের বেশি সময় ধরে তার বুকের উপর দিয়ে যাত্রী পারাপার করে আসছে।

শতাব্দী প্রাচীন ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন; image source: wikimedia commons
পাখির চোখে বাংলাদেশের বৃহত্তম ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন; photo credit: ishwardian

বলা হচ্ছিল বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে জংশন ঈশ্বরদীর কথা। দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত এই জংশনটি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন রেল জংশনগুলোর মধ্যে অন্যতম। চারপাশের সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে; সরু রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে, পাশ দিয়ে গড়ে উঠেছে সুরম্য অট্টলিকা, ঝলমলে রঙিন আলোর শপিং কমপ্লেক্স, বিলাসবহুল সব হোটেল আর আধুনিক সড়কে যাত্রী পরিবহনের ব্যবস্থা। কিন্ত এই জংশনটি দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের পুরোনো ব্রিটিশ ঐতিহ্য আর স্থাপত্য গায়ে জড়িয়ে।

এই স্টেশনের স্থাপত্যশিল্প ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ গুমোট পরিবেশ আপনাকে নিয়ে যাবে ব্রিটিশ শাসনামলে। দু'চোখ বন্ধ করলেই অনুভব করতে পারবেন শতাব্দীপ্রাচীন ব্রিটিশ রাজত্বের অনুভূতি, যেন মনে হবে ঝক ঝক সুর তুলে এই বুঝি ছুটে আসছে ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান রেলওয়ের কয়লাচালিত এতিহাসিক সেই ট্রেন।

বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে ওভার ব্রিজ; image credit: ishwardian

 

স্থলপথে চলাচলের জন্য রেলওয়ে বেশ যাত্রীবান্ধব যোগাযোগব্যবস্থা। ভারতীয় উপমহাদেশে রেলওয়ে এসেছে ব্রিটিশদের হাত ধরে। প্রশাসনিক, সামরিক এবং ব্রিটিশ বাণিজ্যের প্রসারের জন্য ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে রেলসেবার প্রচলন করে।

১৮৫৮ সালে লন্ডনে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠন করা হয়। একই সময়ে আরও দুটি কোম্পানি (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার কোম্পানি) ইস্ট ইন্ডিয়ার সাথে হাওড়া এবং রানীগঞ্জ পর্যন্ত ও মুম্বাই থেকে কল্যাণী পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে রেলপথ নির্মাণের চুক্তি সম্পাদন করে, যা ছিল ব্রিটিশ ভারতে সর্বপ্রথম রেলওয়ে নির্মাণ প্রকল্প।

১৮৫৮ সালের ৩০ জুলাই, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে কলকাতার হুগলী নদীর পূর্বপাড় থেকে (বর্তমানে শিয়ালদহ স্টেশন) রাণাঘাট, দর্শনা, পোড়াদহ হয়ে পদ্মার উপনদী গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত কুষ্টিয়া পর্যন্ত (বর্তমান বাংলাদেশে) একটি রেলপথ নির্মাণের চুক্তি সম্পাদন করে। প্রস্তাবিত এই রেলপথের দৈর্ঘ্য ছিল ১১০ মাইল। ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কলকাতা থেকে রানাঘাট পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ কাজ শেষ করে। এই লাইন নির্মাণের অংশ হিসেবেই ধারাবাহিকভাবে ১৮৬২ সালের ১৫ নভেম্বর কুষ্টিয়ার জগতি পর্যন্ত নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। সেই হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম রেলওয়ে স্টেশনটি কুষ্টিয়ার জগতি বলেই পরিচিত।

১৮৭৪ সালে নর্থ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নামে ব্রিটিশ সরকার একটি নতুন ২৫০ কিলোমিটার মিটারগেজ রেললাইন স্থাপন করে। এটি ছিল বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে স্থাপিত প্রথম রেললাইন। লাইনটি পদ্মানদীর উত্তর পাড়ে সাঁড়াঘাট থেকে চিলাহাটী হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ঠিক একই সময়ে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে সাঁড়াঘাটের উল্টোদিকে পদ্মার দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত দামুকদিয়া থেকে পোড়াদহ পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ করে। অর্থাৎ কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত নির্মিত হলো দীর্ঘ রেল লাইন। কিন্তু মাঝখানে খরস্রোতা প্রমত্ত পদ্মা রেললাইনটিকে দ্বিখন্ডিত করে দেয়।

অবশ্য সে সময় কুষ্টিয়ার দামুকদিয়া থেকে ঈশ্বরদীর সাঁড়াঘাট পর্যন্ত নদী পারাপারের জন্য রেলওয়ে পরিচালিত স্টিমারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তাছাড়া ফেরীতে পারাপার করা হত কয়লা চালিত রেলওয়ে ওয়াগনও। মাঝখানে এই একমাত্র পদ্মা নদীর প্রতিবন্ধকতা ছাড়া কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যাত্রা ছিল নির্বিঘ্ন। ‌তখনও ঈশ্বরদী জংশন স্টেশন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। তখন ঈশ্বরদীর একমাত্র স্টেশন হিসেবে পরিচিত ছিল সাঁড়াঘাট।

সাঁড়াঘাটে ফেরীতে করে রেলের ওয়াগন পারপারের একটি দুর্লভ ছবি; image source: paksey.wordpress.com

 

এদিকে পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে পাট শিল্পের ব্যাপক উন্নয়নের জন্য ময়মনসিংহ, জামালপুর, ঢাকা, রাজশাহী এবং বেশ কিছু অঞ্চলে রেললাইন নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। কিন্তু কলকাতার সাথে সরাসরি ও নির্বিঘ্ন উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণে এ শিল্পের অগ্রগতি হচ্ছিল না। তাই প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় কলকাতার সাথে নির্বিঘ্ন ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের।

কলকাতা থেকে উত্তরবঙ্গ এবং আসামের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের জন্য প্রমত্তা পদ্মার উপর সেতু নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়ে। ১৯১৪ সালে পদ্মার উপর হার্ডিং ব্রিজ নির্মাণ শুরু হলে সাঁড়াঘাট থেকে সান্তাহার পর্যন্ত মিটার গেজ রেললাইনকে ব্রডগেজে উন্নীত করা হয়। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ দুই লেনবিশিষ্ট হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রেল চলাচলের জন্য উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে এই হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ডাবল ব্রডগেজ, ইস্পাত নির্মিত রেলওয়ে ব্রিজ।

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের পর সাঁড়াঘাটের আর কোনো গুরুত্ব থাকলো না। সরাসরি কুষ্টিয়ার পোড়াদহ থেকে ভেড়ামারা হয়ে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পার হয়ে উত্তরবঙ্গে নির্বিঘ্নে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হল। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের সমসাময়িককালে ১৯১০ সালের দিকে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন স্টেশনটি নির্মিত হয়। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ হার্ডিঞ্জ উদ্বোধনের দিনই ট্রেন চলাচলের মাধ্যমে এই জংশনটি উদ্বোধন করা হয়। সে সময় ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলওয়ে ইয়ার্ড আর আড়াআড়িভাবে প্রায় ১৭টি ব্রডগেজ রেললাইন স্থাপিত হয়। বর্তমানে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজের ফলে রেললাইন সংখ্যা ২৩-এ এসেছে।

শতাব্দী ধরে নিরলস যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ এই স্থাপত্যটি; image credit: saifuddin kamal

 

কলকাতা থেকে আসাম কিংবা শিলিগুড়ি পর্যন্ত যোগাযোগের মূল পয়েন্ট ছিল ঈশ্বরদী। সেসময়ে ঈশ্বরদী উপর দিয়ে অনেক যাত্রীবাহী এবং মালবাহী ট্রেন চলাচল করত। সুদীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দীতে সময়ের প্রয়োজনে অনেক কিছুই পরিবর্তন ঘটেছে। সবকিছুতেই লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। কিন্তু এই স্টেশনের খেয়াল রাখেনি কেউই। যেন কারো কাছে কোন অভিযোগ নেই, নেই কোনো আবদার, সবকিছু সয়ে নিজের সর্বস্ব দিয়ে এক শতাব্দী ধরে নিরলস যাত্রীসেবা দিয়ে যাচ্ছে ব্রিটিশ এই স্থাপত্যটি।

বর্তমানে এই স্টেশনের উপর দিয়ে প্রতিদিন ২৪টি যাত্রীবাহী এবং ১৪টি মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মৈত্রী এক্সপ্রেস ঢাকা থেকে কলকাতার মধ্যে ননস্টপ যাত্রায় একমাত্র ঈশ্বরদীতেই যাত্রাবিরতি দিয়ে থাকে। যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় এই জংশন স্টেশনটি বাংলাদেশে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।

ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন গুরুত্বপূর্ণ চারটি রেল রুটের সাথে সংযুক্ত। এগুলো হলো ঈশ্বরদী-খুলনা, ঈশ্বরদী-রাজশাহী, ঈশ্বরদী-পার্বতীপুর এবং ঈশ্বরদী-ঢাকা। এছাড়া বর্তমানে ঈশ্বরদী বাইপাস থেকে ঈশ্বরদী জংশন হয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগামী একটি লাইনের নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে এই জংশনটি রেলওয়ে বন্দর হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

ঈশ্বরদী জংশনের বিখ্যাত কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় আন্তঃনগর বেনাপোল এক্সপ্রেস; image source: railway.gov.bd

 

ঈশ্বরদী স্টেশন এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণকালে পাকশীতে পদ্মার তীরে গড়ে তোলা হয় পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে অফিস। এই  অফিস থেকে সেই সময় সারা বাংলার মধ্যে রেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হতো। বর্তমানে রেলওয়ে অঞ্চল দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পড়েছে পাকশীর মধ্যে। ১৯১০ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নির্মাণ শুরু হলে পাকশী হয়ে ওঠে একখন্ড ব্রিটিশ রাজত্ব। সাজানো-গোছানো ব্রিটিশ বসতি, খেলার মাঠ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এমনকি শিল্পকলা একাডেমিসহ অসংখ্য স্থাপনা ব্রিটিশদের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠে। তৎকালে ব্রিটিশদের পাশাপাশি বাংলাদেশের সমস্ত রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাকশীতে বসবাস করত। তাই এই অঞ্চলের মধ্যে রেলের জন্য জায়গাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে প্রমত্তা পদ্মার পাড়ে অসাধারণ এই ব্রিটিশ শহরটি দর্শনার্থীদের কাছে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শতাব্দী-প্রাচীন বৃক্ষরাজি, ছোট ছোট লালরঙা ইটের ঘর, সবুজের চাদরে বিছানা খেলার মাঠ, স্কুল-কলেজ এবং শিল্পকলা একাডেমি সবই রয়েছে এখানে। পদ্মার পাড় ঘেষে কোলাহলবর্জিত ছিমছাম এই শহরটি এখন বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের সদর দপ্তর।

পাকশী থেকে ঈশ্বরদীতে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য ১৯১০ সালে পাইলট লাইন নামে একটি রেললাইন নির্মাণ করা হয়। এই লাইনের উপর দিয়ে চলত পাইলট ট্রেন নামক এক আজব ট্রেন, যাতে টিকেট কিংবা ভাড়া প্রদানের কোনো পদ্ধতি ছিল না। রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও বিনা ভাড়ায় চলাচল করতে পারত অত্র অঞ্চলের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে পাইলট ট্রেন। এমনকি বর্তমানে এই লাইনগুলো মাটির নিচে এমনভাবে চাপা পড়ে গেছে যে দেখলে বোঝাই যায় না যে এখান দিয়েই একদিন ঝক ঝক রব তুলে ছুটে চলত ট্রেন।

ঈশ্বরদী স্টেশন থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। প্রমত্তা পদ্মার উপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৬০ ফুট উচ্চতায় নির্মিত। এ কারণে রেললাইনকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের সম-উচ্চতায় ওঠানোর জন্য ঈশ্বরদী থেকে দীর্ঘ ৮ কিলোমিটার মাটি দিয়ে ঢালু করা হয়েছে। পাকশী স্টেশনের নিকটবর্তী স্থানে প্রায় ৭০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন সবুজ ঘাস আর গাছপালায় আবৃত এই রেললাইন বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রেললাইন। এই সুউচ্চ রেললাইন দূর থেকে দেখলে সমতল ভূমিতে সবুজ পাহাড়ের মতো দেখায়। পাহাড় সমতুল্য এই রেললাইনের মাঝখান দিয়ে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য তৎকালে একাধিক টানেল নির্মিত হয়, যা এখনও বর্তমান।

রেল লাইনের নিচে দিয়ে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত টানেল; image source: AOTNWI

ঈশ্বরদী জংশনের সাথেই রয়েছে 'ডিজেল লোকোমোটিভ রানিং শেড'। লোকোমোটিভ মানে রেলের ইঞ্জিন। সংক্ষেপে একে লোকোও বলা হয়ে থাকে। এই লোকোশেডটি সার্বিকভাবে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং ব্রডগেজ রেললাইনের ক্ষেত্রে বৃহত্তম লোকোশেড। ১৯২৯ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের লোকোমোটিভ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। তখন এখানে বাষ্পীয় ইঞ্জিন মেরামত করা হত। সত্তরের দশকে এসে যুক্ত হয় ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ।

ঈশ্বরদী লোকোশেডকে বলা হয় দেশের ব্রডগেজ লোকোমোটিভের মাতৃভূমি। বর্তমানে এর অধীনে শতাধিক ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভ কার্যকর রয়েছে। নির্দিষ্ট সময় পর পর এসব ইঞ্জিন মেরামত করা, ট্রেনে ইঞ্জিন সংযোজন, তেল পরিবর্তন ও পরিশোধন, রাবার পুনঃস্থাপন, ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ নানা কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয় এখানে।

ঈশ্বরদী লোকোশেডে রিলিফ ট্রেন; image credit: saifuddin kamal

 

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনের পুনরুদ্ধারের জন্য এখানে সর্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকে উদ্ধারকারী ট্রেন। গুরুত্ব বিবেচনায় ঈশ্বরদী লোকোশেড একটি কেআইপিভুক্ত স্থাপনা। বাংলাদেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো শুধুমাত্র এই মর্যাদা পেয়ে থাকে। প্রায় ৬০ হাজার বর্গ মিটার ভূমির ওপর নির্মিত এই ব্রিটিশ স্থাপনাটি বাংলাদেশের ব্রডগেজ রেল ইঞ্জিনের বেস বলে পরিচিত। ভবিষ্যতে পদ্মা সেতু, মংলা বন্দর, রেল লিংক ও ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ চালু হলে ব্রডগেজ ট্রেনের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। তখন এই লোকোশেডটি আরো কর্মব্যস্ত হয়ে উঠবে।

তবে ঈশ্বরদী জংশনের ন্যায় এ স্থাপনাতেও আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। পুরাতন লক্কর-ঝক্কর যন্ত্রপাতি এবং ইঞ্জিন রাখার শেডগুলো এখনও জরাজীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের দীর্ঘ দুই কিলোমিটার ইয়ার্ডের মধ্যে ফতেহ-মহাম্মাদপুর এলাকায় এই লোকোশেডটি অবস্থিত।

তৎকালে ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠে একাধিক শিল্প-কারখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন শিল্প। বর্তমানে শহরের ব্রিটিশ স্থাপনাগুলো যেকোনো দর্শক বা ভ্রমণপিপাসুকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম। আধুনিকতা এবং ব্রিটিশ স্থাপত্যের মিশেলে বর্তমানে ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

This is a bengali article discussing the attractive history of Ishwardi Railway Junction of Bangladesh. Necessary references have been hyperlinked.

Featured Image; Credit : Fatima Nujhat Nupur