ফ্রম ঢাকা উইথ লাভ: বাংলাদেশে সোভিয়েত গোয়েন্দা কার্যক্রমের কিছু অজানা অধ্যায়

প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি এবং গ্রু সম্পর্কে কে না জানে? কেজিবি (Комитет Государственной Безопасности, ‘КГБ’) বা ‘কোমিতেত গোসুদার্স্তভেন্নয় বেজোপাসনস্তি’ (রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কমিটি) ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। আর গ্রু (Главное Разведывательное Управление, ГРУ) বা ‘গ্লাভনোয়ে রাজভেদিভাতেলনোয়ে আপ্রাভলেনিয়ে’ (মূল গোয়েন্দা বিভাগ) ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। স্নায়ুযুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে কেজিবি এবং গ্রু সমগ্র বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল।

কেজিবি এবং গ্রু–এর কার্যপদ্ধতি ছিল অত্যন্ত সুচতুর, কিন্তু একই সঙ্গে অত্যন্ত নির্মম। সোভিয়েত ইউনিয়নের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রবিরোধী ও সরকারবিরোধীদের ওপর নিষ্পেষণের খড়গ নামিয়ে আনা থেকে আরম্ভ করে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের একান্ত গোপন তথ্য সংগ্রহ করা– সবকিছুতেই কেজিবি এবং গ্রু ছিল অগ্রগামী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই দুইটি সংস্থার লক্ষ্য এক হলেও সাংগঠনিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এদের মধ্যে ছিল সাপে–নেউলে সম্পর্ক!

কেজিবি এবং গ্রু বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশের প্রতিটি রাষ্ট্রেই সক্রিয় ছিল, এবং তারা এতটাই আগ্রাসীভাবে গুপ্তচরবৃত্তির কার্যক্রম পরিচালনা করতো যে, অনেক সময়েই তাদের কার্যক্রম প্রকাশ্যে চলে আসতো এবং এর ফলে প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব দেখা দিত। অনেক ক্ষেত্রে কেজিবি এবং গ্রু অপারেটররা বিভিন্ন রাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িত থাকা অবস্থায় ধরা পড়ে, কিন্তু এই রাষ্ট্রগুলো গ্রেপ্তারকৃত সোভিয়েত গুপ্তচরদের বড়জোর দেশ থেকে বহিষ্কার করা ছাড়া অন্য কিছুই করতে পারত না, কারণ প্রায়ই এই অপারেটররা ‘কূটনৈতিক নিরাপত্তা’র (diplomatic immunity) ছত্রছায়ায় থাকতো।

মস্কোর লুবিয়াঙ্কা স্কয়্যারে অবস্থিত কেজিবির প্রাক্তন সদর দপ্তর। বর্তমানে এটি রুশ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা ‘এফএসবি’র সদর দপ্তর; Source: Wikimedia Commons

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (United States Department of State) তথ্য অনুযায়ী, স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে কেজিবি এবং গ্রু বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে অবস্থিত সোভিয়েত দূতাবাস ও কনস্যুলেটের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের গুপ্তচরবৃত্তিতে নিযুক্ত করত। এদের মধ্যে রাষ্ট্রদূত ও অ্যাটাশে পর্যায়ের কূটনৈতিক কর্মকর্তা থেকে গ্রন্থাগারিক ও দোভাষী পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মচারীরাও ছিল। কেবল কূটনৈতিক পর্যায়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীরাই নয়, বিদেশে কর্মরত সোভিয়েত সাংবাদিক, ব্যাঙ্কার, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি, হোটেল প্রতিনিধি, বিমানকর্মী – এরকম বিভিন্ন পেশার মানুষ কেজিবি বা গ্রু–এর চর হিসেবে কাজ করত। স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে বিভিন্ন রাষ্ট্র বহু সোভিয়েত নাগরিককে গুপ্তচরবৃত্তি বা অন্য কোনো ধরনের বেআইনি কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার করেছিল।

অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা সক্রিয় ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে কেজিবি ‘পূর্ব পাকিস্তান’ সম্পর্কে সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের কাছে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল, তাতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হলেও সেখানে সোভিয়েত–স্টাইলের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা খুবই কম, কারণ বাংলাদেশের জনসাধারণ ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল এবং বাংলাদেশি রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণি মূলত পশ্চিমামুখী। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মস্কো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন প্রদান করে, কিন্তু কেজিবির ধারণা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়।

স্বাধীনতা লাভের পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা লাভ করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এ সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করে, কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থিক সামর্থ্য ছিল পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় যথেষ্ট কম এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল মূলত পশ্চিমামুখী। এজন্য বাংলাদেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জোট নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে।

১৯৭২ সালের ৩ মার্চ মস্কোতে বাংলাদেশি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; Source: Dainik Bangla via The Daily Star

১৯৭৫ সালে মুজিব ৪টি দলের সমন্বয়ে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) গঠন করেন। এই দলগুলোর মধ্যে দুইটি ছিল বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (Communist Party of Bangladesh, CPB) এবং মোজাফফর আহমেদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। সিপিবি এবং ন্যাপ উভয়ই ছিল মস্কোপন্থী রাজনৈতিক দল, এবং এদের সঙ্গে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ ছিল বলে ধারণা করা হয়। এটি অস্বাভাবিক নয়, কারণ জাপান থেকে চিলি পর্যন্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের কমিউনিস্ট দলগুলোর সঙ্গেই কেজিবি যোগাযোগ রক্ষা করে চলত।

১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতীয় ও সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মুজিবকে জানান যে, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা চলছে। কিন্তু মুজিব এই সতর্কবাণী গুরুত্ব সহকারে নেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুথানে মুজিব সপরিবারে নিহত হন এবং খন্দকার মোশতাক আহমেদের রাষ্ট্রপতিত্বে একটি সামরিক–প্রভাবাধীন সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন হয়। এই সরকার পশ্চিমা বিশ্ব, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রয়াসী হয় এবং মস্কোর থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রকৃত শাসকে পরিণত হন এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। তিনি বাংলাদেশের পশ্চিমাপন্থী ও চীনপন্থী পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত রাখেন, ফলে স্বাভাবিকভাবেই মস্কোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটেনি। তবুও এ সময় ঢাকায় অবস্থিত দূতাবাসগুলোর মধ্যে সোভিয়েত দূতাবাস ছিল সবচেয়ে বড় এবং সেখানে ৩৬ জন কূটনীতিবিদ ও প্রায় ১০০ জন কর্মচারী কর্মরত ছিল।

আফগানিস্তানে মোতায়েনকৃত একদল সোভিয়েত সৈন্য। বাংলাদেশ আফগানিস্তানে সোভিয়েত সৈন্য প্রেরণের তীব্র বিরোধিতা করেছিল; Source: The Christian Science Monitor via Asia Times

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে মস্কোর সঙ্গে ঢাকার বেশ কিছু বিষয়ে তীব্র মতপার্থক্য ঘটে। ১৯৭৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর ভিয়েতনাম কম্বোডিয়া আক্রমণ করে এবং কম্বোডিয়ার নৃশংস চীনপন্থী ‘খেমার রুজ’ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে একটি ভিয়েতনামপন্থী সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করে। কম্বোডিয়ার ওপর ভিয়েতনামের এই আক্রমণে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তার পশ্চিমাপন্থী ও চীনপন্থী পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানায়।

১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত সৈন্যরা আফগানিস্তানে প্রবেশ করে এবং আফগান রাষ্ট্রপতি হাফিজুল্লাহ আমিনকে খুন করে তার স্থলে বাবরাক কারমালকে অধিষ্ঠিত করে। বিশ্বের অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশও আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানায় এবং এর প্রতিবাদে ১৯৮০ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিতব্য গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস বর্জন করে।

১৯৮০ সালে বাংলাদেশ সরকার ৪ জন সোভিয়েত কূটনীতিবিদকে বহিষ্কার করে। এই কূটনীতিবিদরা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অত্যাধুনিক যোগাযোগমূলক যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিলেন এবং বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থা সন্দেহ করছিল যে, বাংলাদেশিদের মধ্যে নিযুক্ত সোভিয়েত গুপ্তচরদের (বা ‘এজেন্ট’দের) সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য এগুলো ব্যবহার করা হবে। এজন্য বাংলাদেশ থেকে এই কর্মকর্তাদের বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু ঢাকা ও মস্কো উভয় পক্ষই এই ঘটনাটিকে নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি না করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যায়।

প্রাক্তন কেজিবি কর্মকর্তা ভাসিলি মিত্রোখিনের বইয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সোভিয়েত ভূমিকা সম্পর্কে কিছু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য রয়েছে; Source: Secret Ops

১৯৮১ সালের ৩০ মে একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন এবং উপ–রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন। কিন্তু বাংলাদেশের প্রকৃত শাসনক্ষমতা চলে যায় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে। এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ একটি সামরিক অভ্যুত্থানে সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং ২৭ মার্চ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত করেন, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা তার হাতেই ন্যস্ত ছিল।

এরশাদ বাংলাদেশকে আরো দৃঢ়ভাবে পশ্চিমা ও চীনা প্রভাব বলয়ের অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে। জিয়াউর রহমানের পতনের পর বাংলাদেশে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম আরো বৃদ্ধি পায় এবং এই কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশে হয় সোভিয়েতপন্থী নয়ত জোট নিরপেক্ষ একটি সরকারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। কিন্তু সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম বাংলাদেশ সরকারের কাছে অজানা ছিল না, ফলে এরশাদের শাসনামলের (পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ) প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক দ্বন্দ্বের ঘটনা সংঘটিত হয়।

১৯৮১ সালের আগস্টে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে (বর্তমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর) নিরাপত্তারক্ষীরা দুইজন সোভিয়েত কূটনীতিবিদের কাছে লুকানো বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি খুঁজে পায় এবং এ সময় কূটনীতিক দু’জনের সঙ্গে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তার হাতাহাতি হয়। কূটনীতিক দুইজন ছিলেন ঢাকাস্থ সোভিয়েত দূতাবাসের থার্ড সেক্রেটারি আলেক্সেই জোলোতুখিজ এবং ভ্লাদিমির লাজারেভ। নিরাপত্তারক্ষীরা তাদেরকে গ্রেপ্তার করে এবং ‘একজন বাংলাদেশি কর্মকর্তাকে আক্রমণ’ করার দায়ে তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এই দুইজন ব্যক্তির বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। উল্লেখ্য, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার মাত্র দুই মাস পরেই এই ঘটনা ঘটে।

১৯৮২ সালের ৩১ মার্চ ঢাকা থেকে ২৫ কি.মি. দূরে জয়দেবপুরে (বর্তমান গাজীপুর) রাস্তার পাশের একটি জঙ্গল থেকে দুইজন সোভিয়েত কূটনীতিবিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত কূটনীতিবিদরা সেখানে ৫৮৮ রোল মুভি ফিল্ম পুড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। এই কূটনীতিক দু’জন, যাদের নামের শেষাংশ ছিল যথাক্রমে লোমাভস্কি এবং কিরিচুক, ছিলেন ঢাকাস্থ সোভিয়েত দূতাবাসের অ্যাটাশে। তাদেরকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত করা হয় এবং বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। উল্লেখ্য, এই কূটনীতিক দু’জন গ্রেপ্তার হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে এরশাদ একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে অপসারিত করেন এবং আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে আসীন করেন।

১৯৮০–এর দশকের বাংলাদেশি–সোভিয়েত কূটনৈতিক ঘটনাগুলোর সময়ে বাংলাদেশে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীর ভালেন্তিন স্তেপানভ; Source: Bessmertny Polk – Moskva

১৯৮৩ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (Bangladesh Nationalist Party, ‘BNP’) নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট বাংলাদেশে সামরিক আইনের অবসান, নাগরিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবিতে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। ২৬–২৭ নভেম্বরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও বাংলাদেশ রাইফেলস (Bangladesh Rifles, ‘BDR’) সদস্যদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৪ জন আন্দোলনকারী নিহত হয় ১৯৩ জন গ্রেপ্তার হয়। ২৩৮ জন পুলিশ ও বিডিআর সদস্য এই সংঘর্ষে আহত হয়।

এই ঘটনার মাত্র ১ দিন পর বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বাংলাদেশে নিযুক্ত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ভালেন্তিন স্তেপানভকে তলব করেন। বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সংঘাতের জন্য সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থাকে দায়ী করা হয়। বাংলাদেশি কর্মকর্তারা ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ’, ‘সরকারবিরোধী দলগুলোকে অর্থ সরবরাহ’ এবং ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপে’র জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নকে অভিযুক্ত করেন। ঢাকাস্থ সোভিয়েত দূতাবাসে নিযুক্ত কূটনীতিকদের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়। তদুপরি, ঢাকাস্থ সোভিয়েত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার নির্দেশও দেয়া হয়।

মোট ১৮ জন সোভিয়েত কূটনীতিবিদ এই ঘটনায় বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কৃত হন। এদের মধ্যে ৯ জন ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে, ৫ জন ডিসেম্বরে এবং ৪ জন ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ত্যাগ করেন। উল্লিখিত ১৮ জন কূটনীতিবিদের মধ্যে অন্তত ৪ জন ইতোপূর্বে অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, সোভিয়েত কূটনীতিকদের বহিষ্কারের ঘটনার দুই সপ্তাহের মধ্যেই ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত হন।

একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ থেকে মোট ৪ বার সোভিয়েত কূটনীতিকদের বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এদের মধ্যে ৩ বারই বহিষ্কারের আগে বা পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। এর থেকে আন্দাজ করা যায় যে, সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সোভিয়েত কূটনীতিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বেশ গভীরভাবেই জড়িত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আর্কাইভ এখনো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, ফলে বাংলাদেশে কেজিবি এবং গ্রু–এর কার্যক্রমের প্রকৃত মাত্রা সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য প্রদান সম্ভব নয়।

১৯৮৩ সালের ঘটনার পর বাংলাদেশ ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে আর কোনো ‘কূটনৈতিক ঘটনা’ (diplomatic incident) ঘটেনি। এর থেকে ধরে নেয়া যায় যে, এই ঘটনার পর কেজিবি এবং গ্রু বাংলাদেশে তাদের তৎপরতা হ্রাস করেছিল। কিংবা এটিও হতে পারে যে, বাংলাদেশে গুপ্তচরবৃত্তি করার ক্ষেত্রে তারা আরো সতর্ক ও গোপনীয় পন্থা অবলম্বন করেছিল, যে কারণে আর নতুন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

প্রকৃত ঘটনা যাই হোক না কেন, ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তীব্র গণআন্দোলনের ফলে এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। অন্যদিকে, ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি হয় এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে।

This is a Bengali article about Soviet espionage activities in Bangladesh.

References:

1. "Expulsions of Soviet Officials Worldwide, 1986," Foreign Affairs Note, United States Department of State, Washington, D.C.

2. Shahriar Feroze, "Intellectually Moscow," The Daily Star, December 21, 2014.

3. Alamgir Mohiuddin, "The government has ordered 18 Soviet diplomats expelled for...," UPI, November 30, 1983.

4. "Expelled Soviet diplomats leave Bangladesh capital," The Christian Science Monitor, January 4, 1984.

Source of the featured image: Don S. Montgomery/Wikimedia

Related Articles