দিব্যা ভারতী: স্বল্পায়ু, প্রাণোচ্ছল এক তারকার গল্প

‘সাত সামুন্দার পার’ কিংবা ‘অ্যায়সে দিওয়ানে হি’ গান শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসে এক মিষ্টি মেয়ের মুখ, ‘৯০ দশকের শুরুর দিকে বলিউডে সাড়া জাগানো অন্যতম অভিনেত্রী দিব্যা ভারতী। রুপালী পর্দায় তার অভিষেক ঘটে তেলেগু সিনেমার মাধ্যমে। ১৯৯০ সালের প্রথম দিকে তিনি বেশ কিছু বাণিজ্যিকভাবে সফল তামিল এবং তেলুগু চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন। ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা সুপার হিট হওয়ায় রাতারাতি তারকা বনে যান দিব্যা। এছাড়া তার অভিনয় আর কোমল চেরাহায় সুমিষ্ট হাসি নজর কাড়ে সবার। স্বল্পায়ু এই অভিনেত্রী মাত্র ৫ বছর অভিনয় জীবনে প্রায় ২১টি সিনেমায় অভিনয় করেন। ১৯৯২ সালে হিন্দি সিনেমায় অভিষেক ঘটে এবং সেই বছরই অর্জন করেন ‘ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী অভিষেক পুরস্কার’। তবে খ্যাতির শিখরে অবস্থানকালে আকস্মিক তার মৃত্যুর খবর সকলের কাছে ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। নিজ বাসভবনেই তার মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যা তা আজও সকলের কাছে রহস্য।

দিব্যা ভারতী; Source:cinestaan

১৯৭৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাইয়ে দিব্যা ভারতীর জন্ম। দিব্যার বাবা ওম প্রকাশ ভারতী ছিলেন একজন বীমা কর্মকর্তা। ওম প্রকাশের দ্বিতীয় স্ত্রী মীতা ভারতী ছিলেন দিব্যার মা। ওম প্রকাশ ও মীতার সংসারে দিব্যা ও তার ছোট ভাই কুনাল ছাড়াও ওম প্রকাশের প্রথম স্ত্রীর দুই ছেলেমেয়ে ছিল। শিক্ষাজীবনে তিনি ভারতী জুহু ও মুম্বাইয়ে মানিকজী কুপার উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ছোট থেকেই দিব্যার অভিনয় জগতে ভীষণ আগ্রহ ছিল। অল্প বয়সেই হিন্দি গানের সাথে নাচে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। স্কুলের পড়া বাদ দিয়েই তিনি অনুশীলন করতেন অভিনয় আর নাচ।

বাবা-মা ও ভাই কুনালের সাথে দিব্যা ভারতী; Source:The Bridal Box

স্কুলে পড়ার সময়ই তিনি বেশ কিছু বলিউড সিনেমার প্রস্তাব পান, তবে অল্প বয়সের কারণে তার অভিনয়ে পরিপক্কতা না আসায় অডিশনেই বাদ পড়েন তিনি। এরপর ১৯৯০ সালে তেলেগু ছবির বিখ্যাত প্রযোজক ডি রামানাইড়ু ‘ববিলি রাজা’ সিনেমার জন্য নিজের ছেলের বিপরীতে নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেন দিব্যা ভারতীকে। মাত্র ৯ম শ্রেণীতে পড়াকালীন দিব্যার প্রথম সিনেমা ‘ববিলি রাজা’ মুক্তি পায়। সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে আশাতীত সাফল্য পায় এবং দিব্যার হাসিমাখা পুতুল সদৃশ চেহারা সকলের নজর কাড়ে।

সেবছরই তামিল সিনেমা ‘নিলা পানি’ এবং ১৯৯১ সালে ‘না ইল্লে না সরগাম’, ‘রডি আলুডু’, ‘এসেম্বলি রোডি’, ‘ধর্ম ক্ষেত্রাম’ নামক ৪টি তেলেগু সিনেমায় কাজ করেন তিনি এবং প্রতিটি সিনেমাই বাণিজ্যিক সফলতা পায়। এরপর ১৯৯২ সালে সানি দেওলের বিপরীতে রাজিব রাই পরিচালিত ‘বিশ্বাত্মা‘ ছবির প্রস্তাব পান তিনি। মুক্তির পর সিনেমাটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে, বিশেষ করে সিনেমাটির প্রতিটি গানই জনপ্রিয়তা লাভ করে। ‘সাত সামুন্দর’ গানের সুর ও কথায় বাংলাদেশেও তৈরি হয় ‘নীল সাগর পার হয়ে’ গানটি, যার চিত্রায়নে সালমান শাহ ও সোনিয়াকে দেখা যায়। ‘বিশ্বাত্মা’ সিনেমাটিতে অভিনয়ের প্রশংসা প্রাপ্তির সাথে সুন্দর চেহারার নায়িকা হিসাবেও বেশ আলোচিত হন তিনি। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও জায়গা করে নেয় দিব্যার ছবি।

দিওয়ানা সিনেমায় শাহরুখ ও দিব্যা; Source:poojaslibrary.wordpress.com

পরবর্তী বছর মুক্তি পায় ‘দিল কা ক্যায়া কাসুর’, সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে সফল না হলেও অভিনয়ের জন্য দিব্যা বেশ প্রশংসিত হন। ১৯৯২ সালে মুক্তি পায় ডেভিড ধাওয়ানের ‘শোলা অউর শবনম’, এ সিনেমাটিতে গোবিন্দের বিপরীতে দেখা যায় দিব্যাকে। ছবির এক দৃশ্যে সাঁতারের পোশাকে আবির্ভূত হয়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে দিব্যা। তবে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয় ১৯৯২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিওয়ানা’ সিনেমাটি। নবাগত শাহরুখ খানের বিপরীতে দিব্যার অনবদ্য অভিনয় আর ছবির গানগুলো বিশেষ করে ‘তেরা নাম রাখ দিয়া’ গানের জনপ্রিয়তায় বর্ষসেরা সিনেমার তকমা পায় ‘দিওয়ানা’। সেই বছরেই ফিল্মফেয়ার উৎসবে দিব্যা ও শাহরুখ দুজনেই ‘লাক্স ফেইস অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার অর্জন করেন।

সিনেমার দৃশ্যে গোবিন্দের সাথে দিব্যা; Source:GramUnion

সেই বছরই আরো কিছু সফল সিনেমা খেতাব ঝুলিতে ভরেন দিব্যা। গোবিন্দের বিপরীতে ‘জান সে পেয়ারা’, নবাগত সুনীল শেঠির বিপরীতে ‘বলবান’, আরমান কোহলির বিপরীতে ‘দুশমন জমানা’, অবিনাশ ওয়াধাওয়ানের বিপরীতে ‘গীত’, মোহন বাবুর বিপরীতে তেলেগু ছবি ‘চিত্তামা মগোদু’ সবগুলো ছবিই ছিল ব্যবসাসফল। মিষ্টি হাসি আর অভিনয়ের দক্ষতায় অল্প দিনেই শাহরুখ খান, গোবিন্দ, ঋষি কাপুর, সঞ্জয় দত্তের বিপরীতে জুটি বেঁধে প্রায় ১৩টি বাণিজ্যিকভাবে সফল হিন্দি সিনেমা উপহার দেন এবং বেশ প্রশংসিত হন। একই সাথে তেলেগু ও বলিউডে সমানভাবে রাজত্ব করতে থাকেন টানা কয়েকটি বছর।

সঞ্জয় দত্ত ও দিব্যা; Source:Gram Union

এরই মধ্যে দিব্যার সাথে পরিচয় হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক সাজিদ নাদিয়াদওয়ালার সাথে। গোবিন্দর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ার সুবাদে ‘শোলা আউর শবনম’ সিনেমার শুটিং চলাকালীন বেশ কয়েকবার দেখা হয় তাদের। সেখান থেকেই আলাপ এবং সম্পর্ক গড়ায় ভালবাসায়। ১৯৯২ সালের ১০ মে ইসলামী রীতিতে বিয়ে করেন তারা। বিয়ের পূর্বেই দিব্যা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার নতুন নাম হয় সানা নাদিয়াদওয়ালা।

স্বামীর সাথে দিব্যা; Source:The Bridal Box

জীবদ্দশায় তার মুক্তিপ্রাপ্ত শেষ সিনেমা ‘ক্ষত্রিয়’। মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন পূর্বে মুক্তি পায় এবং সিনেমাটিও ছিল ব্যবসাসফল। এছাড়া তার অসমাপ্ত কাজ তেলেগু ছবি ‘থোলি মুডধু’ এবং হিন্দি ‘রং’ ও ‘শতরঞ্জ’ মুক্তি পায় তার মৃত্যুর পর, সিনেমা তিনটিই অন্য অভিনেত্রীদের দিয়ে ডাবিং করে হয়েছিল।

সময়টা ছিল ১৯৯৩ সালের ৫ এপ্রিল। সেই রাতে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় ভারতীয় উদীয়মান নায়িকা দিব্যা ভারতীর। কী ঘটেছিল সেই রাতে তা নিয়ে আজও অনেক বিতর্ক রয়েছে। সত্যিই আত্মহত্যা নাকি নেহায়েত দুর্ঘটনা ছিল তা নিয়েও চলেছে অনেক তদন্ত। তদন্তের সেসব তথ্য আর পুলিশের সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী জানা যায়, সেই রাতে মুম্বাইয়ের ভারসোভায় পাঁচতলা ভবন তুলসীতে আরো তিনজন উপস্থিত ছিলেন- দিব্যার পোশাক ডিজাইনার ও বান্ধবী নিতা লুলা, তার স্বামী ড. শ্যাম লুলা ও বাসার পরিচারিকা। পরদিন অনেক ভোরে আউট ডোর শুটিং থাকায় নিতা নুলাকে বাসায় ডেকে পাঠান তিনি। তবে দিব্যার স্বামী সেদিন বাসায় ছিলেন না। লিভিং রুমে দুই অতিথির সাথে গল্প করছিলেন আর পরিচারিকা অমৃতা তাদের খাবারের আয়োজনে ব্যস্ত ছিল।

সাক্ষী নিতার ভাষ্যানুযায়ী, দিব্যা মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন। বাড়ির সব জানলায় গ্রিল থাকলেও লিভিং রুমের লাগোয়া জানালাটিতে কোনো গ্রিল ছিল না। তখন প্রায় রাত ১১:৪৫ মিনিট, দিব্যা অমৃতার সাথে কিছুটা উচ্চস্বরে কথা বলতে বলতে জানলার পাশে গেলে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান। গাড়ি পার্কিংয়ের মাটিতে আছড়ে পড়ে তার দেহ। শোরগোলে প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মুম্বাইয়ের কুপার হাসপাতালে। সেখানকার ইমার্জেন্সি বিভাগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। শরীরের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত তার মৃত্যুর কারণ হিসাবে নিশ্চিত করেন ইমার্জেন্সি বিভাগের কর্তব্যরত ডাক্তারেরা। তবে অনেকের মতে, দিব্যার উচ্চতা ভীতি ছিল। তাই খোলা জানলার কাছে নিজ ইচ্ছায় যাওয়াটা সকলের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি।

Source:patrika.com

আবার শোনা যায়, শ্বাশুড়ি ও স্বামীর সঙ্গে তার সম্পর্কের বেশ টানাপোড়ন চলছিল। সেজন্য তিনি আত্মহত্যা করেন। তবে খ্যাতির শীর্ষে অবস্থানকালে কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিবে এটাও আত্মীয়দের কাছে ছিল ভিত্তিহীন। অন্যদিকে নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করার মাত্র ১১ মাস পরই তিনি আত্মহত্যা করবেন এমন মানসিক কষ্টের কোনো প্রমাণ মেলেনি স্বজনদের বক্তব্য থেকে। এছাড়া পরদিন নতুন সিনেমার শুটিং এ যাওয়ার জন্য বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন দিব্যা- এমনটাই বলেন অমৃতা। আত্মহত্যার উদ্দেশ্য থাকলে তিনি কখনই নীতা ও তার স্বামীকে ডেকে আনতেন না।

তবে দিব্যা ভারতীর অধিকাংশ ভক্তদের ধারণা, এটা ছিল তার স্বামী সাজিদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সাজিদ, নীতা ও তার স্বামীর মাধ্যমেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটায় বলে বেশ গুঞ্জন ওঠে। তদন্তের সময় এই মৃত্যুর রহস্য ভেদ করতে মুখোমুখি হতে হয়েছিল আরো অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনার। গুজব আছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আবু সালেম বা দাউদ ইব্রাহিমের সাথে সংযোগ ছিল সাজেদের। ১৯৯৩ সালের ১৩ মার্চ, মুম্বাইয়ে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের কোনো তথ্যের সাক্ষী ছিলেন দিব্যা, যার ফলে তাকে মেরে ফেলা জরুরি ছিল এমনও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছিল তখন। কারণ অনেকের মতে, তদন্তের রিপোর্ট ছিল টাকা দিয়ে সাজানো। তাই সেদিন রাতে ওই দুইজন ছাড়া সেখানে কেউ ছিল কিনা এ বিষয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন।

এই ভবনের পাঁচ তলায় থাকতেন দিব্যা; Source:Twitter

এমনকি কর্তব্যরত পুলিশ অমীমাংসিত অবস্থায় এই হত্যার ফাইল বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে তিনি দুর্নীতির অভিযোগে চাকরি হারান ১৯৯৮ সালে। তাই দিব্যার মৃত্যুর ঘটনা অর্থের বিনিময়ে সাজানো- এই ধারণাও অগ্রাহ্য করা সম্ভব হয়নি। তাই আজও তার মৃত্যু ভক্তদের কাছে রহস্য হিসাবেই রয়ে গেছে। কিছু ধারণা যা অমূলক হতেও পারে না-ও হতে পারে, এর বেড়াজাল ভেদ করে সত্যটা আর কখনোই হয়তো সামনে আসবে না। দিব্যার ভক্তদের মনে আজো প্রশ্ন জাগে, সেদিনের ঘটনা কেবল আত্মহত্যা নাকি হত্যা নাকি কেবলমাত্র দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন এই অভিনেত্রী।

বলিউডের আকাশে ক্ষণস্থায়ী উজ্জ্বল এই নক্ষত্র মাত্র ১৯ বছরেই অর্জন করে গেছেন নাম, খ্যাতি আর ভক্তদের অপরিসীম ভালবাসা। আর এই ভালবাসাই সদা হাস্যোজ্জ্বল, প্রাণোচ্ছল, মায়াবী চেহারার দিব্যা ভারতীকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে সকলের মাঝে।

ফিচার ইমেজ- womenpla.net

Related Articles