পরিবেশের কল্যাণে কম মানুষ আত্মনিয়োগ করেননি। কেউ স্থানীয় মানুষদের সাথে গড়েছেন প্রতিরোধ আন্দোলন, কেউ সরকারের চক্ষুশূল হয়ে করেছেন গারদবাস। আর চিকো মেন্ডেজের নিহত হওয়ার কথা তো সবারই জানা। এমনই অসংখ্য নিরলস কর্মীর ভীড়ে নিজেকে আলাদা করেছেন ডগলাস টম্পকিন্স নামের এক মার্কিন নাগরিক। কী করেছেন তিনি? দেখা যাক।

জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং ব্যবসায়ী জীবন

আর দশজন মার্কিন যুবকের তুলনায় ওহাইয়োর যুবক ডগলাসের জীবন বিশেষ আলাদা কিছু ছিল না। হাই স্কুল ড্রপ আউট ডগলাস জীবনের শুরুর দিকের বেশ কয়েকটা বছর কাটিয়েছেন নিউ ইয়র্ক শহরের ভীড়, মস্ত মস্ত বাড়ি আর ডামাডোলের মধ্যে।

ডগলাস টম্পকিন্স; ছবিসূত্র: youtube

১৯৬০ সাল, ডগলাসের বয়স মাত্র ১৬ কি ১৭, বাড়ি ছেড়ে বেরোলেন পৃথিবীটাকে দেখতে। পাহাড়ে চড়ে আর স্কি করে বেড়ালেন দুটো বছর। ঘুরলেন কলোরাডো, ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকা। প্রকৃতির সাথে সম্পর্কটা হয়ে উঠলো নিবিড়। ১৯৬৪ সালে নর্থ ফেস ইঙ্ক নামের একটা রিটেইল কোম্পানী খুললেন। পাইকারি তাবু এবং শোবার সরঞ্জাম বিক্রি করতো এই কোম্পানী। ডগলাসের ডিজাইন করা তাবু জনপ্রিয় হয়ে উঠলো দ্রুতই। ১৯৬৮ সালে ডগলাস ৫০ হাজার ডলারের বিনিময়ে নিজের অংশ বিক্রি করে দিলেন।

চার বন্ধুতে চললেন দক্ষিণ আমেরিকা। ছবিসূত্র: pinterest.com

সেই আমলে ৫০ হাজার ডলারের দাম ছিল অনেক। ডগলাসের মাথায় তখন ঘুরছে দক্ষিণ আমেরিকার কথা। য়ুভন কনার্ড আর আরো দুই বন্ধুর সাথে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। একটা মাইক্রোবাসে করে গোটা মধ্য আর দক্ষিণ আমেরিকা পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলেন চিলির প্যাটাগনিয়া অঞ্চলে। সেখানেই সাড়ে তিন হাজার মিটার উচু এক দুর্গম পর্বত, মাউন্ট ফিটজ রয় এর চূড়ায় ওঠার এক নতুন রাস্তা আবিষ্কার করে ফেললেন তারা। ছয় মাসব্যাপী এই ভ্রমণ নিয়ে পরে তারা এক চলচ্চিত্রও বানিয়ে ফেলেন, নাম- ‘মাউন্টেন অব স্টোর্মস’।

দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ফিরে ডগলাস এবং তার স্ত্রী সুসি এস্পিরিট নামের এক কোম্পানী খুললেন। এই কোম্পানী মেয়েদের পোশাক বিক্রি করতো। আকর্ষনীয় ডিজাইনের বদৌলতে ১৯৭৮ এর মধ্যেই এস্পিরিট পোশাকের জগতে শীর্ষ স্থান দখল করে নিলো। বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে এস্পিরিটের ব্যবসা চালু ছিল।

তবে ডগলাসের এমন পেশাদার ব্যবসায়ী জীবন যে পছন্দ হবে না, তা বলাই বাহুল্য। ১৯৮৯ এর দিকে স্ত্রীর সাথে তার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। ডগলাস ১৯৮৯-৯৪ সালের মধ্যে বহুজাতিক এই কোম্পানীতে তার যা যা মালিকানা ছিলো, সব বিক্রি করে দিলেন। তারপরে টাকার ঝুলি নিয়ে চললেন সুদূর চিলিতে। উদ্দেশ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ।

প্যাটাগনিয়ার দুর্গম অঞ্চলে

প্যাটাগনিয়া বলতে নির্দেশ করা হয় আর্জেন্টিনা আর চিলির দক্ষিণভাগ নিয়ে যে বিশাল ভূ-ভাগ, সেটাকে। বিচিত্র এই অঞ্চল। কোথাও ধূ ধূ স্তেপে ঘুরে বেড়াচ্ছে রিয়া নামের উটপাখি আর গরু-ঘোড়ার দল, কোথাও বিশাল আন্দিজ তার সুমহান অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সগর্বে। কোথাও পাহাড়ের উপত্যকা বেয়ে নেমে এসেছে প্রকান্ড হিমবাহ, তো কোথাও বরফ সাদা অগম্য শৃঙ্গের অনেক নিচে জন্ম নিয়েছে ভাঙ্গাচোরা গাছ আর এবড়ো খেবড়ো পাথরে ঠাসা দুর্গম বনাঞ্চল।

পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে, বিশেষ করে চিলিতে প্যাটাগনিয়া অঞ্চলকে অনেকটা আমেরিকান ওয়াইল্ড ওয়েস্টের সাথে তুলনা করা হত। মেস্তিজো আর রেড ইন্ডিয়ান অধিবাসীরা ছিল বেশ গরিব। আর চিলিয়ান ধনকুবের এবং মার্কিন তামা ব্যবসায়ীরা এই অঞ্চলটিকে করে ফেলছিলেন ক্ষতবিক্ষত। দীর্ঘদিনের সামরিক সরকার জনগণের মতামতের থোড়াই পরোয়া করতো। প্যাটাগনিয়ার যত্রতত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠছিলো হাইড্রো ইলেক্ট্রিক বাধ। থেমে যাচ্ছিলো নদীর গতিপথ। বাড়ছিলো দূষণ এবং শিকারীদের উৎপাত। ধ্বংস হচ্ছিলো জীববৈচিত্র্য।

চিলির প্যাটাগনিয়া; ছবিসূত্র: Lonely Planet

ডগলাস সবই জানেন। দেখে গিয়েছেন সেই ১৯৬৮ সালেই। ২০-২২ বছর পরে এবারে যখন ফিরলেন, উঠে পড়ে লাগলেন এই অঞ্চলকে রক্ষা করবার জন্য। ১৯৯১ সালে কিনলেন ৪২ হাজার একর বনাঞ্চল। পরের বছর প্রতিষ্ঠা করলেন ‘কনজার্ভেশন ল্যান্ড ট্রাস্ট’। ১৯৯২ সালে এ ল্যান্ড ট্রাস্ট আরো ৭ লক্ষাধিক একর বনাঞ্চল কিনে নিলো চিলিয়ান সরকারের কাছ থেকে। ২০০৫ সালে চিলি সরকার এই অঞ্চলকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে নেয়। আরো পরে, ২০১৭ সালে চিলি সরকার এই গোটা অঞ্চলটাকে দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ ন্যাশনাল পার্কে পরিণত করে। পুমালিন পার্ক নামে পরিচিত এই অঞ্চলটির আয়তন দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লক্ষ একর।

পুমালিনের দক্ষিণেই ছিল এক বিস্তৃত বনাঞ্চল। কাঠ ব্যবসায়ীদের নজর পড়েছিলো এই অঞ্চলে। দেরি না করে ডগলাস এই অঞ্চলের ২ লক্ষ একর জমি কিনে নিলেন। এর পাশেই চিলির মিলিটারি কর্তৃপক্ষের বিরাট জমিজমা ছিল। সরকারের কাছে অনুরোধ করলেন ডগলাস; ২ লক্ষ একর জমি পুনরায় চিলিয়ান সরকারকে বিনামূল্যে ফেরত দিয়ে দিবেন, যদি কিনা সরকার সামরিক বাহিনীর হাতে থাকা জমি আর তার জমি মিলিয়ে একটি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠা করে। প্রেসিডেন্ট রিকার্দো লাগোসের সরকার এই চুক্তি মেনে নিলো। সাত লক্ষ ২০ হাজার একর বিশিষ্ঠ করকোভাদো জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠা হল ২০০৫ সালে।

করকোভাদো জাতীয় উদ্যান; ছবিসূত্র: patagonia dreams

আর্জেন্টিনার বিশাল ইবেরা জলাভূমি রক্ষাতেও ডগলাসের অবদান আছে। ইবেরা জলাভূমি রক্ষার জন্য আর্জেন্টিনা সরকার সাড়ে পাঁচ লক্ষ হেক্টরের সংরক্ষিত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছিলো। ডগলাসের কনজার্ভেশন ল্যান্ড ট্রাস্ট এই অঞ্চলের আশেপাশের জমি কিনে নিতে শুরু করে। পরে ২০১৫ সালে সবশুদ্ধ সাত লক্ষ একর জমি আর্জেন্টিনা সরকারের হাতে কিনে তুলে দেওয়া হয়। আর্জেন্টিনা এই গোটা জমিটাকে ইবেরার সংরক্ষিত অঞ্চলের অন্তর্ভূক্ত করেছে।

বন্য পরিবেশ রক্ষায় ডগলাসের সংগ্রাম শিক্ষণীয়; ছবিসূত্র: telegraph

ডগলাস এসবের বাইরেও চিলির বেশ কিছু অঞ্চল রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। শুধু তা-ই নয়, চাষাবাদকে কিভাবে আরো বেশি প্রকৃতিবান্ধব করা যায় সে ব্যাপারেও তিনি গবেষণা করেছেন, লিখেছেন বেশ কিছু বই। যদিও চিলি আর আর্জেন্টিনার জাতীয়তাবাদী মহলের অনেকেই এভাবে এক বিদেশী কর্তৃক জমিজমা কিনে নেওয়াটাকে সুনজরে দেখেনি। তবে বিশ্বজুড়ে ডগলাসের কর্মকান্ড প্রশংসাই পেয়েছে।

মৃত্যু ও অন্যান্য

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চিলির দক্ষিণে এক হ্রদে কায়াকিং করবার সময় ডগলাস পানিতে ডুবে যান। ঠান্ডা পানি থেকে হাইপোথার্মিয়া হয়ে তিনি ৭২ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময়েও তিনি আরো সাতটি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠায় চিলিয়ান সরকারের সাথে কাজ করছিলেন।

ডগলাসের জীবন, বিশেষ করে তার প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক কর্মকাণ্ডকে উপজীব্য করে ২০১০ সালে ‘১৮০ ডিগ্রী সাউথ: কনকোয়েরার্স অব দ্য ইউজলেস’ নামের একটি তথ্যচিত্র বানানো হয়।

ডগলাসকে নিয়ে বানানো চলচ্চিত্রের পোস্টার; ছবিসূত্র: imdb

ফিচার ইমেজ: Parque Pumalin