ম্যালেরিয়ার পরে প্রোটোজোয়ান পরজীবী ঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী রোগ হলো কালাজ্বর। একটা সময় যথাযথ প্রতিষেধক না থাকার কারণে কালাজ্বরের প্রকোপে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। শুধু তা-ই নয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ মতে, বর্তমানেও প্রতি বছর ২-৪ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কালাজ্বরের তীব্রতা প্রশমিত করে অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন একজন বাঙালি চিকিৎসাবিজ্ঞানী, তার নাম উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী।

১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ডিসেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন বর্ধমানের সারডাঙ্গা গ্রামে। বাবা নীলমণি ব্রহ্মচারী ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ের জেনারেল ফিজিসিয়ান। মা ছিলেন সৌরভ সুন্দরী দেবী। জামালপুর ইস্টার্ন রেলওয়ে বয়েজ স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ভর্তি হন হুগলী মহসিন কলেজে। ১৮৯৩ সালে তিনি সেখান থেকে বি এ পাশ করেন। এরপর ১৮৯৯ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে মেডিসিন ও সার্জারিতে প্রথম স্থান নিয়ে এমবিবিএস পাশ করেন। পড়াশোনায় কৃতিত্বের স্বাক্ষরস্বরুপ তিনি গুডিভ ও ম্যাকলাউড পদক পান। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এমডি ও ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শারীরতত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল লোহিত কণিকার ভাঙন সম্পর্কে আলোকপাত করা।

১৮৯৯ সালেই তিনি প্রাদেশিক স্বাস্থ্যসেবায় যোগদান করেন। প্রথমে তিনি ঢাকা মেডিকেল স্কুল (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ) এবং পরবর্তীতে ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল (বর্তমান নীল রতন সরকার মেডিকেল কলেজ) এ চিকিৎসক হিসেবে যোগদান করেন। যেহেতু তিনি পিএইচডি করার সময় থেকেই লোহিত কণিকার ভাঙন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। তাই চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গবেষণাকার্যেও তিনি লোহিত কণিকার ভাঙন সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটিয়ে কালাজ্বরের প্রতিষেধক আবিষ্কারে মনোনিবেশ করলেন।

ক্যাম্পবেল মেডিক্যাল স্কুলের এই ঘরটিতে গবেষণা করতেন উপেন্দ্রনাথ; Source: asiaticsocietykolkata.org

১৯১৫ সাল থেকে উপেন্দ্রনাথ ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুলের একটি ছোট্ট কক্ষে নিজের গবেষণা শুরু করলেন। ১৯২১ সাল পর্যন্ত আর্সেনিক, পারদ, কুইনাইন আর সোডিয়াম এন্টিমনি টারটারেটের একটি মিশ্রণকে কালাজ্বরের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু তা কালাজ্বর রোধে সম্পূর্ণ কার্যকরী ছিল না। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে গবেষণার একটি পর্যায়ে সোডিয়াম এন্টিমনি থেকে সোডিয়াম পৃথক করে ইউরিয়া আর এন্টিমনির সংযোগে ইউরিয়া স্টিবামিন এর যৌগ তৈরি করতে সক্ষম হলেন।

গবেষণার ফলাফল দেখতে তিনি প্রথমে যৌগটি খরগোশের শরীরে প্রয়োগ করে দেখতে চাইলেন। তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন তার গবেষণালব্ধ ইউরিয়া স্টিবামাইন যৌগটি কালাজ্বরের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ রূপে কার্যকর। ১৯২১ সালের জুলাই মাসের কোনো এক দিন প্রায়ান্ধকার ঘরে তিনি যে অসাধারণ আবিষ্কার করেছিলেন তা অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাসে যে এক অনন্য আলোকিত দিগন্তের সূচনা করেছিল – এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার এই আবিষ্কার নিয়ে বক্তৃতার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন,

“ক্যাম্পবেল হাসপাতালের সেই রাতের কথা মনে হলে এখনো আনন্দ পাই। রাত দশটায় লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় ধূমাচ্ছন্ন ঘরের মধ্যে আমার গবেষণার প্রথম ফল প্রত্যক্ষ করলাম। তখনও জানতাম না ঈশ্বর আমার হাতে কী এক অমোঘ অস্ত্র তুলে দিয়েছেন ! যা দিয়ে আমাদের দেশের লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণ রক্ষা করা যাবে। যে ঘরটিতে আমি দিনের পর দিন মাসের পর মাস কাজ করেছি সে ঘরে না ছিল গ্যাস, না ছিল জলের ট্যাপ। তবুও সে ঘর আমার কাছে চিরদিন তীর্থস্থান হয়ে থাকবে।”

তৎকালীন ক্যাম্পবেল মেডিকেল স্কুল, কলকাতা; Source: asiaticsocietykolkata.org

সত্যিকার অর্থেই, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এর পেনিসিলিন আবিষ্কারের অনেক আগেই উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর এন্টিমাইক্রোব্যাক্টেরিয়াল ড্রাগ হিসেবে ইউরিয়া স্টিবামাইনের আবিষ্কার এক মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভারতীয় উপমহাদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রীয় গবেষণা, কালাজ্বর ও লোহিত কণিকার ভাঙনের উপর তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলো নিচে দেওয়া হল-

  1. Studies in Haemolysis, University of Calcutta, 1909.
  2. Kala-Azar : Its treatment, Butterworth & Co. Ltd. Calcutta 1917.
  3. Kala-Azar in Doctor Carl Mense’s Handbuch der Tropenkrankheiten, vol. IV, 1926.
  4. Treatise on Kala-Azar, John Bale, Sons & Danielsson Ltd., London, 1928.
  5. Campaign against Kala-Azar in India in Jubilee Publication on the 80th birthday of Dr. Prof. Bernhard Nocht, Hamburg, 1937.
  6. Progress of Medical Research work in India during the last 25 years, and progress of Science in India, during the past 25 years, Indian Science Congress Association 1938.
  7. Gleanings from my Researchers Vol. I, University of Calcutta, 1940.
  8. Gleanings from my Researchers Vol. II, University of Calcutta, 1941.
  9. Infantile Biliary Cirrhosis in India in British Encyclopedia of Medical practice edited by Sir Humphrey Rolleston.

উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর কালাজ্বরের উপর প্রকাশিত গবেষণাপত্র; Source: পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি ই-জার্নাল আর্কাইভ ,

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে উপেন্দ্রনাথ সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি গবেষণা কার্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে নিজের বাসভবনেই প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। একজন গবেষক হিসেবেই শুধু নন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবেও সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা সারাজীবন মনে রেখেছেন উপেন্দ্রনাথ। তিনিই বিশ্বের দ্বিতীয় ব্লাড ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠাতা। কলকাতায় তার হাত ধরেই জরুরি চিকিৎসা সেবায় অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। তাছাড়া তৎকালীন ভারতীয় রেড ক্রস সোসাইটির প্রশাসনিক দপ্তরের প্রশাসক হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয়।

তার অসামান্য গবেষণার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯২৪ সালে তিনি রায়বাহাদুর ও ১৯৩৪ সালে নাইটহুড উপাধি লাভ করেন। কালাজ্বরের উপর তার কাজের জন্যে কলকাতা স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন এন্ড হাইজিন তাকে মিন্টো পদকে ভূষিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পদকের জন্যে মনোনয়ন পান। পাশাপাশি তিনি রয়াল সোসাইটি অব লন্ডন, ভারতীয় বিজ্ঞান একাডেমি কর্তৃক সম্মানিত হন। তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে কলকাতা পৌরসভা লাউডন স্ট্রিটকে ‘উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী স্ট্রিট’ নামকরণ করে।

১৮৯৮ সালে ননী বালা দেবীর সাথে উপেন্দ্রনাথ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি দুই সন্তানের জনক ছিলেন। তার মৃত্যুর পর ব্রহ্মচারী রিসার্চ ইনস্টিটিউট এর ভার অর্পিত হয় এই দুজনের উপর। ৭২ বছর বয়সে ১৯৪৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি উপেন্দ্রনাথ পরলোক গমন করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে সেই সময়ের সকল সংকীর্ণতা এবং বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পুরোধা এই বৈজ্ঞানিকের মৃত্যুতে শোকাহত হয়েছিল পুরো বিশ্ব। প্রখ্যাত গবেষণা পত্রিকা নেচারে (২৭ এপ্রিল, ১৯৪৬) তার মৃত্যুতে শোক বার্তা প্রকাশ করে বলা হয়েছিল-

“৬ ফেব্রুয়ারি স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারীর মৃত্যুর সাথে সাথে ভারতবর্ষ হারিয়েছে তার বুকে জন্ম নেওয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানীকে। স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী বিশ্বের কাছে মূলত একজন আবিষ্কারক এবং লিশমেনিয়া গোত্রের পরজীবী ঘটিত রোগের প্রতিষেধক হিসেবে সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ থেরাপিউটিক এজেন্ট ইউরিয়া স্টিবামাইনের জনক হিসেবে পরিচিত হলেও, যারা ভারতীয় উপমহাদেশের চিকিৎসাশাস্ত্র সম্বন্ধীয় গবেষণা সম্পর্কে একটু হলেও আগ্রহী, তারা জানেন তিনি ছিলেন সহজাত মৌলিক গবেষক এবং বিভিন্ন বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য ও অপরিসীম কৌতূহল সম্পন্ন একজন অক্লান্ত পর্যবেক্ষক। “

সহায়ক তথ্যপঞ্জি:

  1. Nature 157, 542–543 (27 April 1946)
  2. London Gazette, 1 June 1934
  3. www.asiaticsocietykolkata.org
  4. চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস – বিনয়ভূষণ রায়

ফিচার ইমেজ: nobelprizeseries.in