গেনরিখ লিউশকভ: সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার সবচেয়ে উচ্চপদস্থ বিশ্বাসঘাতকের বৃত্তান্ত

ভোর ৫:৩০। ১৩ জুন, ১৯৩৮। সোভিয়েত ইউনিয়নের রুশ যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্রের উপকূলীয় প্রদেশ (Приморский край, ‘প্রিমোরস্কি ক্রাই’) এবং উত্তর–পূর্ব চীনে অবস্থিত জাপানি–নিয়ন্ত্রিত মাঞ্চুকুয়ো রাষ্ট্রের মধ্যেকার সীমান্তের চাংলিংৎজু মালভূমিতে মাঞ্চুকুয়োর দুইজন সীমান্তরক্ষী পুলিশ টহল দিচ্ছে। স্থানটি সোভিয়েত ‘উপকূলীয় প্রদেশে’র রাজধানী ভ্লাদিভোস্তক থেকে প্রায় ৮০ মাইল দূরে এবং মাঞ্চুকুয়োর হুঞ্চুন শহরের পূর্বদিকে অবস্থিত। টহলরত সীমান্ত পুলিশরা একজন সন্দেহজনক লোককে দেখতে পেল। লোকটি দেখতে স্থানীয় চীনা বা কোরীয়দের মতো নয়। কোট এবং হান্টিং ক্যাপ পরিহিত লোকটি সীমান্তরক্ষীদের ১৫ ফুটের মধ্যে চলে আসার পরপরই তারা লোকটিকে থামার জন্য নির্দেশ দিল। অদ্ভুত লোকটি নির্দেশ মেনে দুইটি পিস্তল সীমান্তরক্ষীদের দিকে ছুঁড়ে দিল, দুই হাত উপরে তুলল এবং সীমান্তরক্ষীদের উদ্দেশ্যে অজানা এক ভাষায় কিছু বলতে শুরু করল।

সীমান্তরক্ষী দু’জন এর কিছুই বুঝতে পারল না, কিন্তু আন্দাজ করল, লোকটি সম্ভবত রুশ ভাষায় কথা বলছে। তারা লোকটিকে গ্রেপ্তার করে তাদের সদর দপ্তরে নিয়ে গেল। সেখানে লোকটিকে প্রশ্ন করে মাঞ্চুকুয়োর সীমান্ত পুলিশ কর্মকর্তারা বুঝতে পারল যে, তারা যে ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে, সে সাধারণ কেউ নয়। লোকটি সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার সমগ্র দূরপ্রাচ্যের প্রধান, একজন সোভিয়েত স্পাইমাস্টার! লোকটির নাম – গেনরিখ লিউশকভ।

লিউশকভের পূর্ণ নাম ছিল গেনরিখ সামোয়লোভিচ লিউশকভ (Генрих Самойлович Люшков)। লিউশকভ ১৯০০ সালে তদানীন্তন রুশ সাম্রাজ্যের বন্দরনগরী ওদেসায় একটি জাতিগতভাবে রুশ ও ধর্মগতভাবে ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সামুয়েল লিউশকভ পেশায় ছিলেন একজন দর্জি। উল্লেখ্য, ১৮৯৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ওদেসা শহরের ৩৭℅ অধিবাসী ছিল ইহুদি এবং শহরটিতে প্রায়ই ইহুদিবিরোধী দাঙ্গা হতো। ১৮৮১ সালের পর ওদেসা থেকে বহু ইহুদি তদানীন্তন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ফিলিস্তিনে চলে যায় এবং ওদেসা ছিল জায়নবাদের (Zionism) একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। বর্তমানে শহরটি ইউক্রেনের অন্তর্গত।

রাশিয়ার অসংখ্য তরুণের মতো গেনরিখ লিউশকভও ভ্লাদিমির লেনিনের বলশেভিক মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন; Source: Brewnimate

১৯০৮ সালে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত স্কুলে লিউশকভের শিক্ষাজীবন শুরু হয় এবং ১৯১৫ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানে পড়াশোনা করেন। তার ৬ ভাই-বোনের মধ্যে এক ভাই ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তার প্রভাবে লিউশকভ নিজেও বলশেভিক দলে যোগদান করেন। ১৯১৭ সালের নভেম্বরে সংঘটিত বলশেভিক বিপ্লবে লিউশকভ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯১৮ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত লিউশকভের জন্মস্থান ওদেসায় যে ক্ষণস্থায়ী সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রটি কার্যকর ছিল, সেটির প্রতিষ্ঠায় লিউশকভ অংশ নিয়েছিলেন। ১৯১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মানরা ইউক্রেন আক্রমণ করলে লিউশকভ বলশেভিক সৈন্যদলের সঙ্গে যোগ দিয়ে জার্মান আক্রমণ প্রতিহত করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। ১৯১৯ সালের প্রথম দিকে তিনি বলশেভিক ক্রিমিয়া রেজিমেন্টের রাজনৈতিক সদস্য নিযুক্ত হন এবং একই বছরের এপ্রিলে কিয়েভে অবস্থিত কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হন। এখানে পড়াশোনা করার সময়েই তিনি রুশ গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং এর পরপরই তাকে বলশেভিক ১৪তম সৈন্যদলের একটি রাইফেল ব্রিগেডে রাজনৈতিক কাজে নিযুক্ত করা হয়। এই বাহিনীর অংশ হিসেবে তিনি জেনারেল আন্তন দেনিকিনের নেতৃত্বাধীন বলশেভিকবিরোধী শ্বেতবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং ১৯১৯–১৯২০ সালের পোলিশ–সোভিয়েত যুদ্ধে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি তার ব্রিগেডের রাজনৈতিক কমিশার নিযুক্ত হন।

১৯২০ সালে লিউশকভ সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘চেকা’য় যোগদান করেন এবং ইউক্রেন ও মস্কোয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে বেশ কয়েক বছর ধরে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তাকে ১৯৩০ সালের দিকে জার্মানিতে প্রেরণ করা হয়। সেখানে তিনি জার্মান ভাষায় বিশেষ নৈপুণ্য প্রদর্শন করেন এবং জার্মান বিমান ও বিমানের ইঞ্জিন নির্মাতা কোম্পানি জাঙ্কার্সের ওপর নজরদারি করেন। জাঙ্কার্স কোম্পানির কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে তিনি বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন এবং সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন স্বয়ং জার্মানিতে লিউশকভের কার্যক্রমের ভূয়সী প্রশংসা করেন। রুশ গৃহযুদ্ধে এবং জার্মানিতে তার কৃতিত্বের জন্য লিউশকভ দুইবার সম্মানসূচক সোভিয়েত পদক ‘অর্ডার অফ দ্য রেড ব্যানার’ লাভ করেন।

সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তার উর্দিতে গেনরিখ লিউশকভ; Source: Wikimedia Commons

জার্মানিতে লিউশকভের কাজের সাফল্যে সন্তুষ্ট হয়ে সোভিয়েত সরকার তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে ডেকে পাঠায় এবং সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘এনকেভিডি’র আজভ সাগরীয় ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান নিযুক্ত করে। শুধু তাই নয়, লিউশকভ সোভিয়েত আইনসভা ‘সুপ্রিম সোভিয়েতে’র এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৩৪ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির লেনিনগ্রাদ (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) শাখার প্রধান সের্গেই কিরভ গুপ্তহত্যার শিকার হন এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যাপক হারে শুদ্ধি অভিযান আরম্ভ হয়। অপরাধী–নিরপরাধ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ এসময় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয় কিংবা কারাবরণ করে। সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা ‘এনকেভিডি’ এই শুদ্ধি অভিযানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে এবং এনকেভিডির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে লিউশকভ এই শুদ্ধি অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

১৯৩৬ সালে দুইজন শীর্ষ সোভিয়েত কমিউনিস্ট নেতাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ ও ‘প্রতিবিপ্লবী’ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের একজন ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাক্তন উপপ্রধানমন্ত্রী এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির লেনিন ইনস্টিটিউটের পরিচালক লেভ কামেনেভ। অপর জন ছিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সভাপতি গ্রিগোরি জিনোভিয়েভ। কামেনেভ ও জিনোভিয়েভ দু’জনেই ছিলেন লেনিনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবে তাদের দু’জনেরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। লিউশকভ এই দু’জনের জিজ্ঞাসাবাদ পরিচালনা করেন এবং দু’জনের ওপরেই নির্যাতন চালিয়ে মিথ্যা অভিযোগের দায় স্বীকার করানো হয়। পরবর্তীতে দু’জনকেই মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

এই শুদ্ধি অভিযানে লিউশকভের ভূমিকার জন্য তিনি ১৯৩৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘অর্ডার অফ লেনিন’ লাভ করেন। ১৯৩৭ সালের ৩১ জুলাই তাকে সোভিয়েত দূরপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে এনকেভিডির প্রধান নিযুক্ত করা হয়। সেখানে তার কর্তৃত্বাধীনে ছিল ৩০ হাজার সুপ্রশিক্ষিত এনকেভিডি সৈন্য।

১৯৩৭ সালে খাবারোভস্কে ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিষয়ক ৩য় শ্রেণির কমিশার’ গেনরিখ লিউশকভ (বামে); Source: Russia Beyond the Headlines

লিউশকভকে দূরপ্রাচ্যে প্রেরণের সময় তাকে দূরপ্রাচ্যে কর্মরত তিনজন শীর্ষ সোভিয়েত কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়া হয়। এই তিনজন ব্যক্তি ছিলেন – দূরপ্রাচ্যে এনকেভিডির তৎকালীন প্রধান ভসেভলোদ বালিতস্কি, দূরপ্রাচ্যে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর প্রধান মার্শাল ভাসিলি ব্লুখার এবং দূরপ্রাচ্যে সোভিয়েত বিমানবাহিনীর প্রধান আলেক্সান্দর লাপিন। লিউশকভ দূরপ্রাচ্যের খাবারোভস্ক শহরে পৌঁছানোর পরপরই বালিতস্কিকে গ্রেপ্তার করে মস্কোয় প্রেরণ করা হয় এবং লিউশকভের প্রদত্ত মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। লাপিনকে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা অভিযোগ স্বীকার করানোর জন্য নির্যাতন করা হয় এবং তিনি বন্দি অবস্থায় আত্মহত্যা করেন।

কিন্তু দূরপ্রাচ্যে লিউশকভের দায়িত্ব স্থায়ী হয় নি। ১৯৩৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে শুদ্ধি অভিযান চরম পর্যায়ে পৌঁছে এবং লিউশকভের বস ও এনকেভিডির প্রধান নিকোলাই ইয়েঝভ ক্রমশ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে থাকেন। এসময় লিউশকভকে মস্কোয় ডেকে পাঠানো হয়। এতে লিউশকভ প্রমাদ গোনেন, কারণ তার দু’জন পূর্বসূরীকেও একই ভাবে মস্কোয় ডেকে পাঠিয়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল। লিউশকভ সন্দেহ করছিলেন যে, তার ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে। এই আশঙ্কায় তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। যেহেতু তার কর্মস্থল ছিল সোভিয়েত দূরপ্রাচ্যে এবং দূরপ্রাচ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে জাপানি–নিয়ন্ত্রিত মাঞ্চুকুয়োর সীমান্ত ছিল, তাই তিনি জাপানে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেসময় তার পদমর্যাদা ছিল ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিষয়ক ৩য় শ্রেণির কমিশার’, এবং এই পদমর্যাদা ছিল সোভিয়েত সেনাবাহিনীর একজন ডিভিশনাল কমান্ডার বা জাপানি সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেলের সমতুল্য।

দেশত্যাগের জন্য লিউশকভ বিস্তৃত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি তার স্ত্রী ইন্না লিউশকোভা এবং তাদের ১১ বছর বয়সী মেয়েকে নিরাপদে দেশের বাইরে প্রেরণের উদ্দেশ্যে তার মেয়ের ‘চিকিৎসা করানো’র জন্য পোল্যান্ডে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। তাদের পরিকল্পনা ছিল যে, ইন্না পোল্যান্ডে পৌঁছে লিউশকভকে একটি টেলিগ্রাম প্রেরণ করবেন এবং টেলিগ্রামটিতে একটি সংকেত থাকবে, যেটি দেখে লিউশকভ বুঝতে পারবেন যে, তার পরিবার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে গেছে। এরপর লিউশকভ সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগ করে জাপানে চলে যাবেন।

কিন্তু লিউশকভ সময়মতো তার স্ত্রীর কাছ থেকে টেলিগ্রাম পান নি এবং এই বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে তারও ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল। এজন্য তিনি তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৩৮ সালের ১৩ জুন সোভিয়েত–মাঞ্চুকুয়ো সীমান্ত অতিক্রম করেন এবং মাঞ্চুকুয়োর সীমান্ত পুলিশের হাতে বন্দি হন। তাকে মাঞ্চুকুয়োর সীমান্ত পুলিশের সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তার পরিচয়পত্র দেখে তারা লিউশকভের পরিচিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। লিউশকভের সঙ্গে ছিল ২টি পিস্তল (যেগুলো তিনি সীমান্ত পুলিশের কাছে জমা দিয়েছিলেন), ১টি ঘড়ি, রুশ সিগারেট, একজোড়া সানগ্লাস, ৪,১৫৩ জাপানি ইয়েন (জাপান, কোরিয়া ও মাঞ্চুকুয়োর ব্যাঙ্ক থেকে মুদ্রিত), ১৬০ সোভিয়েত রুবল, ৩টি পদক (১টি অর্ডার অফ লেনিন এবং ২টি অর্ডার অফ দ্য রেড ব্যানার), তার স্ত্রী ইন্নার একটি ছবি এবং রুশ ভাষায় লেখা কিছু কাগজপত্র। এই কাগজপত্রগুলো ছিল অত্যন্ত গোপনীয় এবং এগুলোতে সমগ্র দূরপ্রাচ্যে অবস্থিত সকল সোভিয়েত সেনাঘাঁটি, বিমানপঘাঁটি, সীমান্ত চৌকি ও অস্ত্র কারখানা সম্পর্কে তথ্য ছিল।

মাঞ্চুকুয়োর সীমান্ত পুলিশ দ্রুত লিউশকভকে জাপানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থার হুঞ্চুন শাখায় প্রেরণ করে, কারণ এত বড় পদমর্যাদার একজন সোভিয়েত কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা তাদের এখতিয়ারে ছিল না। হুঞ্চুনে যে জাপানি মেজর জাপানি সেনা গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বে ছিলেন, তিনি ছিলেন একজন রুশ ভাষাবিদ এবং লিউশকভের পরিচয় পাওয়ার পর তিনিও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নির্দেশনার জন্য সিউলে অবস্থিত জাপানি কোরীয় সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

১৯৩৮ সালের খাসান হ্রদের যুদ্ধের সময় একটি লুকায়িত সোভিয়েত ট্যাঙ্ক। লিউশকভের সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালানোর এক মাস পরেই এই যুদ্ধ আরম্ভ হয়; Source: Wikimedia Commons

জাপানি সামরিক বাহিনী লিউশকভের দলত্যাগের ফলে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়। লিউশকভ সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালিয়ে আসার সময় যেসব গোপন কাগজপত্র নিয়ে এসেছিলেন সেগুলো থেকে জাপানিরা জানতে পারে যে, ঐ অঞ্চলে সোভিয়েত সামরিক শক্তি সম্পর্কে তাদের গোয়েন্দা সংস্থা যে তথ্য ছিল, তাতে মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। বস্তুত জাপানিদের প্রাপ্ত তথ্যের তুলনায় দূরপ্রাচ্যে সোভিয়েত সামরিক শক্তির পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। লিউশকভের প্রদত্ত তথ্য জাপানিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এসময় জাপানিরা সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে সোভিয়েত দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়াসহ উরাল পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চল দখল করে নিতে আগ্রহী ছিল এবং এজন্য এতদঞ্চলে সোভিয়েত সামরিক শক্তি সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকা তাদের জন্য অত্যাবশ্যক ছিল।

লিউশকভের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাপানিরা দূরপ্রাচ্যে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে পরপর দুই বার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ‘পরীক্ষামূলক আক্রমণ’ চালায়। ১৯৩৮ সালে সংঘটিত খাসান হ্রদের যুদ্ধে সোভিয়েতরা জয়লাভ করে, কিন্তু সংখ্যাগত ও প্রযুক্তিগতভাবে পশ্চাৎপদ জাপানি সৈন্যদের হাতে সোভিয়েতদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৩৯ সালে তারা মঙ্গোলিয়ার খালখিন গোল নদী অঞ্চলে আরেকবার সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, কিন্তু এবার তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।

জাপানি সরকার প্রথমে লিউশকভের পক্ষত্যাগের খবর গোপন রেখেছিল, কিন্তু লিউশকভ ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ ত্যাগ করা সবচেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং এরকম একজন কর্মকর্তা জাপানে পালিয়ে এসেছেন – জাপানের জন্য এটির প্রচারণামূলক মূল্য ছিল অপরিসীম। এজন্য জাপানি কর্মকর্তারা লিউশকভের পক্ষত্যাগের ঘটনাটি সম্প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯৩৮ সালের ১৩ জুলাই জাপানের রাজধানী টোকিওতে একটি হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে এই খবরটি বিশ্ববাসীকে জানানো হয়। লিউশকভের বিশ্বাসঘাতকতা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক, এবং মস্কো দাবি করে যে, ইনি প্রকৃত লিউশকভ নন, বরং পুরো ঘটনাটি সোভিয়েত ইউনিয়নকে অপদস্থ করার জন্য জাপানিদের সাজানো একটি নাটক! সেসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’–সহ বিভিন্ন পশ্চিমা পত্রপত্রিকাও লিউশকভের ঘটনা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে। কিন্তু পরবর্তীতে এই ঘটনা সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে।

খাসান হ্রদের যুদ্ধের পর দূরপ্রাচ্যে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর কমান্ডার মার্শাল ভাসিলি ব্লুখারকে গ্রেপ্তার করা হয়। খাসান হ্রদের যুদ্ধে সোভিয়েত সৈন্যদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির জন্য তাকে অভিযুক্ত করা হয় এবং লিউশকভের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ও ‘জাপানি গুপ্তচর’ হওয়ার অভিযোগেও তিনি অভিযুক্ত হন। এই অভিযোগগুলো স্বীকার করানোর জন্য তার ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালানো হয় এবং এরপরও তিনি এই অভিযোগ স্বীকার না করায় তাকে বন্দি অবস্থায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। খাসান হ্রদের যুদ্ধে সোভিয়েতদের ক্ষয়ক্ষতির জন্য তিনি আংশিকভাবে দায়ী ছিলেন, কিন্তু লিউশকভের পক্ষত্যাগে তার তো কোনো ভূমিকা ছিলই না, বরং লিউশকভকে দূরপ্রাচ্যে প্রেরণের পশ্চাতে ক্রেমলিনের অন্যতম একটি উদ্দেশ্যই ছিল ব্লুখারকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো।

রুশ গৃহযুদ্ধের নায়ক এবং দূরপ্রাচ্যে সোভিয়েত সেনাপ্রধান মার্শাল ভাসিলি ব্লুখারকে লিউশকভের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য দায়ী করা হয়েছিল; Source: Wikimedia Commons

সোভিয়েত ইউনিয়ন ত্যাগের পর লিউশকভ স্তালিনীয় শাসনব্যবস্থার কঠোর সমালোচকে পরিণত হয়েছিলেন, কিন্তু তখনো তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমাজতান্ত্রিক। এসময় তিনি নিজেকে রুশ বিপ্লবের অন্যতম নায়ক ও স্তালিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিয়ন ত্রৎস্কির রাজনৈতিক মতাদর্শকে গ্রহণ করেন, কিন্তু তার জাপানি সহকর্মীদের মতে, তিনি একজন উদারপন্থী (liberal) কমিউনিস্টে পরিণত হয়েছিলেন। তার এই কমিউনিস্ট চিন্তাধারার জন্য তিনি শ্বেত রুশদের (White Russians) সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎখাত করার পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন নি। উল্লেখ্য, রুশ বিপ্লবের পর প্রাক্তন রুশ সাম্রাজ্যের যেসব নাগরিক সোভিয়েত সরকারের বিরোধিতা করেছিল, তাদেরকে ‘শ্বেত’ বা ‘সাদা’ রুশ বলে অভিহিত করা হত। রুশ গৃহযুদ্ধে শ্বেত বাহিনীর পরাজয়ের পর এই শ্বেত রুশদের অনেকেই ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে এবং চীনে পালিয়ে গিয়েছিল। জাপানি–নিয়ন্ত্রিত মাঞ্চুকুয়োয় বহুসংখ্যক শ্বেত রুশ বসবাস করত এবং এদের একটি অংশ সোভিয়েত সরকারকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে জাপানিদের সঙ্গে সহযোগিতায় লিপ্ত ছিল।

শ্বেত রুশদের প্রতি লিউশকভের অবিশ্বাস সত্ত্বেও স্তালিনকে খুন করার জন্য তাদের গৃহীত একটি পরিকল্পনায় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মাঞ্চুকুয়োয় সক্রিয় একটি শ্বেত রুশ দল এই পরিকল্পনা করেছিল। তাদের পরিকল্পনাটি ছিল এরকম: তাদের একটি দল সোভিয়েত–তুর্কি সীমান্ত অতিক্রম করে সোভিয়েত ইউনিয়নের দক্ষিণাঞ্চলের সোচি শহরে যাবে। সোচিতে স্তালিনের একটি অবসর যাপন কেন্দ্র ছিল এবং স্তালিন মাঝে মাঝে সেখানে আসতেন। লিউশকভ এনকেভিডির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা হওয়ায় স্তালিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানতেন এবং সে সম্পর্কে এই দলটিকে জানিয়ে দেন। তার সুপারিশে জাপানিরা এই পরিকল্পনায় সহায়তা করতে রাজি হয়। কিন্তু উক্ত শ্বেত রুশ দলটিতে একজন সোভিয়েত গুপ্তচর প্রবেশ করেছিল এবং সে এই পরিকল্পনা সম্পর্কে মস্কোকে অবহিত করে। ফলে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ হয়।

এসময় লিউশকভ জাপানের টোকিওতে অবস্থান করছিলেন এবং জাপানি জীবনধারার সঙ্গে বহুলাংশে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। টোকিওতে থাকাকালে একবার সেখানকার সোভিয়েত দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার দেখাও হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে লিউশকভ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন, কারণ সোভিয়েতরা তাকে খুন করার চেষ্টা করতে পারে বলে তার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু জাপানে কর্মরত সোভিয়েত কর্মকর্তারা লিউশকভকে অগ্রাহ্য করে এবং তাকে খুন করার প্রচেষ্টা থেকে বিরত থাকে, কারণ তারা এর ফলে জাপানের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি কূটনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হোক, এটি চাইছিল না। অবশ্য জাপানি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জাপানি কমিউনিস্ট পার্টিকে লিউশকভকে খুন করার নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু জাপানি কমিউনিস্টরা এই কাজে ব্যর্থ হয়।

লিউশকভ দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়ায় সোভিয়েত সামরিক বাহিনী সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাপানিদেরকে সরবরাহ করেন এবং এর পাশাপাশি সোভিয়েত সামরিক সংকেত সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও তাদেরকে প্রদান করেন। জাপানিরা এই তথ্য জার্মান গোয়েন্দা সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে, যার ফলে ১৯৪১ সালে জার্মানির সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের সময় জার্মানরা সহজেই সোভিয়েত সামরিক পরিকল্পনাগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছিল।

লিউশকভের প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং পরিশ্রমী স্বভাব তার সঙ্গে কর্মরত জাপানি সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মুগ্ধ করে, কিন্তু লিউশকভের মানসিক অবস্থা নিয়ে তাঁরা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে পালিয়ে আসার পর থেকে লিউশকভ তার স্ত্রী–কন্যার আর কোনো খবর পান নি এবং তাদের ভাগ্য নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন। এমতাবস্থায় জাপানি গোয়েন্দা সংস্থা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পোল্যান্ডে লিউশকভের স্ত্রী ও কন্যার সম্পর্কে খোঁজ নেয়, কিন্তু কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়।

১৯৪১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর জার্মান আক্রমণের একটি দৃশ্য। লিউশকভ এই আক্রমণের ব্যর্থতা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন; Source: Britannica

আসলে লিউশকভের স্ত্রী ও কন্যা তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক পোল্যান্ডে পৌঁছাতেই পারে নি। সীমান্ত অতিক্রম করার সময় তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়, যদিও কীভাবে তারা ধরা পড়েছিল সে সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি। লিউশকভের মেয়ের ভাগ্যে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না, কিন্তু তার স্ত্রী ইন্নাকে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তর লুবিয়াঙ্কায় জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয় এবং ১৯৩৮ সালেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। লিউশকভের পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তার করে সাইবেরিয়ার শ্রম শিবিরে নিক্ষেপ করা হয়। লিউশকভের মা ও ভাই সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু লিউশকভের বোন বেঁচে যান।

১৯৪১ সালের ২২ জুন জার্মানি ও জার্মানির অন্যান্য ইউরোপীয় মিত্র রাষ্ট্রগুলো সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করে। এ সময় জাপানি সেনাবাহিনীর একটি উগ্রপন্থী অংশও পূর্ব দিক থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের জন্য জাপানি সরকারকে চাপ দিতে থাকে, কারণ তাদের ধারণা ছিল, সোভিয়েত রাষ্ট্রব্যবস্থা শীঘ্রই ভেঙে পড়বে। লিউশকভ তাদের মতামতের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তার মতামত ছিল, জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নকে সহজে পরাজিত করতে সক্ষম হবে না এবং এজন্য জার্মানির পক্ষে যোগ দেয়ার আগে জাপানিদের সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি বিবেচনা করা উচিত। লিউশকভের মতামতকে মাথায় রেখে এবং অন্যান্য বেশকিছু কারণে জাপানি সরকার সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ থেকে বিরত থাকে। জার্মান–সোভিয়েত যুদ্ধ সম্পর্কে লিউশকভের মতামত সঠিক হিসেবে প্রমাণিত হয়।

এ সময় লিউশকভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়ার এবং সেখানে গিয়ে তার জীবনবৃত্তান্ত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে বই লেখার পরিকল্পনা করছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও তিনি জোগাড় করতে শুরু করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত জাপানিরা তাকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে দিত কিনা সেটি নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। যাই হোক, ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার নৌঘাঁটি আক্রমণের মধ্য দিয়ে জাপানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে লিউশকভের বই লেখার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়।

১৯৪৫ সালের ৯ মে মিত্রপক্ষের কাছে জার্মানির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে, কিন্তু দূরপ্রাচ্যে তখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের নেতৃত্বাধীন মিত্রশক্তির সঙ্গে জাপানের তীব্র যুদ্ধ চলছিল। ১৯৪৫ সালের ২০ জুলাই লিউশকভকে মাঞ্চুকুয়োয় মোতায়েনকৃত জাপানি কুয়ান্টাং সৈন্যবাহিনীর বিশেষ গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করার জন্য পাঠানো হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪১ সালে স্বাক্ষরিত ‘সোভিয়েত–জাপানি নিরপেক্ষতা চুক্তি’ ভঙ্গ করে এবং জাপানি–নিয়ন্ত্রিত মাঞ্চুকুয়ো, অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া ও কোরীয় উপদ্বীপে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়।

১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট সোভিয়েত–জাপানি যুদ্ধের প্রাক্কালে সোভিয়েত সৈন্যদের সোভিয়েত–মাঞ্চুকুয়ো সীমান্ত অতিক্রমের দৃশ্য; Source: Wikimedia Commons

জার্মানদের বিরুদ্ধে বিজয়ী অভিজ্ঞ সোভিয়েত সৈন্যদের তীব্র আক্রমণের মুখে জাপানিরা দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়। সোভিয়েত–জাপানি যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট গোলযোগের মধ্যে লিউশকভ হারিয়ে যান। তাকে শেষ দেখা গিয়েছিল মাঞ্চুকুয়োর দালিয়ান শহরের একটি রেল স্টেশনে ভিড়ের মধ্যে। এ সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৪৫ বছর।

লিউশকভের মৃত্যু কীভাবে হয় সেটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, লিউশকভ মাঞ্চুকুয়োয় অগ্রসরমান সোভিয়েত সৈন্যদের হাতে বন্দি হন এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। আবার কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, লিউশকভ যাতে সোভিয়েতদের হাতে ধরা না পড়েন, সেজন্য জাপানিরাই তাকে খুন করে। কারণ লিউশকভ জাপানি সশস্ত্রবাহিনী সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য জানতেন এবং তিনি সোভিয়েতদের হাতে বন্দি হলে এসব তথ্য সোভিয়েতরা জেনে যেতে পারত। সত্যিকার অর্থে সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থার ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চপদস্থ বিশ্বাসঘাতক গেনরিখ লিউশকভের ভাগ্যে কী ঘটেছিল, সেটি হয়ত কখনোই জানা যাবে না।

২০২০ সালে প্রখ্যাত হরর ও থ্রিলার লেখক ফ্র‍্যাঙ্ক স্কিল্ডিনার লিউশকভের জীবনীর ওপর ভিত্তি করে একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনা করেছেন। উপন্যাসটির নামকরণ করা হয়েছে ‘দ্য ক্লাউস প্রোটোকল’ (The Klaus Protocol)।

This is a Bengali biographical article about Genrikh Lyushkov, a top Soviet defector.

References:

1. Oleg Yegorov, "The 3 most notorious defectors in Soviet history," Russia Beyond the Headlines, June 9, 2017.

2. Alvin D. Coox, "L'affaire Lyushkov: Anatomy of a defector," Soviet Studies, Vol. 19, No. 3 (1968), p. 405–420.

3. Alvin D. Coox, "The lesser of two hells: NKVD general G. S. Lyushkov's defection to Japan, 1938–1945," The Journal of Slavic Military Studies, Vol. 4, No. 3–4 (1998).

Source of the featured image: The Global Domain News

Related Articles