মার্শাল গিওর্গি ঝুকভ: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক || পর্ব ২

(পর্ব ১ এর পর)

১৯২০ সাল নাগাদ ২৪ বছর বয়সী গিওর্গি ঝুকভ একজন পুরোদস্তুর সৈনিকে পরিণত হন। ততদিনে তিনি রুশ সেনাবাহিনীর একজন এনসিও থেকে লাল ফৌজের একজন স্কোয়াড্রন কমান্ডারে পরিণত হয়েছেন। অংশ নিয়েছেন জার্মান ও অস্ট্রো–হাঙ্গেরীয় সশস্ত্রবাহিনী এবং অ্যাডমিরাল কোলচাক ও ব্যারন ভ্রাঙ্গেলের শ্বেত ফৌজের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। অর্থাৎ, এ সময় নাগাদ ঝুকভ যথেষ্ট পরিমাণ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন।

তামবোভ বিদ্রোহ: ঝুকভের বীরত্ব

স্কোয়াড্রন কমান্ডার হিসেবে পদোন্নতি প্রদানের পর ঝুকভ ও তার ইউনিটকে তদানীন্তন সোভিয়েত রাশিয়ার ভরোনেঝ প্রদেশে একটি বলশেভিকবিরোধী কৃষক বিদ্রোহ দমন করার জন্য প্রেরণ করা হয়। উক্ত বিদ্রোহটি পার্শ্ববর্তী তামবোভ প্রদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গৃহযুদ্ধ চলাকালে বলশেভিক সরকার ‘যুদ্ধকালীন কমিউনিজম’ (War Communism) নীতি গ্রহণ করে এবং এই নীতির অংশ হিসেবে শহরগুলো জনসাধারণ ও লাল ফৌজকে খাদ্য সরবরাহের জন্য কৃষকদের উৎপাদিত অধিকাংশ শস্য বিনা ক্ষতিপূরণে বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করে। মূলত এই নীতির প্রতিক্রিয়াতেই তামবোভ বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তদানীন্তন রাশিয়ার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ‘সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী দলে’র নেতা আলেক্সান্দর আন্তোনভ। এই বিদ্রোহটি এত ব্যাপক আকার ধারণ করে যে এটি দমনের জন্য বলশেভিক সরকারকে ১৯২১ সাল নাগাদ লাল ফৌজের প্রায় দেড় লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করতে হয়েছিল।

ঝুকভ এই বিদ্রোহ দমনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। কৌতূহলোদ্দীপকভাবে, এই অভিযানের সময় তার নববিবাহিতা স্ত্রী আলেক্সান্দ্রা দিয়েভনাও তার সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু ঝুকভের পক্ষে এই অভিযানটি ঠিক চড়ুইভাতির মতো ছিল না। ঝুকভের নিজের ভাষ্যমতে, এই বিদ্রোহের সময় ঝুকভ তখন পর্যন্ত তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই প্রত্যক্ষ করেন। ১৯২১ সালের ৫ মার্চ ঝুকভের স্কোয়াড্রনের সঙ্গে ১,৫০০ থেকে ২,০০০ সদস্যের একটি বিদ্রোহী দলের রক্তাক্ত সংঘর্ষ হয় এবং ঝুকভের নেতৃত্বে তার ক্ষুদ্র স্কোয়াড্রন প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে বিদ্রোহীদের আটকে রাখতে সক্ষম হয়। এরপর তারা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং ৬ ঘণ্টাব্যাপী তীব্র যুদ্ধের পর বিদ্রোহীদের পিছু হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়। এ সময় ঝুকভের ঘোড়া বিদ্রোহীদের গুলিতে নিহত হয়, কিন্তু তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য সোভিয়েত সরকার ঝুকভকে ‘অর্ডার অফ দ্য রেড ব্যানার’ পদক প্রদান করে।

তামবোভ বিদ্রোহের সময় একদল বিদ্রোহী সৈন্য। এই বিদ্রোহ দমনে কৃতিত্ব প্রদর্শনের জন্য ঝুকভ ‘অর্ডার অফ দ্য রেড ব্যানার’ পদকে ভূষিত হন; Source: Russia Beyond

১৯২১ সালের গ্রীষ্মকাল নাগাদ বিদ্রোহীরা পরাজিত হয় এবং প্রদেশটির ওপর সোভিয়েত সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃস্থাপিত হয়। কিন্তু ঝুকভের স্কোয়াড্রনকে ঐ অঞ্চলে বিদ্রোহীদের অবশিষ্টাংশকে নির্মূল করার কাজে মোতায়েন করা হয়। ফলে ১৯২১ সালের শেষ নাগাদ ঝুকভ ও তার স্কোয়াড্রনটি তামবোভেই অবস্থান করে এবং বিদ্রোহীদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে।

স্কোয়াড্রন কমান্ডার থেকে রেজিমেন্টাল কমান্ডার এবং কমিশার

১৯২২ সাল নাগাদ রুশ গৃহযুদ্ধ স্তিমিত হয়ে আসে এবং প্রাক্তন রুশ সাম্রাজ্যের সিংহভাগ ভূমি জুড়ে বলশেভিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে সোভিয়েত সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের কাজে মনোনিবেশ করে এবং এর অংশ হিসেবে লাল ফৌজের আকৃতি হ্রাসের প্রক্রিয়া শুরু হয়। যুদ্ধ শেষ লাল ফৌজের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ লক্ষ। এটিকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করে বাহিনীটির সদস্য সংখ্যা ৫ লক্ষে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু ঝুকভ লাল ফৌজে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। উল্লেখ্য, ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমিউনিস্ট পার্টি নির্দেশ দিয়েছিল, লাল ফৌজের কমিউনিস্ট সদস্যরা যাতে যুদ্ধের পর লাল ফৌজ ত্যাগ না করে। কিন্তু বহু কমিউনিস্ট এই নির্দেশনা অগ্রাহ্য করে এবং যুদ্ধ শেষে লাল ফৌজ ছেড়ে অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত হয়। কিন্তু ঝুকভ সামরিক জীবন পছন্দ করতেন এবং এই জীবনধারাতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য তিনি লাল ফৌজে থেকে যান।

১৯২২ সালের জুনে ঝুকভকে লাল ফৌজের ৩৮তম অশ্বারোহী রেজিমেন্টের স্কোয়াড্রন কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ১৯২৩ সালের মার্চে তিনি পদোন্নতি লাভ করেন এবং তাকে ৭ম সামারা ডিভিশনের অন্তর্গত ৪০তম অশ্বারোহী ডিভিশনের সহকারী কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এর মাস চারেকের মধ্যেই তিনি আবার পদোন্নতি লাভ করেন। তাকে একই ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত ৩৯তম বুজুলুক অশ্বারোহী রেজিমেন্টের সাময়িক কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। অবশ্য শীঘ্রই তিনি রেজিমেন্টটির স্থায়ী কমান্ডারে পরিণত হন।

ঝুকভ যখন রেজিমেন্টাল কমান্ডার পদ লাভ করেন, তখন তার বয়স ২৬ বছর। উল্লেখ্য, লাল ফৌজের রেজিমেন্টাল কমান্ডার পদটি ছিল প্রচলিত সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার সমতুল্য। পরবর্তী সাত বছর তিনি একই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ঝুকভের আত্মজীবনী অনুযায়ী, এই সময়টি ছিল তাঁর সামরিক শিক্ষার গঠনমূলক সময়। ঝুকভকে যে রেজিমেন্টের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছিল, সেটির অবস্থা ছিল খুবই বিশৃঙ্খল। ঝুকভ সৈন্যদের প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নির্দেশনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং রেজিমেন্টটির পরিস্থিতিতে ব্যাপক উন্নতি ঘটে।

একই বছরের শরৎকালে রেজিমেন্টটিকে সোভিয়েত বেলোরাশিয়ার (বর্তমান বেলারুশ) রাজধানী মিনস্কে বদলি করা হয়। এখানে পৌঁছানোর পর ঝুকভ তার পুরনো প্রেমিকা মারিয়া ভলখোভার সাক্ষাৎ পান। ১৯১৯ সালে ঝুকভ সারাতভের একটি হাসপাতালে থাকা অবস্থায় তাদের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, কিন্তু ভলখোভা তার নিজের শহর পলতাভায় ফিরতে বাধ্য হওয়ায় এই সম্পর্কে ছেদ পড়েছিল। ঝুকভ বেলোরাশিয়ায় মোতায়েন হওয়ার পর এই সম্পর্কটি পুনরায় গড়ে ওঠে। অবশ্য ঝুকভের স্ত্রী আলেক্সান্দ্রা এই ব্যাপারে তখন জানতে পেরেছিলেন বলে প্রতীয়মান হয় না।

লেনিনগ্রাদ উচ্চতর অশ্বারোহী স্কুলের স্নাতকদের ছবি। ছবির তৃতীয় সারিতে একেবারে ডান কোণে ঝুকভকে দেখা যাচ্ছে; Source: Wikimedia Commons

১৯২৪ সালের অক্টোবরে ঝুকভের ডিভিশনের কমান্ডার তাকে লেনিনগ্রাদের (বর্তমানে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ) উচ্চতর অশ্বারোহী স্কুলে এক বছরের একটি কোর্স করার জন্য প্রেরণ করেন। এখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় ঝুকভের সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন কনস্তান্তিন রোকোসোভস্কি এবং ইভান বাগ্রামিয়ান। জাতিগতভাবে পোলিশ রোকোসোভস্কি এবং জাতিগতভাবে আর্মেনীয় বাগ্রামিয়ান উভয়েই পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মার্শাল পদ লাভ করেছিলেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ঝুকভ ছিলেন একজন অতি মনোযোগী ছাত্র এবং রোকোসোভস্কি ও বাগ্রামিয়ান উভয়েই তাদের আত্মজীবনীতে ঝুকভের মেধা ও একনিষ্ঠতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রোকোসোভস্কির ভাষ্যমতে, যখনই তাদের মধ্যে কেউ ঝুকভের কক্ষে যেত, দেখতে পেত ঝুকভ কোনো মানচিত্রের ওপর ঝুঁকে সামরিক কৌশল সংক্রান্ত অধ্যয়নে ব্যস্ত। বলাই বাহুল্য, ঝুকভ কোর্সের প্রতিটি পরীক্ষায় অসাধারণ সাফল্যের সঙ্গে উন্নীত হন।

কোর্স সমাপ্ত হওয়ার পর ঝুকভ ও তার দুই সহকর্মী ঘোড়ায় চড়ে মিনস্কে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই মোতাবেক রওনা হন। কিন্তু ঝুকভের ঘোড়াটি পথিমধ্যে খোঁড়া হয়ে যাওয়ায় তাকে পথের বড় একটি অংশ হেঁটেই অতিক্রম করতে হয়। লেনিনগ্রাদ থেকে মিনস্কের দূরত্ব প্রায় ৯৬৩ কি.মি., ফলে তাদের ঘোড়ায় চড়ে লেনিনগ্রাদ থেকে মিনস্ক যাত্রা একটি বিশ্ব রেকর্ডের সৃষ্টি করে। তারা যখন মিনস্কে পৌঁছান, তখন মিনস্কের জনসাধারণ ব্যাপক উৎসাহ সহকারে জয়ধ্বনি দিয়ে তাদের বরণ করে। ঝুকভের সিনিয়ররা তার এই অর্জনের প্রশংসা করেন এবং পুরস্কার হিসেবে তাকে একটি সংক্ষিপ্ত ছুটি প্রদান করেন।

ছুটি থেকে ফেরার পর ঝুকভ জানতে পারেন যে, তার ৩৯তম অশ্বারোহী রেজিমেন্টকে ব্যাপকভাবে বর্ধিত করা হয়েছে এবং তাকে নতুনভাবে গঠিত এই রেজিমেন্টটির কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে তাকে রেজিমেন্টটির কমিশার পদও প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, সোভিয়েত সরকারের প্রতি লাল ফৌজের সদস্যদের রাজনৈতিক আনুগত্য পর্যবেক্ষণ ও নিশ্চিতকরণের জন্য সেসময় লাল ফৌজের প্রতিটি ইউনিটে ‘কমিশার’ (Commissar) নামক এক শ্রেণির কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হতো। ঝুকভকে তার রেজিমেন্টের কমিশার পদ প্রদানের অর্থ ছিল, তার রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কোনো সন্দেহ ছিল না। ঝুকভ দক্ষতার সঙ্গে রেজিমেন্টাল কমান্ডার ও কমিশার হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।

মস্কোর ফ্রুঞ্জে সামরিক অ্যাকাডেমিতে ঝুকভ উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন; Source: Wikimedia Commons

১৯২৮ সালে ঝুকভের স্ত্রী আলেক্সান্দ্রা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন এবং তার নামকরণ করা হয় এরা। এর ছয় মাস পরেই ঝুকভের প্রেমিকা মারিয়া ভলখোভা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন, যার নামকরণ করা হয় মার্গারিতা। পরবর্তীতে এরা ও মার্গারিতার প্রদত্ত বিবরণ অনুযায়ী, বাবা হিসেবে ঝুকভ ছিলেন খুবই স্নেহশীল। অবশ্য ১৯৩০–এর দশকে ভলখোভার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায় এবং এর ফলে তার বা তার মেয়ের সঙ্গে সেসময় ঝুকভের তেমন যোগাযোগ ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ভলখোভার স্বামী নিহত হন এবং এরপরই কেবল তাদের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়।

গভীর অভিযান তত্ত্ব এবং ঝুকভের উচ্চতর প্রশিক্ষণ

১৯২৯ সালের শেষদিকে ঝুকভকে মস্কোয় অবস্থিত অত্যন্ত সম্মানজনক ফ্রুঞ্জে সামরিক অ্যাকাডেমিতে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য প্রেরণ করা হয়। এখানে তার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন লিওনিদ গভোরভ এবং ফিয়োদোর তোলবুখিন, যাদের দু’জনেই পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মার্শাল পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। ১৯৩০ সালের বসন্তকালে কোর্সটি সমাপ্ত হয়। কোর্স শেষে ঝুকভের কৃতিত্ব সম্পর্কে যে প্রতিবেদন পেশ করা হয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, ‘কম্বাইন্ড আর্মস ট্যাকটিক্স’ এবং যুদ্ধক্রীড়া (war game) ও দলগত কাজে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ঝুকভের কাজ ‘খুবই সন্তোষজনক’, ফিল্ড সার্ভিস রেগুলেশন সম্পর্কে তার জ্ঞান ‘সন্তোষজনক’ এবং অপারেশনাল–ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার স্পষ্টতা ও দৃঢ়তা প্রশংসনীয়। কেবল স্টাফ সংক্রান্ত কাজের ক্ষেত্রে তার কাজ ‘প্রায় সন্তোষজনক’। প্রতিবেদনের শেষে ঝুকভ সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়, ঝুকভ স্টাফ অফিসার হিসেবে উপযুক্ত নন, বরং ফ্রন্টলাইন কমান্ডার হওয়ার যোগ্য।

এ সময় লাল ফৌজের রণকৌশলে ব্যাপক পরিবর্তন আসছিল। বিশ্বের অন্যান্য সশস্ত্রবাহিনীর মতো তারাও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করছিল এবং সামরিক প্রযুক্তিতে আধুনিক উদ্ভাবনগুলোর (ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান প্রভৃতি) প্রভাব মূল্যায়ন করছিল। রুশ গৃহযুদ্ধের সময় অর্জিত অভিজ্ঞতাও তারা আত্তীকৃত করার চেষ্টা করছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল একটি স্থবির, অবস্থানমূলক যুদ্ধ, অন্যদিকে রুশ গৃহযুদ্ধ ছিল এমন একটি যুদ্ধ যেটিতে শত শত মাইল বিস্তৃত অঞ্চলে সৈন্য পরিচালনা করতে ও অভিযান চালাতে হয়েছিল। এসবের ভিত্তিতে লাল ফৌজের অধিকর্তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধগুলো হবে মেকানাইজড এবং এগুলোর বৈশিষ্ট্য হবে ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি, যুদ্ধবিমান, মোটরবাহী পদাতিক সৈন্যদল এবং প্যারাট্রুপারদের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে শত্রুপক্ষের ভূমি ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার গভীরে ক্ষিপ্রগতিতে আঘাত হানা।

১৯৩০–এর দশকের প্রথমদিক নাগাদ লাল ফৌজ ‘গভীর খণ্ডযুদ্ধ’ (deep battle) ও ‘গভীর অভিযান’ (deep operation) নামক একটি দ্বৈত সমরনীতি (dual doctrine) প্রণয়ন ও গ্রহণ করেছিল। এই সমরনীতি অনুযায়ী, একের পর এক সমন্বিত সৈন্যদল আক্রমণ চালিয়ে শত্রুপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অতি গভীরে প্রবেশ করবে এবং এরপর পশ্চাদ্ভাগ থেকে শত্রুপক্ষকে ঘিরে ফেলবে। সোভিয়েত সশস্ত্রবাহিনীর বিভিন্ন শাখাকে অতি কার্যকরভাবে পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে ‘কম্বাইন্ড আর্মস’ ব্যবহার করে এ রকম বেশ কয়েকটি গভীর অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং এই প্রক্রিয়ায় যুদ্ধ পরিচালিত হবে। সোভিয়েতদের এই সমরনীতি ছিল বহুলাংশে জার্মানদের গৃহীত ‘ব্লিটজক্রিগ’ (বিদ্যুৎগতির যুদ্ধ) সমরনীতির অনুরূপ। কিন্তু জার্মানরা যেভাবে ট্যাঙ্কের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করেছিল, সোভিয়েতরা সেরকমটা করেনি। তাদের পরিকল্পনায় ট্যাঙ্কবহরের ভূমিকা ছিল সহায়ক ও স্বতন্ত্র। সোভিয়েত সমরনীতিতে ট্যাঙ্কবহরের কার্যক্রমের সঙ্গে পদাতিক, অশ্বারোহী, গোলন্দাজ ও বিমানবাহিনীর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সমন্বিত করার ওপরেও অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।

১৯৬৩ সালে প্রকাশিত একটি ডাকটিকেটে মার্শাল মিখাইল তুখাচেভস্কি। তুখাচেভস্কি ছিলেন ‘গভীর অভিযান’ তত্ত্বের প্রবক্তা এবং ঝুকভ তার একনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন; Source: Wikimedia Commons

এই নতুন সমরনীতি অনুযায়ী লাল ফৌজ ১৯৩২ সালে বিশ্বের প্রথম মেকানাইজড কোর গঠন করে এবং ১৯৩৬ সাল নাগাদ লাল ফৌজে ছিল ৪টি মেকানাইজড কোর, ৬টি পৃথক মেকানাইজড ব্রিগেড এবং ৬টি পৃথক ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট। ‘গভীর অভিযান’ সমরনীতির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় দিকের মূল প্রবক্তা ছিলেন রুশ গৃহযুদ্ধের বিখ্যাত কমান্ডার মার্শাল মিখাইল তুখাচেভস্কি। ঝুকভ তুখাচেভস্কির একজন অনুরাগী ছিলেন এবং তার আত্মজীবনীতে তিনি তুখাচেভস্কির মেধার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অবশ্য যখন এই সমরনীতি প্রণীত হয়, তখন ঝুকভ ছিলেন মাঝারি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা মাত্র এবং এই নীতি প্রণয়নে তার কোনো ভূমিকা ছিল না। কিন্তু তিনি গভীর যুদ্ধ ও গভীর অভিযানের তত্ত্ব ও কার্যপ্রণালী অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আত্তীকৃত করে নেন। পরবর্তীতে এই জ্ঞান তার বিশেষ কাজে এসেছিল।

রেজিমেন্টাল কমান্ডার থেকে সামরিক জেলার উপ–কমান্ডার: ক্রমাগত উত্থান

এদিকে ১৯৩০ সালের ১৭ মে লাল ফৌজের অশ্বারোহী কোরের কমান্ডার (পরবর্তীতে মার্শাল) সেমিয়ন তিমোশেঙ্কো ঝুকভের রেজিমেন্ট পরিদর্শন করেন এবং রেজিমেন্টটির মনোবল ও শৃঙ্খলার ব্যাপক প্রশংসা করে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। এর পরেই ঝুকভকে ৭ম সামারা ডিভিশনের ২য় অশ্বারোহী ব্রিগেডের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এ সময় ডিভিশনটির কমান্ডার পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন ঝুকভের প্রাক্তন সহপাঠী রোকোসোভস্কি। তিনি ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে ঝুকভের কার্যক্রম নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট ছিলেন এবং নভেম্বরে তিনি ঝুকভ সম্পর্কে একটি অতি ইতিবাচক প্রতিবেদন জমা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঝুকভ আবার পদোন্নতি লাভ করেন। এবার তাকে লাল ফৌজের অশ্বারোহী বাহিনী সহকারী পরিদর্শক নিযুক্ত করা হয়।

অশ্বারোহী বাহিনীর পরিদর্শকের কার্যালয়টি ছিল মস্কোয়। সেখানে ঝুকভকে সামরিক প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত শাখায় নিযুক্ত করা হয়। ঝুকভের বস ছিলেন রুশ গৃহযুদ্ধের সময়কার কিংবদন্তী অশ্বারোহী কমান্ডার মার্শাল সেমিয়ন বুদিওন্নি। এই পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে ঝুকভ নিয়মিত ফিল্ড ও স্টাফ মহড়া এবং যুদ্ধক্রীড়ার আয়োজন করতেন। একই সময়ে ঝুকভ স্থানীয় কমিউনিস্ট পার্টির শাখার সচিবও নির্বাচিত হন। এ সময় তাকে সোভিয়েত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামরিক প্রশিক্ষণ বিভাগের সঙ্গে প্রায়ই কাজ করতে হতো। সেখানে কর্মরত লাল ফৌজ কর্মকর্তা আলেক্সান্দর ভাসিলেভস্কির সঙ্গে ঝুকভের সুসম্পর্ক স্থাপিত হয়। ভাসিলেভস্কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনানায়ক হিসেবে বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন।

১৯৩১ সালের অক্টোবরে মার্শাল বুদিওন্নি ঝুকভ সম্পর্কে একটি ইতিবাচক প্রতিবেদন পেশ করেন। ১৯৩৩ সালের মার্চে ঝুকভকে সোভিয়েত বেলোরাশিয়ার স্লুৎস্কে অবস্থানরত ৪র্থ (ভরোশিলভ) অশ্বারোহী ডিভিশনের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। পরবর্তী চার বছর ঝুকভ এই দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তার নিজের ভাষ্যমতে, ডিভিশনাল কমান্ডার হিসেবে তার লক্ষ্য ছিল ডিভিশনটিকে লাল ফৌজের শ্রেষ্ঠ ইউনিটে পরিণত করা। এর মধ্য দিয়ে ঝুকভের ইচ্ছাশক্তি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা উভয়ই স্পষ্টরূপে ফুটে ওঠে।

ঝুকভ স্লুৎস্কে পৌঁছানোর অল্প কিছুদিন আগেই ডিভিশনটিকে লেনিনগ্রাদ অঞ্চল থেকে সেখানে প্রেরণ করা হয়েছিল। সেখানে তাদেরকে নিজেদের জন্য ব্যারাক ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করতে হচ্ছিল। ঝুকভ যখন সেখানে পৌঁছান, তখন ডিভিশনটি সুশৃঙ্খল সৈন্যদলের পরিবর্তে পরিণত হয়েছিল কার্যত একটি অসংগঠিত শ্রমিক দলে। ঝুকভ এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনেন এবং কঠোর শৃঙ্খলার মাধ্যমে ডিভিশনটিকে একটি কার্যকর সৈন্যদলে পরিণত করেন। বস্তুত দুই বছরের মধ্যে ঝুকভ ডিভিশনটির পরিস্থিতির এতটা উন্নতি ঘটিয়েছিলেন যে, ১৯৩৫ সালে এই কৃতিত্বের জন্য তাকে এবং তার ডিভিশনকে সোভিয়েত সরকার ‘অর্ডার অফ লেনিন’ পদকে ভূষিত করে।

১৯৩০–এর দশকে লাল ফৌজের একদল সৈন্য। এ সময় লাল ফৌজ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয় এবং ঝুকভের ক্রমাগত পদোন্নতির এটি ছিল একটি অন্যতম কারণ; Source: Wikimedia Commons

কমান্ডার হিসেবে ঝুকভ ছিলেন খুবই কড়া। তার ডিভিশনের প্রতিটি সৈন্য ও অফিসারের কাছ থেকে তিনি কঠোর শৃঙ্খলা ও অতিমানবীয় পরিশ্রম প্রত্যাশা করতেন, এবং তার এই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে তিনি কঠোরতা প্রদর্শনে ইতস্তত করতেন না। তার দৃষ্টিতে এই কঠোরতার প্রয়োজন ছিল, কারণ তার ডিভিশনটি মোতায়েন ছিল সীমান্ত অঞ্চলে এবং সম্ভাব্য যুদ্ধের ক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের আক্রমণের প্রথম ধাক্কা তাদেরকেই সামলাতে হতো। এজন্য এই সময়ে যতগুলো বড় মাত্রার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়, ঝুকভের ডিভিশন তার প্রত্যেকটিতেই অংশগ্রহণ করে। অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে ঝুকভ ছিলেন সৈন্য ও অফিসারদের প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল এবং তাদের নিয়মিত খোঁজখবর নেয়ার পাশাপাশি তিনি তাদের বিপদে-আপদে সহযোগিতাও করতেন। এজন্য তার অধীনস্থরা তাকে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা এবং ভয় দুটোই করত।

স্লুৎস্কে অবস্থানকালেই ঝুকভ ও তার স্ত্রী আলেক্সান্দ্রার দ্বিতীয় মেয়ে এল্লার জন্ম হয়। ঝুকভের মেয়ে এরার ভাষ্যমতে, সৈন্যদলের মতো ঘরেও ঝুকভ শৃঙ্খলা দেখতে পছন্দ করতেন। পরিবারের সদস্যদের প্রতি তিনি খুবই যত্নশীল ছিলেন, কিন্তু কোনো ধরনের অসততা সহ্য করতেন না। ঘরে অবস্থানকালে তিনি প্রচুর বই পড়তেন। বস্তুত ঝুকভের নিজের একটি বিস্তৃত বইয়ের সংগ্রহ ছিল এবং তার মৃত্যুর আগে তার সংগ্রহে অন্তত ২০,০০০ বই ছিল!

১৯৩৭ সালের জুলাইয়ে ঝুকভকে বেলোরুশীয় সামরিক জেলার ৩য় অশ্বারোহী কোরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। ১৯৩৮ সালের মার্চে তাকে বদলি করা হয় এবং ৬ষ্ঠ কসাক কোরের কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এই সময়ে তিনি মেকানাইজড সেনাবাহিনীতে অশ্বারোহী সৈন্যদলকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় সেটি নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করছিলেন এবং তার কোরকে মেকানাইজড যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে তুলছিলেন। একই সময়ে প্রতি রাতে তিনি কার্ল মার্ক্স ও ভ্লাদিমির লেনিনের লেখাগুলোসহ কমিউনিজমের ক্লাসিক লেখাগুলো পড়ে ফেলছিলেন। অবশ্য তার মতে, এটি মোটেও সহজ কাজ ছিল না!

ইতোমধ্যে ১৯৩৮ সালের জুনে ঝুকভকে বেলোরুশীয় সামরিক জেলার উপ–কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। এই পদে অধিষ্ঠিত থাকা অবস্থায় তার বিশেষ দায়িত্ব ছিল উক্ত সামরিক জেলার অশ্বারোহী ইউনিট ও ট্যাঙ্ক ব্রিগেডগুলোর যথাযথ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা। সোভিয়েত রণকৌশলে সীমান্তবর্তী বেলোরুশীয় সামরিক জেলার অবস্থান ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাই ঝুকভের পদটি ছিল একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পদ। তখনো ঝুকভ সোভিয়েত জনসাধারণের নিকট পরিচিত ছিলেন না, কিন্তু শীঘ্রই সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে তিনি পরিণত হবেন জাতীয় বীরে!

(এরপর দেখুন ৩য় পর্বে)

Related Articles