গভীর রাত, সারাদিনের পরিশ্রম শেষে পৃথিবীর মানুষরা নিজ নিজ বাসস্থানে গভীর ঘুমে অচেতন। ঘুমের ঘোরে কেউ কেউ সুন্দর স্বপ্ন দেখছে। আবার কেউ হয়তো দুঃস্বপ্নের আগ্রাসনে চিৎকার করে জেগে উঠছে। কিন্তু এ ঘুম শুধু মানুষের। অলিম্পাসের চূড়ায় অধিষ্ঠিত দেবতাদের সর্দার জিউসের চোখে সে ঘুম নেই। তার মাথায় তখন রাজ্যের চিন্তা। বার বার একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জিউসের চিন্তাধারা- কীভাবে অ্যাকিলিসের সম্মান রক্ষা করা যায়?

অ্যাকিলিসের জন্মদাত্রী মাতা দেবী থেতিস জিউসের নিকট প্রার্থনা করেছেন যেন তার সন্তানের কোনো সম্মানহানী না হয়। অপরদিকে জিউসের স্ত্রী দেবী হেরা থেতিসকে সহ্যই করতে পারেন না। তিনি আগামেমননের পক্ষে সাফাই গাইছেন। একদিকে গ্রীক অধিপতি আগামেমনন, আরেকদিকে অ্যাকিলিস। কী করবেন জিউস? শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না দেখে দেবতা জিউস আগামেমননের নিকট স্বপ্নের বেশে বার্তা প্রেরণ করলেন।

দেবতা জিউস আগামেমননের নিকট স্বপ্নাদেশ প্রেরণ করেন; Source: Greek Mythology Link

জিউসের বার্তা আগামেমননের স্বপ্নে তার প্রিয় উপদেষ্টা নেস্টরের রূপে হাজির হলো। নেস্টর আগামেমননকে জানালেন, “হে আত্রিয়াসের পুত্র আগামেমনন! আমি দেবতা জিউসের পক্ষ থেকে এসেছি। গ্রীক সেনাবাহিনীর সময় এসে পড়েছে। ট্রোজানদের গৌরব মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার সুসময় হাজির হয়েছে।”

নেস্টরের প্রস্থানের মাধ্যমে সুন্দর একটি স্বপ্নের সমাপ্তি হলো। স্বপ্ন শেষে জেগে উঠলেন আগামেমনন। তার মনের ভেতরে বার বার ধ্বনিত হতে থাকলো দেবতা জিউসের আশীর্বাদ বার্তা- ট্রোজানদের গৌরব মাটিতে মিশিয়ে দেয়ার সুসময় হাজির হয়েছে। আর বসে থাকা ঠিক হবে না তার। এবার সময় ট্রোজানদের বিপক্ষে যুদ্ধে যাওয়ার। মনে মনে কুটিল হাসি হাসতে থাকলেন তিনি।

ঠিক তখন অলিম্পাস থেকে জিউস কঠিন দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছেন গ্রীক সেনাবাহিনীর দিকে। আগামেমননের তত্ত্বাবধানে তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ট্রয় যুদ্ধের আর বেশি দেরি নেই। এর মাধ্যমে তিনি কি পারবেন অ্যাকিলিসকে সম্মানিত করতে? এর উত্তর যদি হ্যাঁ হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক কীভাবে তিনি তার উদ্দেশ্য সফল করবেন?

এভাবেই আসরের মাঝখানে বসে নিজের মুখে কবিতার ছন্দে ট্রয় যুদ্ধের রোমাঞ্চকর কাহিনী আবৃত্তি করে চলেছেন হোমার। বেশ রহস্যময় কবি এই হোমার। অসাধারণ ভঙ্গিতে চমৎকার সব গল্প বলতে পারে এ কবি। একবার হোমারের আসরে বসলে ফের উঠে কাজে ফিরে যাওয়া মুশকিল। গ্রীক, ট্রোজান, দেবতা, যুদ্ধ, প্লেগ- একবার হোমারের ফাঁদে পড়লে শ্রোতারা খুব সহজেই কাবু হয়ে পড়ে।

কিন্তু কে এই হোমার? কোথায় তার জন্ম? সেটা কেউ জানে না। ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডিসি’র অন্তরালে সে এক রহস্যজট। হাজার বছর পূর্বের হোমারকে নিয়ে গবেষণার শেষ নেই। এমনকি তার অস্তিত্ব নিয়েও তৈরি হয়েছে হাজার প্রশ্ন। সাহিত্য জগতের সবচেয়ে জটিল রহস্যগুলোর মাঝে অন্যতম হয়ে উঠেছে ‘হোমার রহস্য’।

হোমার পরিচিতি এবং অন্ধ ডেমোডোকস

হোমারের সাথে আমাদের পরিচয় হয় ইলিয়াড এবং ওডিসি নামক দুটি মহাকাব্যের মাধ্যমে। গ্রীক সাহিত্যজগতে হোমার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা কবি হিসেবে ধরা হয়। এ গ্রীক মহাকবিকে নিয়ে গবেষকদের প্রশ্নের শেষ নেই। তার জন্ম, মৃত্যু, জন্মস্থান, তিনি দেখতে কীরকম ছিলেন ইত্যাদি সম্পর্কিত নানা তথ্য নিয়ে ইতিহাসবিদগণের নিকট তেমন কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই।

‘হোমার’ একটি গ্রীক শব্দ। এর দুটো অর্থ হতে পারে- অন্ধ ও জিম্মি। এ থেকে ধারণা করা হয় হোমার একজন গ্রীক ক্রীতদাস ছিলেন, যিনি আবার অন্ধও ছিলেন। নামের অর্থ ছাড়াও আরো এক জায়গায় হোমারের অন্ধত্বের প্রমাণ মেলে। সেজন্য আমাদের পরিচিত হতে হবে কবি ডেমোডোকসের সাথে।

হোমার কি সত্যিই অন্ধ ছিলেন? Source: Alchetron

হোমার রচিত মহাকাব্য ওডিসি’র একটি চরিত্রের নাম ডেমোডোকস। কাব্যে তার আবির্ভাব ঘটে ফিয়েশিয়ান রাজার সভায় আগমনের মাধ্যমে। ডেমোডোকস পেশায় একজন কবি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তিনি ছিলেন অন্ধ। জাহাজডুবির কারণে বিধ্বস্ত ওডেসিয়াসের মনোরঞ্জনের জন্য তিনি নিবেদিত ছিলেন। হোমারের বর্ণনায় তিনি ছিলেন একজন স্বর্গীয় গায়ক, যিনি দেবতাদের কাছ থেকে নিজের খেয়াল খুশিমতো সঙ্গীত রচনার অনুমতি অর্জন করেছেন। ওডেসিয়াসের সম্মুখে মানুষের ভালো এবং মন্দ দিক নিয়ে কীর্তন রচনা করেন তিনি। তার কাব্যের ছন্দে ওডেসিয়াস এবং আকিলিসের দ্বন্দ্বের ছবি ফুটে উঠে।

তার আবৃত্তি শুনে ওডেসিয়াস মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি তার গুণের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাছাড়া হোমারের কবিতায় তার জীবনধারা এবং অন্ধদের নিকট পৃথিবীর হালচিত্র নিয়ে বিশদ বিবরণ ফুটে উঠেছে। তার বর্ণনার ছন্দে মনে হয় এ যেন হোমারের নিজের জীবনের গল্প বলা হচ্ছে। তাই ইতিহাসবিদগণের দাবী, এ ডেমোডোকসই আমাদের মহাকবি হোমার। তবে হোমার ঠিক কীভাবে অন্ধ হয়েছেন, তা নিয়ে তেমন কিছু বলতে পারেনি ইতিহাসবিদরা।

সে অনুযায়ী, মহাকবি হোমার তেলেমাচুস এবং এপিকাস্তের সন্তান। বাস্তব জীবনে অন্ধ হয়ে থাকলেও আত্মিকভাবে অন্ধ ছিলেন না। অন্তর দিয়ে চারপাশ অনুভব করতেন। অন্ধ জগতেই তিনি ট্রয়ের ময়দানে দেবতা আর মানুষদের লড়াই দেখতে পেয়েছেন। তার দুই মহাকাব্যে তা দৃঢ়ভাবে ফুটেও উঠেছে। হোমারের অন্ধত্ব নিয়ে আর কোনো সুস্পষ্ট দলিল নেই। তাই ডেমোডোকস এবং হোমার, দুজনেই গবেষকদের নিকট এক ধাঁধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ডেমোডোকস কি স্রেফ কল্পনা? নাকি তার আড়ালে লুকিয়ে আছেন হোমার? এর সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই।

রাজসভায় অন্ধ চারণ কবি ডেমোডোকসের আবির্ভাব; Source: Pinterest/Francesco Hayez

হেরোডোটাস ছদ্মনামে এক ইতিহাসবিদ ৪র্থ শতাব্দীতে দ্য লাইফ অফ হোমার শিরোনামে একটি গবেষণাধর্মী পুস্তক রচনা করেন। তিনি সেখানে ডেমোডোকসের তত্ত্বের বাইরেও আরেকটি নতুন তত্ত্ব প্রদান করেন। তার মতে, হোমারের আসল নাম মেলেসিয়েনে। তার পিতা হিসেবে উল্লেখ করা হয় আরগস শহরের ক্রেথেইস নামক এক ব্যক্তির নাম। আবার অনেকের মতে, হোমার নিতান্ত নিঃসঙ্গ একজন কবি, যিনি পথে পথে নিজের মহাকাব্য শুনিয়ে বেড়াতেন।

জন্মসাল এবং স্থান বিতর্ক

হোমারের পরবর্তী রহস্যের শুরু হয় তার জন্মসাল নিয়ে। সভ্যতার ইতিহাসে সাল, মাস গণনা পদ্ধতি বেশ প্রাচীন হলেও, হোমারের সময় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই ঠিক কবে হোমার জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে দ্বিধায় বিভক্ত সাহিত্য সমাজ।

তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তত্ত্ব অনুযায়ী, হোমারের জন্মসাল ৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বের মাঝামাঝি সময়ে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হোমার ট্রয় যুদ্ধের কয়েক বছর ব্যবধানে জন্মেছিলেন। তাই তার কাব্যে ট্রয়ের উপাখ্যান বেশ দৃঢ়ভাবে অঙ্কিত হয়েছে। যেমন- ইলিয়াডে হোমার উল্লেখ করেছেন, দেবতা পসেইডন সামোথ্রেস দ্বীপের (বর্তমানে সামোথ্রাকি) সর্বোচ্চ চূড়ায় আসীন হয়ে রাজা প্রিয়ামের সাম্রাজ্য অবলোকন করছেন। কিন্তু হোমারের দ্বারা কোনো মানচিত্রের সাহায্যে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। কারণ ইম্ব্রোস দ্বীপের অবস্থানের কারণে সামোথ্রেস থেকে প্রিয়ামের রাজ্যের সীমানা অবলোকন করা সম্ভব নয়।

প্রাচীন সামোথ্রেস দ্বীপ, যার বর্তমান নাম সামোথ্রাকি দ্বীপ; Source: Outpost Magazine

কিন্তু তার কাব্যে ছন্দের ব্যবহার এবং সংলাপ তৈরির ঢং বিশ্লেষণ করে আরেকদল গবেষক দাবি করেছেন, হোমারের জন্মসাল ১২০০ খ্রিস্টপূর্বের আরো পরে হতে পারে। ওদিকে ইতিহাসের জনক হেরোডোটাসের মতে হোমারের জন্ম ৮৫০ খ্রিস্টপূর্বে।

জন্মসালের পর জন্মস্থান নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৭টি শহরের নাম উঠে এসেছে এই তালিকায়। তবে তথ্য প্রমাণ এবং যুক্তির উপর নির্ভর করে দুটি অঞ্চলকে হোমারের সম্ভাব্য জন্মস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। এগুলো হলো– গ্রিস এবং এশিয়া মাইনর অঞ্চল। ইলিয়াডে ব্যবহৃত ভাষার ধরন এশিয়াটিক গ্রিক। সে অনুযায়ী, হোমারের জন্মস্থান আয়োনিয়া অথবা চিওস দ্বীপ। ৬ষ্ঠ শতাব্দীতে চিওস দ্বীপের এক পরিবার নিজেদেরকে হোমারের বংশোদ্ভূত হিসেবে দাবী করেছে। তারা নিজেদের হোমারয়েড হিসেবে পরিচয় প্রদান করে। এমনকি তারা হোমারের বিভিন্ন কবিতার পঙক্তি পবিত্র হিসেবে সংরক্ষণের দায়িত্বও পালন করে এসেছে যুগ যুগ ধরে।

যদি হেরোডোটাসের তথ্য সত্য হয়ে থাকে, তাহলে মেলেসিয়েনে ওরফে হোমারের জন্মস্থান হবে স্মিরনা শহর। এত এত অনুমান আর তত্ত্বের ভিড়ে যেন আসল তথ্যই চাপা পড়ে গেছে। গবেষকরা এর কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। এই জটিল রহস্যে নতুন করে তত্ত্ব প্রদান করেন রোমান রম্যকার লুসিয়ান। তার মতে, ব্যাবিলনে তাইগ্রেন নামে এক লোক ছিলেন। তিনি কোনো কারণে গ্রীক বাহিনীর হাতে বন্দী হন। গ্রিসে আসার পর তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হোমার। এত তত্ত্বের ভিড়ে এখন কোনটা সত্য, তা কেউ জানে না।

হোমারের সাহিত্যকর্ম

হোমারকে সাহিত্যজগতে সম্রাটে আসনে বসিয়েছে তার দুই অমর কীর্তি ইলিয়াড এবং ওডিসি। তবে এই দুই মহাকাব্যের বাইরেও হোমার ঈশ্বর বন্দনামূলক বিভিন্ন চারণ কাব্য রচনা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে মাত্র ২৩টি কাব্য বর্তমানে রক্ষিত আছে। তার উল্লেখযোগ্য চারণ কবিতাগুলো হচ্ছেThe Battle of the Frogs and Mice, Cypria, The Little Iliad, The Phocais, The Thebais, The Capture of Oichalia প্রভৃতি। কিন্তু এ চারণ কবিতাসমূহ ইলিয়াড এবং ওডিসি’র মাহাত্ম্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে বলে মনে করেন সাহিত্য বিশারদগণ।

ইলিয়াড

ট্রয় যুদ্ধের ঘটনাকে পুঁজি করে প্রায় ১৫ হাজার ৬৯৩টি ষড়মাত্রিক পঙক্তির সমন্বয়ে রচিত সুবৃহৎ মহাকাব্য ইলিয়াড। দেবী থেতিসের পুত্র আকিলিসের ক্রোধ, প্যারিস কর্তৃক হেলেন অপহরণ এবং ট্রয় যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে ইলিয়াডের ঘটনাবলী। ইলিয়াডের উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে- অ্যাকিলিস, ট্রোজান বীর হেক্টর, হেক্টরের ভ্রাতা প্যারিস, ট্রয়ের রাজা প্রিয়াম, গ্রিক রাজা আগামেমনন, দেবরাজ জিউস, রূপসী হেলেন, পাত্রক্লুস এবং এনিয়া। ট্রয় যুদ্ধের মাধ্যমে মানুষ এবং দেবতাদের রূপকথাময় জগতের সংমিশ্রণে এক অপরূপ কাব্য হিসেবে ইতিহাসের পাতায় ভাস্বর এই ইলিয়াড। ইলিয়াডকে পশ্চিমা সাহিত্যের জগতে অন্যতম সেরা মহাকাব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গ্রীক এবং ট্রোজান বাহিনীর যুদ্ধকৌশলের বিস্তারিত বিবরণ, পাত্রক্লুসের মৃত্যু, অ্যাকিলিসের বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ইত্যাদি ইলিয়াডের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার তালিকায় উঠে এসেছে। গ্রীক এবং ট্রোজানদের মধ্যে বেশ কয়েক দফা যুদ্ধকে ছাপিয়ে সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে দুই বীর আকিলিস এবং হেক্টরের সম্মুখ যুদ্ধ। প্রায় প্রতিটি যুদ্ধেই বিভিন্ন দেবতারা গ্রীক এবং ট্রোজানদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। যেমন– দেবী এথেনা গ্রীকদের পক্ষে এবং দেবতা অ্যাপোলো ট্রোজানদের পক্ষে যুদ্ধ করেন।

ট্রয় চলচ্চিত্রে অ্যাকিলিস ও হেক্টরের সম্মুখ যুদ্ধ; Source: WB

রাজপুত্র হেক্টরের মৃত্যুর পর অ্যাকিলিসের নিকট রাজা প্রিয়ামের সন্ধি স্থাপনের দৃশ্যকে পশ্চিমা সাহিত্যের অন্যতম হৃদয়বিদারক এবং আবেগঘন দৃশ্য হিসেবে অভিহিত করা হয়। রাজা প্রিয়াম অ্যাকিলিসের প্রতি হাতজোড় করে মিনতি করেন, “হে অ্যাকিলিস! দেবতাদের প্রতি সম্মান রেখে নিজের পিতাকে স্মরণ করো। এরপর আমার প্রতি করুণা করো”। এভাবে সন্তানের মৃত্যুতে শোকার্ত এক পিতার আহাজারির মাধ্যমে ইলিয়াড হাজার বছর ধরে সাহিত্যপ্রেমীদের মন জয় করে এসেছে। কাব্যের শেষে অ্যাকিলিসের বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্তে ট্রয়ের নাটকীয় পতন ঘটে।

ইলিয়াডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি সিনেমা নির্মিত হয়। এদের মধ্যে ট্রয় (২০০৪), দ্য ফিউরি অফ অ্যাকিলিস (১৯৬২), হেলেন অফ ট্রয় (১৯৫৬) বিখ্যাত।

ওডিসি

ইলিয়াডের ঘটনার পর থেকে শুরু হওয়া মহাকাব্য ওডিসি প্রায় ১২ হাজার ১০৯টি ষড়মাত্রিক পঙক্তির সমন্বয়ে রচিত। ট্রয় যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে গ্রিক বীর ওডেসিয়াসের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন মুখ্য হয়ে উঠেছে এখানে। পথিমধ্যে দেবতা পোসাইডনের ঐশ্বরিক হস্তক্ষেপে নানা প্রতিকূলতার মাঝে শুরু হয় এ যাত্রা। এছাড়া ওডেসিয়াসের বিরুদ্ধে সাইরেন, সাইক্লপ পলিথেমাস সহ আরো অনেকের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্বও কাব্যের মাঝে ফুটে উঠেছে। পঙক্তি বিন্যাস এবং বিভিন্ন উপমার ব্যবহারের মাধ্যমে যেন এক নতুন হোমারকে আবিষ্কার করা হয় এই কাব্যে। সাহিত্যিকদের দৃষ্টিতে ইলিয়াডে যে হোমারের যাত্রা শুরু হয়, তা ওডিসির ছন্দে পূর্ণতা লাভ করে।

তবে ওডিসির মাঝে বিভিন্ন দ্বন্দ্বযুদ্ধে ওডেসিয়াসের বীরত্ব ফুটে উঠেছে। ভয়ংকর দানব পলিথেমাসের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে ওডেসিয়াস দক্ষতার সাথে তাকে কুপোকাত করে। যুদ্ধ শেষে ওডেসিয়াসের হাতে অন্ধ হয়ে যায় সেই দানব। ওডিসির মাঝে ব্যবহৃত ভাষাশৈলী বর্তমান যুগের সাহিত্যিকদের জন্য আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত হয়। হোমার নাটকীয়ভাবে কাহিনীর মধ্যবর্তী অবস্থা থেকে তার কবিতা শুরু করতেন। তারপর ধীরে ধীরে পূর্ব কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হতেন।

ওডেসিয়াস এবং সাইক্লপ দানবের যুদ্ধ; Source: Greek Mythology

হোমারের ওডিসির ঘটনা সমান্তরালভাবে বর্ণিত হয়েছে জেমস জয়েস রচিত আধুনিক সাহিত্যের উপন্যাস ইউলেসিস-এর মাঝে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক জে আর আর টলকিনের দ্য ফল অফ গনডোলিন-এ প্রতিধ্বনিত হয়েছে ইলিয়াডের বীর আকিলিসের বিজয়গাঁথা। এমনকি কোয়েন ভ্রাতৃদ্বয় কর্তৃক পরিচালিত সিনেমা O Brother, Where Art Thou?-তে ওডিসির কথা উল্লেখ করা হয়। মূলত, এই সিনেমাটি ওডিসি’র কাহিনীকে ব্যঙ্গ করে হাস্যরসাত্মকভাবে নির্মিত হয়েছে।

ইলিয়াডের ন্যায় ওডিসির কাহিনীকে অনুসরণ করে চিত্রায়িত হয়েছে  ইউলেসিস (১৯৫৪), দ্য ওডিসি (১৯৯৭), ল’ওডিসিয়া (১৯৯৮), ট্রাভেলিং ওয়ারিয়র (১৯৮১) এর মতো বিখ্যাত সিনেমাসমূহ।

হোমার আসলে কয়জন?

হোমারের কাব্য রচনার ধরন পর্যালোচনার মাধ্যমে অনেক সাহিত্যিক দাবী করেছেন, হয়তো হোমার কোনো নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি নন। হোমারের নামের অন্তরালে লুকিয়ে আছেন একদল কবি। এ সন্দেহ থেকে জন্ম নেয় নতুন আরেকটি প্রশ্ন, হোমার আসলে কয়জন? মজার ব্যাপার হলো, সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিখ্যাত প্রশ্নের একটি বিশেষ নামও আছে। তা হলো, হোমারিয় প্রশ্ন বা ‘Homeric Question। ১৭৯৫ সালে সর্বপ্রথম এ প্রশ্নের জন্ম দেন জার্মান সাহিত্য সমালোচক অগাস্ট উলফ। ইলিয়াড এবং ওডিসির বর্ণনায় বিভিন্ন অসঙ্গতির দিকে আঙুল তুলে ধরেন এই সমালোচক। তিনি ধারণা করেন, ইলিয়াড এবং ওডিসি বেশ কয়েকজন কবির দ্বারা ধারাবাহিকভাবে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি ইলিয়াডের মাঝে ঘোড়ার গতির প্রশংসা করে হোমার বেশ কয়েকটি পঙক্তি রচনা করেছেন। কিন্তু ওডিসির মাঝে এ ধরনের কোনো পঙক্তির উল্লেখ নেই। এমনকি প্রাণীর সবরকম বর্ণনা থেকে বিরত থেকেছেন তিনি। হয়তো দুজন আলাদা কবি ওডিসি এবং ইলিয়াড রচনা করেছেন।

ইলিয়াড এবং ওডিসির লেখক কি আলাদা দুজন হোমার? Source: Amazon

এ প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু একজন হোমারে বিশ্বাসী সাহিত্যিকদের মতে, ইলিয়াড রচনাকালে হোমার যুবক ছিলেন। কিন্তু ওডিসি রচনাকালে তিনি কাব্য বিন্যাসে যথেষ্ট দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন। তাই দুটি মহাকাব্যে দুই ধরনের বর্ণনা বিদ্যমান। কিন্তু দিনশেষে হোমারিয় প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর নেই।

হোমার সম্পর্কিত বিবিধ তথ্য

  • দার্শনিক প্লেটোর রিপাবলিক গ্রন্থে হোমারকে গ্রীক সংস্কৃতির গুরু হিসেবে অভিহিত করা হয়।
  • অ্যারিস্টটলের পয়েটিক্স গ্রন্থে হোমারকে প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের অগ্রদূত হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সমসাময়িক কবিদের তুলনায় হোমারকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে ধরা হয়।
  • অ্যাম্ফিডামাসের শেষকৃত্যে হোমার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি হিসিয়ড নামক এক কবির সাক্ষাৎ লাভ করেন। প্রসঙ্গক্রমে, হিসিয়ডের প্রস্তাবে হোমার তার সাথে কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। হিসিয়ড তার বিখ্যাত কবিতা ‘Work and Days’ আবৃত্তি করেন। ওদিকে হোমার ইলিয়াড থেকে আবৃত্তি করেছিলেন। বিচারকরা সবাইকে অবাক করে দিয়ে হিসিয়ডকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, হিসিয়ডের কাব্যে শান্তির বার্তা ছিল। অথচ হোমারের কাব্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। তাই হিসিয়ডই সেরা!
  • হোমার রচিত প্রায় অর্ধেক কবিতাই লোকমুখে প্রচলিত ছিল। মানুষের মুখে মুখে তা ছড়িয়ে পড়েছিলো বিভিন্ন অঞ্চলে।
  • জার্মানির মিউনিখে বাভারিয়ান স্টেট লাইব্রেরি প্রাঙ্গনে হোমারের ভাস্কর্য নির্মিত হয়। বিভিন্ন ইতিহাসবিদের বর্ণনানুযায়ী এটি নির্মিত হয়।

হোমারের ভাস্কর্য; Source: Wikimedia Commons

হোমারের মৃত্যু

হোমারের জন্মসালের পর মৃত্যুসাল নিয়েও বিতর্ক জন্ম নিয়েছে। অনেকের মতে, তিনি ৭০১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু গবেষকগণ সুনির্দিষ্টভাবে তার মৃত্যুসাল বের করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে হোমারের মৃত্যুকে ঘিরে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। ৫ম শতাব্দীর দার্শনিক হেরাক্লিটাসের বর্ণনানুযায়ী, একবার একদল বালক হোমারের নিকট হাজির হলো। তারা হোমারকে উকুন সম্পর্কিত একটি জটিল ধাঁধার উত্তর জিজ্ঞাসা করেন। হোমার সারাদিন ভেবেও তার উত্তর বের করতে পারেননি। এ ধাঁধার ব্যর্থতা মাথায় নিয়ে হোমার মৃত্যুবরণ করেন। তবে এ ঘটনার কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

পশ্চিমা সাহিত্যের অগ্রদূত হোমার আমাদের নিকট একটি ধাঁধা। প্রশ্ন উঠে, হোমার কি আসলেই ছিলেন? এ প্রশ্নের প্রমাণ সহ উত্তর দিতে পারেননি কেউ। কিন্তু ইলিয়াড, ওডিসির পঙক্তির মাঝে আমরা হোমারকে খুঁজে পাই। রাজসভার সেই অন্ধ চারণ কবি ডেমোডোকসের বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেন হোমার। যদিও বর্তমান সাহিত্যিকদের নিকট হোমারিয় প্রশ্নের উত্তর জানা নেই, কিন্তু তাদের বিশ্বাস, সেই উত্তর জানার খুব বেশি দেরি নেই। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। সময়ই সবকিছু প্রমাণ করে দেবে।

ফিচার ইমেজ- The Washington Post