‘মানব কম্পিউটার’ শকুন্তলা দেবী

ছোট একটা প্রশ্ন দিয়ে লেখাটি শুরু করি। আচ্ছা, বলুন তো ১৩ অঙ্কের দু’টি সংখ্যা গুণ করতে সর্বোচ্চ কতক্ষণ লাগতে পারে? যেমন ধরুন, ৭,৬৮৬,৩৬৯,৭৭৪,৮৭০ এবং ২,৪৬৫,০৯৯,৭৪৫,৭৭৯ সংখ্যা দু’টি গুণ করে সঠিক উত্তর দিতে আপনার কত সময় লাগবে? কয়েক সেকেন্ডে পারবেন? অসম্ভব কোনোকিছু মনে হচ্ছে কি? মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন ব্যক্তির জন্য এই অসম্ভব কাজ করতে তথা সঠিক উত্তর (১৮,৯৪৭,৬৬৮,১৭৭,৯৯৫,৪২৬,৭৭৩,৭৩০) দিতে সময় লেগেছিল মাত্র ২৮ সেকেন্ড!

তিনি ভারতীয় লেখক এবং মানব কম্পিউটার শকুন্তলা দেবী। গণনা করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণেই বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি লাভ করেন ‘মানব কম্পিউটার’ হিসেবে। বিস্ময়কর প্রতিভার জন্য তাকে ১৯৮২ সালে ‘গিনেজ বুক অভ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গণনা করার বিশেষ ক্ষমতার পাশাপাশি গাণিতিক বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা ও জ্যোতির্বিদ্যা নিয়েও যথেষ্ট ধারণা ছিল শকুন্তলার। এ অসাধারণ প্রতিভাবান শকুন্তলা দেবীর জীবনের কিছু বিশেষ অংশ নিয়ে আজকের এই লেখাটি। উল্লেখ্য, ‘বিশ্বের দ্রুততম মানব কম্পিউটার’-এর শিরোপা এতদিন পর্যন্ত শকুন্তলার হাতে ছিল যে বিশ্বরেকর্ডের কারণে, তা সম্প্রতি ভেঙে দিয়েছেন ভারতের হায়দ্রাবাদের নীলকান্ত ভানু প্রকাশ

শকুন্তলা দেবী; Image source: nytimes.com

১৯২৯ সালের ৪ নভেম্বর, বেঙ্গালুরুর একটি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম শকুন্তলা দেবীর। তার বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখনই তার গণনা করার অসাধারণ প্রতিভা দৃষ্টিগোচর হয়। শকুন্তলার পিতা একটি সার্কাসে কাজ করতেন। তিনি লক্ষ করলেন, তাসের খেলায় তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, নিজের মেয়েকে হারানো ছিল অসম্ভব। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই জটিল জটিল অঙ্ক কষে ফেলতেন শকুন্তলা। একসময় তার পিতা সার্কাস ছেড়ে মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যান ও রোড শো করেন, যেখানে শকুন্তলা তার বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তা দেখাতেন।

মাত্র ছ’ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বেশ বড় পরিসরে জ্ঞানীগুণীদের মাঝে মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ পান। বলা বাহুল্য, উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলেই এ গণনা করার অসাধারণ ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। এর দু বছর পর আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো নিজের এই বিশেষ গুণটি তুলে ধরেন তিনি। ১৯৪৪ সালে শকুন্তলা তার পিতার সাথে লন্ডনে চলে যান। দেশের বাইরে প্রথমবারের মতো নিজের বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শন এরপর থেকেই শুরু হয় বিশ্ব জুড়ে তার খ্যাতি অর্জন করার সফর।

কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই জটিল জটিল অঙ্ক কষে ফেলতেন শকুন্তলা; Image source: indiatimes.com

বিশেষ মানসিক দক্ষতা

শকুন্তলা খুব সহজেই তিনের বর্গমূল, উচ্চতর বর্গমূল বের করতে পারতেন এবং বড় বড় সংখ্যা গুণ করতে পারতেন। ১৯৫০ সালের দিকে ইউরোপে এবং ১৯৭৬ সালে নিউইয়র্কেও তিনি তার দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৯৭৭ সালে সাউদার্ন মেথডিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১ অঙ্কের একটি সংখ্যার ২৩তম বর্গমূল মাত্র ৫০ সেকেন্ডে বের করে সকলকে বিস্মিত করে দেন। তার উত্তর ছিল ৫৪৬,৩৭২,৮৯১; যা নিশ্চিত করা হয় তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কম্পিউটার ইউনিভ্যাক-১১০১ এর মাধ্যমে। মাত্র ৫০ সেকেন্ডে শকুন্তলা এ উত্তর দিতে পারলেও বিশেষজ্ঞদের ইউনিভ্যাকে একটি বিশেষ প্রোগ্রাম তৈরি করতে হয় এর সঠিক উত্তর বের করার জন্য। আর ইউনিভ্যাকের এ অঙ্ক কষতে সময় লাগে ৬২ সেকেন্ড।

১৯৮৮ সালে শকুন্তলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরকালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্থার জেসন তার এ অসাধারণ প্রতিভার রহস্য উদঘাটন করার চেষ্টা করেন। এ তাগিদে জেসন তার কিছু পরীক্ষাও নেন। এসব পরীক্ষার মধ্যে দু’টি হলো- ৬১,৬২৯,৮৭৫ এর তিনের বর্গমূল এবং ১৭০,৮৫৯,৩৭৫ এর সাতের বর্গমূল বের করা। জেসনের মতে, এই গাণিতিক সমস্যাগুলো তিনি তার নোটবুকে তুলে শেষ করার আগেই শকু্ন্তলা এগুলোর সঠিক উত্তর (৩৯৫ এবং ১৫) বলে দেন। জেসন তার প্রাপ্ত তথ্যগুলো দিয়ে ১৯৯০ সালে তার বই ‘ইনটেলিজেন্স’ প্রকাশ করেন। শকুন্তলার আরেকটি বিশেষ দক্ষতা ছিল দিন-তারিখের হিসাব নিয়ে। ১৯৮৮ সালে বার্কলিতে ‘জুলাই ৩১, ১৯২০’ তারিখে কোন বার ছিল জানতে চাওয়া হলে মাত্র এক সেকেন্ডেই তিনি উত্তর দিয়ে দেন।

 
শকুন্তলা ছিলেন অনন্য ক্ষমতার অধিকারী; Image source: indiatimes.com

বিশ্বরেকর্ডও গড়ে তোলেন

১৯৮০ সালের ১৮ জুন যুক্তরাজ্যের ইমপেরিয়াল কলেজ অব লন্ডনে শকুন্তলাকে ১৩ অঙ্কের দু’টি সংখ্যা গুণ করতে দেওয়া হয়। সংখ্যাগুলো পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। বাছ-বিচার ছাড়াই তৎক্ষণাৎ লেখা হয়। এটার কথাই লেখার শুরুতে বলেছিলাম। এই গুণ করতে তার সময় লাগে মাত্র ২৮ সেকেন্ড। পরদিনই ‘দ্য বুলেটিন’ পত্রিকায় তার এই রেকর্ডের কথা প্রকাশ করা হয়। তার এ রেকর্ডের দরুন ১৯৮২ সালে ‘গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ তাকে স্বীকৃতি দেয়। আর সেইসাথে ‘বিশ্বের দ্রুততম মানব কম্পিউটার’ হওয়ার খেতাব পান তিনি।

লেখক শকুন্তলা

শকুন্তলা দেবী তার জীবদ্দশায় বেশ কিছু বই লিখে গেছেন। এর মধ্যে অন্তত ছ’টি বই এরকম ছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মকে গণিত বিষয়ে পড়াশোনা করতে উদ্বুদ্ধ করবে। তার বইগুলো দেখলে বোঝা যায়, বিভিন্ন গাণিতিক বিষয় যা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত, যেমন- ত্রিকোণমিতি ও লগারিদম সম্পর্কেও জানতেন। তার সেরকম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকা সত্ত্বেও এসব বিষয়ে এত দক্ষতা কীভাবে এল, তা নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, নিজের চেষ্টায় বিভিন্ন বই পড়ার মাধ্যমে এসব বিষয়েও পারদর্শী হন। উল্লেখ্য, তিনি জীবদ্দশায় একটি ক্রাইম থ্রিলারও লিখেছেন, যার নাম ‘পারফেক্ট মার্ডার’।

জ্যোতির্বিদ্যার প্রতিও শকুন্তলার অগাধ আগ্রহ ছিল। এরই দরুন তিনি এ বিষয়ে বেশ জ্ঞান অর্জন করেন এবং জ্যোতির্বিদ্যার উপর একটি বই ‘অ্যাস্ট্রোলজি ফর ইউ’ লিখেন। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি আর্টিকেল অনুসারে, শকুন্তলা একদিনে প্রায় ৬০ জন ব্যক্তির সাথে দেখা করতেন, যারা তাকে নিজেদের জন্মের তারিখ, সময় ও স্থান বললে তিনি তাদের জীবন সম্পর্কে যেকোনো তিনটি প্রশ্নের জবাব দিতেন।

অ্যাস্ট্রোলজি ফর ইউ; Image source: goodreads.com

১৯৬০ সালের মাঝামাঝি পরিতোষ ব্যানার্জির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শকুন্তলা দেবী। তাদের ঘরে একটি মেয়ে হয় যার নাম অনুপমা ব্যানার্জী। ডিভোর্সের পর শকুন্তলাই তাকে পেলে-পুষে বড় করেন। বিয়ের কয়েক বছর পরই তাদের বিয়েটি ভেঙে যায়। বলা হয়ে থাকে পরিতোষ সমকামী ছিলেন যার কারণে তাদের বিয়েটি ভেঙে যায়। আর সেজন্যই শকুন্তলা দেবীও সমকামিতা নিয়ে গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ হন। ২০০১ সালের একটি তথ্যচিত্র “ফর স্ট্রেইটস অনলি”-তে এই দাবি করা হয়। সেই সময়ে সমকামিতা শুধু সমাজের চোখে নয়, বরং আইনের চোখেও ছিল নিকৃষ্ট অপরাধ। সেই সত্তরের দশকে শকুন্তলা সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটান যেন তাদের মন-মানসিকতা ও জীবনযাপনের ধরন বুঝতে পারেন। তার এই দীর্ঘ সময়ের গবেষণার ফল ছিল ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব হোমোসেক্সুয়ালিটি’ বইটি। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে, তবে সেই সময়ে বইটি সামাজিক প্রেক্ষাপট ও মানসিকতার কারণে সেরকম স্বীকৃতি পায়নি। কিন্তু পরবর্তীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পায় তার বইটি। ভারতে সম্ভবত সমকামিতা সম্পর্কে এত বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে সেরকম বই এটিই প্রথম। উল্লেখ্য যে, শকুন্তলার মেয়ে অনুপমা ব্যানার্জী দাবি করেন তার পিতা পরিতোষ সমকামী ছিলেন না। বলা হয় যে, শকুন্তলা তার বইয়ের প্রচারের জন্য অথবা কেন এরকম বই লেখার সাহস করলেন বা কেন এই বই লেখার জন্য অনুপ্রাণিত হলেন সেসব প্রশ্নের ঝড় থেকে বাঁচতেই এটা বলে ফেলেন। অথবা নিছক মজার ছলেই হয়তো বলে ফেলেন যার ভুল অর্থ অন্যরা বের করেন। তবে এরকম কথা বা দাবির ফল কতটা বড় হতে পারেন তা সম্পর্কে ভাবেননি।

১৯৬০ সালের মাঝামাঝি পরিতোষ ব্যানার্জির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন শকুন্তলা দেবী; Image source: thecinemaholic.com

‘মানব কম্পিউটার’ উপাধি

১৯৫০ সালের ৫ অক্টোবর, শকুন্তলা বিবিসির একটি অনুষ্ঠানে নিজের অনন্য প্রতিভা প্রদর্শন করেন। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে ছিলেন লেসলি মিচেল। বিবিসির দরুন তার খ্যাতি আরো বেড়ে যায়। একসময় তিনি ‘মানব কম্পিউটার’ উপাধি লাভ করেন। কিন্তু এই উপাধি মোটেও পছন্দ করতেন না শকুন্তলা দেবী। তার মতে, মানুষের মস্তিষ্কের শক্তি-সামর্থ্য ও দক্ষতা একটি কম্পিউটারের চেয়ে অনেক বেশি। কম্পিউটার ও মানুষের মস্তিষ্কের তুলনা করা যৌক্তিক নয়।

এ সাক্ষাৎকারে একটা মজার ঘটনাও ঘটে। শকুন্তলা অনবরত জটিল সব গণিত করার মাধ্যমে উপস্থিত সকলকেই চমকাতে থাকেন। কিন্তু হঠাৎ ঝামেলা বাঁধে, যখন শকুন্তলা ও বিবিসির হিসাবে অমিল দেখা যায়। শকুন্তলাও মানতে নারাজ যে, তার হিসাবে গণ্ডগোল হয়েছে। তাই আবার নতুন করে সব হিসাব-নিকাশ করে মিচেল ঘোষণা করেন যে, শকুন্তলার হিসাবে নয়, বরং তাদের পক্ষ থেকেই ভুলটা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এরকম একটি ঘটনা রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানেও ঘটে। আর এবারও শকুন্তলা নয়, বরং কর্তৃপক্ষ ভুল প্রমাণিত হয়।

রাজনীতিতে শকুন্তলা দেবী

জীবনের এক পর্যায়ে শকুন্তলা দেবী রাজনীতির দিকে কিছুটা অগ্রসর হয়েছিলেন। তবে সেরকম কোনো সফলতা পাননি। ১৯৮০ সালে তিনি ভারতের লোকসভায় স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মুম্বাই ও মেদাক থেকে নির্বাচনে দাঁড়ান। মেদাকে শকুন্তলার বিপরীতে ছিলেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী, যাকে নিয়ে তিনি প্রায়ই খোলামেলাভাবে সমালোচনা করতেন। তবে শকুন্তলার খ্যাতি তাকে মানুষের ভোট পেতে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারেনি। ফলস্বরূপ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পরাজিত হন তিনি।

জীবনাবসান

২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল শকুন্তলা দেবী নিজ জন্মস্থান তথা বেঙ্গালুরুতে শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মারা যান। এই সময় তার বয়স ছিল ৮৩ বছর। তাছাড়া মৃত্যুর বেশ আগে থেকে হার্ট ও কিডনির বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি।

This article is in Bangla language. It's about 'Human computer' Shakuntala Devi.
Sources have been hyperlinked in this article.
Featured image: nytimes.com
 

Related Articles