হুমায়ূন ফরীদি: এদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের জগতের এক নক্ষত্র

‘সংশপ্তক’ নাটকে ‘কান কাটা রমজান’ এর অভিনয় যারা দেখেছেন, তারা জানেন কি যাদুকরী মন্ত্রে অভিনেতা বশীভূত করে ফেলেছিলেন দর্শকদের? সময় বয়ে যায়, থেকে যায় মানুষের কর্ম। আর থেকে যায় ‘কান কাটা রমজান’ এর মতো সৃষ্টি ও শিল্প। অভিনয় এক শিল্পই বটে! নইলে কীভাবে সাধারণ মানুষ একজন অভিনেতার আসল পরিচয়ের চেয়ে বেশি তাকে তার অভিনীত চরিত্রের মাধ্যমে মনে রাখে? না হলে আজও এ দেশের মানুষ কেন কয়েক যুগ আগের ‘সংশপ্তক’, ‘অয়োময়’, ‘কোথাও কেউ নেই’ এর মতো নাটকগুলোতে অভিনয় করা হুমায়ূন ফরীদিকে তার সেই অসাধারণ অভিনয় দিয়ে মনে রাখে? গ্রামের সহজ সরল মানুষগুলো কেন ফরীদি বলতে ব্যক্তি হুমায়ূন ফরীদির চেয়ে বেশি চলচ্চিত্রের খলনায়ক ফরীদিকে চেনে?

এ দেশের চলচ্চিত্র আর টেলিভিশনের জগতে এমনি অসাধারণ অভিনয়ের সাক্ষর রেখে যাওয়া পর্দার এই নায়ক এবং খলনায়ক শুধু নাটক ও বাণিজ্যিক সিনেমা নয়, নিজের প্রতিভার সাক্ষর রেখে গেছেন ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘বহুব্রীহি’, ‘আহা!’ ও ‘একাত্তরের যীশু’র মতো সময়ের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া চলচ্চিত্রগুলোতেও। ‘শ্যামল ছায়া’তে তাকে আমরা দেখেছি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত বীর মুক্তিযোদ্ধার চরিত্রে। কিন্তু শুধু সিনেমাতে নয়, শত্রুর বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্র ধরেছিলেন তার নিজের জীবনেও। ১৮ বছরের মেধাবী ফরীদি ১৯৭০ সালে যখন কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়ন বিভাগে ভর্তি হন, তার এক বছরের পরেই দেশমাতৃকার জন্য যুদ্ধের ডাক পড়ে। নিজের দেশ ও মানুষের প্রতি প্রবল দরদী ফরীদি সে ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি। অস্ত্র হাতে অংশ নেন সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামে। যুদ্ধের পরে এ দেশের অভিনয়ের জগতকে অন্য এক মাত্রায় নিয়ে যান তিনি। মোট কথা, দেশকে দেয়ার অংকটা তার মোটেও ছোট নয়।

‘শ্যামল ছায়া’ সিনেমার পোস্টার; shopnil.com

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ যখন চারিদিকে ক্ষতি আর ধ্বংসের হিসেবে ব্যস্ত, তখন কিছু মানুষের মমতার ছায়ায় এ দেশের টেলিভিশনের জগত বেশ দ্রুতই তার ক্ষতি পুষিয়ে দাঁড়াতে শুরু করে। বিশেষ করে তখন চলমান নাট্যশালার সংস্কৃতি যেন যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে অভিনয়ের জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। আর সেলিম-আল-দ্বীন, নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, আফজাল হোসেন, গোলাম মোস্তফা, পিযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো মানুষগুলো এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এই তালিকা কখনোই সম্পূর্ণ হবে না যদি হুমায়ূন ফরীদির নাম তাদের সাথে না নেয়া হয়। ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চনাটক ‘ভূত’ এর মঞ্চায়নের সময় ফরীদি পরিচালক হিসেবে প্রথম মঞ্চের সাথে জড়িয়ে যান। এরপর আর থেমে থাকার কোনো গল্প নেই তার জীবনে। এমনকি নাট্যশালার দুঃসময়েও তিনি মহিলা সমিতি ও গাইড হাউজের মঞ্চে নাটকের মঞ্চায়ন চালাতে থাকেন। শকুন্তলা, কীর্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, ফণি মনসার মতো মঞ্চনাটকগুলোতে অভিনয় করে খুব দ্রুতই তিনি অনেক প্রশংসা আর জনপ্রিয়তা কুড়ান। সেই সাথে জড়িয়ে যান নাট্যদল ফেডারেশন, গ্রাম থিয়েটারের মতো দেশের প্রথম সারির অনেক নাট্য সংগঠনগুলোর সাথে। ফরীদির জীবনের এর পরের পর্বটাই তার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। এরপরই তার অভিষেক ঘটে টেলিভিশনের পর্দায়। টেলিভিশনে আসার পরই নাটক আর সিনেমার মাধ্যমে তিনি আজ শহর থেকে গ্রামে প্রত্যেক বাংলাদেশীর কাছে হয়ে আছেন এক পরিচিত মুখ।

তরুণ ফরিদী জড়িয়ে পড়েন মঞ্চের সাথে; jagonews24.com

হুমায়ূন ফরীদি পাকিস্তান শাসিত পূর্ব বাংলার ঢাকার নারিন্দায় ১৯৫২ সালের ২৯ মে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এটিএম নুরুল ইসলাম এবং মায়ের নাম বেগম ফরিদা ইসলাম। গ্রামের বাড়ি কালিগঞ্জে তার প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। মাদারীপুরের ইসলামিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে ১৯৭০ সালে তিনি চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। সে বছরই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জৈব রসায়নে ভর্তি হন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের জন্য সেখানে তার পড়াশোনায় ছেদ পড়ে। দেশের জন্য যুদ্ধের পরম দায়িত্ব সম্পন্ন করে ফিরে এসে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকেই অভিনয় ও সাংস্কৃতিক পথে তার যাত্রার শুরু। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসই ছি্লো তার অভিনয়ের পীঠস্থান, প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সেলিম-আল-দ্বীনের সংস্পর্শে এই ক্যাম্পাসে তার দিনগুলোই ছিলো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার দিন। ১৯৭৬ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য উৎসবে সবচেয়ে অগ্রগামী আয়োজক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করে এই জগতে তিনি নিজের অবস্থান আরো পোক্ত করেন।

‘নিখোঁজ সংবাদ’ নাটকের মাধ্যমে অসাধারণ এই অভিনেতার পর্দায় অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর আর থেমে থাকা নয়। ১৯৮২ সাল থেকে পর্দায় অভিনীত নাটকের তালিকায় যোগ হয় আরো অনেক নাম, যার মধ্যে আছে ‘নীল নকশার সন্ধানে’, ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’, ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’, ‘বকুলপুর কত দূর’, ‘একটি লাল শাড়ি’, ‘মহুয়ার মন’, ‘হঠাৎ একদিন’, ‘সংশপ্তক’ (১৯৮৭-৮৮), ‘কোথাও কেউ নেই’ (১৯৯০), ‘সমুদ্রের গাংচিল’, ‘তিনি একজন'(২০০৫), ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘মোহনা’, ‘ভবের হাট’ এবং ‘আরমান ভাই দ্য জেন্টলম্যান’ (সর্বশেষ নাটক) এর মতো সচরাচর ধারা থেকে ভিন্ন, অসামান্য আর বিপুল জনপ্রিয় সব নাটক। এতো নাটকের ভিড়েও সংশপ্তকে ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রে তার মোহনীয় অভিনয় এ দেশের দর্শকদের মনে চিরস্থায়ী স্থান করে নিয়েছে।

‘সংশপ্তকে’ তার অভিনয় মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়; priyo.com

নাটকের মাধ্যমে অভিনয়ের এই রাজার টেলিভিশনের পর্দায় অভিষেক ঘটলেও শুধুমাত্র তাতেই তিনি নিজেকে বন্দী রাখেননি কখনো। চলচ্চিত্রের জগতেও তিনি রেখে গেছেন নিজের অসাধারণ প্রতিভার সাক্ষর। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে তার খলনায়কের অভিনয় শহরের সীমানা পার করে গ্রামের দর্শকদের মনেও স্থায়ী স্থান দখল করে। ‘দহন’, ‘সন্ত্রাস’, ‘মায়ের মর্যাদা’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘ত্যাগ’, ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’, ‘দূরত্ব’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র মতো বাণিজ্যিক সিনেমার মাধ্যমে তিনি শহরের পাশাপাশি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোর পাশাপাশি তার ঝুলিতে আছে ‘হুলিয়া’, ‘ব্যাচেলর’, ‘মাতৃভা’, ‘বহুব্রীহি’, ‘আহা!’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামলছায়া’র মতো অনন্য সব চলচ্চিত্র। ‘মাতৃভা’তে অভিনয়ের জন্য ২০০৪ সালে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগে তিনি অতিথি শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের অভিনয় বুঝতে ও শিখতে সাহায্য করেন।

বিনোদনের জগতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ব্যক্তি হিসেবে কেমন ছিলেন? তার প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তার স্নেহধন্য ও ভাতৃতুল্য মো: জসীমউদ্দীন জানান, “হুমায়ূন ফরীদি কেবল অত্যন্ত সরল মনের সদাহাস্য ও মিষ্টভাষী মানুষ ছিলেন না, একইসাথে তিনি ছিলেন তার বিভাগের তুখোড় মেধাবী একজন ছাত্র। সেই সাথে ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন বামধারার রাজনীতির একজন জোরালো সমর্থক”। তারা দুজনই আল-বিরুনী হলে থাকতেন। মো: জসীমউদ্দীন এখন সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন।

এই অভিনেতার ব্যক্তিজীবনের গল্পটা তার কর্মজীবনের সাফল্যের মতো ঠিক অতটা সুখকর ছিলো না। তার প্রথম স্ত্রীর নাম নাজমুন আরা বেগম মিনু। ১৯৮০ সালে তারা দুইজন গাঁটছড়া বাঁধলেও চার বছরের মাথায় ১৯৮৪ সালে তাদের ঘর ভেঙে যায়। শারারাত ইসলাম দেবযানী নামে এই দম্পতির এক কন্যাসন্তান আছে। এরপর তিনি সহকর্মী এবং বাংলাদেশের অভিনয়ের জগতের আরেকজন উজ্জ্বল নক্ষত্র সুবর্ণা মোস্তফার সাথে সেই একই বছর ঘর বাঁধলেও ২০০৮ সালে অনেক তিক্ততার মধ্য দিয়ে তাদের সে ঘর ভেঙ্গে যায়।

সুবর্ণা মোস্তফার সাথে তার ভালোবাসার ঘরও শেষ পর্যন্ত ভেঙে যায়; worldtoptenfact.com

এ দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান, প্রশংসিত ও জনপ্রিয় অভিনেতাদের একজন এই হুমায়ূন ফরীদি। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ধানমন্ডির বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সে সময় তার একমাত্র কন্যা দেবযানী তার পাশে ছিলেন।

Featured image: Dhaka Courier

Related Articles