আলকেমি কী? এর অনেকগুলো অর্থের মধ্যে একটি অর্থ হচ্ছে অপরসায়ন। নানাবিধ কুসংস্কার আর অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস থাকার জন্যই আধুনিক বিজ্ঞানে তা অপরসায়ন হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে। তবে আলকেমির পুরোটাই কিন্তু অপরসায়নের মধ্যে ফেলে দেয়া যায় না। বিশেষত যখন জানবেন, মধ্যযুগে রসায়ন বলতে যা ছিল তা এই আলকেমিই। মূলত পদার্থের পরিবর্তন সংক্রান্ত পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং গবেষণাই আলকেমির অংশ ছিল। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে, সাধারণ ধাতুকে স্বর্ণে রূপান্তরের বিজ্ঞানই আলকেমি। এর অতিপ্রাকৃত দিকটি ছিল ‘এলিক্সার’ বা অমোঘ ঔষধ তৈরির প্রচেষ্টা, যে ঔষধ খেলে মানুষ অমরত্ব লাভ করতে পারবে!

ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে, ‘জিবারিশ’। এর অর্থ হলো ‘অর্থশূন্য’। এই শব্দটি এসেছে মূলত জাবির নাম থেকেই! আলকেমি নিয়ে জাবির ইবনে হাইয়্যানের অনেক কাজই আধুনিককালের তাত্ত্বিকগণের নিকট অর্থহীন মনে হয়েছে। আর তা থেকে জাবিরীয় কাজগুলো, অর্থাৎ ইংরেজিতে ‘জিবারিশ’ শব্দটির অর্থই হয়ে গেছে অর্থহীন। তবে, অনেক তাত্ত্বিক এক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করে থাকেন। তাদের মতে, জাবিরের আলকেমি বিষয়ক অধিকাংশ কাজই ছিল অতি গোপন এবং শুধুমাত্র তার শিষ্যদের জন্য উন্মুক্ত। ফলে, আজকের যুগে বসে লিখিত বিবরণ পড়ে তা বোঝা দুঃসাধ্য।

বুক অব দ্য কম্পোজিশনস অব আলকেমি বইয়ের পৃষ্ঠা; source: lib.udel.edu

জাবির ইবনে হাইয়্যানের আলকেমি বিষয়ক গবেষণার মূলে ছিল ‘তাকবিন’ সৃষ্টি করা। আরবী শব্দ তাকবিন অর্থ গঠন। তিনি তার গবেষণাগারে এ সংক্রান্ত অনেক গবেষণা করেছেন। তার বই বুক অব স্টোনস-এ তিনি কৃত্রিম কাঁকড়া, সাপ, এমনকি মানুষ তৈরির প্রণালীও উল্লেখ করেছেন। গবেষণাগারে সৃষ্ট এই তাকবিনগুলো আবার তাদের সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। এ ধরনের গবেষণার জন্য তাকে অনেকেই ধর্ম বিচ্যুত বলে গালমন্দ করতো। তবে, জাবির ছিলেন বরাবরই ধর্মভীরু মানুষ। তিনি বুক অব স্টোনসে বারংবার উল্লেখ করেছেন, প্রাণের সঞ্চার আল্লাহ ছাড়া কেউ করতে পারে না এবং তাই, এসব সৃষ্টি করতে হলে আল্লাহর একনিষ্ঠ উপাসক হতে হবে। বইয়ের শুরুর দিকে তিনি দীর্ঘ মোনাজাতও যোগ করেছেন। তার মতে আলকেমি বিষয়ক কোনো গবেষণা শুরুর আগে মরুভূমিতে গিয়ে একাকী এ দোয়া পাঠ করলেই তবে গবেষণা সফল হবে।

জাবির ইবনে হাইয়্যান ইতিহাসে অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছেন রসায়নের কারণে। সে সময় রসায়ন বলতে যা ছিল সবই আলকেমি নামের অপরসায়ন। জাবিরের আলকেমি বিষয়ক কাজগুলোর মধ্যে যেগুলো আধুনিক রসায়নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেগুলোকে আজকের বিজ্ঞান রসায়ন হিসেবে গ্রহণ করেছে। জাবির কেবল আলকেমির অতীন্দ্রিয়তার মধ্যেই ডুবে থাকেননি। তিনি কিছু অসাধারণ কাজও করেছেন, যেগুলোর জন্য তার নিকট আজকের রসায়ন ঋণী হয়ে থাকবে। তার কাজগুলোই পরবর্তী সকল মধ্যযুগীয় বিজ্ঞানীদের আলকেমি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী করেছে।

source: lib.udel.edu

কেবল সাধারণ ধাতুকে স্বর্ণে রূপান্তরের প্রচেষ্টায় মগ্ন না থেকে, জাবির ইবনে হাইয়্যান অনেক সময়োপযোগী কাজ করেছেন। ইস্পাত তৈরি, লোহার মরিচা রোধ, স্বর্ণালঙ্কারে মসৃণ খোদাই, কাপড় রঙ করার প্রণালী, চামড়ার ট্যানিং, বিভিন্ন রঞ্জক পদার্থের সংশ্লেষণের মতো বেশ কিছু কার্যকরী কাজ করেছেন তিনি। তিনিই প্রথম কাঁচ তৈরিতে ম্যাংগানিজ ডাইঅক্সাইড ব্যবহার করেছিলেন, যা আজ অবধি ব্যবহৃত হচ্ছে। তার বুক অব স্টোনস ছাড়াও, ‘বুক অব দ্য কম্পোজিশন অব আলকেমি’, ‘বুক অব ব্যালেন্সেস’, ‘বুক অব কিংডম’ সহ বেশকিছু বই ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন রোবার্ট অব চেস্টার নামক এক ব্যক্তি। বইগুলো এত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে যে, পরবর্তী কয়েকশো বছর সেগুলো ইউরোপজুড়ে আলকেমির প্রধান পাঠ্যবই হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

গবেষণাগারের জন্য এসব যন্ত্রপাতি তৈরি করেছিলেন জাবির; source: wikiwand.com

আলকেমির উন্নয়নের ধারাবাহিকতায়, আধুনিক রসায়নে জাবির ইবনে হাইয়্যানের অবদানগুলো-

  • আলকেমিতে পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষণের প্রচলন;
  • খনিজ ধাতু নিয়ে গবেষণার দ্বার উন্মোচন;
  • উষ্ণতা, আর্দ্রতা, শীতলতা ও শুষ্কতা- এ চারটি বিষয়ের বিস্তারিত বিজ্ঞানসম্মত বিবরণ;
  • নাইট্রিক এবং সালফিউরিক অ্যাসিড উৎপাদন;
  • বিভিন্ন খনিজ ধাতু থেকে স্বর্ণ পৃথকীকরণ;
  • পারদের বিশুদ্ধিকরণ ও লবণকে পানিতে সম্পূর্ণ দ্রবণীয় বলে আখ্যায়িতকরণ;
  • ‘অ্যাকোয়া রেজিয়া’ প্রস্তুতকরণ, যা স্বর্ণকে দ্রবীভূত করতে পারে;
  • ক্ষারের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘অ্যালকালি’র প্রচলন;
  • স্ফটিকিকরণের মাধ্যমে বিশুদ্ধিকরণ;
  • সিলভার নাইট্রেটের অধঃক্ষেপণ;
  • মারকিউরাস অক্সাইড ও মারকিউরিক অক্সাইডের অধঃক্ষেপণ;
  • আর্সেনিয়াস অ্যাসিড প্রস্তুতকরণ।

অষ্টম শতাব্দীর কথা। ইরানে তখন উমাইয়্যা খলিফাদের শাসন চলছে। সে সময়, খুব সম্ভবত ৭২১ খ্রিস্টাব্দে খোরাসানের তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জাবির ইবনে হাইয়্যান। পুরো নাম আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়্যান। ল্যাটিন ভাষায় তিনি ‘জেবার’ বলে পরিচিত। তার আদি বংশ পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। কেউ বলেন, তার বাবা হাইয়্যান আল আজাদি ছিলেন একজন সিরিয়ান, কেউ বলেন ইরাকি, আর বাকিরা বলেন তিনিও তুসেরই নাগরিক। তবে পেশাগতভাবে আজাদি একজন ঔষধ প্রস্তুতকারক ছিলেন- এ ব্যাপারে তাতে সকলেই একমত। শৈশবেই জাবিরকে তুস ছেড়ে ইয়েমেন পালিয়ে আসতে হয়েছিল। কারণ তার বাবা আজাদি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পরই তার পরিবার তুস ছেড়ে পালিয়ে যায়।

তুস নগরের একটি সৌধের ধ্বংসাবশেষ; source: Pinterest

হারবি আল হিমায়ারির নিকট গণিত এবং কুরআনের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন জাবির। পরে জাফর আল সাদিকের নিকট আলকেমি এবং চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। অধ্যয়ন শেষে তিনিও বাবার মতো ঔষধ প্রস্তুতের কাজে মনোযোগ দেন। এ সময় তিনি ‘বুক অব ব্লোজোম’ নামে আলকেমির প্রাথমিক জ্ঞান সম্বন্ধীয় একটি বই লিখে খলিফা হারুন আল রশিদের দরবারে প্রেরণ করেন। এ বই পড়ে খলিফা মুগ্ধ হন। কিন্তু মুগ্ধতা শীঘ্রই উবে যায়, যখন খলিফা জানতে পারেন যে জাবির বার্মাকিদদের সমর্থক। উল্লেখ্য, বার্মাকিদ হচ্ছে আব্বাসীয় খলিফাদের প্রতিযোগী প্রভাবশালী রাজবংশ।

জাবির ইবনে হাইয়্যান (৭২১-৮১৫); source: .thefamouspeople.com

নানা সন্দেহের জের ধরে ৮০৩ খ্রিস্টাব্দে জাবিরের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন হারুন আল রশিদ। বাঁচার জন্য তিনি কুফায় পালিয়ে যান। তবে দুই বছরের মাথায় ধরা পড়েন এবং গৃহবন্দী হন। মৃত্যুদণ্ড যদিও কার্যকর করা হয়নি, তথাপি আমৃত্যু তাকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। সম্ভবত ৮১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বন্দী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

ইতিহাসে ৩ হাজারের অধিক ছোট বড় গ্রন্থ, প্রবন্ধ, গবেষণা পাওয়া যায় জাবির ইবনে হাইয়্যানের নামে। তবে এগুলোর মাঝে অনেকগুলোই বিতর্কিত। গবেষকদের মতে, জাবির ইবনে হাইয়্যানের অনুসারীদের পরবর্তী কাজ এবং গবেষণাগুলোও জাবিরের নামে প্রচলিত হয়ে গেছে। আবার অনেকের মতে, ৩ হাজার জাবিরীয় লেখা সংকলনের অধিকাংশই জাবিরের নিজস্ব কাজ। তার লেখা সংকলনে সৃষ্টিতত্ত্ব থেকে শুরু করে রসায়ন, জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যামিতি, সঙ্গীত, দর্শন, অধিবিদ্যা, যুক্তিশাস্ত্র, প্রযুক্তি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, পুরাতত্ত্ব, ব্যাকরণ সহ জ্ঞানের অসংখ্য শাখায় তার পদচারণার উল্লেখ পাওয়া যায়।

জাবিরের পাতন প্রণালী; source: AboutIslam.net

ল্যাটিন ভাষায় জাবির ইবনে হাইয়্যান জেবার নামে পরিচিত। কিন্তু এই নাম নিয়েই ত্রয়োদশ শতকে একটি সমস্যার উদ্ভব হয়, যা সিউডো-জেবার বা ছদ্মজেবার নামে পরিচিত। ১৩ শতকে কোনো এক অজানা ব্যক্তি আলকেমির উপর বেশ কিছু বই লিখেছিলেন, যেগুলোতে তিনি ছদ্মনাম জেবার ব্যবহার করেন। প্রাথমিকভাবে, ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত সে বইগুলোকে জাবিরের কোনো অখ্যাত কাজের অনুবাদ বলেই ধরে নেয়া হয়। কিন্তু ১৫ শতকের পর থেকে আরো বিস্তারিত গবেষণায় অনেকেই সেগুলো নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। ১৮ ও ১৯ শতকে এই বিতর্ক আরো জোর পায় এবং সিউডো-জেবার তত্ত্বের প্রচলন হয়। বর্তমানে অধিকাংশ ইতিহাসবিদই মনে করেন সেই নির্দিষ্ট সংখ্যক বইগুলো আসলে কোনো এক অপরিচিত, অখ্যাত ল্যাটিন আলকেমিস্টের লেখা। কিন্তু এই তত্ত্ব এখনো প্রমাণিত হয়নি। তাই বিতর্ক এখনও বিদ্যমান।

জাবিরের প্রস্তুতকৃত রসায়ন গবেষণাগার; source: alamy.com

কী প্রমাণিত হয়েছে আর কোনটি এখনো বিতর্কিত, এসব একপাশে রেখেও জাবির ইবনে হাইয়্যানকে মধ্যযুগের তো বটেই, ইতিহাসের একজন গুরুত্বপূর্ণ রসায়নবিদ হিসেবে গণ্য করা যায়। তার অবদানের জন্য মধ্যযুগ জুড়ে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী আলকেমিস্ট। ইউরোপীয়দের নিকটও তিনি সমান জনপ্রিয়। বিখ্যাত ব্রাজিলিয়ান লেখক পাউলো কোয়েলহোর কালজয়ী বই ‘দ্য আলকেমিস্ট’এ জাবিরের কথা উল্লেখ আছে। আমেরিকান কমিক বই ‘শিল্ড’ এর একটি খণ্ডে অষ্টম শতকের শিল্ডের নেতা হিসেবে একটি প্রধান চরিত্রে জাবিরকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। আমেরিকান সিটকম ‘বিগ ব্যাং থিওরি’র একটি পর্বে উল্লেখিত হয়েছেন জাবির। ডিসি কমিক্সের ‘ডেমন নাইটস’ পর্বে ‘ইঞ্জিনিয়ার আল জাবর’ রূপে আবির্ভূত হন জাবির। বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ও তার একটি ছোটগল্প ‘প্রফেসর শঙ্কু’তে জাবিরের কথা উল্লেখ করেছেন।

ফিচার ছবি: mvslim.com