ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান বিশ্বাস করতো কোনো উষ্ণ বস্তু থেকে শক্তির বিকিরণ অবিচ্ছিন্নভাবে হয়। এই বিশ্বাস থেকে বিজ্ঞানকে বের করে আনেন এক মহান বিজ্ঞানী। তিনিই হচ্ছেন ম্যাক্স কার্ল আর্নেস্ট লুডভিগ প্ল্যাঙ্ক। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানকে এবং বিশ্বকে বোঝার ও জানার ক্ষেত্রটি চিরতরে বদলে যায় যখন তিনি আবিষ্কার করলেন কোনো উষ্ণ বস্তু থেকে শক্তির বিকিরণই অবিচ্ছিন্নভাবে হয় না বরং নির্দিষ্ট পরিমাণে বিচ্ছিন্নভাবে নির্গত হয়। তিনি সূচিত করলেন পদার্থবিজ্ঞানের এক নতুন বিস্ময়কর ধারা যার নাম ‘কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান’। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব যেমন স্থান, কাল, মহাকর্ষ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে আমাদের ধারণায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে, প্ল্যাঙ্ক এর কোয়ান্টাম তত্ত্বও তেমনি পারমাণবিক, অতিপারমাণবিক ব্যাপারগুলো বোঝার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন করে দেয়।

জন্ম ও বেড়ে ওঠা

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ২৩ এপ্রিল ১৮৫৮ সালে জার্মানিতে জোনাথন প্ল্যাঙ্ক এবং এমা পেটজিগ-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। জোনাথন ছিলেন একজন আইনের প্রফেসর। এমাও স্বশিক্ষিত ছিলেন। নয় বছর বয়সী ম্যাক্স জার্মানীর কিয়েল শহরে একটি এলিমেন্টারি স্কুলে ভর্তি হন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করেন। তার প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটতেও বেশি সময় নেয়নি। স্কুলের গণিত শিক্ষক হারমান মুলার বুঝতে ভুল করেননি যে ম্যাক্স আর যাই হোক সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতো নয়। ম্যাক্সের গণিতের প্রতিভা ছিল অন্য সকলের চেয়ে অনেক বেশি। হারমান তাই ম্যাক্সকে বাড়তি করে জোতির্বিজ্ঞান ও বলবিদ্যা পড়াতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মেধাবী ম্যাক্স অত্যন্ত উৎসাহের সাথেই লুফে নেন এই প্রস্তাব। আর হারমানের কাছেই তিনি লাভ করেন পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ ও মৌলিক কিছু বিষয়ের ধারণা।

ম্যাক্সের প্রতিভা যে কেবল গণিতে আটকে ছিল তা কিন্তু নয়। সঙ্গীত চর্চায়ও তিনি ছিলেন অনবদ্য। ক্লাসিক্যাল গানগুলো তিনি তার চমৎকার কণ্ঠে গাইতেন যা মন্ত্রমুগ্ধের মতোই শুনতো তার শ্রোতারা। অন্যদিকে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পিয়ানো বাজানোও শিখে নেন তিনি। মাধ্যমিক স্কুলে নিজের সঙ্গীত দক্ষতা তাকে বেশ সুনামও এনে দেয়। অনেকে গায়ক হবার পরামর্শও দেন তাকে। কিন্তু স্কুল ছাড়ার আগে তিনি সিদ্ধান্ত নেন বিজ্ঞানই হবে তার জীবনের আসল সঙ্গী। গান থাকবে কেবলই শখ হিসেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যাক্স

জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়; ছবিসূত্রঃ applysquare

১৮৭৪ সালে সতেরো বছর বয়সে ম্যাক্স পাড়ি জমান জার্মানির মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হতে গেলে সে বিভাগে প্রফেসর ফিলিপ ভন জলি তাকে বলেন, “পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মৌলিক সবকিছুই আবিষ্কৃত। যা বাকি আছে তা হচ্ছে কেবল তাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভুলগুলো শুধরানো।” শুধু এ কথাই নয়, ফিলিপ ম্যাক্সের মধ্যে নতুন কিছু করার প্রবণতা দেখে তাকে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে পড়ার পরামর্শও দেন!

ফিলিপ যা-ই বলুক না কেন, ম্যাক্স ভর্তি হলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগেই। পদার্থবিজ্ঞান পড়া শুরু করেই তিনি মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন পদার্থবিদের উপর বিরক্ত হন। তার নিকট যার চিন্তা-চেতনা সবচেয়ে বেশি হাস্যকর মনে হতো তিনি আর কেউ নন, সেই ফিলিপই। ফিলিপ ধারণা করতেন ততদিনে পদার্থবিজ্ঞানের সকল আবিষ্কার হয়ে গেছে এবং মহাবিশ্বের যা কিছু বোঝার মানুষ বুঝে ফেলেছে! আর মজার ব্যাপার হলো ফিলিপের এই ধারণা সমকালীন আরও অনেক পদার্থবিদই সমর্থন করতেন!

উত্তর ইতালির কোমো লেক; ছবিসূত্রঃ mysnowglobes

১৮৭৭ সালে বসন্তের ছুটিতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক কার্ল রাঞ্জ-এর তত্ত্বাবধানে বন্ধুদের সাথে ইতালির উত্তরাঞ্চলে হাইকিংয়ে যান। রাঞ্জ সেখানে ছাত্রদের সামনে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেন। তিনি জানতে চান খ্রিষ্টধর্ম কি পৃথিবীতে ভালোর চেয়ে মন্দ কাজই অধিক করেনি? লুথারান মতবাদে বিশ্বাসী ম্যাক্সের মনে এই প্রশ্ন বেশ জোরেশোরেই আঘাত করে। তিনি আমৃত্যু লুথারান ছিলেন। নাস্তিকতাকে তিনি অস্বীকার করতেন। তবে ভিন্নমত ও ভিন্ন ধর্মের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

তাপগতিবিদ্যা এবং প্রথম চাকরি

১৮৭৭ সালে ২০ বছর বয়সী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বার্লিনের ফ্রেডরিখ উইলহেলম বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য বদলি হন। সেখানে তিনি হেলমহল্টজ নামক এক পদার্থবিদের সাহচর্যে আসেন যার সাথে পরবর্তী সময়ে তার বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। হেলমহল্টজের তাপগতিবিদ্যার প্রতি ছিল ভীষণ ঝোঁক যা অল্প সময়ের মধ্যেই ম্যাক্সের মধ্যেও সংক্রমিত হয়। শুরু হয় তাপগতিবিদ্যা বিষয়ক পড়াশোনা। ক্লসিয়াসের গবেষণাপত্রে তার যতটা ঝোঁক সৃষ্টি হয়, তার অর্ধেকও ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস লেকচারে!

১৮৭৮ সালের শেষ দিকে বার্লিন থেকে ম্যাক্স মিউনিখে ফিরে আসেন। এসেই একটি মাধ্যমিক স্কুলে পদার্থের শিক্ষক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরের বছর তিনি তাপগতিবিজ্ঞানের দ্বিতীয় সূত্রের উপর তার গবেষণা প্রবন্ধ জমা দেন এবং মাত্র ২১ বছর বয়সেই লাভ করেন পিএইচডি ডিগ্রীর সম্মান! পরের বছরই তিনি তার আয় বাড়াতে আরও একটি গবেষণা প্রবন্ধ জমা দেন। এই গবেষণা প্রবন্ধই তাকে মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক হবার সুযোগ করে দেয়। তবে প্রাথমিকভাবে তিনি ছিলেন অবৈতনিক। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্ল্যাঙ্ক তার জীবনের শেষভাগে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন যে তার প্রথম গবেষণা প্রবন্ধটি জন্য তিনি যখন মৌখিক পরীক্ষায় যোগ দেন, পরীক্ষকের প্রশ্ন শুনেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন পরীক্ষক তার গবেষণাটি বুঝতে পারেনি!

ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান থেকে বেরিয়ে আসা এবং কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কার

কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ গ্রাফ; ছবিসূত্রঃ boundless.com

১৮৮৯ থেকে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। ততদিনে ছাত্রদের নিকট তার জনপ্রিয়তা আকাশ-ছোঁয়া। তার দুজন ছাত্র পরবর্তী সময়ে নোবেল পুরস্কারও জেতেন।

ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের সময়ে ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞানের একটি বড় সমস্যা ছিল কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ। কৃষ্ণ বস্তু হলো এমন বস্তু যা এর উপর আপতিত সকল তড়িৎচুম্বক বিকিরণ শোষণ করে নেয়। বিজ্ঞানীরা ভাবতেন কৃষ্ণবস্তুকে উত্তপ্ত করলে এটি তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বিকিরণ করে। এসব তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অতিবেগুনী, অবলোহিত এবং দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যসীমার মধ্যে পড়ে। কিন্তু উনিশ শতকে অনেক বিজ্ঞানী পরীক্ষায় দেখতে পান যে ক্লাসিক্যাল তাপগতিবিজ্ঞানের সাথে পরীক্ষায় পাওয়া উষ্ণ বস্তুর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কোনো মিল নেই।

তত্ত্বের সাথে পর্যবেক্ষণের এই সমস্যা দূর করতে এগিয়ে আসেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক। তিনি প্রস্তাব করেন যে শক্তি অবিচ্ছিন্নভাবে যেকোনো পরিমাণে নির্গত হয় না বরং নির্দিষ্ট পরিমাণে নির্গত হয় যার নাম দেন তিনি ‘কোয়ান্টা’। একটু সহজভাবে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ছোটবেলার গণিত ক্লাসে। দুই/তিন ইত্যাদি সংখ্যা দ্বারা বিভাজ্য সংখ্যার সারণি আমরা প্রায় সবাই তৈরি করেছি কোনো এককালে। এখানেও ব্যাপারটা এরকম। শক্তি যখন নির্গত হয় তখন তার পরিমাণ যেকোন সংখ্যায় হয় না বরং তার একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ হয়।

এখান থেকেই কোয়ান্টাম তত্ত্বের উদ্ভব। এই তত্ত্ব পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সম্পর্কে সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হওয়া যায়। প্ল্যাঙ্ক আরও বের করেন যে তড়িৎচুম্বক বিকিরণ এর সাথে বাহিত শক্তির পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা দ্বারা বিভাজ্য হতে হবে। এ সংখ্যাটিকে আজ আমরা প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক বলেই জানি। তিনি একটি সমীকরণ আবিষ্কার করেন যা থেকে বিকিরণ থেকে নির্গত শক্তির পরিমাণ হিসাব করা যায়।

E=hv

E= শক্তির পরিমাণ, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক h= ৬.৬২৬*১০-৩৪, v= কম্পাঙ্ক

আইনস্টাইনের সাথে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক; ছবিসূত্রঃ sciencepenguin

শক্তির প্যাকেট বা কোয়ান্টা তথা কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য ১৯১৮ সালে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

ব্যক্তিগত জীবন

১৮৮৭ সালে ২৮ বছর বয়সে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক বান্ধবী ম্যারি মেরেককে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে চার সন্তানের জন্ম হয়- কার্ল, গ্রেটি, এমা এবং এরভিন। দুঃখজনকভাবে ৯০ বছর জীবনযাপন করা ম্যাক্স শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে নিজের পুরো পরিবারকে মারা যেতে দেখেছেন। ১৯০৯ সালে প্রথমে টিবি রোগে মারা যান তার স্ত্রী ম্যারি। কার্ল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে গিয়ে আর ঘরে ফেরেননি। গ্রেটি আর এমা সন্তান প্রসবকালে মারা যায়, যদিও উভয়ের সন্তানই বেঁচে ছিল। হিটলারকে মারার ষড়যন্ত্রে শামিল থাকার অভিযোগে এরভিনকে ১৯৪৫ সালে মৃত্যুদন্ড দেয় নাৎসি বাহিনী।

পরিবারের সাথে প্ল্যাঙ্ক; ছবিসূত্রঃ .eugenicsarchive

তবে ম্যারির মৃত্যুর দুই বছর পর ম্যাক্স মার্গা ভন হসিনকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে জন্ম এক সন্তান হয় হারমানের। ম্যাক্সের দ্বিতীয় পরিবারের কেউই ম্যাক্স জীবিত থাকাকালীন মারা যায়নি।

আইনস্টাইন ম্যাক্স প্লাঙ্কের সঙ্গীত চর্চার একজন অত্যন্ত ভালো সঙ্গী হয়ে ওঠেন। মূলত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কই প্রথম বিজ্ঞানী যিনি সেসময় আইনস্টাইনের যুগান্তকারী এবং জটিল আবিষ্কারের মর্ম বুঝতে সক্ষম হন। বার্লিনে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হওয়ায় প্ল্যাঙ্কই সাহায্য করেছিলেন আইনস্টাইনকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাণভয়ে একের পর এক বিখ্যাত সব ইহুদী বিজ্ঞানী জার্মানী ছেড়ে চলে যাওয়া দেখে প্ল্যাঙ্ক ব্যথিত হন। ১৯৪৪ সালে মিত্র বাহিনীর এক বিমান হামলায় তার বাড়ি বিধ্বস্ত হয় এবং ধ্বংস হয় তার সকল মূল্যবান গবেষণা প্রবন্ধ ও অন্যান্য কাজ। তথাপি তিনি জার্মানির একনিষ্ঠ দেশপ্রেমিক ছিলেন এবং সর্বদা নাৎসি বাহিনী যেন তাদের ভুল না বুঝে সে আশাই করতেন। তবে ১৯৪৫ সালে দেশদ্রোহের অপরাধে যখন তার ছেলে এরভিন এর মৃত্যুদণ্ড হয় তখন তার সকল আশা ভেঙে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার দুই বছর পর ১৯৪৭ সালের চার অক্টোবর ৮৯ বছর বয়সে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক জার্মানির গটিংএন শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরের বছর বিজ্ঞানীদের একটি সংগঠন ‘কায়সার উইলহেলম সোসাইটি’র নাম পরিবর্তন করে প্ল্যাঙ্কের সম্মানে ‘দ্য ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক সোসাইটি’ করা হয়। ৮০টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট নিয়ে প্ল্যাঙ্ক সোসাইটি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ও সফল বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা।

ফিচার ছবিরঃ mpe.mpg.de