১৮৫২ সালের কোনো একদিনের কথা। দুপুরবেলা লাঞ্চের পর ‘দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভে’র বড়সাহেব দিনের বাদবাকি সময়ের কাজগুলো সেরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ঠিক তখন হাতে একটি ফাইল নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন এক তরুণ। এই তরুণ এসে দাবি করলো সে নাকি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু পর্বতশৃঙ্গ আবিষ্কার করে ফেলেছে। বড় সাহেব বড়সড় চমকই খেলেন। পরে অবশ্য সারা বিশ্বই চমকে গিয়েছিল এই তরুণের আবিষ্কারে। তার নাম রাধানাথ শিকদার। আমরা অনেকেই ভুলে গিয়েছি তাকে। মেধাবী এই ব্যক্তিটি জীবদ্দশাতেও ছিলেন বড্ড উপেক্ষিত।

রাধানাথ শিকদার; ছবিসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

১৮১৩ সালের অক্টোবরে জোড়াসাঁকোর শিকদার পাড়ায় এক গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে রাধানাথ জন্মেছিলেন, বাবা তিতুরাম শিকদার। শিকদারেরা মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রাক্কাল থেকে প্রধানত শান্তিরক্ষক হিসেবে কাজ করতো। বংশ পরম্পরায় এ কাজ করার কারণে তাদের মধ্যে লেখাপড়ার চর্চা অনেক কমে এসেছিল। কিন্তু তারপরেও বাবার তত্ত্বাবধানে রাধানাথের প্রাথমিক শিক্ষায় ঘাটতি হয়নি। রাধানাথ প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় এবং পরে কমল বসুর স্কুলে ভর্তি হন। ১৮২৪ সালে হিন্দু কলেজ (বর্তমান প্রেসিডেন্সি কলেজ)-এ ভর্তি হন। সে সময় তিনি যে টাকা বৃত্তি হিসেবে পেতেন তার বড় একটা অংশ দিয়ে বই কিনে ফেলতেন। পারিবারিক অবস্থা ভালো না থাকায় অনেক সময় পড়ালেখাতে মন দিতে পারতেন না। তিনি লিখেছিলেন,

“কলেজে একমনে পড়িতে পাইতাম না, একবার পড়ার কথা মনে পড়িত, পরক্ষণেই বাটিতে ফিরিয়া যাইয়া কি খাইব, মা বুঝি এখনও কিছু খান নাই, এই সকল ভাবনা মনে উত্থিত হইয়া পড়ার ব্যাঘাত ঘটিত।”

কলেজে পড়াকালীন সময় থেকেই তিনি গণিত চর্চায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রাখেন। সে সময়ের ভারতবর্ষের স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে তিনি ছিলেন একজন যিনি স্যার আইজ্যাক নিউটনের ‘প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ পড়েছিলেন এবং চর্চা করেছিলেন। ছাত্রাবস্থায় রাধানাথ গ্যালিলিও, টাইকো ব্রাহে, জোহানেস কেপলার, শ্রীধর আচার্য এবং ভাস্করাচার্যের বৈজ্ঞানিক লেখা পড়েন। হেলেনিক গণিতবিদ থেলিস, আর্কিমিডিস এবং ইরাটোথেনিসের পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনি বক্রতলীয় ত্রিকোণমিতি অধ্যয়ন করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পর্যবেক্ষণের প্রতিও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি তার অসাধারণ মেধার সাক্ষ্য স্বরূপ বেশ কয়েকটি ক্লাসে ডাবল প্রমোশন লাভ করেন। কলেজে পড়াকালীন সময়েই তার রচিত দুটি বৃত্তের উপর স্পর্শক রেখা (Tangent) অঙ্কন করার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করেন এবং তার প্রবন্ধ Gleanings in Science (Vol. III, 1831) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

দুর্দান্ত ইংরেজি পারতেন। একবার কলকাতার টাউন হলে শেক্সপিয়রের ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’ থেকে পাঠ করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। গ্রিক এবং লাতিন ভাষাতেও দক্ষতা ছিল। সর্বস্তরে বিজ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি ইংরেজি ভাষায় রচিত বিভিন্ন বিজ্ঞানগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করার উদ্যোগ নেন। তখনো বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা শুরু হয়নি। এর কিছুকাল পর তার বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস রচনা করেন।

সব ছাত্রছাত্রীই একপর্যায়ে তাদের মানসিক উৎকর্ষ সাধন এবং মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে তাদের শিক্ষক কিংবা পথপ্রদর্শক দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাধানাথও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তার শিক্ষক ডিরোজিও দ্বারা। ডিরোজিও ছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ) অসাম্প্রদায়িকতা ও উন্মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিচর্চার অগ্রদূত। জন্মসূত্রে বাঙালি না হলেও বাঙালিদের সঙ্গে মনে প্রাণে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। একাধারে শিক্ষক, কবি, সাংবাদিক এই মানুষটি তার বৈদ্যগ্ধতা আর বৌদ্ধিক উৎকর্ষে উদ্যমী হয়ে সমাজ সংস্কারের কাজে নেমেছিলেন। যখন তিনি শিক্ষকতা শুরু করলেন, তার সান্নিধ্যে থাকা প্রাণোচ্ছল তরুণেরা তার প্রভাবে প্রভাবিত হতে শুরু করলো। তার অন্যতম ফসল ছিল আমাদের রাধানাথ শিকদার।

ডিরোজিওর ভাস্কর্য; ছবিসূত্র: vle.du.ac.in

আরেকজন মানুষ দ্বারা রাধানাথ প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন শিক্ষক মিস্টার টাইটলার। তার সম্বন্ধে বলতে গিয়ে রাধানাথ বলেছেন,

“কলেজের সকল শিক্ষক অপেক্ষা টাইটলার সাহেবের শিক্ষাপ্রণালী অতি উত্তম। তিনি প্রশ্নচ্ছলে শিক্ষা দিতেন। … শেষ তিন বৎসর আমি রস ও টাইটলার সাহেবের বক্তৃতা শ্রবণ করি। ১৮৩০ খৃঃ অব্দে টাইটলার সাহেবের নিকট গণিত শাস্ত্র শিক্ষা করি। এই বৎসর হইতে উচ্চ গণিতের শিক্ষা আরম্ভ হয়। এই বৎসর ইঁহার নিকট নিউটনের প্রিন্সিপিয়া (Newton’s Principia) গ্রন্থের প্রথম ভাগ অধ্যয়ন করি। পর বৎসর সাহেবের বক্তৃতা শ্রবণ ও বাটিতে নিজে চেষ্টা করিয়া উচ্চ গণিতের কতক কতক বিষয়ে জ্ঞান লাভ করি।”

দারিদ্র্যের কষাঘাতে যখন রাধানাথ কলেজ ছাড়লেন তখন তার একটি চাকরির বড্ড দরকার ছিল। তখন যোগ দিলেন ‘দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভে’র কলকাতা অফিসে গণণাকারী হিসেবে। প্রতি মাসে মাইনে পেতেন মাত্র তিরিশ টাকা। এ পদে নিযুক্ত হওয়া প্রথম ভারতীয় ছিলেন রাধানাথ শিকদার। সে সময় দ্য গ্রেট ট্রিগোনোমেট্রিক সার্ভেতে একটি পদের জন্য সুপারিশ করেন সার্ভেয়র জেনারেল জর্জ এভারেস্টকে। জেনারেল এভারেস্টের তখন গোলকীয় ত্রিকোণমিতি এবং বক্র জ্যামিতিতে দক্ষ একজন গণিতবিদ প্রয়োজন। কারণ এভারেস্টের মূল কাজ ছিল দক্ষিণ ভারত থেকে নেপাল পর্যন্ত যে দ্রাঘিমাংশীয় চাপ রয়েছে তার সঠিক পরিমাপ বের করা। ফলে ঐ অংশের জিওয়েড (Geoid)-এর আকার অনুমান করা যায়।

টাইটলার সাহেবের সুপারিশে তাই রাধানাথকে জর্জ এভারেস্ট লুফে নিলেন। ১৮৩২ সালের ১৫ অক্টোবর রাধানাথ কাজে নিযুক্ত হয়ে চলে গেলেন ভূপালের সেরোঞ্জ বেইজ লাইনে (Serunge Base Line)। সেখানে গিয়ে তিনি জিওডেটিক প্রসেস এর উপর বিশদ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি নিজের আগ্রহেই গণিতের বিভিন্ন বই অধ্যয়ন ও গণিত চর্চা করতে থাকেন।

গ্রেট ট্রিগনোমেট্রিক্যাল সার্ভের সময় ‘ক্যালকাটা বেসলাইন’ পরিমাপের কাজ চলছে; শিল্পী জেমস প্রিন্সেপ, ১৮৩২

ব্যারোমিটারের সাথে যুক্ত থাকা ধাতব স্কেলের তাপজনিত প্রসারণ এবং ব্যবহৃত পারদের প্রসারণজনিত পরিমাপের ত্রুটি সার্ভের পরিমাপে বিচ্যুতি ঘটায়। এই বিচ্যুতি বাতিলের জন্য যে সূত্র ইউরোপে ব্যবহৃত হতো তা রাধানাথ জানতেন না। তাই তিনি নিজের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে শূন্য ডিগ্রিতে ব্যারোমিটারের পাঠ নির্ণয়ের সূত্র উদ্ভাবন করেন। এই সূত্র সম্বলিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধটি পরে এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গল জার্নালে প্রকাশিত হয়। শুধু তা-ই নয়, সার্ভে চলাকালীন সময়ে রাধানাথের হাত ধরে প্রচলিত অনেক নিয়ম কানুনই কয়েক দশক ধরে জরিপের কাজে প্রচলিত হতে থাকে। এই ব্যাপারগুলোতে রাধানাথের পদার্থবিজ্ঞানেও অসাধারণ দক্ষতার ব্যাপারটি ফুটে ওঠে।

জর্জ এভারেস্ট; ছবিসূত্র: Alchetron

গণিত আর পদার্থবিজ্ঞানে এরকম দক্ষ ব্যক্তিকে এভারেস্ট নিংড়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাই ১৮৩৭-এ যখন রাধানাথ ডেপুটি কালেক্টর পদে যেতে চাইলেন তখন এভারেস্ট রাধানাথকে সুপারিশপত্র তো দিলেনই না বরং তাকে আটকে রাখলেন। আর ব্যবস্থা করলেন তিনি যেন ইংরেজ সরকারের অন্য কোনো দফতরে কাজ না পান। কারণ রাধানাথ শুধুমাত্র যে মেধাবী ও দক্ষতাসম্পন্ন গণিতবিদ ছিলেন তা-ই নয়, তিনি ছিলেন সুঠাম দেহ ও দৃঢ় শারীরিক গঠনের অধিকারী। তার উপর ছিলেন বেশ বলবান ও সাহসী। কথা ও কাজে মিল ছিল। মুখে যা বলতেন তা করে দেখাতেন। কাউকে ভয় পেতেন না যেমন, তেমনি কারও মুখাপেক্ষীও ছিলেন না। সার্ভের কাজে যে প্রচুর শ্রম দরকার হতো, রাধানাথের পক্ষে তা করতে তেমন সমস্যা হতো না। রাধানাথের সাহায্য নিয়ে এভারেস্ট হায়দ্রাবাদের বিদর থেকে মুসৌরির ব্যানোগ পর্যন্ত প্রায় ৮৭০ মাইল দূরত্বের গ্রেট আর্কটি জরিপ করে ফেলেন।

এই কাজটি সম্বন্ধে হেনরী লরেন্সের বলেছিলেন– “A measurement exceeding all others as much in accuracy as in length.” অন্যদিকে সি. আর. মার্কহ্যামের মতে– “One of the most stupendous works in the whole history of science.”

সার্ভেয়র জেনারেল এভারেস্টের মুখ থেকে কারো প্রশংসা খুব কমই শোনা যেত। কিন্তু রাধানাথ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। ১৮৩৮ সালে তিনি রাধানাথ সম্বন্ধে বলেছিলেন, ভারতে এ দেশের বা ইউরোপের এমন কেউ নেই যিনি রাধানাথের সঙ্গে তুলনীয়। এভারেস্ট মনে করতেন, গণিতে তার সমকক্ষ বিশ্বেই খুব কম আছে। রাধানাথের উপর এভারেস্ট এতটাই নির্ভর করতেন যে বাবার সঙ্গে দেখা করার জন্য রাধানাথকে ছুটি দিতেও তিনি চাইতেন না, বরং এভারেস্ট চাইতেন তার বাবাই এসে যেন রাধানাথের সঙ্গে দেখা করেন। এ প্রসঙ্গে ১৮৪১ সালের ৩রা জুলাই দেরাদুন থেকে রাধানাথের বাবা তিতুরামকে লেখা এভারেস্টের একটি চিঠি ছিল–

“I wish I could have persuaded you to come to Dehra Dun for not only it would have given me the greatest pleasure to show you personally how much I honour you for having such a son as Radhanath, but you yourself have, I am sure, been infinitely gratified at witnessing the high esteem in which he is held by his superiors and equals.”

১৮৪৩ সালে এভারেস্ট চাকরি থেকে অবসর নিলেন। তার স্থলে তখন নিযুক্ত হলেন কর্ণেল এন্ড্রু ওয়া (Col. Andrew Scott Waugh)। তিনিও রাধানাথের কার্যক্রমে বেজায় খুশি। আর এভারেস্টের মতোই রাধানাথকে অন্য কোথাও কাজ করতে দিতে নারাজ। ১৮৫০ সালে রাধানাথ যখন কলকাতায় বদলির দরখাস্ত করলেন, তখন তিনি তাতেও বাগড়া দিলেন। রাধানাথকে তার দফতরে রেখে দেয়ার জন্যে তিনি রাধানাথের মাইনে আরো বাড়িয়ে দিলেন। রাধানাথের কাজ সম্বন্ধে তৎকালীন আর্যদর্শন পত্রিকা লিখেছিল-

“যখন রাধানাথ এই বিভাগে প্রবিষ্ট হন তখন জরিপ করিবার অনেক প্রথা অনাবিষ্কৃত ছিল। দেশের অবস্থাও অতি অল্পই জানা ছিল। যে যে কারণে গণনা ভুল হইত সে সকলও অজ্ঞাত ছিল। সে আমলে জরিপ করিতে যে কত কষ্ট সহ্য করিতে হইত তাহা কর্ণেল এভারেষ্টের সুবৃহৎ গ্রন্থে বিশেষ করিয়া লেখা আছে। বরফ, হিম, জল, কাদা, বৃষ্টি ভোগ করিয়াও রাত্রি জাগরণ করিয়া প্রফুল্ল চিত্তে কয়জন লোক কাজ করিতে পারে!”

প্রায় বিশ বছর পর রাধানাথ যখন কলকাতায় বদলি হয়ে এলেন তখন তিনি প্রধান কম্পিউটর আর পাশাপাশি খনিতত্ত্ব বিভাগের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হিসেবে কাজ করা শুরু করলেন। এর কিছুকাল পরে কর্ণেল ওয়ার নির্দেশে রাধানাথ হিমালয়ের বরফে ঢাকা কিছু পর্বতশৃংগের উচ্চতা মাপার কাজ শুরু করলেন। তখনকার সময় নাম না দেয়া হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গগুলো সূচিত হলো রোমান সংখ্যা দিয়ে। এরকম একটা শৃঙ্গ ছিল পিক ফিফটিন (Peak XV)। রাধানাথের নেয়া প্রায় ছয়টি রিডিং প্রমাণ করলো, পিক ফিফটিনের উচ্চতা ২৯,০১৭ ফুট, যা পুরনো মাপ অনুযায়ী উচ্চতম পর্বতশৃংগ কাঞ্চনজঙ্ঘার চেয়েও বেশি উঁচু।

এই পিক ফিফটিনের রিডিং নেয়ার জন্য রাধানাথের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বায়ুমণ্ডলে আলোর প্রতিসরণের জন্য বিচ্যুতি এড়াতে প্রয়োজনীয় সংশোধন নির্ণয় করা। এ সংশোধন নির্ণয় করে রাধানাথ পিক ফিফটিনের উচ্চতা নির্ণয় করে মূল কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। এরপরই সেই দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল যে দৃশ্যের অবতারণা লেখার একদম শুরুতে করা হয়েছে। এরপর বড় সাহেব কর্ণেল ওয়া নিজে তথ্যটি যাচাই করে জনসমক্ষে স্বীকৃতি দিলেন, এই পিক ফিফটিনই হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পর্বতশৃঙ্গ। কিন্তু এর নাম কী হবে ? এভারেস্ট যখন দায়িত্বে ছিলেন তখন তিনি স্থানীয় এলাকার মানুষের মুখের নাম অনুযায়ী পর্বতশৃংখে  নাম প্রস্তাব করতেন। এভাবেই কাঞ্চনজঙ্ঘা, নন্দাদেবী ইত্যাদি নাম প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু এই পিক ফিফটিনের নাম নিয়ে ঝামেলা হলো। কারণ পিক ফিফটিন নেপাল আর তিব্বতের মাঝে অবস্থিত, দুই দেশে এর নাম দুই রকম। তখন কর্ণেল ওয়া নিজের পুরনো প্রভুকে একজন বাধ্য ভৃত্যের মতো খুশি করতে চাইলেন। তিনি রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে একটি চিঠি লিখে পিক ফিফটিনকে ‘মাউন্ট এভারেস্ট’ নামের প্রস্তাব জানালেন। যে শৃঙ্গ আবিষ্কার বা পরিমাপে এভারেস্টের কোনো ভূমিকাই ছিল না তার নাম হয়ে গেল মাউন্ট এভারেস্ট। রাধানাথ রয়ে গেলেন উপেক্ষিত।

কর্ণেল ওয়ার আঁকা এভারেস্টের ভৌগোলিক স্কেচ; ছবিসূত্র: natureinfocus.in

মানুষটিকে কোনো কালেই সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ সরকার স্বীকৃতি দিতে চায়নি। বারংবার সার্ভে থেকে সরে যেতে চাইলেও তাঁকে কর্মচারী হিসেবেই রাখা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তাকে প্রশংসা করা হয়েছে। মাইনে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তার প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করাই এর মূল কারণ।

একটি বড় উদাহরণ আমরা দেখতে পাই ১৯০৪ সালে নেচার সাময়িকীতে সিডনি জেরাল্ড বারার্ডের নিবন্ধ ‘মাউন্ট এভারেস্ট: দ্য স্টোরি অব আ লং কনট্রোভার্সি’তে। সেখানে এ প্রসঙ্গে মাত্র একটি বাক্য আছে। তিনি লিখেছেন- ১৮৫২ সাল নাগাদ কলকাতার দফতরে কর্মরত প্রধান গণক, দেরাদুনে অবস্থানরত সার্ভেয়র জেনারেল অ্যান্ড্রু ওয়াকে জানালেন, ‘আ পিক ডেজিগনেটেড ‘XV’ হ্যাড বিন ফাউন্ড টু বি হায়ার দ্যান এনি আদার হিদারটু মেজারড ইন দি ওয়ার্ল্ড’। এই প্রধান গণকটি নিশ্চিত রাধানাথ শিকদার। ওদিকে ভারতে সার্ভের ইতিহাসের আকরগ্রন্থ, রেজিনাল্ড হেনরি ফিলিমোর-এর হিস্টোরিক্যাল রেকর্ডস অব দ্য সার্ভে অব ইন্ডিয়ার পঞ্চম খণ্ডে (১৯৬৪) রাধানাথের নাম করে জানানো হচ্ছে, এভারেস্ট শৃঙ্গের উচ্চতা গণনায় তার হাত নেই, কাজ চলেছিল দেরাদুনে, কিন্তু তিনি ততদিনে কলকাতায় বদলি হয়ে এসেছেন। এই দুয়ের মধ্যে কোনটা সত্যি? আবার যে রেকর্ড নেয়া হয়েছিল সেটাও তো ওই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর হাতেই করা। সেটাকেও বা কতটুকু নির্ভর্যোগ্য বলে ধরা যায়?

জরিপের জন্য অতি প্রয়োজনীয় বই ‘ম্যানুয়াল অব সার্ভেয়িং ফর ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত হয় ১৮৫১ সালে। এর প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণে ঠিকই রাধানাথের অবদানের কিয়দংশ ছিল। কিন্তু থ্যুলিয়ার কর্তৃক তৃতীয় সংস্করণ থেকে তার অবদানটুকু রেখে স্বীকৃতি লোপাট করে দেয়া হয়। নিজেদের কায়েমী গদি টিকিয়ে রাখতে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কাজ অবশ্য সব শাসক গোষ্ঠীই করে থাকে।

আর এদিকে আমরাই বা ক’জন মনে রেখেছি তাকে? শুধু রাধানাথের গণিতের জ্ঞান ও অন্যান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে জার্মানীর ব্যাভেরিয়ান শাখার বিখ্যাত ‘ফিলোসফিক্যাস সোসাইটি’ তাকে তাদের সদস্য নির্বাচিত করে। সে সময়ের ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই প্রথম এ সম্মান লাভ করেছিলেন।

রাধানাথের স্মরণে ভারতীয় ডাকটিকিট; ছবিসূত্র: stampsathi.in

রাধানাথ ছিলেন অত্যন্ত সমাজ সচেতন মানুষ। ১৮৬২ সালে অবসর গ্রহণের পর তার বন্ধু প্যারিচাঁদ মিত্রের সাথে মিলে ‘মাসিক পত্রিকা’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন। হিন্দু ধর্মে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি বরাবরই সরব ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। ১৮৪৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেট ভ্যান্সিটার্টের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এই ম্যাজিস্ট্রেট তার বিভাগে কর্মরত চাকরিজীবীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করাতেন এবং তারা আপত্তি জানালে তাদেরকে চাবুক মারতেন। এই অমানবিক কাজের প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাধানাথ ইংরেজদের সাথে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েন। ২০০ টাকা পরে জরিমানাও দিতে হয়েছিল তাকে।

রাধানাথ সর্বদা নিজের কাজেই ডুবে থাকতেন। অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়, তার অসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা যদি কেবলমাত্র সার্ভের জট না খুলতে ব্যবহৃত হয়ে অন্য গবেষণার কাজে নিযুক্ত হতো, হয়তো বিশ্ব আরো পরিণত ও প্রজ্ঞাবান একজন গণিতবিদ পেতো। বস্তুতই রাধানাথের সমকক্ষ মেধা সারা বিশ্বে অতুলনীয় ছিল। অকৃতদার এই মানুষটির কোনো ছেলেমেয়ে ছিল না। তিনি কোনোদিন বিয়ে করেননি। কিন্তু বাচ্চাদের তিনি বড্ড ভালোবাসতেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি গঙ্গার ধারে চন্দননগরে বাড়িতে এসে উঠেন। ১৮৭০ সালের ১৭ই মে আধুনিক ভারতের এই প্রথম বৈজ্ঞানিক-গণিতবিদ মৃত্যুবরণ করেন।

তথ্যসূত্র

  1. রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, শিবনাথ শাস্ত্রী
  2. দ্বি-শতবর্ষে রাধানাথ শিকদার– আশীষ লাহিড়ি
  3. আর্য্যদর্শন পত্রিকা, কার্ত্তিক সংখ্যা, ১২৯১ বঙ্গাব্দ
  4. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সম্পাদনা – সুবোধ সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা ৬৫১
  5. The Illustrated London News, 15 August 1857
  6. Radhanath Sikdar and colonial science- A. Lahiri
  7. Radhanath Sikdar: Beyond the Peak – Ashis Lahiri
  8. Radhanath Sikder : First Scientist in Modern India – Mukhopadhyay

ফিচার ইমেজ- Radhanath Sikdar and colonial science- A. Lahiri