পিটার দ্য গ্রেট: আধুনিক রাশিয়ার রূপকার

একটি দেশ বা জাতি হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহু ঘটনাবলীর ঘনঘটা থেকে জন্ম নেয় একটি নতুন জাতি বা একটা নতুন দেশ। ঠিক তেমনি সব জাতিরই ভাগ্যাকাশে কোনো না কোনো সময় উদয় হয় এমন একজন মহামতি মানুষের, যার নেতৃত্ব বা কৃতিত্বের ছোঁয়ায় বদলে যেতে পারে গোটা জাতিরই ভাগ্য, পাল্টে যেতে পারে তাদের ইতিহাস। স্লাভ জাতির অন্যতম অংশ রুশীদের ভাগ্যে এমনই একজন মানুষ এসে জুটেছিলেন, যিনি তাদেরকে দিয়েছেন নতুন একটি দেশ, নতুন একটি পরিচয়। পূর্বের বর্বর আর অশিক্ষিত জাতির তকমা ছুঁড়ে ফেলে আধুনিক ইউরোপের সভ্য-ভব্য একটি আধুনিক জাতি হিসেবে রুশীদেরকে গড়ে তোলা সেই মানুষটির নাম সম্রাট পিটার দ্য গ্রেট।

শৈশব থেকে ক্ষমতায় আরোহণ

১৬৭২ সালের জুন মাসে মস্কো শহরে সম্রাট অ্যালেক্সিসের দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন পিওতর আলেক্সেইভিচ। তার মা ছিলেন জনৈকা তাতার রমণী। মাত্র চার বছর বয়সে পিওতরের বাবা মারা গেলে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা চলে যায় পিটারের সৎ ভাই, সম্রাট তৃতীয় ফিওদরের হাতে। দুর্বলচিত্তের সম্রাট তার পরিষদদের দ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন, অনেকটা তাদের যোগসাজশেই পিটার আর তার পরিবার একরকম কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৬৮২ সালে ফিওদর মারা গেলে পিটার আর ফিওদরের উত্তরসূরি পঞ্চম ইভানের অনুসারীদের মধ্যে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেঁধে যায়। মস্কোর অভিজাতরা ছিলেন পিটারের পক্ষে, অন্যদিকে ইভানকে সমর্থন যোগাচ্ছিলেন বিশেষ রাজকীয় বাহিনী স্ত্রেলতসি এর হর্তাকর্তারা। দুই পক্ষের মধ্যে অবশেষে একটা চুক্তি হয়, যার ফলস্বরূপ পিটার আর ইভান দুজনকেই যুগ্মভাবে রাশিয়ার জার/সম্রাট ঘোষণা করা হয়। পিটারের বয়স তখন মাত্র দশ বছর।

বালক পিটার; source: pinterest.com

যুগ্মভাবে জার ঘোষিত হলে কী হবে, দুজনেই তখন নাবালক। তাদের অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় ইভানেরই ২৫ বছর বয়স্কা বোন সোফিয়াকে। কূটচালে দফায় দফায় পিটারের পরিবারকে ইনি পর্যদুস্ত করতে থাকেন, ফলে পিটারের মা পিটারকে নিয়ে মস্কো থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলে বসবাস করতে থাকেন। সোফিয়ার কূটচাল আপাতদৃষ্টিতে সফল হয়েছে বলে মনে হলেও, আদতে কিন্তু এতে পিটারের উপকারই হয়েছিলো। সেকালে রাশিয়ার রাজপরিবারে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে আদব-কায়দা আর নানা অসাড় প্রাচীন রীতিনীতির দিকেই বেশি জোর দেওয়া হত। ফলে সম্রাটেরা অনেকটা বাইরের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্নই থাকতেন। পিটার কিন্তু গ্রামের মুক্ত পরিবেশে দিব্যি ডানপিটেমি করে বেড়াতে থাকলেন। সত্যি বলতে কী, জীবনের এই পর্যায়ে তার মধ্যে রাজ্য পরিচালনা নিয়ে বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না। বালক জার খেলাধুলা, ছবি আকাঁ, ঘোড়ায় চড়া এসব নিয়েই মেতে থাকতেন।

১৬৮৯ সালে কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে গেল। স্ত্রেলতসি বাহিনীর মধ্যে আরেক দফা বিদ্রোহ দেখা দিলে পিটার এই সুযোগে ক্ষমতা দখল করে বসলেন। ১৬৯৬ সালে ইভান মারা গেলে পুরো ক্ষমতা চলে যায় ২৪ বছরের তরুণ পিটারের হাতে। রাশিয়ার ভাগ্যচক্রও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে।

সাম্রাজ্য বিস্তার

পিটার যখন ক্ষমতায় বসেন, তখন রাশিয়া বিপুল এক দেশ হলেও কৃষ্ণ সাগর, বাল্টিক সাগর বা কাস্পিয়ান সাগরের সাথে তার কোনো সংযোগ ছিল না। সে যুগে নৌপথে রমরমা বাণিজ্য হত, কাজেই সম্রাট পিটারের প্রথম উদ্দেশ্যই হলো, যেভাবে হোক সমুদ্র উপকূলের সাথে একটা সংযোগ স্থাপন করা। ক্ষমতায় বসেই তিনি দক্ষিণের আজভ অঞ্চল দখল করে নিলেন তাতার খানদের হাত থেকে, তারপরে হাত দিলেন এক নতুন নৌবাহিনী গড়ে তোলার কাজে। শুধু তা-ই নয়, ছদ্মবেশে কাজ শিখলেন ব্রিটিশ আর ডাচ নৌবাহিনীর কারখানায়। আর দেশে এসে সেসব জ্ঞান প্রয়োগ করলেন নিজস্ব এক আধুনিক নৌবাহিনী গড়ে তোলার কাজে।

যুদ্ধসাজে রুশ সম্রাট পিটার; source: royalcollection.org.uk

দক্ষিণের যুদ্ধ বিগ্রহ সমাপ্ত করে পিটার নজর ফেরালেন উত্তরের দিকে। সে আমলে সুইডেন খুব শক্তিশালী দেশ ছিল। আজকের বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো ছিলো তার দখলে। পিটার ডেনমার্ক, নরওয়ে আর জার্মান রাষ্ট্র স্যাক্সনির সাথে মিলে ১৭০০ সালে আক্রমণ করে বসলেন সুইডেনকে। টানা ২১ বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে রুশী বাহিনী অনেকগুলো জয়লাভ করে, বিশেষ করে গাংগুটের নৌ যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সফলতা দেখায়। দীর্ঘ এই যুদ্ধ পিটারকে নেতা হিসেবে আরো পাকাপোক্ত করে তোলে। কখনো জাহাজের ডেকে নৌ অফিসারের বেশে, কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে পিটার তৎকালীন পরাশক্তি সুইডেনকে পদে পদে পর্যুদস্ত করতে থাকেন। এই সময়েই সুযোগ বুঝে পুরনো প্রতিপক্ষ তুর্কীরা আজভ অঞ্চল কেড়ে নেয়, উত্তরের যুদ্ধ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত পিটার তখন সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে পারেননি।

যুদ্ধক্ষেত্রে পিটার দ্য গ্রেট; source: pinterest.com

১৭২২ সালে যুদ্ধংদেহী পিটারের নজর পড়লো কাস্পিয়ান সাগরের আশেপাশের পারস্য সম্রাট শাসিত অঞ্চলগুলোর ওপরে। দুর্বল পারস্যের পক্ষে পিটারের বিরাট সেনাবাহিনীকে ঠেকানো সম্ভব হয়নি। শীঘ্রই কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলো এলো পিটারের দখলে।

সংস্কার কাজ

পিটারের শাসনামল পুরোটাই যে যুদ্ধ-বিগ্রহে ভরপুর, তা নয়। রাশিয়ার সমাজেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছিলেন এই আধুনিক সম্রাট। সেকালে রাশিয়ার লোকজন খুব কুঁড়ে ছিল, দেশ ভ্রমণ বা লেখাপড়া শিখতেও তাদের ছিল ভীষণ অনীহা। গোটা সমাজটা ভর্তি ছিল নানা কুসংস্কারে আর এসব অশিক্ষিত লোকের ওপরে ছড়ি ঘোরাতেন ক্ষমতালোভী পাদ্রীর দল।

পিটার দেখলেন, রাশিয়াকে ইউরোপের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সমাজের খোলনলচে পাল্টে ফেলতে হবে। নৌ বাণিজ্যের সুবিধার্থে তিনি ১৭০৩ সালে গড়ে তোলেন সেন্ট পিটার্সবার্গ নামের বিশাল এক শহর, পরে রাজধানীও মস্কো থেকে সেখানে সরিয়ে আনেন। তিনি অর্থনীতি আর প্রশাসনে ব্যাপক সংস্কার আনলেন, বণিকদের দিলেন বাড়তি সুবিধা, শহরগুলোতে গড়ে তুললেন মিউনিসিপ্যালিটি, গোটা রাশিয়াকে ৫০টি প্রদেশে ভাগ করার মাধ্যমে শাসনকাজেও আনলেন ব্যাপক সংস্কার। এসব সংস্কারের ফলে সাম্রাজ্য পরিচালনা যেমন সহজ হয়ে এলো, তেমনি কেন্দ্রের হাতে ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লো।

পিটার স্থাপন করেছিলেন রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ; source: saint-petersburg.com

ইউরোপ সফর করে পিটার বুঝেছিলেন, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা বাড়াতে না পারলে দেশকে শক্তিশালী করা যাবে না। বিপুল অর্থ ঢাললেন তিনি এসব ক্ষেত্রে। ধাতুবিদ্যায় তো রাশিয়া ইউরোপের আর সকল দেশের মধ্যে শীর্ষস্থানই দখল করে বসে এই সময়ে। দেশময় গড়ে ওঠে অসংখ্য কলকারখানা। সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করে তোলা হলো। পিটারের শাসনামলেই একটি শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলে রাশিয়া। রাশিয়ার প্রথম খবরের কাগজ ‘ভেদোমস্তি’, প্রথম বিজ্ঞান একাডেমী গড়ে ওঠে এ সময়ে। পাদ্রীদের হাত থেকে স্কুলগুলো কেড়ে নিয়ে নিরপেক্ষ ধর্মশিক্ষা চালু করা হলো। সেই সাথে দলে দলে রুশী ছাত্রদেরকে পড়তে পাঠানো হলো অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে। পিটার আধুনিক পোশাক-আশাক আর ইউরোপীয় রীতিনীতির প্রচলন করেন দরবারে। নারীদেরকেও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত করতেন তিনি। তবে এর ক্ষতিকর প্রয়োগও যে করেননি তা নয়, যেমন- এমন একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে রাজি হননি বলে নিজের স্ত্রীকে তিনি বহুদিন একটা ছোট ঘরে আটকে রেখেছিলেন। মানুষ যাতে দাড়ি না রাখতে পারে, সেজন্য দাড়ির ওপরেও মোটা অংকের ট্যাক্স বসিয়েছিলেন পিটার।

অশ্বপৃষ্ঠে পিটার দ্য গ্রেট; source:saint-petersburg.com

মৃত্যু

পিটারের মৃত্যু নিয়ে মতভেদ আছে ইতিহাসবিদদের মাঝে। বলা হয়, ১৭২৫ সালে ফিনিশ উপসাগরের কাছে একদল সৈন্যকে সমুদ্রে ডুবে দেখে যেতে দেখে সম্রাট পিটার পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। বরফ শীতল সেই পানির প্রভাবে পরে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে মারা যান তিনি। অনেকে অবশ্য এই কাহিনী বিশ্বাস করেন না। সে যা-ই হোক, ১৭২৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা আধুনিক রুশী সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার কোনো পুত্রসন্তান জীবিত না থাকায় দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যাথরিন রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন।

পিটার দ্য গ্রেটের সমাধি; source: saint-petersburg.com

পিটার দ্য গ্রেটের সব সংস্কারই যে সুফল বয়ে নিয়ে এসেছিল, তা নয়। পিটার ছিলেন ভীষণ একগুঁয়ে, ভয়ানক জেদী আর প্রয়োজনে নিষ্ঠুর। তার সাধের সেন্ট পিটার্সবার্গ গড়তে কৃষকদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে কাজে লাগিয়েছিলেন, তাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ, নিজের ছেলেকে নির্যাতন করে হত্যা করিয়েছিলেন অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে। পিটারের অন্যতম ক্ষমতার খুঁটি ছিল দেশের ধনী লোক আর জমিদারেরা, ফলে কৃষকদের ওপর নেমে আসে তুমুল অত্যাচারের খড়গ। প্রায় সাড়ে ছ’ফুট লম্বা রুশ সম্রাটের ক্রোধ প্রশমিত করার ক্ষমতা ছিল কেবল তার স্ত্রী ক্যাথরিনের। তুখোড় কুটনীতিবিদ আর ইস্পাত কঠিন মানসিকতার পিটার স্বেচ্ছাচারী হলেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তার শাসনামলেই রাশিয়া ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

ফিচার ইমেজ- Royal Museums Greenwich

Related Articles