ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং: চিকিৎসাবিদ্যায় সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী

রাত ২টা; ৩১ অক্টোবর, ১৯২০। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর ন্যায় আজ ব্যান্টিং গভীর ঘুমে তলিয়ে নেই। তবে ঘুম যে ধরছে না তা বলাও ভুল হবে। আধো আধো ঘুমের ঘোরে দিব্যি চিন্তা করে যাচ্ছেন তিনি। সন্ধ্যার সময় পড়া এক গবেষণাপত্র তার ভাবনার জগৎ অনেকাংশেই নাড়া দিতে পেরেছে। অবশেষে আড়মোড়া ভেঙে উঠে পড়লেন ব্যান্টিং। খাতা-কলম নিয়ে লিখে ফেললেন তার ভাবনার সারাংশ

Diabetus [sic]. Ligate pancreatic ducts of dog. Keep dogs alive till acini degenerate leaving islets. Try to isolate the internal secretion of these and relieve glycosurea [sic].

ডায়াবেটিসের প্রতিকার নিয়ে ভাবছিলেন তিনি। কীভাবে কুকুরের প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় থেকে কিছু একটা রস বের করে এ রোগের উপশম করা যায় তাই ভাবছিলেন তিনি। কে জানত ২৫ শব্দের এই হাইপোথিসিস একদিন বদলে দেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাস, জীবন বাঁচাবে কোটি কোটি মানুষের, ব্যান্টিংকে এনে দেবে চিকিৎসায় সর্বকনিষ্ঠ নোবেলজয়ীর মর্যাদা।

শুরুর জীবন

১৪ নভেম্বর, ১৮৯১। কানাডার অন্টারিওর অ্যালিস্টনে উইলিয়াম থমসন ব্যান্টিং আর মার্গারেট গ্রান্টের কোল আলোকিত করে জন্ম হলো এক শিশুর। ফ্রেডেরিক গ্রান্ট ব্যান্টিং। বাবা-মার পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সে। সহজ, সরল, ধর্মপ্রাণ বাবার চাওয়া তার ছেলে গির্জার সাথে যুক্ত হোক। স্কুলজীবনে পড়ুয়া ছিলেন ব্যান্টিং, ভালো লাগত খামারে প্রাণীর সংস্পর্শ। ছোটবেলায় এক বন্ধুর ডায়াবেটিসে মারা যাওয়ার ঘটনা খুব নাড়া দেয় তাকে। এছাড়া একদিন ছাদ থেকে পড়ে আহত দুই ব্যক্তির ভাঙা হাড় আর ক্ষতের চিকিৎসা করার দৃশ্য খুব মনে ধরে ব্যান্টিংয়ের। ঠিক করেন- ডাক্তার হতে হবে তাকে। কিন্তু গড়পড়তা মানের ছাত্র ব্যান্টিং স্কুলজীবনে স্যারদের কাছে কখনোই ভবিষ্যতে ভালো কিছু করে নাম করবে এমন কেউ ছিলেন না। ব্যান্টিং প্রথমে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনারেল আর্টস প্রোগ্রামে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে ১৯১২ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিভাগে পুনরায় ভর্তি হন। 

ব্যান্টিং
ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং; Image Source: cosmosmagazine.com/wikimedia commons

যুদ্ধের দামামা এবং সাহসী ব্যান্টিং

১৯১৪ সাল; প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। আর দশজন কানাডার নাগরিকের ন্যায় ব্যান্টিংও চাইলেন যুদ্ধে যোগ দিতে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াল তার চোখের সমস্যা। অবশেষে ১৯১৫ সালে মেডিকেল ট্রেনিং শেষ করে যোগ দেন কানাডিয়ান আর্মি মেডিকেল কর্পসে। ১৯১৬ সালের দিকে তিনি ব্যাচেলর অব মেডিসিন ডিগ্রি শেষ করেন। ১৯১৮ সালে ফ্রান্সে ক্যাম্ব্রাই যুদ্ধে অসম সাহসীকতার পরিচয় দেন ব্যান্টিং। নিজে আহত হয়েও সেবা-শুশ্রুষা চালিয়ে যান সহকর্মী সৈন্যদের। যুদ্ধে সাহসিকতার দরুন তিনি ১৯১৯ সালে লাভ করেন ‘মিলিটারি ক্রস‘ পুরস্কার।

ইনসুলিন আবিষ্কার

যুদ্ধ থেকে ফিরে ব্যান্টিং ইন্টার্নশিপ শেষ করার জন্য হসপিটাল ফর সিক চিলড্রেনে যোগ দেন। পরবর্তীতে টরন্টোর কোনো হাসপাতালে ভালো পদে কাজ না পেয়ে ব্যক্তিগতভাবে চেম্বারে প্র‍্যাক্টিস শুরু করার কথা ভাবেন তিনি। অন্টারিওর লন্ডনের অ্যাডিলেড স্ট্রিটে বাড়ি ভাড়া নিয়ে শুরু করেন প্রাইভেট প্র‍্যাক্টিস। শুরুতে চেম্বারে ভালো সুযোগ করতে না পেরে পাশাপাশি ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওলজির ডেমন্সট্রেটর হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই একদিনের লেকচারের বিষয়বস্তু হিসেবে ছিল মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয়।

লেকচারের ভালো প্রস্তুতির জন্য এ বিষয়ে অনেক পড়াশোনা শুরু করেন ব্যান্টিং। আগে থেকেই এটা  প্রমাণিত যে অগ্ন্যাশয় থেকে ক্ষরিত রস বিভিন্ন খাদ্য হজমে সহায়তা করে। অগ্ন্যাশয় প্রধানত অন্তঃক্ষরা ও বহিঃক্ষরা দুই ধরনের অংশ নিয়ে গঠিত। অন্তঃক্ষরা অংশের নাম আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স। ১৯১০ সালে বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড শার্পি-শেফার দেখান যে এই আইলেটস অফ ল্যঙ্গারহ্যান্স থেকে একধরনের রস নিঃসৃত হয় যা রক্তে শর্করাজাতীয় খাদ্য তথা গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তিনি এর নাম দেন ‘ইনসুলিন’।

প্যানক্রিয়াস
প্যানক্রিয়াস বা অগ্ন্যাশয় ও আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স (pancreatic islet) ; Image Source: Wikimedia Commons

কিন্তু এই প্যানক্রিয়াসেই আবার ট্রিপসিন নামের একধরনের এনজাইম তৈরি হয় যা ইনসুলিনকে মুহূর্তেই ভেঙে দেয়। আর এই ইনসুলিনের অভাবেই রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। রক্তে গ্লুকোজের এই অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়াকেই আমরা বলি ডায়াবেটিস। এদিকে আবার ১৮৯০ সালেই ভন মেরিং আর মিনকোস্কি দেখান যে কুকুরের প্যানক্রিয়াস কেটে ফেললেও তার ডায়াবেটিস হতে পারে।

সারা সন্ধ্যা পড়াশোনা চালিয়ে যান ব্যান্টিং। হঠাৎ তার হাতে এসে পড়ে মোসেস ব্যারনের একটি গবেষণাপত্র, যেখানে ব্যারন একজন রোগীর ময়নাতদন্ত রিপোর্টে দেখান যে, রোগীর অগ্ন্যাশয়ের নালিগুলো পাথর জমে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অগ্ন্যাশয়ের বহিঃক্ষরা অংশের কোষগুলো সব নষ্ট হয়ে গেলেও আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স বহাল তবিয়তেই রয়ে যায়। ব্যান্টিং খুব কৌতূহলী হয়ে পড়েন এটা জানতে পেরে। খুলে দেন তার ভাবনার সব জানালা-দরজা। ভাবতে ভাবতে গভীর রাত হয়ে গেলেও ঘুম নেই তেমনটি তার চোখে। একটি একটি করে মেলাতে শুরু করেন জটপাকানো ধাঁধাগুলো।

অবশেষে ঘুমের ঘোরেই উঠে পড়েন বিছানা থেকে। পেয়ে যান সেই ইউরেকা মুহূর্ত! খাতায় লিখে রাখেন সেই ২৫ শব্দের হাইপোথিসিস, যার সহজ অর্থ দাঁড়ায় এরকম: অগ্ন্যাশয়ের নালিগুলোতে পাথরের বাধার পরেও যখন আইলেটস অব ল্যাঙ্গারহ্যান্স ঠিক থাকছে, তাহলে দেহের গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রনকারী ইনসুলিন উৎপাদনও চলছে। আবার অগ্ন্যাশয়ের অন্য কোষগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ট্রিপসিন উৎপন্ন হয়ে ইনসুলিনকে ভেঙে দিতে পারছে না। ফলে কোনো কুকুরের দেহে অগ্ন্যাশয়ের নালিতে বাধার সৃষ্টি করে কিছুক্ষণ বাঁচিয়ে রেখে ইনসুলিন সহজেই সংগ্রহ করা যায়। এই ইনসুলিন পরে ডায়াবেটিস রোগীদের সরবরাহ করে সহজেই সুস্থ করে তোলা যাবে তাদের।

Banting with his dog in laboratory
ব্যান্টিং গবেষণাগারে কুকুরের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন পৃথক করতে সক্ষম হন; Image Source: Wikimedia Commons

ভাবনাটা অনেক সাদামাটা মনে হলেও এর বাস্তবায়ন ছিল কঠিন। তখন তিনি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শর্করা বিপাকে অভিজ্ঞ জন ম্যাক্লিওডের শরণাপন্ন হন। ব্যান্টিং তার কাছে একজন গবেষণা সহকারী, ১০টি কুকুর এবং গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ সরবরাহের অনুরোধ জানান। ব্যান্টিং এর সফলতা নিয়ে দ্বিধা থাকলেও ম্যাক্লিওড যাবতীয় ব্যবস্থা করে দেন। মেডিকেল শিক্ষার্থী চার্লস বেস্টকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন ব্যান্টিং।

ব্যান্টিংয়ের হাইপোথিসিস অনুযায়ী শুরু হয় কাজ। অবশেষে সফলতার মুখ দেখেন ব্যান্টিং-বেস্ট। কুকুরের অগ্ন্যাশয় থেকে সফলতার সাথে ইনসুলিন পৃথক করতে সক্ষম হন তারা। প্রাথমিকভাবে এই ইনসুলিন রোগাক্রান্ত অন্য কুকুরের উপর প্রয়োগে যথেষ্ট ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ব্যান্টিং দেখান যে, গরুর অগ্ন্যাশয় থেকে পৃথক করা ইনসুলিনও একই কাজ করে।

ডায়াবেটিসে ভোগা ১৪ বছর বয়সী থমসনের উপর প্রয়োগ করা হয় এই ইনসুলিন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে অভাবনীয় উন্নতি দেখা যায় থমসনের। ইনসুলিনের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। কোটি কোটি ডায়াবেটিস রোগী নির্ঘাত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরেন। পরবর্তীতে জে. বি. কলিপ সংগৃহীত ইনসুলিন বিশুদ্ধকরণে বিস্তর ভূমিকা রাখেন।

ব্যান্টিং, বেস্ট ও কলিপ নামমাত্র ১ ডলার মূল্যে ইনসুলিনের প্যাটেন্ট টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে বিক্রি করে দেন। ইনসুলিনকে ডায়াবেটিসের সার্বজনীন মহৌষধ হিসেবে পুরো বিশ্বেই ছড়িয়ে দিতে চান তারা।

ব্যান্টিং যখন শিল্পী

ব্যান্টিং ছবি আঁকতে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। একটানা গবেষণা এবং প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদের দরুন বিষণ্নতা আর একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে তার এই শিল্পীসত্ত্বা। ১৯২৭ সালে তার সাথে পরিচয় ঘটে কানাডার ‘গ্রুপ অব সেভেন’ পেইন্টারদের একজন জে. ওয়াই. জ্যাকসনের। একসঙ্গে দুজনে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে কানাডার প্রকৃতি উপভোগ করেন, এবং এর স্বাক্ষর ফুটিয়ে তোলেন তুলির নরম পরশে। 

স্বীকৃতি ও সম্মাননা

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আবিষ্কার ‘ইনসুলিন’ আবিষ্কারে ভূমিকা রাখায় ১৯২৩ সালে চিকিৎসাবিদ্যায় জন ম্যাক্লিওডের সাথে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান ফ্রেডেরিক ব্যান্টিং। ততদিনে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে মাত্র ৩২ বছর বয়সে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়ে ইতিহাস গড়ে ফেলেন ব্যান্টিং, যা আজও বিদ্যমান। যদিও তার এ পুরস্কারপ্রাপ্তিতে একটু হলেও বিষণ্নতার ছাপ ছিল সহকর্মী চার্লস বেস্টকে পুরস্কারের জন্য বিবেচনা না করায়। ব্যান্টিং তার পুরস্কার ভাগাভাগি করে নেন সহকর্মী বেস্টের সাথে। উপযুক্ত মূল্যায়ন করেন গবেষণায় সহকর্মীর সহযোগিতার।

পরবর্তীতে ১৯৩৪ সালে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। তার জন্মদিন ১৪ নভেম্বর সারা বিশ্বে একযোগে পালিত হয় ‘বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবস’ হিসেবে।

ফ্লেম অব হোপ

ফ্লেম অব হোপ
১৯৮৯ সালে রানী এলিজাবেথ প্রজ্জ্বলিত করেন ‘ফ্লেম অব হোপ’; Image Source: travel.sygic.com

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্যান্টিং আবার কানাডার সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪১ সালে এক আকস্মিক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ব্যান্টিংয়ের জীবনপ্রদীপ সেদিন নিভে গেলেও তার অ্যাডিলেড স্ট্রিটের বাড়ি-সংলগ্ন স্থানে আজও তার সম্মানে জ্বলছে ‘ফ্লেম অব হোপ‘। পৃথিবীতে সর্বশেষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হওয়ার পরই নেভানো হবে তা! 

Related Articles