একজন মানুষকে চেনা আর তাকে জানার মধ্যে ব্যবধান ঠিক কতটা সেটা বুঝতে কখনো কখনো আমাদের পুরো জীবনটাই লেগে যায়। বিস্তর এই ব্যবধানটা পেরিয়ে ঠিক আসল মানুষটার কাছে পৌঁছানো অতটা সহজ নয় যতটা আমরা ভাবি। এমনটা প্রায়ই হয় একটা মানুষ বারবার আমাদের সামনে আসলেও তার সাথে আমাদের শুধু পরিচয়ই থেকে যায়, তাকে জানা হয়ে ওঠে না কখনো।

কাজী নজরুল ইসলাম এমনি একটা নাম আমাদের কাছে। একদম ছোটবেলায় এই নামটার সাথে আমাদের পরিচয় হয়, সে পরিচয় থাকে জীবনের শেষ পর্যন্ত। আমাদের দেশের জাতীয় কবি তিনি। তবু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে অধিকাংশ সময়ই নজরুলকে জানা আমাদের আটকে থাকে পাঠ্য বইয়ের নির্দিষ্ট কিছু লাইনে। অথচ এদেশের মানুষ হিসেবে নজরুলকে আমাদের জানা উচিত আরও অনেক বেশি।

আমাদের ক্ষুদ্র প্রয়াসে তাই আজ আমরা পাঠকদের জন্য এনেছি নজরুলের জীবনের অজানা কিছু অংশ। নজরুলের জীবনের প্রথম দিককার সচরাচর না জানা গল্পগুলোই প্রাধান্য পাবে এই অংশে।

প্রেমের কবি- বিদ্রোহের কবি, কাজী নজরুল ইসলাম : suggest-keywords.com

নজরুলের মা জাহেদা খাতুন ছিলেন তাঁর বাবা কাজী ফকির আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী। সাধারণত মনে করা হয় দারিদ্র্যের প্রবল কষাঘাতে তার শৈশব পার হয় বলে তাঁর নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। কিন্তু আসলে মা জাহেদা খাতুনের চার পুত্রের অকাল মৃত্যুর পরে নজরুলের জন্ম হয় বলে শিশুকালেই তাঁর নাম রাখা হয় দুখু মিয়া। ছেলেবেলায় তিনি ‘তারা ক্ষ্যাপা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। পরে ‘নুরু’ নামও তিনি ব্যবহার করেছেন।

সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের শিক্ষক এবং যুগান্তর দলের গোপন বিপ্লবী নিবারণ চন্দ্র ঘটক কিশোর নজরুলের মধ্যে স্বাধীনতা এবং বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার সঞ্চার করেছিলেন। বিপ্লবী কর্মতৎপতার জন্য এক সময় এই শিক্ষকের বিচার হয়। আর বিপ্লবের সাথে যোগাযোগ আছে সন্দেহে দশম শ্রেণীর সেরা ছাত্র নজরুলের মাসিক ৫ টাকা হারে ছাত্রবৃত্তি কেড়ে নেওয়া হয়, যদিও পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বৃত্তি পুনরায় অব্যাহত রাখা হয়।

করাচি সেনানিবাসে কঠোর  শৃংখলার মধ্যে থেকেও তরুণ নজরুলের সাহিত্য-সংগীত অনুরাগী মন শুকিয়ে যায়নি, বরং অদম্য আগ্রহে পথ খুঁজে নিয়েছে। প্রাণবন্ত  হৈ-হুল্লোড়ে আসর জমাতেন বলে সেনানিবাসে তিনি  “হৈ হৈ কাজী” নামে পরিচিত ছিলেন।

১৯১৯ সালের ২৮ জুন ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ৪৯ নং বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দেওয়া শুরু হলে নজরুল স্থায়ীভাবে করাচী ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় এসে তিনি একটি মেসে ওঠেন। কিন্তু  তিনি যে মুসলমান একথা জানতে পেরে মেসের  চাকর তাঁর এঁটো বাসন ধুতে আপত্তি জানায়। এমতাবস্থায় দুইদিনের মাথায় তিনি মেস ছাড়তে বাধ্য হন। অবশ্য মেস ছাড়ার পরে তিনি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য  সমিতি’র অফিসের একটি কক্ষে মুজফফর আহমেদের সাথে থাকা শুরু করেন। এই ব্যক্তি নজরুলের পরবর্তী ব্যক্তি জীবনে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এই একই জায়গায় নজরুল আসার আগে থাকতেন বাংলা ভাষার আরেকজন প্রবাদপুরুষ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বাংলার অন্যতম প্রবাদপুরুষ : azora4life.blogspot.com

বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে থাকার ব্যবস্থা হওয়ার দুইদিন পর জিনিসপত্র রেখে কবি চুরুলিয়া গ্রামের বাড়িতে যান। যতদূর জানা যায় এই সময় মায়ের দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের কারণে মায়ের সাথে মান-অভিমানের কোনো ঘটনা ঘটে। এরপর মা জীবিত থাকা পর্যন্ত নজরুল আর চুরুলিয়া যাননি, এমনকি যাননি মায়ের মৃত্যু সংবাদ শোনার পরও।

এরপর ১৯২১ সালের ৫ মে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে সৈয়দা খাতুন নামের এক সম্ভ্রান্ত তরুণীর সাথে তরুণ নজরুলের পরিচয় হয়। সৈয়দা খাতুন ওই অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেছিলেন। পরে তাকে আরো ভালোভাবে জানার সুযোগ হলে নজরুল তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এই আকর্ষণ তাদের বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যায়, যদিও সে বিয়ে সফল হয়নি। পরবর্তীতে নাজরুলের দেওয়া ‘নার্গিস’ নামেই সৈয়দা খাতুন সবার কাছে পরিচিত হন।

১৭ জুন, ১৯২১ সাল শুক্রবার গভীর রাতে নজরুলের সাথে নার্গিসের আকদ সম্পন্ন হয়। কিন্তু অত্যন্ত অভিমানী নজরুল একটি রাতও তার নতুন বিবাহিত স্ত্রীর সাথে পার করেননি। কনের মামা আলী আকবর খান কাবিননামায় জবরদস্তিমূলক শর্ত আরোপ করেন যে নজরুল নার্গিসকে দৌলতপুর ছেড়ে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারবেন না। অন্যায় এই বৈবাহিক শর্তে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে নজরুল কনেকে গ্রহন না করে ভোর হবার আগেই চিরদিনের জন্যে দৌলতপুর ছেড়ে আসেন এবং পায়ে হেঁটে কুমিল্লায় পৌঁছান। বিয়ে ভেঙ্গে গেলেও নজরুল কখনো এর জন্য নার্গিসকে দায়ী করেননি।

নার্গিসের সাথে বিয়ের রাতেই নজরুল অভিমানে ক্লান্ত মন নিয়ে কর্দমাক্ত পথে দশ-এগারো মাইল হেঁটে কুমিল্লা শহরের কান্দিরপাড়ে বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের বাড়িতে আসেন। এখানে বীরেন্দ্র সেনগুপ্তের জেঠাইমা গিরিবালা দেবীর কন্যা কিশোরী  আশালতার (ডাক নাম- দুলি/দোলন এবং পরে নজরুলের দেওয়া নাম  প্রমীলা) প্রতি নজরুল অনুরক্ত  হয়ে পড়েন। হিন্দু মেয়ের সাথে মুসলমান যুবকের এই সম্পর্ক কুমিল্লার কিছু গোঁড়া হিন্দু এবং রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ মেনে নেয়নি, তাই নজরুলকে বারবার কুমিল্লা ত্যাগ করতে হয়েছে।

অবশ্য আরো জানা যায় কবির জীবনের একটা পর্যায়ে নাকি জাহানারা চৌধুরী নামক এক অপূর্ব সুন্দরী মহিলার সাথেও তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিলো। জাহানারা চৌধুরী রবি ঠাকুরের আশির্বাদ নিয়ে বর্ষবাণী বলে একটা বার্ষিকী কয়েক বছর চালিয়েছিলেন। জাহানারা ও নজরুলের  মধ্যে পত্র  বিনিময় হত। কবির অনেক পত্র ও কবিতা এই মহিলার কাছে ছিলো। তবু  নজরুলের জীবন প্রমীলা ছাড়া শুধু অসম্পূর্ণই না, অসম্ভবও ছিলো।

সঙ্গীত সাধনায় মগ্ন নজরুল : daily-sun.com

‘যুগবাণী’র জন্য রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধ লেখা ও প্রচারণার অভিযোগে কবি গ্রেফতার হন ১৯২৩ সালে । হুগলীর জেলে নজরুল ৩৯ দিন কতৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, অবমাননামূলক আচরণ ও নির্যাতনের প্রতিবাদে আরো ২১ জন সহবন্দির সাথে অনশন ধর্মঘট পালন করেন। এসময় তার শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি হওয়ায় তা তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের গভীর চিন্তার মধ্যে ফেলে। এ সময় কবিগুরু কালিম্পং থেকে নজরুলকে অনশন ভাঙ্গার অনুরোধ করে টেলিগ্রাম করেছিলেন, “Give up hunger strike, our literature claims you.” যদিও ব্রিটিশ সরকার সে বার্তা নজরুলের কাছে পৌঁছুতে দেয়নি ।

কবিগুরুর অপার স্নেহভাজন ছিলেন নজরুল : quora.com

১৯২৪ সালে প্রমীলা সেনগুপ্তের সাথে নজরুলের বিয়ে হয় কলকাতায়। প্রমীলার বয়স ১৮ না হওয়ায় এবং নজরুল প্রমীলার ধর্ম পরিবর্তনে রাজী না থাকায় ‘আহলুল কিতাব’ মতে তাদের বিয়ে হয়। কনের মা ছাড়া কনেপক্ষের আর কেউই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন না। নজরুলেরও হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধুই উপস্থিত ছিলেন সেখানে। এমনকি গোলযোগের আশংকায় বিয়ের সময়ও আগে থেকে প্রকাশ করা হয়নি। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে  দুই ধর্মেরই মানুষজন মারমুখো হয়ে উঠলে নতুন দম্পতিকে কলকাতা ছেড়ে হুগলি আসতে হয়। হুগলিতে তাঁরা যদিও তরুণ বিপ্লবীদের সমর্থন পান, কিন্তু মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করায় সেখানে কোনো হিন্দু বাড়িওয়ালা তাদের বাড়ি ভাড়া দিতে চায়নি।

প্রমীলা দেবী, নজরুলের হৃদয়াকাশের চাঁদ : aponvubon.com

যে বিয়ের জন্য এতো প্রতিকূলতা  পেরুতে হয়েছে কেমন ছিলো প্রমীলা-নজরুলের সেই বিবাহিত জীবন? তাঁদের কারোর জন্যই  জীবনের চলার পথ সহজ ছিলো না, কিন্তু তাদের পারস্পারিক  ভালোবাসা আর বোঝাপড়ার অভাব ঘটেনি কখনো। ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কাজ করার সময় কবি ধীরে ধীরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করেন। তিনি ক্রমশ স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলতে লাগলেন এবং মারধোর করতে লাগলেন । তিনি অনবরত কাগজ ছিঁড়ে চলতেন, চশমা সহ্য করতে পারতেন না এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেজাজ করতেন।

কবিপত্নী আরো কয়েক বছর আগে থেকেই প্যারালাইসিস এ আক্রান্ত হয়ে সম্পুর্ণ বিছানাগত ছিলেন। (তখন উমা নামের  একটি অল্প বয়সী মেয়ে সব সময় কবিপত্নীকে দেখাশোনা করতেন, এই উমাকেই পরে কবির বড়ো ছেলে কাজী সব্যসাচী বিয়ে করেন।) প্রমীলা নজরুল এই অবস্থাতেও  মাঝে মাঝে কবিকে নিজের পাশে বসিয়ে খাইয়ে দিতেন। মাহমুদ নুরুল হুদার লেখা নজরুলের সাথে তার ব্যক্তি জীবনের স্মৃতি নিয়ে বই “চিরঞ্জীব নজরুল” এ নজরুল-প্রমীলার এই অপূর্ব সম্পর্কের কথা বলতে যেয়ে লেখক  বলেন- “লক্ষ্য করেছি কবি এই সময় অন্য কাউকে সহ্য করতে না পারলেও প্রমীলার ইঙ্গিত মতো চলতেন।  জানিনা স্মরণশক্তি লোপ পাওয়া সত্ত্বেও কবি প্রমীলাকে তাঁর প্রিয়তমা পত্নী হিসেবে চিনতে পারতেন কি না।

স্ত্রী ও পুত্রদ্বয়ের সাথে কাজী নজরুল : fcmag.ru

অজানা নজরুলের গল্প আজ এ পর্যন্তই থাক। কবির জীবন গল্পের শেষ দিকের দুঃখভারাক্রান্ত কথা শুনবো আমরা খুব শীঘ্রই অন্য কোনোদিন এই লেখারই শেষ অংশে।

তথ্যসূত্র

১) নজরুল তারিখ অভিধান- মাহবুবুল হক

২) চিরঞ্জীব নজরুল- মুহাম্মদ নুরুল হুদা

৩) en.wikipedia.org/wiki/Kazi_Nazrul_Islam