সুজান বি. অ্যান্থনি: নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের অগ্রপথিক

বর্তমানে নারীরা ভোটাধিকার পাবে সেটি খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ব্যাপারটি কখনোই এতটা সহজ ছিল না। ভোটাধিকার পেতে দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করতে হয়েছে নারীকে। হয়তো আপনি ভাবছেন, কোন ক্ষেত্রেই বা খুব কম লড়াইয়ে নিজের অধিকার অর্জন করতে পেরেছে নারীরা? না, এমন ক্ষেত্রের সংখ্যা হয়তো খুব হাতেগোনা। তবে একটি দেশের নাগরিক হিসেবে নারীর সম্মান এবং সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অন্যতম উপায় হচ্ছে ভোটাধিকার। তাই অন্যসব ক্ষেত্রেও চাইতেও নিজের অস্তিত্ব নিয়ে বাঁচতে ভোট প্রদানের অধিকার পাওয়াটা ছিল নারীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নিজেদের ভোটাধিকার আদায় করতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে নারীকে। তবে এই ক্ষেত্রে সবার অগ্রপথিক হয়ে যিনি কাজ করেছেন তিনি হলেন সুজান বি. অ্যান্থনি। চলুন আজ আপনাদের জানাবো এই মহান নারীর জীবনী এবং নারী ভোটাধিকারের পেছনে তার অবদান সম্পর্কে।

সুজান বি. অ্যান্থনি; Source: Why Virtual Embassy?

পরিচয়

১৮২০ সালে ম্যাসাচুসেটসের অ্যাডামসে জন্ম নেন সুজান বি. অ্যান্থনি। পরবর্তীতে ১৮৪৫ সালে নিউ ইয়র্কের রচেস্টারে চলে যায় সুজানের পরিবার। সেখানে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে কথা বলতে এগিয়ে যায় তারা। দাসপ্রথার বিরুদ্ধে নানারকম মিটিং চলতো সেখানকার খামারে। সেখানে আসতেন ফ্রেডরিক ডগলাস এবং উইলিয়াম লয়েড গ্যারিসনের মতো আরো অনেকে। সুজানের দুই ভাই ড্যানিয়েল এবং মেরিট সেখানে ধীরে ধীরে দাসপ্রথা বিরোধী কর্মী হিসেবে কানসাস এলাকায় বিখ্যাত হয়ে যায়। সুজান অবশ্য এই ব্যাপারগুলোর সাথে খুব বেশি সংযুক্ত ছিলেন না। তিনি তখন শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

১৮৪৮ সালের কথা। সেখানে শিক্ষকতা করার সময়েই খুব অদ্ভুত আর বাস্তব একটি ব্যাপার লক্ষ করেন তিনি। সেটি হলো, পুরুষ শিক্ষকেরা মাসে আয় করেন মোট ১০ ডলার, যেখানে নারী শিক্ষকেরা পান মাত্র ২.৫০ ডলার। এত বেশি অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখে বেশ অবাক হন তিনি।

সুজান এবং ক্যাডি; Source: Quotabelle

টিচার্স ইউনিয়নে ধীরে ধীরে নিজেকে জড়ান সুজান। ১৮৪৮ সালের ২ আগস্ট সুজানের বোন এবং পিতামাতা সহ রচেস্টার’স উইমেন রাইট কনভেনশনে যোগ দেন। টিচার্স ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়ে দাসপ্রথার বিরুদ্ধে সমস্ত প্রচারণা দেখে সুজান শুরু থেকেই অনেক বেশি সচেতন ছিলেন নারী অধিকার নিয়ে। একইসাথে এ নিয়ে বেশ চিন্তিতও ছিলেন তিনি। কিছু করতে চাচ্ছিলেন নারীদের নিয়ে। আর ঠিক এই সময় তার দেখা হয় আরেক নারী অধিকার নিয়ে কাজের ক্ষেত্রে অগ্রপথিক এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যান টোনের সাথে।

১৮৫১ সালের কথা। সেনেকা ফলসের পাশে এক সড়কে সুজানের সাথে অ্যামেলিয়া ব্লুমার পরিচয় করিয়ে দেন ক্যাডির। প্রথম দেখাতেই সুজানকে পছন্দ করে ফেলেন ক্যাডি। সেখান থেকেই শুরু হয় নারী অধিকার বিষয়ে সুজানের আগ্রহ। তবে এটি ছাড়াও যে বিষয়টি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করতে সুজানকে উদ্বুদ্ধ করে সেটি হলো ১৮৫২ সালে লুসি স্টোনের দেওয়া একটি বক্তৃতা। নিজের এই একটি বক্তৃতার মাধ্যমে লুসি স্টোন সুজানকে নারী অধিকার সম্পর্কে কাজ করতে এবং এই আন্দোলনে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করে তোলেন। এরপর আর খুব বেশিদিন অপেক্ষা করেননি সুজান।

১৮৫৩ সালে উইমেনস প্রোপার্টি রাইট বা নারীদের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে একটি ক্যাম্পেইন করেন তিনি। বিভিন্ন সভায় এই ব্যাপারে কথা বলেন সুজান, মানুষের কাছে থেকে স্বাক্ষর নেন, তাদের কথা শোনেন, সেগুলোকে রাষ্ট্রপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৮৫৪ সালে জাতীয় নারী অধিকার সম্মেলনের পেছনে কাজ করেন সুজান এবং আর অনেক বেশি পিটিশন ক্যাম্পেইনের জন্য আবেদন জানান। সমাজের উঁচু অবস্থানে অবস্থানরত নারীদেরকেও চিঠি লিখেন তিনি।

সুজান বি. অ্যান্থনির সমাধি; Source: CNN.com

জানান যে, কেবল দাসপ্রথা নয়, এরচাইতেও অনেক বেশি কিছু করার আছে। করার আছে নারীদের অবস্থাকে আরো উন্নত করে তোলার ব্যাপারে। ১৮৫৬ সালে সুজান আমেরিকার দাসপ্রথা বিরোধী কর্মকান্ডের সাথে ভালভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং এই আন্দোলনের একজন সদস্য হন। এ বিষয়ে বিভিন্ন স্থানে মিটিং-এর ব্যবস্থা করেন তিনি। চারিদিকে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে লিফলেট বিলি করেন, পোস্টার লাগান। ধীরে ধীরে শত্রু তৈরি হয়ে যায় সুজানের চারপাশে। তাকে নিয়ে নেতিবাচক কথা রটানোও শুরু হয়।

দলগত হামলা চলে সুজানের উপরে। বিভিন্ন জিনিস ছুঁড়ে মারা হয় সুজানকে লক্ষ্য করে। সুজানের বাসস্থান ও কর্মস্থলের চারপাশে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা এবং কাজ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তবু থেমে যাননি এই নারী। ১৮৫৬ সালে জাতীয় নারী অধিকার সম্মেলনে নিজেদের সমস্ত কর্মকান্ডকে ছাপা অক্ষরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানান সুজান এবং সেই অনুযায়ীই কাজ চলতে থাকে। ‘দ্য লিলি’ এবং ‘দ্য উইমেন’স এডভোকেট’ নামে দুটি নাম প্রস্তাব করা হয়। নিজেদের অনেক কিছুই মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আছে বলে জানান সুজান। সেই অনুযায়ীই কাজ চলতে থাকে।

নারী ভোটাধিকার এবং একজন সুজান বি. অ্যান্থনি

ডলারে সুজান বি. অ্যান্থনি; Source: USA Coin Book

নারীদের অধিকার নিয়ে সবসময়ই সোচ্চার ছিলেন সুজান। এর আগেই এ নিয়ে অনেক কাজ করেছিলেন তিনি। তবে খুব দ্রুতই সুজান বুঝতে পারেন যে, তাদের কথা কখনোই ততটা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হবে না, যদি না রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একজন হিসেবে কোনো ভূমিকা নারীরা পালন না করতে পারে। বাস্তবেও, একজন শাসক কেন মানুষের কথা ভাবেন বা মানুষের জন্য কাজ করেন? কারণ জনগণ তার কাজের উপরে ভিত্তি করে একদিন তাকে নিজেদের ভোটের মাধ্যমে জয়যুক্ত করবে, আবার নির্বাচিত করবে পরবর্তী শাসনকালের জন্য।

নারীদের ব্যাপারে শাসকরা ততক্ষণ পর্যন্ত ভাববেন না, যতক্ষণ না তাদের মনে হবে যে, নারীদের উন্নয়নে কোনো কাজ করলে নারীরাও তাদের ভোট দেবেন। তাই নিজেদের এই ভাবনা থেকেই, রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি ও সম্মান পেতে নারীদের ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা শুরু করেন সুজান বি. অ্যান্থনি। ক্যাডি এবং সুজান মিলে ১৯৬৯ সালে জাতীয় নারী ভোটাধিকার সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। নারীদের ভোটাধিকার পাইয়ে দেওয়ার জন্য একটি নির্দেশনার জন্য কাজ করতে থাকেন তারা।

১৮৭২ সালের কথা। অ্যান্থনি এবং তার ৩ বোন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথম নারী হিসেবে ভোট প্রদান করেন। নিশ্চয়ই ভাবছেন এমনটা কীভাবে সম্ভব হলো সেই সময়? অবশ্যই এটা সম্ভব করার জন্য নিয়ম ভাঙতে হয়েছিল তাদের। নিয়ম ভাঙতে ভালোবাসতেন অ্যান্থনি, আর সেবারও তা-ই করেছিলেন। চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন কাজটিকে আর ফলাফল হিসেবে আদালতে যেতে হয়েছিল তাকে।

নারী ভোটাধিকারের আন্দোলন; Source: Mission Language Lab

নিউ ইয়র্কের ওন্টারিও আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে সুজানকে অপরাধী করা হয় তাকে আর ১০০ ডলার শাস্তিস্বরূপ দিতে বলা হয়। সুজানের ইচ্ছা ছিল তাকে জেলে দেওয়া হলে সেখান থেকে আপিল করবেন এবং পুরো ব্যাপারটিকে সবার নজরে আনবেন তিনি। কিন্তু যেহেতু তাকে জেলের শাস্তি দেওয়া হয়নি। ফলে আপিল করার কোনো সুযোগ পাননি সুজান। তাই বলে থেমে থাকেননি তিনি।

১৯৮১ সাল থেকে ১৯৮৫ আল পর্যন্ত এলিজাবেথ ক্যাডি এবং মাটিল্ডা জোসলিনের সাথে নারী ভোটাধিকারের ইতিহাস লেখায় অংশ নেন তিনি। ১৯১৮ সালে প্রেসিডেন্ট উইলসন নারীদের ভোটাধিকারের ব্যাপারটিকে ইতিবাচকভাবে দেখা শুরু করেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নারীদের উপস্থিতি বাড়িয়ে তোলেন। তবে এতকিছুর পরও সিনেটে মাত্র দুটো ভোটের কারণে এই সংশোধনী বাতিল হয়ে যায়।

১৯১৯ সালের ২১শে মে। সুজান বি. অ্যান্থনির আবেদন নিয়ে কাজ করা হয় এবং এবার সংশোধনীটি সিনেটে পাশ করা হয়। কেউ এর পক্ষে ছিল, কেউ বিপক্ষে। তবে পক্ষ বিপক্ষের এই সমস্যা দূর হয় ম্যাকমিন কাউন্টির হ্যারি টি. বার্নের ভোটের মাধ্যমে। ১৯২০ সালের ২ নভেম্বর অবশেষে নারীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায় পুরুষদের পাশাপাশি। প্রায় ৮ মিলিয়ন নারী ভোট প্রদান করেন সেবার। সুজান বি. অ্যান্থনির কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯তম সংশোধনীটির নামকরণ করা হয় সুজান বি. অ্যান্থনি সংশোধনী।

ফিচার ইমেজ: Makers

Related Articles