বৈদ্যুতিক বাতির উদ্ভাবক সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন? যদি আপনি ভাবলেশহীন উত্তর দেন, তাহলে বলবো এক সপ্তাহ নিজের ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বালানো বন্ধ রাখুন। রাতের বেলা ঘর আলো করতে হারিকেন, মোমবাতি, প্রদীপ বা প্রয়োজনে মশাল ব্যবহার করুন। এক সপ্তাহ পর আপনাকে আবার প্রশ্ন করা হলে আপনি উদভ্রান্তের মতো জানতে চাইবেন- কোন ব্যক্তি আবিষ্কার করেছে বৈদ্যুতিক বাতি? তাকে যে খুব মনে পড়বে তখন! থমাস আলভা এডিসনই সে ব্যক্তি যিনি বৈদ্যুতিক বাতি উদ্ভাবন করেছেন, যা ছাড়া আজকের পৃথিবী কল্পনা করাও আমাদের জন্য দুঃসাধ্য।

থমাস আলভা এডিসন (১৮৪৭-১৯৩১); image source: youtube.com

আমেরিকার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক থমাস আলভা এডিসন তার ৮৪ বছরের জীবনে যত আবিষ্কার/উদ্ভাবন করে গেছেন তা যেকোনো বিজ্ঞানীর নিকট কেবলই স্বপ্ন। তার মোট প্যাটেন্ট সংখ্যা ১০৯৩টি (একক এবং যৌথভাবে)! এই সাফল্যকে অবিশ্বাস্য বললেও কম বলা হবে। বৈদ্যুতিক বাতি, গ্রামোফোন, কাইনেটোগ্রাফ (ভিডিও ক্যামেরা), পৃথিবীর প্রথম ইনডাস্ট্রিয়াল গবেষণাগার সহ অজস্র উদ্ভাবন তাকে অন্য সবার মাঝে করে তুলেছে অনন্য। এসব তথ্যই প্রমাণ করে উদ্ভাবনের নেশায় তিনি কতটা বুঁদ ছিলেন।

প্রাথমিক জীবন

থমাস আলভা এডিসন ১৮৪৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যের মিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা স্যামুয়েল এডিসন জুনিয়র ছিলেন ব্যবসায়ী। মা ন্যান্সি ইলিয়ট এডিসন ছিলেন স্কুল শিক্ষিকা। এডিসন দম্পতির ঘরে জন্ম হয় ৭ সন্তানের, যাদেরই একজন থমাস আলভা এডিসন। তবে তাদের মধ্যে তিনজনই শৈশবে মারা যায়। জন্ম থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও এডিসনের বাবা স্যামুয়েল ছিলেন কানাডার অধিবাসী। ‘ম্যাকেঞ্জি’ বিপ্লবে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনি কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফেরারি হন।

শৈশবে একবার মারাত্মক ব্যাধি স্কারলেট জ্বরে ভোগার সময় কানে ইনফেকশন হয় এডিসনের। এতে করে তার শ্রবণ ক্ষমতা অনেকটাই কমে যায়। প্রাপ্তবয়স্ক হতে হতে তিনি প্রায় বধির হয়ে যান। তবে মজার ব্যাপার হলো, পরবর্তীতে কোনো একসময় তিনি শৈশবের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছিলেন ট্রেন দুর্ঘটনায় তার কানের শ্রবণ ক্ষমতা কমেছিল!

শিশু থমাস আলভা এডিসন; image source: pinterest.com

১৮৫৪ সালে এডিসন পরিবার ওহিও ছেড়ে মিশিগান অঙ্গরাজ্যে চলে যায়। সেখানেই শুরু হয় থমাস আলভা এডিসনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে মাত্র ১২ সপ্তাহের জন্য! যে স্কুলে তিনি ভর্তি হন, সেই স্কুলের শিক্ষকগণ এডিসনকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে পড়াতে আপত্তি জানান। এডিসনের মা এই আপত্তির কারণ জানতে চাইলে শিক্ষকরা কেবল এতোটুকুই বলেন, “Difficult to understand!

এডিসনকে তার শিক্ষকরা বুঝতে না পারলেও তার মা ঠিকই বুঝেছিলেন। তিনি ছেলেকে আর কোনো স্কুলে ভর্তি করাননি। বরং নিজে স্কুল শিক্ষিকা হবার সুবাদে বাড়িতেই শিক্ষাদান শুরু করেন। ১১ বছর বয়স থেকেই জ্ঞানার্জনের জন্য এডিসনের আর তার মাকে দরকার হলো না। ততোদিনে তার জ্ঞানস্পৃহা অবিশ্বাস্য পরিমাণে বেড়ে গেল। তিনি বিভিন্ন বিষয়ের অসংখ্য বই পড়তে শুরু করলেন এবং স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হবার প্রক্রিয়ায় নিজেকে সর্বোতভাবে যুক্ত করলেন। ভাবতে কি একটুও অবাক লাগছে না? যে ব্যক্তির নামের পাশে রয়েছে ১০৯৩টি প্যাটেন্ট, তার কিনা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নেই! এবার তবে বুঝুন প্রমথ চৌধুরী কেন বলেছিলেন যে প্রতিটি সুশিক্ষিত ব্যক্তিই স্বশিক্ষিত।

একটি কথা না বললেই নয়। এডিসনের জীবনী থেকে কেউ যেন আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে না ফেলেন। কারণ এডিসন নিজেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপর বেশ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রতি বছর মাধ্যমিক লেভেলে সেরা শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি ‘এডিসন স্কলারশিপ’ চালু করেন । অতএব স্কুল ছেড়ে দিয়ে এডিসন হবার চিন্তা করার মতো বোকামি করবেন না যেন!

কিশোর এডিসনের নিজস্ব গবেষণাগার

নিজ বাড়ির সেলারে কিশোর এডিসনের প্রথম গবেষণাগার; image source: daviddarling

মাত্র এগারো বছর বয়সেই নিজের রসায়ন গবেষণাগার বানিয়ে নেন এডিসন। বাড়ির সেলারে তৈরি করা সেই গবেষণাগারে খুঁটিনাটি কাজকারবার করে যেতেন আর পড়তেন অজস্র বই। ১২ বছর বয়সে তিনি ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রেইলরোড’ লাইনে সংবাদপত্র বিক্রয় করার চাকরি নেন। খুব দ্রুতই তিনি সংবাদপত্র বিষয়ক কাজে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এরই মাঝে নিজের একটি ক্ষুদ্র পত্রিকা ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক হেরাল্ড’ চালু করেন। তবে এই চাকরির সময় নিজের গবেষণার কাজ তিনি ছাড়েননি। ট্রেনের একটি মালামালের বগির ক্ষুদ্র অংশে জায়গা করে নেন গবেষণার জন্য!

এই স্টেশনে পত্রিকা বিক্রয় করেছেন এডিসন; image source: railroadforum.com

ভাগ্যের চাকার উল্টো ঘুর্ণন শুরু হতে বেশিদিন লাগেনি। ট্রেনের বগিতে বসে গবেষণা করতে গিয়ে একদিন আগুন লেগে যায় বগিতে। আগুন নেভানোর চেষ্টা করবেন কি! হঠাৎ করেই কানের নিচে প্রচণ্ড শব্দে ঘন্টা বাজিয়ে দিলেন ট্রেনের টিটি। আর হতবুদ্ধি এডিসন ততক্ষণে ভয়ে কাঁচুমাচু। সে যা-ই হোক, এডিসনের ট্রেনে পত্রিকা বিক্রয় বন্ধ হয়ে গেল। গবেষণাও বন্ধ হলো সাথে। কারণ এখন পত্রিকা বিক্রি করতে হবে বিভিন্ন স্টেশনে ঘুরে ঘুরে। এই ঘটনাকে কী বলবেন? দুর্ঘটনা নিশ্চয়ই। এই দুর্ঘটনাই আবার তার ভাগ্য খুলে দিল। একটি তিন বছরের বাচ্চাকে ট্রেনে কাঁটা পরার হাত থেকে রক্ষা করেন এডিসন। শিশুটির বাবা তাকে পুরস্কৃত করতে চাইলেন। কিন্তু এডিসন কী চাইলেন জানেন? তিনি চাইলেন টেলিগ্রাফ সম্পর্কে তার যত কৌতুহল আছে সব যেন মেটানোর ব্যবস্থা করেন ভদ্রলোক! ফলাফল হলো আশাতীত। ভদ্রলোকের সহায়তায় ১৫ বছর বয়সেই এডিসন হয়ে গেলেন একজন দক্ষ টেলিগ্রাফ অপারেটর। এরপর তিনি টেলিগ্রাফ সম্পর্কে ব্যাপক পড়াশোনা ও গবেষণা করেন।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসে এডিসন

১৮৬৬ সালে ১৯ বছর বয়সী এডিসন লুইভিলে চলে আসেন এবং রাতের শিফটে টেলিগ্রাফ অপারেটরের চাকরি পান। রাতের শিফটে কাজ করায় গবেষণার জন্য যথেষ্ট সময় পেতেন এডিসন। তবে বিপত্তি ঘটলো অন্যত্র। মোর্স কোড লেখার বদলে মানুষ টেলিগ্রাফারদের মুখে সংবাদ পড়ে শুনতে চাইতো। কিন্তু এডিসনের ছিল কানে সমস্যা। ফলে অপর প্রান্তের ব্যক্তিদের সাথে তার যোগাযোগে সমস্যা দেখা দেয়।

এবার বোস্টনে

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের চাকরি ছেড়ে ১৮৬৮ সালে এডিসন নিজের শহরে ফিরে আসনে। ফিরে এসেই দেখলেন পরিবারের দুর্দশা। বাবার চাকরি নেই, মা’র মানসিক অবস্থার দিন দিন অবনতি হচ্ছে। পরিবারের দায়িত্ব এবার নিজের কাঁধে নিতেই হবে। এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি চলে গেলেন বোস্টন। সেখানে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নে চাকরি শুরু করলেন। অবসর সময়ের চিন্তা-ভাবনায় বানিয়ে ফেললেন একটি ভোট গণনাযন্ত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ম্যাসাচুসেটসের আইন প্রণেতারা যন্ত্রটির প্রতি কোনো আগ্রহই দেখাননি!

পুরোদমে উদ্ভাবনে এডিসন

১৮৬৯ সালে এডিসন নিউ ইয়র্ক চলে আসেন। এ সময় তিনি একটি ‘স্টক টিকার’ যন্ত্র উদ্ভাবন করেন যা একইসাথে একাধিক কাজ করতে পারতো। এডিসনের এই কাজে ‘দ্য গোল্ড অ্যান্ড স্টক কোম্পানি’ মুগ্ধ হয় এবং যন্ত্রটির স্বত্ব কিনে নিতে এডিসনকে ৪০ হাজার ডলার প্রদান করে! এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এডিসন তার টেলিগ্রাফারের কাজ একেবারেই ছেড়ে দেন এবং উদ্ভাবক হিসেবে পুরোদমে কাজ শুরু করেন।

এডিসনের তৈরি স্টক টিকার; image source: bullmarketgifts.com

১৮৭১ সালে এডিসন ১৬ বছর বয়সী তরুণী ম্যারি স্টিলওয়েলকে বিয়ে করেন। সে বছরই তার মা মারা যান। তবে এসব বিষয় তার উদ্ভাবনের কাজে খুব একটা প্রভাব ফেলেনি। আগের বছরই তিনি তার বাবার সহায়তায় নিউ জার্সিতে একটি ছোটখাটো গবেষণাগার ও মেশিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। ১৮৭০-৭৫ সালের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি একই সাথে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন ও এর প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য টেলিগ্রাফ সংক্রান্ত অনেক যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে। এরই মাঝে তিনি তৈরি করেন চমৎকার ‘কোয়াড্রুপ্লেক্স টেলিগ্রাফ’ যা একই সাথে দুটি গন্তব্যে সিগন্যাল পাঠাতে সক্ষম ছিল। যন্ত্রটি তিনি মূলত ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের জন্যই বানিয়েছিলেন। কিন্তু রেলওয়ে টাইকুন জে গোল্ড যন্ত্রটি অবিশ্বাস্য পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের নাকের ডগা থেকে ছিনিয়ে নেয়। গোল্ড এডিসনকে ক্যাশ, বন্ড সহ ১ লক্ষ ডলার প্রদান করে যন্ত্রটির জন্য!

১৮৭৬ সালে নিউ জার্সির মেনলো পার্কে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের জন্য একটি বড়সড় গবেষণাগার ও যন্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এডিসন। এখানে ব্যবস্থা করেন উন্নত গবেষণার। আর মাত্র এক বছর পরই এখান থেকে তৈরি করেন ‘ফোনোগ্রাম’। উদ্ভাবনের সাথে সাথেই যন্ত্রটি দিকে দিকে সাড়া ফেলে দেয়। কয়েক বছরের মধ্যেই ফোনোগ্রামের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় এবং এডিসন আর্থিকভাবে ব্যাপক সফলতার মুখ দেখেন। একই বছর তিনি মেনলো পার্ক থেকে ‘কার্বন ট্রান্সমিটার’ও উদ্ভাবন করেছিলেন। এই কার্বন ট্রান্সমিটারের সাহায্যে তখন অ্যালেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল কর্তৃক আবিষ্কৃত টেলিফোনের শ্রবণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়।

বৈদ্যুতিক বাতি ও এডিসন

এডিসনের তৈরি প্রথম বাতি (প্লাটিনামের ফিলামেন্ট); image source: isonmuckers.org

বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক হিসেবে অধিকাংশ মানুষই থমাস আলভা এডিসনকেই চেনেন। কিন্তু ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। ১৮০০ সালে পৃথিবীর প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী হামফ্রে ডেভি। তার বাতিটি ছিল একটি আর্ক ল্যাম্প। তবে এডিসন বৈদ্যুতিক বাতির ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেন এবং এমন একটি বাতি তৈরি করেন যা ডেভির আবিষ্কৃত বাতি থেকে অনেক বেশি আলো দেয়। তাছাড়া তিনিই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বাতি উৎপাদন শুরু করেন। সেজন্য অনেকে এডিসনকেই বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারক বলতে চান।

১৮৭৮ সালে এডিসন সিদ্ধান্ত নেন প্রচলিত স্বল্প আলোর ব্যয়বহুল বাতির পরিবর্তে অধিক আলোর সস্তা বাতি তৈরি করবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি চালু করেন ‘এডিসন ইলেকট্রিক লাইট কোম্পানি’। মাত্র এক বছরের মাথায়ই সাফল্য ধরা দিল। তিনি প্লাটিনাম ফিলামেন্ট ব্যবহার করে যে বাতি তৈরি করলেন তা প্রচলিত বাতির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আলোকিত করতো। তবে ফিলামেন্ট দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে গলে যাওয়ায় বাতিগুলো দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছিল না।

টিভিতে একটি জনপ্রিয় ভারতীয় বিজ্ঞাপন আছে এরূপ- “মেন্টোস খাও, দিমাগ কি ‘বাত্তি’ জ্বালাও।” এডিসনের সময়ে মেন্টোস ছিল না, কিন্তু তার মস্তিস্কে ঠিকই ‘বাত্তি’ জ্বলেছিল। তিনি ফিলামেন্ট হিসেবে প্লাটিনামের পরিবর্তে ব্যবহার করলেন কার্বন। আর এতে ফল হলো আশাতীত। আলো হলো অনেক বেশি, সাথে যোগ হলো দীর্ঘস্থায়ীত্ব। ১৮৮১ সালে ‘প্যারিস লাইটিং এক্সিবিশন’ এবং ১৮৮২ সালে লন্ডনের ক্রিস্টাল প্যালেস সজ্জিত হলো এডিসনের নবনির্মিত বৈদ্যুতিক বাতিতে। আর এতে করে তার উদ্ভাবনের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে গেল।

আরো কিছু কাজ

কাইনেটোস্কোপ; image source: weebly.com

১৮৮৪ সালে এডিসনের প্রথম স্ত্রী স্টিলওয়েল মারা যান। ১৮৮৬ সালে তিনি মিরনা মিলারকে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে আরো তিন সন্তানের জন্ম হয়। একই বছর এডিসন ওয়েস্ট অরেঞ্জে একটি নতুন গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় একই সাথে তিনি বিশাল ভূসম্পত্তির মালিক হন। নতুন এই ল্যাবে ছিল একটি অত্যাধুনিক রসায়ন গবেষণাগার, একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ বিক্রয়ের দোকান, একটি দর্শনীয় লাইব্রেরি এবং ধাতুবিজ্ঞান গবেষণায় আলাদা একটি ভবন। এই সময়ে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে আসে ‘কাইনেটোগ্রাফ’ এবং ‘কাইনেটোস্কোপ’। কে. এল ডিকসনের সাথে যৌথভাবে কাজ করে তিনি তৈরি করেন পৃথিবীর প্রথম এই মোশন পিকচার বা চলচ্চিত্রের ক্যামেরা। এ ক্যামেরার নামকরণ করা হয় কাইনেটোগ্রাফ এবং মোশন পিকচার দেখার জন্য যে যন্ত্রটি তৈরি হয় তার নাম কাইনেটোস্কোপ।

কাইনেটোস্কোপ আবিষ্কারের পর এডিসন চলচ্চিত্র বিষয়ে আরো গবেষণা চালিয়ে যান। তবে ১৮৯১ সালে কাইনেটোস্কোপের যে প্যাটেন্ট তিনি করান, তা নিয়ে ঝামেলা বাধে সমসাময়িক আরো বেশ কয়েকজন উদ্ভাবকের সাথে যারা এর প্যাটেন্ট দাবি করেন। এই বিষয়টি আদলতে গড়ায় এবং দীর্ঘদিন মামলা চলতে থাকে। এ ব্যাপারে তিনি এতটাই বিরক্ত হন যে ১৯১৮ সালের দিকে তিনি চলচ্চিত্রের উপর গবেষণা ছেড়ে দেন। মাঝে ‘অ্যালকালাইন ব্যাটারি’ নির্মাণ করেও বেশ সাফল্য পান এডিসন। তার এই ব্যাটারি প্রাথমিকভাবে ফোনোগ্রামের কাজে ব্যবহৃত হলেও পরে সাবমেরিনেও ব্যবহার করা হয়।

মৃত্যু

১৯৩১ সালের ১৮ অক্টোবর থমাস আলভা এডিসন নিউ জার্সির ওয়েস্ট অরেঞ্জে নিজ বাড়ি ‘গ্লেনমন্টে’এ মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় তার বয়স ছিল ৮৪ বছর।

এডিসন শুধু একজন সফল উদ্ভাবকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তাও। ১১ বছর বয়স থেকে ঘরের কোণে ছোট্ট একটি ল্যাব বানিয়ে যে গবেষণা তিনি শুরু করেন, তা চালিয়ে যান জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত। বয়স যখন তার আশির কোঠা পার হয়, তখন তার কাজের গতি কিছুটা কমে আসলেও বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা হেনরি ফোর্ডের সাথে মিলে আমৃত্যু গবেষণা চালিয়ে যান এডিসন। যে ব্যক্তির পোষাকে সবসময় থাকতো ভাঁজ, যার চুলগুলো এলোমেলো বৈ ঠিক হতো না কখনো, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল যার শূন্য, সেই এডিসন শিল্প বিপ্লব যুগের সভ্যতাকে একা হাতে যতটুকু এগিয়ে দিয়ে গেছেন তা যে কারো জন্য কল্পনাতীত। তার জীবনের প্রতিটি দিকই অনুপ্রেরণাদায়ক। তবে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দেয় যে বিষয়টি সেটি বলতে গেলে আরো একবার প্রমথ চৌধুরীর কাছে ফিরে যেতে হবে।

“সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত।”

ফিচার ইমেজঃ invention.si.edu