মানুষটি ছিলেন সুরের ঐন্দ্রজালিক, মুহূর্তেই সংগীতের মায়াজালে আবিষ্ট করতে পারতেন সকলকে। তা করতে গিয়ে কখনোই মঞ্চে শ্রোতাদের মন ভোলাতে ঠুমরি গাননি। শাস্ত্রীয় সংগীতের রীতির মধ্যে থেকেই সম্রাটের মতো দাপটের সাথে শ্রোতার মন জিতবেন এই প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তা বাস্তবায়নও করেছিলেন তিনি। শুধু খেয়াল গেয়েই আসর জিতে নিয়েছিলেন এমন অনেক উদাহরণ ছড়িয়ে আছে তার জীবনে। কীভাবে একটি রাগে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে হয় তা তিনি জানতেন। আশ্চর্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী এই মানুষটি দেখিয়ে দিতেন কতসব অনন্য উপায়ে একটি রাগের বিস্তার সম্ভব। মানুষটি সুর সম্রাট উস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব, ইন্দোর ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাণপুরুষ।

উস্তাদ আমীর খাঁ; ছবিসূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

জন্মেছিলেন ১৯১২ সালের ১৫ আগস্ট ইন্দোরে। বাবা শাহমির খাঁ, তিনি সারেঙ্গী বাজাতেন। ইন্দোর দরবারে সে সুবাদে তার কিঞ্চিত আনাগোনাও ছিল। কিন্তু সেই সূত্র খাঁ সাহেবকে শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠিত করতে যথেষ্ট ছিল না। যদিও বাবার কাছেই খাঁ সাহেবের প্রথম তালিম শুরু হয়। ১৯৩৬ সালে তিনি মধ্য প্রদেশের মহারাজ চক্রধর সিং এর দরবারে যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে বাবা শাহমির খাঁ মারা গেলে তিনি ভাগ্য অন্বেষণে পাড়ি জমান কলকাতায়।

ইন্দোরে আমীর খাঁ সাহেবের বাড়ি, শাহমির মঞ্জিল; ছবিসূত্র: সংগীতসূর্য উস্তাদ আমীর খাঁ, মূল: তেজপাল সিং, অনুবাদ: মীনা বন্দ্যোপাধ্যায়

১৯৪৬ এর দিকে যখন তিনি কলকাতায় আসেন তখন কলকাতা শহরে তার মাথা গোঁজার মতো জায়গা ছিল না। হোটেলে থাকবার মতো টাকা ছিল না। শেষপর্যন্ত এক পূর্বপরিচিত ব্যক্তি তাকে আশ্রয় দেয়। পরে বৌ বাজার সেন্ট্রাল এভিন্যুয়ের ক্রসিংয়ের ধারে এক বাড়ীতে নৈশ প্রহরীর কাজ করতেন। সারাদিন কলকাতার পথে ভাগ্য অন্বেষণে ঘুরে বেড়াতেন আর রাতে নৈশ প্রহরীর খাটিয়ায় খোলা আকাশের নিচে শুতেন। তখনো কি তিনি ভাবতে পেরেছিলেন এই কলকাতাই তাকে মাথায় তুলে রাখবে?

তখন গোটা দেশে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে দুর্দান্ত খ্যাতি লাভ করেছেন বড়ে গুলাম আলি খাঁ। তার আসরের গানে শ্রোতারা মজে থাকতো। তিনি আসরে নিজের পছন্দের চেয়ে শ্রোতার পছন্দের প্রতি নির্ভর করতেন বেশি। নিজেই বলতেন সে কথা। শ্রোতার মন ভোলাতে তার ঠুমরি ছিল অসম্ভব কার্যকরী। যখন তিনি ‘আয়ে না বালাম’ কিংবা ‘ইয়াদ পিয়া কি আয়ে’ ধরতেন তখন আসর মাত হয়ে যেতো।

অন্যদিকে আমীর খাঁ সাহেব ছিলেন ঠিক অন্যরকম। তিনি বলতেন ‘নাগমা ও হি নাগমা হ্যায় যো রুহ সুনে অউর রুহ সুনায়ে’। অর্থাৎ “যে সংগীত হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে উৎপত্তি লাভ করেছে আর স্পর্শ করেছে আত্মিক প্রশান্তিকে সেই সংগীতই প্রকৃত সংগীত।” খাঁ সাহেব যখন মধ্যপ্রদেশে রাজদরবারে যুক্ত ছিলেন তখন রাজার তরফ থেকে তাকে গাইতে বলা হয় এক সংগীত আসরে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আরো অনেক খ্যাতনামা গায়ক ও সংগীতজ্ঞ। তাকে বলা হলো ঠুমরি গাইতে, কিন্তু তিনি তা গাইতে সম্মত নন। তার এক কথা, “যে গান আমার হৃদয়কে স্পর্শ করে না,কেবল মাত্র শ্রোতার মনোরঞ্জনের জন্যে, সে গান আমি গাইবো না।”

খাঁ সাহেব যখন কলকাতায় গাওয়া শুরু করলেন, সংগীত জগতে নিজেকে স্থান পেতে লড়তে হয়েছিল। কারণ তখন সকলে বড়ে গুলাম আলি খাঁ-তে মজে ছিল। অন্যদিকে তার প্রতিজ্ঞাও ছিল। কেবলমাত্র খেয়াল গেয়েই আসরকে মুগ্ধ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এই মানুষটি নিজেই নিজের টিকে থাকার লড়াইকে আরো কঠিন করে নিয়েছিলেন। নিজের শৈল্পিক ও পাহাড়সম ব্যক্তিত্ব নিয়ে অবশ্য সেই লড়াইয়ে জিতেছিলেন তিনি। একটা কাহিনীর উল্লেখ করা যায় এ প্রসঙ্গে। কাহিনীটির উৎস গোবিন্দ বসু, যিনি অনেক দিনব্যাপী খাঁ সাহেবের সাথে তবলায় সংগত করেছেন। তিনি বলছেন-

আমির খাঁ সাহেবের উদ্যোগেই কলাসঙ্গমের অনুষ্ঠান চলছে। ১৯৬৯-৭০ হবে, যদ্দুর মনে পড়ছে। শেষ দিনে দু’জনের অনুষ্ঠান- খাঁ সাহেব আর বেগম আখতার। অনুষ্ঠান শুরুর আগে গ্রিনরুমে পৌঁছে দেখি, দু’জনেই বসে আছেন। আখতারির হাতে যথারীতি সিগারেট জ্বলছে। দু’জনেই বলছেন নিজে আগে গাইবেন। আখতারি বলছেন, আপনি উস্তাদ, আপনার পরে গাওয়ার গুস্তাখি আমি কী করে করব? খাঁ সাহেব বলছেন, আরে তাতে কী, লোকে তোমার গান শুনবে বলেই বসে আছে- আমি আগে গেয়ে নিই। এ নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি। শেষ পর্যন্ত জিতলেন বেগম আখতার। বললেন, এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা আপনি, আমি আপনার মেহমান। আমাকে আগে গাইতে দেবেন না? আমির খাঁ পরে গাইতে রাজি হলেন।

আখতারি গাইতে বসলেন। তবলায় কেরামতুল্লা খাঁ। সে কী গান! অমন গজল গোটা হিন্দুস্তানে কেউ কখনও গায়নি। আর, ঠুংরিও গাইতেন চমৎকার। তার ওপর বেগমের বিভিন্ন ছলাকলা, আদাঁয়ে। শ্রোতারা একেবারে মাত হয়ে গিয়েছে। আমি তো গ্রিনরুমে বসে প্রবল দুশ্চিন্তা করছি এই আসরের পর কি আর খাঁ সাহেবের খেয়াল জমবে? তা, ঘণ্টা দুয়েক গাওয়ার পর বেগম নামলেন। খাঁ সাহেবকে আদাব জানিয়ে একেবারে সামনের সারিতে গিয়ে বসলেন। তানপুরা মিলিয়ে গান ধরলেন খাঁ সাহেব। যদ্দুর মনে পড়ছে, পুরিয়া। কী বলব, দশ মিনিটের মধ্যে ভুলেই গেলাম যে আগে কেউ গেয়েছিলেন। শ্রোতারা সমাহিত ভঙ্গিতে শুনছে, বেগমের গান যে চাঞ্চল্য তৈরি করেছিল, তার লেশমাত্র নেই। সে দিন বুঝেছিলাম, কী দরের শিল্পী তিনি।

কেবল অসাধারণ শিল্পীই নন, উস্তাদ আমীর খাঁ সাহেব, ছিলেন অসম্ভব গাণিতিক প্রতিভা সম্পন্ন একজন মানুষ। তার হাত ধরে শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ‘মেরুখণ্ড’ নামের এক অমূল্য রত্ন। মেরুখণ্ড কৌশল হলো নির্দিষ্ট কিছু স্বরকে বিন্যাস-সমাবেশের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করার অনন্য এক পদ্ধতি। যেমন ‘নি রে গা’ এই তিনটি স্বরকে কেউ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে (পুনরাবৃত্তি ব্যতীত) যদি করতে চায় তাহলে ছয় ভাবে এর বিন্যাস সম্ভব। এ হিসেবে চারটি স্বরকে ২৪ ভাবে বিন্যস্ত করে তিনি দেখিয়েছিলেন।

এই পদ্ধতিতে দেখিয়েছিলেন সপ্তকের সাতটি স্বর নিয়ে বিভিন্ন ভাবে বিন্যস্ত করে কীভাবে খেলা করা যায়। কোনো এক বর্ষায় খাঁ সাহেব কলকাতায় পাঁচটি আসরে মেঘ রাগ পরিবেশন করেছিলেন পাঁচটি ভিন্ন ভাবে। পাঁচটি আসরে একই রাগ নিয়ে তিনি পাঁচটি রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। তার উপর তিনি গাইতেন বিলম্বিত ঝুমরায়। চৌদ্দ মাত্রার তাল। যারা তাল সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল তারা জানেন এমনিতেই এ ধরনের তালে সমে ভেড়ানো মুশকিল। আর খাঁ সাহেব সমে পড়তেন সরাসরি, তান করতে করতে, কোনো আলাদা খণ্ড কিংবা টুকরা জুড়ে নয়। সংগীত আর গণিত দুটোতেই অনবদ্য পাণ্ডিত্য তাকে এ দক্ষতা এনে দিয়েছিল।

সা- রে- গা- পা এই চারটি স্বর দিয়ে মেরুখণ্ডের উদাহরণ; ছবিসূত্র: SwarDhanu

ব্যক্তিগত জীবনে সুখী ছিলেন না খুব একটা। সংগীতই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। জাগতিক সব দীনতা হীনতা থেকে মানুষটিকে এক অন্য জগতে সমাহিত, শান্ত স্মিত ভাব দিতো তার সুর, তার গান। সংগীতের মোহনীয় সিন্ধু থেকে তিনি নিয়ে আসতেন নতুন এক অর্থের সন্ধান। আমীর খুসরো সুফি কাব্যের কল্বানা (Qalbana)-র আদলে তারানা নামে নতুন এক ধারার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সকলেই মনে করতো তারানা কেবল অর্থহীন কিছু বোলের বা ধ্বনির সমষ্টি। কিন্তু তিনি বলেছিলেন তারানার গূঢ় কিছু অর্থ রয়েছে। যেমন, আপাত দৃষ্টিতে নাদের দানি, তোম, তাদানি, ওদানি, ইয়ালালা এগুলিকে অর্থহীন শব্দ বলেই মনে হয়। তিনি বলেছিলেন এগুলো আরবী, ফার্সি প্রভৃতি ভাষা থেকে নেয়া শব্দ যাদের প্রত্যেকটির নিজস্ব অর্থ রয়েছে। যেমন, ইয়ালালা আরবী ভাষা থেকে আগত শব্দ। ইয়া আল্লা, ‘আল্লাহ’ শব্দটির সংক্ষিপ্ত রুপ; নাদের দানি, ফার্সি– সব জানে; তোদানি, তুমি জানো; ওদানি, ও জানে। তোম- ম্যায় তেরা হুঁ এটা জপের মতো করা হয়– তোম তোম তোম তানানা তানানা তানানা তোম– নাদের দানি, নাদের দানি– তু সব্ জান্তা হ্যায়। তার ভাষায়-

এটা সূফী যারা ছিলেন, ওঁদের ‘হাল ঔর কাল’ যাকে বলে– এমন এক মঞ্জিল হয় ফকিরী দর্জে মেঁ, যেখানে সঙ্গীত ছাড়া পৌঁছতে পারে না, যে ধর্মেরই সন্ত হোক। ওই গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য এই ‘রিপিটেশন’ করা হতো– তোদানি ওদানি, নাদের দানি ওদানি।

১৯৭১ সালে তিনি পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। তার পথ ধরে তার শিষ্যরাও হয়েছেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে নমস্য ও প্রণম্য। পণ্ডিত অমরনাথজী, অর্কুট কান্নভিরহাম (এ. কানন), গজেন্দ্র বকশী, ভীমসেন শর্মা, মুনীর খান, থমাস রস, প্রদ্যুম্ন কুমুদ ব্যানার্জী প্রমুখ অন্যতম।

জীবনের মোড়ে বাঁক নেয়ার সময় থেকে তার কলকাতার সাথে সখ্যতা। কলকাতা তাকে দিয়েছিলও দু’হাত ভরে। শাস্ত্রীয় সংগীতের মধ্যগগনে তিনি ছিলেন সুরসম্রাটের মতো। কিন্তু কেউই ভাবেনি এই কলকাতাতেইএমন আকস্মিকভাবে শেষ শয্যা রচিত হবে তার। ১৯৭৪ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি সাউদার্ন এভিন্যু ধরে যখন তিনি ফিরছিলেন, ঘাতক লরির ধাক্কায় দুমড়ে গিয়েছিল তাঁর গাড়িটা। অকালেই প্রয়াণ ঘটেছিল। গোবরা সিমেট্রিতে সেই থেকেই ঘুমিয়ে আছেন।

দিনকয়েক আগে বসে যখন সকালে নিজের মনে তিনি রেওয়াজ করছিলেন, গান্ধারে এক অকল্পনীয় সুর লাগল তার। সঙ্গতকারী গোবিন্দ বসুর দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ঔর জাদা দিন নেহি, গোবিন্দ। ইয়ে গান্ধার জিসে লগ যাতা হ্যায়, ও ইনসান জাদা দিন রহেতা নেহি।

উস্তাদ আমীর খাঁ’র সমাধি; ছবিসূত্র: flickr.com

তথ্যসূত্র

  1. Thomas W. Ross (Spring–Summer 1993). Forgotten Patterns: Mirkhand and Amir Khan. Asian Music. University of Texas Press. 24 (2): 89–109
  2. “Ustad Amir Khan”, from “Great Masters of Hindustani Music” by Susheela Misra
  3. Banerjee, Meena (4 March 2010). “Immortal maestro”. The Hindu. Chennai, India.
  4. Biographical documentary on Amir Khan on YouTube, produced in 1970 by the Films Division of India
  5. https://arts.bdnews24.com/?p=6675
  6. Swarmaye, P. No. 29, Amir Khan Saheb, Author: Prabha Atre
  7. সুরের আমীর – আনন্দবাজার পত্রিকা (২৭ শ্রাবণ ১৪১৯ রবিবার ১২ অগস্ট ২০১২)
  8. সংগীতসূর্য উস্তাদ আমীর খাঁ -মূলঃ তেজপাল সিং অনুবাদঃ মীনা বন্দ্যোপাধ্যায়

ফিচার ছবি- Scroll.in