চোখে কাজল, পরনে পাঞ্জাবি ও ঢাকাই লুঙ্গি আর বলনে পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা– ইদের দিনে টিভির পর্দায় প্রচারিত বিশেষ নাটকে এমন ধারার এক মানুষকে দেখা যায়। বলছি আরমান ভাই ওরফে জাহিদ হাসানের কথা। সদা হাসিমুখ এই মানুষটি আমাদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় একজন নাট্য ব্যক্তিত্ব। শুধু নাট্য ব্যক্তিত্ব বললে ভুল বলা হবে, চলচ্চিত্র অভিনেতা ও ব্যক্তি জীবনে একজন সফল প্রেমিক ও গৃহকর্তার এক সুন্দর নজির তিনি। আজকে এই গুণী ব্যক্তির জীবন সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নেয়া যাক।

জাহিদ হাসান; Source: 24binodonbd.com

বিশিষ্ট অভিনেতা জাহিদ হাসানের অভিনয় জীবন নিয়ে কথা বলার আগে তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে কিছু তথ্য উল্লেখ করছি প্রথমে। ১৯৬৭ সালের ৪ অক্টোবর, সিরাজগঞ্জের এক সাধারণ পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন একজন কাস্টম কর্মকর্তা এবং মা একজন গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই সবার আদরে বড় হয়েছেন তিনি। ৮ ভাইবোনের মাঝে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তার শিক্ষাজীবন অতিবাহিত হয়েছে সিরাজগঞ্জে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার বেশ আগ্রহ ছিল এবং প্রায়সময় বিভিন্ন স্কুলের অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সিরাজগঞ্জে থাকাকালীন তিনি সিরাজগঞ্জ তরুণ সম্প্রদায় নাট্য দলের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সেখানে নিয়মিত অভিনয় করতেন। সেসময় সেখানে তিনি ‘সাত পুরুষের ঋণ মঞ্চ’ নাটকটিতে অভিনয় করেছিলেন।

পড়াশোনা শেষে একসময় তিনি ঢাকার পথে পাড়ি জমান নিজের কর্মজীবন শুরুর লক্ষ্যে। তবে অভিনয়কে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নেবেন, এমন ভাবনা তখনও তার ছিল না। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খন্ডাবে কে, তিনি ঢাকায় এসে মঞ্চ নাটকের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। নিজের অভিনয় প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগটি তিনি হেলায় নষ্ট করেননি।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে, আমাদের জীবনে এমন অনেক কিছুই ঘটে থাকে যা হয়তো আমরা কল্পনা করি না। কিছু ঘটনা আমাদের চলার পথকে কিছুটা সহজ করে দেয়। জাহিদ হাসান অভিনীত ‘সাত পুরুষের ঋণ’ মঞ্চ নাটকটি ১৯৮৪ সালের ১০ আগস্ট  বিটিভিতে প্রচারিত হয়। আর এভাবেই রূপালী পর্দার ছোট ঘরানায় তার পদযাত্রা শুরু হয়।

পথপরিক্রমায় ঠিক ৫ বছর পর, ১৯৮৯ সালে বিটিভির একটি নাটকের অডিশনে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তার অভিনয়শৈলীতে মুগ্ধ হয়ে বিচারকগণ তাকে নাটকের জন্য মনোনীত করেন। তার অভিনীত প্রথম ছোট পর্দার নাটক ‘জীবন যেমন’। ১৯৯০ সালে এই নাটকটি প্রচারিত হয়। এরপর নতুন নতুন টিভি চ্যানেল আসতে থাকে এবং কাজের পরিসর বাড়তে থাকে। একটি-দুটি করতে করতে আজ জাহিদ হাসানের ঝুলিতে রয়েছে অসংখ্য নাটকে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা। আমরা তাকে মূলত হাস্যরসাত্মক চরিত্রগুলোতে অভিনয় করতে দেখে থাকি। চরিত্রগুলোকে তিনি তার সুনিপুণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন। প্রতিটি চরিত্রে আমরা ভিন্ন জাহিদ হাসানকে দেখে থাকি। চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি নিজেকে সেই ধাতে গড়ে তোলেন। কখনো শুদ্ধ বাংলা ভাষায় চলিত রীতিতে অনর্গল কথা বলে চলেছেন, আবার কখনো রপ্ত করেছেন আঞ্চলিক ভাষাকে।

জাহিদ হাসানের নাটকমাত্রই দৃশ্যপটে একটি ভালো কিছু উপহার পাওয়ার আশা জাগে। তিনি এমন একজন অভিনেতা যিনি ‘কোয়ান্টিটি’ নয়, বরং ‘কোয়ালিটি’তে বিশ্বাসী। সময়টা তখন বিটিভির, সে সময়ে বাংলাদেশে আজকের মতো এত টেলিভিশন চ্যানেল ছিল না। হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘আজ রবিবার’ নাটকে আমরা তাকে মফিজ চরিত্রে অভিনয় করতে দেখেছি। তখনকার দিনে সকলের কাছে জনপ্রিয় একটি নাটক ছিল এবং এখন ইউটিউবের বদৌলতে আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছেও নাটকটি দেখার সুযোগ রয়েছে। এরপর বহু বছর পেরিয়ে গেছে, আজো তিনি দাপটের সাথে অভিনয় করে চলেছেন। এখানে তার অভিনীত কিছু টেলিফিল্ম ও নাটকের নাম উল্লেখ করছি, সময় পেলে আপনিও দেখে নিতে পারেন।

  • তারায় তারায় খচিত
  • সমুদ্র বিলাস প্রাইভেট লিমিটেড
  • মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন
  • আজ রবিবার
  • গ্রাজুয়েট
  • শুভ বিবাহ
  • আরমান ভাই হাউজ হাজবান্ড
  • রঙ নাম্বার
  • আরমান ভাই ফাইস্যা গেছে
  • খোয়াবনামা
  • সুপাত্রের সন্ধানে
  • ইমোশনাল আব্দুল মতিন

শ্রাবণ মেঘের দিন; Source: bongobd.com

এবার আসা যাক তার চলচ্চিত্র অভিনয় সম্পর্কিত তথ্যে। কথায় আছে, যে পারে, সে সবই পারে। শক্তিশালী এই অভিনয়শিল্পী চলচ্চিত্র অঙ্গনেও তার প্রখর মেধার পরিচয় দিয়েছেন, উপহার দিয়েছেন বেশ কিছু ব্যবসাসফল ও দর্শকনন্দিত সিনেমা। তার অভিনীত প্রথম সিনেমা ‘বলবান’। বাংলাদেশ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি তৈরি হয় এবং প্রদর্শিত হয় ১৯৮৬ সালে। এরপর তিনি বেশ কিছু সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যেমন- শ্রাবণ মেঘের দিন, মেড ইন বাংলাদেশ, প্রজাপতি, আমার আছে জল, ঝন্টু মন্টু দুই ভাই ইত্যাদি। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ এ মন্টু চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি সকলের নজর কাড়েন এবং দর্শকদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন। এই চলচ্চিত্রের জন্য ১৯৯৯ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে মেরিল প্রথম আলো পুরষ্কার অর্জন করেন।

হালদা; Source: Youtube

এ পর্যন্ত তার সর্বশেষ অভিনীত সিনেমা হালদা। কিছুদিন আগে সিনেমাটি রিলিজ পেয়েছে, যেখানে তাকে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে। মানুষ তাকে সবসময় একজন কৌতুক অভিনেতা ও ইতিবাচক চরিত্রেই অভিনয় করতে দেখেছেন। অনেকটা সাহস নিয়ে তিনি নিজেকে ভিন্ন ধাঁচে উপস্থাপন করেছেন এবং তিনি নিরাশ করেননি। দর্শকরা তার অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছে।

জাহিদ হাসানের ভক্তরা জেনে খুশি হবেন, সম্প্রতি তিনি ‘কলকাতার সিতারা’ নামক একটি নতুন সিনেমাতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। কলকাতার জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আবুল বাশার রচিত উপন্যাস ‘ভোরের প্রসূতি’ অবলম্বনে সিনেমার গল্প তৈরি হয়েছে এবং সিনেমাটি পরিচালনা করবেন আশীষ রায়। এই ছবিতে তাকে দিলু নামক একজন দায়িত্ববান পুরুষের ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যাবে।

Source: amarphonebook.com

এত বছরের অভিনয় অভিজ্ঞতাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে লাগিয়ে একসময় তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। মেয়ের নামে তার একটি নিজস্ব প্রোডাকশন হাউজ রয়েছে, নাম পুষ্পিতা। তার প্রোডাকশন হাউজ থেকে বর্তমানে দুটি ধারাবাহিকের কাজ চলছে– ‘রাজু ৪২০’ ও ‘ভ্যাগাবন্ড’। দুই ধারাবাহিকের নাম ভূমিকায় তিনি অভিনয় করছেন, তবে দুই নাটকে তাকে দুটি ভিন্নরূপে দেখা যাবে।

সস্ত্রীক জাহিদ হাসান; Source: dailyinqilab.com

এবার তার বিবাহিত জীবন নিয়ে আলোকপাত করা যাক। অভিনয় করতে করতে একসময় অভিনয় জগতের এক মানুষকে তিনি ভালোবেসে ফেলেন। ভালোবাসা উভয় পক্ষ থেকেই ছিল। একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের শ্যুটিং চলাকালে সাদিয়া ইসলাম মৌ ও জাহিদ হাসানের মধ্যে ভালোলাগার জন্ম নেয়। গানটি ছিল “আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে…”। তাদের মাঝে প্রণয়ের সূত্রপাতে হয়ত এই গানের কথাগুলোর কিছু প্রভাব থাকলেও থাকতে পারে। একপর্যায়ে তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক বিয়ের সম্পর্কে গড়ায়। তবে ভালোবাসা থেকে বিয়ের মধ্যকার পথটুকু মোটেও সহজ ছিল না জাহিদ হাসানের জন্য। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তাকে বৌ হিসেবে ঘরে তুলতে পেরেছেন।

মৌ সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছুই নেই; তিনি একজন স্বনামধন্য মডেল, অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী। তারা দুজনই মিডিয়া জগতের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। বছরের পর বছর ধরে তারা একই ছাদের তলায় সুখে শান্তিতে বসবাস করছেন। তাদের ঘর আলো করে রয়েছে দুই সন্তান– মেয়ে পুষ্পিতা ও ছেলে পূর্ণ।

জাহিদ হাসান এমন একজন মানুষ, যিনি তার কর্ম ও ব্যক্তিজীবন, উভয়ক্ষেত্রেই একজন সফল মানুষ।

ফিচার ইমেজ: dailykalbela.com