একশন-এডভেঞ্চার বা ফ্যান্টাসি-ফিকশনের পাশাপাশি ড্রামা ধাঁচের মুভিগুলোর একটি অনন্য অবস্থান আছে। হাইটেক ফ্যান্টাসি কিংবা মাথা গুলিয়ে ফেলা কোনো থ্রিলার যেমন কিছু কিছু দর্শকের মন জয় করে নেয় তেমনই ভিন্ন এক দিক থেকে একদম সরল ও সাধারণ মুভিগুলোও তাদের নিজস্ব আবেদনের মাধ্যমে দর্শকের মন জয় করে নেয়। এসব মুভিগুলোতে সারল্যতাই তাদের শক্তি। এই ধাঁচের মুভিগুলোর মাঝে ছোট একটি শাখা ধাঁচ হচ্ছে বন্ধুত্বের জীবন ও জটিলতার মুভি। এসব মুভিকে বলা হয় ‘বাডি ফিল্ম’। ভালো হোক মন্দ হোক, প্রত্যেক মানুষেরই বন্ধু বা বান্ধবী থাকে এবং তাদের মাঝে টুকটাক জটিলতাও থাকে। বাডি ফিল্মগুলো তাদের কথাই বলে। জীবনের কথা বলে বলে এই ধাঁচের মুভিগুলো দর্শকের মনে অন্যরকম এক আদরের অবস্থান গড়ে নেয়।

এখানে এরকমই কয়েকটি ফ্রেন্ডশিপ মুভি নিয়ে আলোচনা করবো। ইতিহাসে বিখ্যাত ও বিশ্ববিখ্যাত অনেক বাডি ফিল্ম আছে। এদের নিয়ে অনেক আলোচনা আছে। এখানে আর সেগুলোকে না এনে কিছু ব্যতিক্রমী বাডি ফিল্ম নিয়ে আলোচনা করবো।

১. কপ কার- Cop Car (2015)

দুটি বাচ্চা ছেলে, ‘দোস্ত’ টাইপের বন্ধু, গলায় গলায় খাতির। বাড়ি থেকে পালিয়ে এডভেঞ্চারের নেশা নিয়ে মাইলের পর মাইল ঘাসের জমি পার হয়ে যাচ্ছে। শাসন থেকে দূরে গিয়ে ইচ্ছেমতো স্বাধীনতা ভোগ করছে। ৫০/৬০ মাইল দূরে জনমানবহীন এলাকায় দেখতে পায় একটি পুলিশের গাড়ি। ঘটনা কী রে? এত দূরে তো পুলিশ থাকার কথা নয়। মানুষই নেই, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের কী দরকার? হতে পারে পরিত্যক্ত গাড়ি, কিন্তু এটা চকচক করছে এবং কয়েক ঘণ্টা আগেও ব্যবহার হয়েছে এমন ছাপ লেগে আছে। এর পেছনে চাঞ্চল্যকর কিছু থাকতে পারে তা আর ছোট বাচ্চাদের কল্পনায় যায় না।

আট-দশ বছরের বাচ্চার কাছে এই ঘটনা যতটা মজার হিসেবে দেখা দেয় দর্শকের কাছে সেটা ততটা ‘মজাকর’ হয় না। এর পেছনে আছে গুরুতর কোনো কারণ। শুরু হয় সাসপেন্স আর উত্তেজনা। ঠাণ্ডা একটা মুভি। বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়, শেষও হয় বন্ধুত্বের দারুণ নিদর্শন দিয়ে। এই মুভি দেখলে ছোটবেলার কথাগুলো মনে পড়ে যায়। যদিও আমেরিকান সংস্কৃতির ছেলেবেলা থেকে আমাদের ছেলেবেলা একদমই ভিন্ন তারপরেও নস্টালজিক হয়ে যেতে হয়। কত সিরিয়াস ও বিপদজ্জনক জিনিস নিয়ে হেলাফেলা করছে, আমরাও যেমন ছোটবেলায় মাঝে মাঝে বড় ভুলে করে ফেলতাম, অনেকটা তেমন।

২. আনএক্সপেকটেড- Unexpected (2015)

সামান্থা (স্যাম) নামের একজন মাঝ-বয়সী মহিলা একটি স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করেন। তার অনেকগুলো ছাত্রীর মাঝে একজনের নাম জেসমিন। শিক্ষিকা স্যামের জীবনে একসময় একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়। পাশাপাশি তার ছাত্রী জেসমিনের জীবনেও একই ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়। দুজনের একই সমস্যা। দুইজনের অপ্রত্যাশিত ঘটনার কারণে তাদের মাঝে অপ্রত্যাশিতভাবে বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। মুভিটি একদমই ঠাণ্ডা। কাহিনীর মাঝে কোনো জটিলতা নেই, একদম সরল গতিতে চলে। কিন্তু তারপরেও বাস্তব অভিনয়ে মনকে মুগ্ধতার সাথে টেনে রাখে। অভিনয় এতটাই নিখুঁত হয়েছে যে, মনে হয় যেন বাস্তবে রক্ত মাংসে দেখছি। মুভিতে স্যাম গর্ভবতী থাকে। অভিনয়ের সময় তিনি (Cobie Smulders) সত্যিকারেই গর্ভবতী ছিলেন। পরিচালকের ধৈর্য আছে বলা যায়! এর পাশাপাশি শক্তিশালী একজন অভিনেত্রীকেও চেনা হয়ে যাবে এটি দেখলে।

৩. ভেরি গুড গার্লস- Very Good Girls (2013)

এটিও সরল কাহিনীর ঠাণ্ডা মুভি। দুই বান্ধবী, জীবন মরণের সই। মাধ্যমিক শেষ করে ফেলবে এমন সময়ের কাহিনী। তাদের দুজনেরই দুঃখ মাধ্যমিক শেষ করে ফেলছে অথচ এখনো তারা ভার্জিনই রয়ে গেল! কী আফসোস!! কী আফসোস!!! এদের দুজনের জীবনে আসে একটি ছেলে। সমস্যা হচ্ছে এক ছেলেকে ভালো লেগে যায় বান্ধবী দুজনেরই। প্রেমের ত্রিভুজ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তবে সমস্যাটি বহুল পরিচিত ত্রিভুজ সমস্যার মতো নয়। একটু অন্যরকম। তাদের মাঝে থাকা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ব্যাপক ঝামেলা পাকায়। নিজেদের সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা, বন্ধুত্বের সমস্যা সব মিলিয়ে অন্যরকম একটা মুভি। ঠাণ্ডা মুভি, ফুরফুরে সময়ে দেখতে খুবই ভালো লাগবে। একা একা দেখাই উত্তম। ব্যাকগ্রাউন্ডে সুন্দর সাউন্ডের পাশাপাশি অনেকগুলো শ্রুতিমধুর ভালো ভালো গান আছে (নাচ গান নয় কিন্তু)। মুভির শেষে Rilo Kiley এর গাওয়া Go Ahead গানটা খুব ভালো লেগেছে, বার বার শোনার মতো।

৪. ম্যারি এন্ড ম্যাক্স- Mary and Max (2009)

১৯৭৬ সালে ‘ম্যারি’ নামে অস্ট্রেলিয়ার ৮ বছরের এক মেয়ে ঘরকোনো হয়ে একা একা জীবন পার করছে। একই সময়ে হাজার মাইল দূরের একটি দেশ আমেরিকাতে বাস করছে নিঃসঙ্গ ও মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত একজন লোক। লোকটির নাম ‘ম্যাক্স’। দুজনেরই কোনো বন্ধু নেই। তখন ছিল কলমী বন্ধু (pen friend) হবার রীতি। এমন অবস্থায় অস্ট্রেলিয়া থেকে আমেরিকায় আসে ছোট একটি মেয়ের চিঠি। মেয়েটি বলে- “আমার নাম ম্যারি, আমার বয়স ৮ বছর। … তোমাদের আমেরিকাতে বাবু কীভাবে হয়? আমাদের অস্ট্রেলিয়াতে বাবুরা কফির মগ থেকে বের হয়ে আসে, আম্মু বলেছে। তোমরা তো অনেক ক্যান খাও, তোমাদের এখানে কি ছোট বাবুরা ক্যানের বোতল থেকে বের হয়?” এভাবে অসম বয়সের এক অসম বন্ধুত্বের সূচনা হয়। এরপর এগিয়ে যায় বন্ধুত্বের কাহিনী। খুবই অসাধারণ একটি মুভি।

৫. লিটল বয়- Little Boy (2015)

একটি অসম বন্ধুত্বের গল্প। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পটভূমিকে ‘কল্পনা’ করে নির্মিত। আমেরিকার এক ছোট শিশু আর আমেরিকায় থাকা জাপানী এক লোকের মাঝে তৈরি হওয়া বন্ধুত্বের অসম গল্প। তখনো হিরোশিমাতে ‘লিটল বয়’ নামক এটম বোমা ফেলা হয়নি। জাপানীরা ঐ উত্তপ্ত সময়ে অনেক আমেরিকানকে মারছিল, তাই আমেরিকায় থাকা জাপানী লোকের প্রতি সকলের ঘৃণা উপচে পড়ে। মুভিটা মনকে খুবই ছুঁয়ে যায়। খুব আবেগী মুভি। আবেগী হলেও সমালোচক দৃষ্টিকোণ থেকে নেতিবাচক রিভিউ পায় এটি। কারণ পুরো মুভিটাই কাল্পনিক। কাল্পনিক হলেও কোনো সমস্যা ছিল না, সমস্যা হয়েছে এখানে ২য় বিশ্বযুদ্ধের এমন কিছু জিনিসকে ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলো খুবই গুরুতর। এই মুভি দেখে এর কাহিনী বিশ্বাস করলে ইতিহাসের অনেক কিছুই মিথ্যা হয়ে যাবে। তবে সত্য মিথ্যা যাই হোক, ফিকশন হচ্ছে ফিকশন। হোক না নেতিবাচক রিভিউ, মন ছুঁয়ে যাওয়া কোনো কিছু বাদ যেন না যায়।

৬. অল ক্রিয়েচার্স বিগ এন্ড স্মল- All Creatures Big and Small (2015)

ইংরেজি ভাষার ইতালীয় মুভি। এনিমেটেড জনরা। ছোটদের আগ্রহের হেয়ালি পটভূমিতে নির্মিত। নূহের মহাপ্লাবনের সময়কাল, প্রবল বন্যা থেকে প্রাণীদের বাঁচতে হলে নূহের তৈরি জাহাজে উঠতে হবে। কিন্তু সমস্যা বাধিয়েছে Noah (নূহ)-এর দেয়া তালিকা। তিনি তার তালিকায় বলে দিয়েছেন কোন কোন প্রজাতি জাহাজে আশ্রয় নিতে পারবে। যারা তালিকায় নেই তারা বাদ। বাদ পড়ে যাওয়া এক প্রজাতির প্রাণী আবার বন্ধুত্বের জন্য খুব পাগল। খুব ইচ্ছুক হলেও কারো সাথে বন্ধুত্ব করতে পারে না। দুঃখজনকভাবে বাদ পড়ে যাওয়ার ফলে অপ্রত্যাশিতভাবেই একজনের সাথে বন্ধু হবার রাস্তা খুলে যায়। শুরু হয় শুরু হয় এডভেঞ্চার।

০৭. ম্যাক্স- Max (2015)

সামরিক বাহিনীর কাজে কুকুরকে ব্যবহার করার রীতি প্রায় শত বছর আগে থেকেই প্রচলিত। আমেরিকায় এই ধরনের প্রশিক্ষিত কুকুর প্রচুর ব্যবহার করা হয়। তীক্ষ্ণ ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তি থাকার কারণে যে কাজ মানুষ তার স্বাভাবিক ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে করতে পারে না সেই কাজ প্রশিক্ষিত কুকুর সহজেই করতে পারে। যে সকল সৈনিক তাদের নিয়ন্ত্রণ করে বা দেখাশোনার দায়িত্বে থাকে তাদের সাথে মাঝে মাঝে কুকুরদের চমৎকার বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয়। এরকমই কুকুর ও মানুষের বন্ধুত্বের গল্প বলা হয়েছে ম্যাক্স নামের মুভিতে।

০৮. জুটোপিয়া- Zootopia (2016)

চমৎকার একটি শহর আছে, নাম জুটোপিয়া (Zootopia)। যত ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে সবাই মিলে থাকে এই শহরে। বলা যায় স্তন্যপায়ীদের মেট্রোপলিটন শহর। শুধুমাত্র মানুষ নেই ওখানে। এই রাজ্যে সবাই রাজা। সবাই সবার ইচ্ছামতো নিজেকে গড়তে পারে। খরগোশ হতে পারে পুলিশ অফিসার, ইঁদুর হতে পারে আন্ডারওয়ার্ল্ডের গডফাদার, ভালুক হতে পারে ইঁদুরের বডিগার্ড, শেয়াল হতে পারে আইসক্রিম বিক্রেতা। বন্ধুত্ব আর ভালোবাসাও যে একই প্রজাতির মাঝে হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আলাদা আলাদা প্রজাতির মাঝেও বন্ধুত্ব বা ভালোবাসা যায় এখানে। খরগোশ হতে পারে শেয়ালের বন্ধু, ভেড়া হতে পারে খরগোশের বন্ধু।

সুখে শান্তিতে থাকার মতো এই শহরটিতে হঠাৎ করে ১৪/১৫ টি মাংসাশী প্রাণী নিখোঁজ হয়ে গেল। এরপর শুরু হয় এডভেঞ্চার আর বন্ধুত্বের কাহিনী। এনিমেটেড জেনারের এই মুভিটি ছেলে বুড়ো সকলের দেখার উপযোগী।

০৯. হোম- Home (2015)

অসম্ভব সুন্দর। প্রথমবার দেখার পরে যতই দেখি ততোই ভালো লাগে। বুভ নামের এক এলিয়েন জাতি শত্রুর ভয়ে পালিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। কোথাও গিয়ে বাঁচতে পারে না। শেষমেশ এসে ঠাই মিললো পৃথিবীতে। এখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম। আস্তানা গাড়লো, সব মানুষকে পাঠিয়ে দিল একটা মহাদেশে আর বাকি মহাদেশগুলো হয়ে গেল বুভদের। একটা মানুষ মেয়ে কোনো একভাবে থেকে যায় এখানে। অন্যদের সাথে যেতে পারেনি। একা, মা নেই কাছে। খুঁজে বের করতে হবে। অন্যদিকে বুব জাতিদের মাঝে একটা ‘মাথা নষ্ট’ সদস্য উলটা পালটা কাজ করে বসে। শাস্তি হবে, তাই পালাতে হবে। মানুষ মেয়ে আর বুব ছেলে মিলে শুরু হয় ভ্রমণ-এডভেঞ্চার। ধীরে ধীরে দুই গ্রহের দুই প্রজাতির মাঝে তৈরি হয় বন্ধুত্ব। নির্মল হাস্যরস ও হিউমার সিনেমাটিকে খুবই ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। অসাধারণ এক বন্ধুত্বের গল্প। ইনসাইড আউটকে বাদ দিলে বলা যায় ২০১৫ সালের সবচেয়ে সুন্দর এনিমেটেড সিনেমা।

মন্তব্য

এখানে একটি ব্যাপার খেয়াল করতে হবে, এগুলো আমার দেখা সাম্প্রতিক কিছু মুভি। এই মুভিগুলোর বাইরে অনেক ভালো ভালো বাডি ফিল্ম আছে, যেগুলো এখানে আলোচনা করা হয়নি। তাই আপনাদের মনে স্থান করে নেয়া অনেক মুভি এই তালিকায় নাও থাকতে পারে।

The following article is a review on some of the best buddy-movies.

Featured image: Fmovies- unblocked