এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

বাংলাদেশের প্রথম নারী পাইলট ফারিয়া লারার বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাবার খবরটা এখনকার তরুণ প্রজন্মের অনেকেই হয়তো ছোটবেলায় দেখেছেন, সংবাদপত্রে বা টিভিতে। সেই লারাকে নিয়ে তার মায়ের লেখা বইটি নিয়েই আজ কথা বলব।

ফারিয়া লারা হোসেন। জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মেয়ে। জন্মের সময় মায়ের বেশ কষ্ট হয়েছিল। যদিও সন্তান জন্মদানে সব মায়েরই কষ্ট হয়। ১৯৭০ সালে তার জন্ম। ছোট থেকেই বেশ তুখোড় ছিলেন তিনি। নতুন কুঁড়ি সহ বেশ অনেক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি প্রাইভেট পাইলট লাইসেন্স এবং ১৯৯৮ সালে বাণিজ্যিক পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন।

এরই সাথে ফারিয়া লারা ১৯৯৪ সালে ইংরেজিতে এম.এ. পাশ করেন। ১৯৯৮ সালে বাণিজ্যিক লাইসেন্স পাবার পরপর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রায় পঞ্চাশ ঘণ্টার এই প্রশিক্ষণের শেষ দিনে তার বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। আকাশের মাঝে হারিয়ে গেল এক জ্বলন্ত নক্ষত্র। 

পাখির মতোই চঞ্চল ছিল লারা; Image Source: Facebook

পাখির মতোই চঞ্চল ছিল লারা। বোন মুনা আর মা ছিল তার বন্ধু। মাকে তর্কে হারিয়ে বোধহয় লারা বেশ আনন্দ পেত। নিজের জন্মের গল্প আর তার নাম কীভাবে 'লারা' হলো, সে গল্প বারবার শুনতে চাইত লারা। ডক্টর জিভাগোর একটা উপন্যাস পড়ে সেলিনা হোসেন রেখেছিলেন তার নাম। এরপরে নিজেই হাজারবার শোনা নিজের জন্মের গল্প মাকে বলে যেতে থাকত। 

লারা নিজের জন্মের গল্প জানে, এর আগের গল্প জানে না। কিছুটা অপ্রত্যাশিতভাবেই এসেছিল সে, পৃথিবীকে দেখার এক ব্যগ্রতা ছিল তার। বোধকরি তীব্র এক আকাঙ্ক্ষা ছিল তার আকাশের পাখি হবার। লেখিকা, বেশ ভয় পেয়েছিলেন, কেন জোর করে কোলে আসতে চাইছে এই শিশু? 

'ইউরা জিভাগো'র লেখা বইটিতে লারা ছিল প্রচণ্ড মেধাবী আর পরিশ্রমী, মায়াবতী। 

এই বইয়ের একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে। মাঝে মাঝে লেখক, লেখক হয়ে লিখেছেন; মাঝে মাঝে লিখেছেন লারা হয়েই। খুব অদ্ভুত। সেলিনা হোসেন আর লারা মিলে মিশে এক হয়ে গেছে। সেলিনা হোসেনের ডাক নাম কুমু, মুনা-লারা, দু’বোন নিজেই মাঝে মধ্যে মাকে ডাকে কুমু বলে, পরক্ষণে সে নিজেই কুমু হয়ে যায়। মায়ের মুখে খালার মৃত্যুর গল্প শুনতে শুনতে সে নিজেই চোখের সামনে সব দেখে। হঠাৎ আবার স্বরূপে এসে মা আর মুনার সাথে আড্ডা দেয়। 

একদিকে আকাশ যেমন লারার প্রিয় ছিল, তেমনি আকাশে উড়ে বেড়ানোর বড্ড শখ ছিল, সেটা হতে পারে পাখি, কিংবা প্রজাপতি। মুক্ত চিন্তা, মুক্ত জীবনের লক্ষ নিয়েই সে পথ চলছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত ছিল তার প্রিয়। দোভাষীর কাজ করে টাকা জমিয়ে সে ফ্লাইং শিখত; ২০০ ঘণ্টা ফ্লাইং করে সে লাইসেন্স পেয়েছিল। স্বাধীনচেতা লারাকে মা যদি প্রশ্ন করতেন, কবে ফিরবে কিংবা কখন ফিরবে, সে একটু রেগে যেত। কারণ সে বাঁধা-ধরা সময়ের ছকে বিশ্বাস করত না। সে যে ছিল মুক্ত বিহঙ্গ। আকাশ তার ঠিকানা আর সীমানা। দেশে- বিদেশে, আনাচে-কানাচে কত মানুষ তাকে চিনত, তাকে ভালবাসত। লারাকে বড্ড আপন লাগে সবার। যেন নিজের আত্মার আত্মীয় কেউ। 

লারা নিজের মায়ের পরিচয়ে পরিচিত হতে চাইত না। কারণ সে নিজের নাম নিজে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। পেরেছিল সে, পাইলট লারা হতে, যাকে আজো তার নামেই চেনে সবাই।

লারা যে প্লেন চালাত, সেটার যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল বেশ কিছু। সে-ও বোধহয় তার মৃত্যুর কথা বুঝতে পেরেছিল। তাই বারবার নিজের মৃত্যুর কথা বলত। কেন বলত? হেসে উড়িয়ে দিলেও বোধহয় সে হাসির আড়ালে ছিল একটা চাপা কষ্ট।  

নিজে সাহস নিয়ে যেভাবে ফ্লাইং স্কুলে ভর্তি হয়েছিল, সেই একই সাহস নিয়ে নিজের এনগেজমেন্ট ভেঙ্গে দেবার কথা বলেছিল। কারণ? বাবার নাম লেখা নিয়ে। জন্মদাতা পিতার নাম লিখতে চেয়েছিল বরপক্ষ কাবিননামায়, কিন্তু লারার কথা, যে বাবা তাদের সুখে-দুখে পাশে ছিল, এতকাল ধরে বড় করে চলেছে, তার নাম লিখবে সে। জন্মদাতার চাইতে পালনকারী পিতাকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল সে।

এভাবেই লারার জীবনের দিন যেতে যেতে এল ১৯৯৮ সাল। সেদিন রাতে তিনটার সময় লারা আধো ঘুমে ছিল, মা সেলিনা হোসেন গিয়ে রুমের লাইট বন্ধ করে দিয়ে এল। খুব ভালোভাবে মেয়ের চেহারা দেখেননি তিনি। পরদিন সকালে নিজে পোলাও গরম করে খেয়ে, স্যান্ডউইচ সাথে নিয়ে বাবাকে বলে লারা বেরিয়ে গেল। মায়ের সাথে দেখা হল না, মা ঘুমোচ্ছিল। দুপুরে তার ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সে আর ফেরেনি। মায়ের সাথে তার শেষ দেখা আর হয়নি।

অফিস থেকে গাড়ি মাকে নিয়ে এল এয়ার পারাবতের অফিসে, মা জানলেন মেয়ের বিমান ক্র্যাশ করেছে।

অবশেষে কাঠের বাক্সে বন্দী হয়ে সাদা কাপড়ে বলপেন দিয়ে লেখা লারা এল। লারা ফিরল মায়ের কাছে। 

ঘুমিয়ে গেছে পাখিটি; Image Source: Facebook 

মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ঘুমিয়ে আছে সে। চঞ্চলমতি পাখিটি থেমে গেছে চিরতরে, আর আকাশে হারিয়ে যায় না। নক্ষত্রের মতো হারিয়ে গেছে। 

লারার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর আগে মুনা ফিরে আসে, লন্ডন থেকে। এক চীনা নারী নাকি আত্মা নামাতে পারে, সেই অচেনা নারী জানায় মুনা-লারা-শমিকের মামা, কর্ণেল তাহেরের কথা, সে জানায় লারা নাকি মুনার স্বামীর মাধ্যমে নীল পোর্সেলিনের এক হাতি পাঠিয়েছে, যা মুনা কেবল জানত। লারার মতো অঙ্গভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে থেকে সেই নারী কি আসলেই আনতে পেরেছিলেন আত্মাকে?

প্রিয় প্রজাপতি পোড়ে কেন? 

যারা বইটা এখন ও পড়েননি, পড়ে দেখতে পারেন। অনেক অদ্ভুত আর সত্যি কথা জানতে পারবেন। জানতে পারবেন, প্রজাপতির মতো চঞ্চল এক মেয়ের ক্ষুদ্র কিন্তু রোমাঞ্চকর জীবনকে। পড়তে পড়তে আপনি নিজে কুমু হয়ে উঠবেন, কখনও হবেন লারি বা লারা। লেখিকা এটিকে উপন্যাস বললেও এ যেন এক আত্মজীবনী, লারা আর কুমুর জীবনী। ফ্ল্যাপে লেখা কথাগুলো যেন পাঠকের নিজের সময়কেও আটকে দিয়েছে নষ্ট হয়ে যাওয়া ঘড়ির মতো। 

ফ্ল্যাপে লেখা কথাগুলো; Image Credit: Author

লেখিকা সেলিনা হোসেনের সাথে পরিচয় সেই ছোটবেলায়, একটা নামে 'হাঙ্গর নদী গ্রেনেড'। তার লেখা উপন্যাস থেকে নির্মিত সিনেমা। মা তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন দেশের জন্য, সেই দৃশ্য যেন আজও চোখে গেঁথে আছে।

লেখিকা আর লারা; Image Source: Author

অনলাইন থেকে বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করতে পারেন নিচের লিঙ্কে

১) লারা

This is a Bangla article. This is a review of the book 'Lara' written by Selina Hossain. This about a deceased Bangladeshi female pilot Fareea Lara Hossain who was also the author's daughter.

Featured Image: Facebook