রেবেকা থেকে সাইকো: মাস্টার অব সাসপেন্স আলফ্রেড হিচকক

সিনেমা দেখতে ভালোবাসেন? কোন ধরণের সিনেমা? রোমান্টিক, ড্রামা, অ্যাকশন, সায়েন্স ফিকশন অথবা সাসপেন্সে ভরা থ্রিলার? যদি থ্রিলার হয় আপনার পছন্দ, তাহলে একজন ব্যক্তির নাম আপনার মাথায় গেঁথে যাবার কথা। আর তিনি হলেন সিনেমায় সাসপেন্সের জনক আলফ্রেড হিচকক। এই কিংবদন্তি চলচ্চিত্র পরিচালকের আজ ১১৮তম জন্মদিন। তার স্মৃতিচারণ করার আজই তো সঠিক সময়।

প্রাথমিক জীবন ও কিছু ঘটনা

আলফ্রেড হিচকক (১৮৯৯-১৯৮০); image source: thefamouspeople.com

১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন কিংবদন্তী ব্রিটিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচকক। উলিয়াম হিচকক এবং এমা হিচককের তিন সন্তানের মধ্যে আলফ্রেডই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। স্থানীয় স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি সেন্ট ইগনাটিয়াস কলেজে ভর্তি হন। পরে লন্ডনের কান্ট্রি কাউন্সিল স্কুলে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা করেন। ১৯১৪ সালে এখানে পড়াশোনা শেষ করে তিনি একটি টেলিগ্রাফ কোম্পানিতে সেলস ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরু করেন। ১৯১৮ সালে তিনি বিজ্ঞাপন নির্মাণ ডিপার্টমেন্টে চলে আসেন। এ সময় তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। তবে পড়ালেখার জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত অসফল। স্কুল, কলেজ সর্বত্রই তিনি ছিলেন মাঝারি মানের ছাত্র। যা-ই হোক, বিজ্ঞাপন নিয়ে কাজ করতে করতে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ হয়ে ওঠা হিচকক ১৯২২ সাল থেকে স্বাধীনভাবে বিভিন্ন প্রযোজকের সাথে চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেন। প্রথমে আর্ট ডিরেক্টর, পরে প্রোডাকশন ডিজাইনার, এডিটর, অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার হিসেবেও কাজ করেন।

ভবিষ্যতের ‘মাস্টার অব সাসপেন্স’ আলফ্রেড হিচকক একবার শৈশবে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ‘জ্যাক দ্য রিপার’ এর পাল্লায় পড়েছিলেন! জ্যাকের হাতে খুন হননি ঠিকই, তবে মনের মধ্যে একটা ভীষণ রকমের একটা ভয় ঠিকই ঢুকেছিল তার। কে জানে সেই ভয়টাই তিনি তার ছবির মাধ্যমে দর্শকদেরও পাইয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন কিনা! তাছাড়া আরো দুটি ভাই-বোন থাকলেও শৈশবটা তার কাটে একাকী নিরানন্দভাবে। কারণ তার বাবা উইলিয়াম ছিলেন কঠোর নিয়মনিষ্ঠ ব্যক্তি। শিশুসুলভ চঞ্চলতাও তিনি তার সন্তানদের মধ্যে দেখতে চাইতেন না। একবার কিছু পুলিশ এসে বালক আলফ্রেডকে থানায় নিয়ে যায় এবং বেশ কিছুক্ষণ জেলে বন্দী করে রাখে। ভয়ে অস্থির হিচকক ভেবে পাচ্ছিলেন না কী এমন দোষ তিনি করেছিলেন। পরে জানা যায় তার বাবা উইলিয়াম ওসিকে অনুরোধ করেই এ কাজ করিয়েছেন যেন হিচকক অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারেন!

হিচককের প্রথম ছবি

দ্য প্লেজার গার্ডেন ছবির পোস্টার; image source: foldingseats.wordpress.com

পরিচালক হিসেবে আলফ্রেড হিচককের শুরুটা একেবারেই ভালো হয়নি। ১৯২২ সালের শেষের দিকে তিনি ‘মিসেস পিবডি’ নামক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করলেও অর্থাভাবে এর কাজ মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। পরের বছর ‘সিমোর হিকস’ এর সাথে যৌথ পরিচালনায় নির্মাণ করেন ‘অলয়েজ টেল ইয়োর ওয়াইফ’। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ছবিতে পরিচালক হিসেবে তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয়নি। অবশেষে ১৯২৫ সালে ‘দ্য প্লেজার গার্ডেন’ হয় তার একক পরিচালনায় প্রথম ছবি। অবশ্য মেলোড্রামা জনরার এই ছবিটি মাঝারি বা নিম্নমানের বললেও ভুল হবে না। প্রথম যে ছবিতে তার প্রতিভার সামান্য হলেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় সেটি হলো ‘দ্য লজার: এ স্টোরি অব দ্য লন্ডন ফগ’। ১৯২৬ সালে আলফ্রেড হিচকক ফিল্ম এডিটর এবং স্ক্রিপ্ট সুপারভাইজার আলমা রেভেলকে বিয়ে করেন। পরের বছর পরিচালনা করেন তার প্রথম ক্রিটিকাল সাফল্য ‘দ্য রিং’।

মূক থেকে সবাক হিচকক

১৯২৯ সালে মুক্তি পায় হিচককের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘ব্লাকমেইল’। থ্রিলার জনরার এই ছবিটি সে বছর ইংল্যান্ডের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি ছিল। পাশাপাশি ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম ছবি ব্লাকমেইল, যার প্রতিটি দৃশ্যে শব্দ সিনক্রোনাইজ করা হয়েছে। সে বছরই থ্রিলার ছবি নির্মাণে নিজের পারদর্শীতা আরো এক ধাপ উপরে নিয়ে যান হিচকক তার ‘জুনো অ্যান্ড দ্য পেকক’ ছবিটির মাধ্যমে। এরপর মার্ডার, সেভেনটিনথ, দ্য স্কিন গেম, ভিয়েনা ইত্যাদি মুভির মাধ্যমে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন আলফ্রেড হিচকক।

image source: torrentbutler.eu

প্রথম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি

গোমাউন্ট ব্রিটিশ চলচ্চিত্র কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ১৯৩৪ সালে হিচককের পরিচালনায় মুক্তি পায় ‘দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ’, যা ছিল হিচককের ক্যারিয়ারের ইংল্যান্ডের বাইরে মুক্তি পাওয়া প্রথম ছবি। ক্রাইম ড্রামা জনরার ছবিটি ব্যবসাসফল হবার পাশাপাশি হিচকককে এনে দেয় পরিচালক হিসেবে খ্যাতি। পরবর্তীতে ‘দ্য ৩৯ স্টেপস’(১৯৩৫) এবং ‘সিক্রেট এজেন্ট’ ছবিদুটির মাধ্যমে হিচকক এক কথায় একটি নতুন জনরার সূচনা করেন যার নাম রোমান্টিক থ্রিলার।

১৯৩৬ সালে কিছুটা যেন ছন্দপতন ঘটলো আলফ্রেড হিচককের। সে বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাবোটেজ’ না ব্যবসায়িক সফলতা পায়, না সমালোচকদের প্রশংসা। কেননা থ্রিলার মুভি নির্মাতা হিসেবে ততদিনে হিচককের বেশ সুনাম। সাবোটেজ ছবিটি ঠিক হিচককের মনে হয়নি। তার চেয়ে বরং পরের বছর মুক্তি পাওয়া ‘ইয়াং অ্যান্ড ইনোসেন্ট’ চলচ্চিত্রটিতে ভালো সাসপেন্স ছিল।

image source: youtube.com

মার্গারেট লকউড নামের এক মহিলা ভ্রমণ করছিলেন ট্রেনে। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন যে তার পাশের অন্য মহিলা যাত্রীটি আর নেই। কোথায় গেল সে? মার্গারেট ওয়াশরুমে খোঁজ করলেন। তারপর অন্যান্য বগিতে। কিন্তু কোথাও নেই সে। চলন্ত ট্রেন থেকে যাবে কোথায় মহিলা? নিজের বগিতে ফিরে এসে যখন অন্যান্য যাত্রীদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন তখন দেখা গেল তারা সে মহিলার কথা মনে করতে পারছে না! তাহলে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য আছে। পুরোটা জানতে দেখতে হবে ‘দ্য লেডি ভ্যানিশেস’(১৯৩৮)। এই ছবিটি তখন পর্যন্ত ইংল্যান্ড এবং আমেরিকা, উভয় বাজারে হিচককের সবচেয়ে বেশি আয় করা ছবি হয়। এই ছবিটি দেখেই আমেরিকান প্রযোজক রবার্ট সেলজনিক (যিনি মূল্যস্ফীতি হিসেব করলে পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি ‘গন উইথ দ্য ওয়াইন্ড’-এ অর্থায়ন করেছিলেন) আলফ্রেড হিচকককে আমেরিকায় গিয়ে ছবি বানাতে আমন্ত্রণ জানান এবং তাকে চুক্তিবদ্ধ করেন। হলিউডে যাবার আগে হিচককের শেষ ছবি ছিল ‘জ্যামাইকা ইন’।

হলিউডে হিচকক

আলফ্রেড হিচকক হলিউডে চলে যাওয়ায় ব্রিটিশ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা দায়। তার চেয়ে বরং হলিউডে গিয়ে হিচকক যে ছবিগুলো উপহার দিয়েছেন সেগুলো দেখলেই সহজে বোঝা যাবে। ১৯৪০ সালে হলিউডে প্রথম বছরই হিচকক উপহার দিলেন সমালোচকদের প্রশংসায় ভাসা এবং একই সাথে বক্স অফিস কাঁপানো ছবি ‘রেবেকা’। ছবিটি সে বছর সেরা ছবির জন্য অস্কার পুরস্কার লাভ করে আর হিচকক লাভ করেন সেরা পরিচালকের জন্য প্রথম অস্কার মনোনয়ন। ১৯৪১ সালের ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস স্মিথ’ ছিল হলিউডে তার প্রথম এবং শেষ কমেডি ছবি, যদিও ছবিটি ব্যবসাসফল হয়েছিল।

রেবেকা ছবির একটি দৃশ্যে অভিনয় করেন আলফ্রেড হিচকক; image source: alfredhitchcockgeek.com

এরপর ১৯৪১-১৯৪৩ সালে একে একে মুক্তি পায় সাসপিকন, স্যাবোটিয়ার এবং শ্যাডো অব ডাউট। তবে ১৯৪৩-৪৪ সালে নির্মিত হিচককের ‘লাইফবোট’ ছবিটি সমালোচকদের মাঝে সাড়া ফেলে দেয়। কেননা সম্পূর্ণ ছবিটি হিচকক তৈরি করেছিলেন কেবল একটি লাইফবোটকে কেন্দ্র করে! তবে ১৯৪৫ সালে হিচককের পরিচালিত ‘স্পেলবাউন্ড’ ছবিটি আক্ষরিক অর্থেই আমাদেরকে স্পেলবাউন্ড বা হতবাক করে দিয়েছিল। সাইকোলজিক্যাল মিস্টেরি ঘরনার ছবিটিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ইনগ্রিড বার্গম্যান। ছবিটির আর্ট বিভাগে কাজ করেছিলেন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভাদর ডালি। এছাড়াও ছবিটির স্বপ্নের দৃশ্যের সেট ডিজাইন করেন ডালি। হিচকক যদিও ছবিটি নিয়ে হতাশ ছিলেন, এই ছবি তাকে এনে দেয় অস্কারে সেরা পরিচালকের জন্য তৃতীয় মনোনয়ন। মনোনয়ন পাবার পর যখন ছবিটি সম্বন্ধে হিচককের নিকট জানতে চাওয়া হয়, তিনি অবজ্ঞার স্বরে বলেছিলেন, “জাস্ট অ্যানাদার মুভি!

প্রযোজক সেলজনিকের সাথে আলফ্রেড হিচককের শেষ ছবি ছিল একটি কোর্টরুম ড্রামা ‘দ্য প্যারাডাইন কেস’। এরপরই হিচকক নিজের চলচ্চিত্র নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সআটলান্টিক পিকচারস’ প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের কোম্পানি থেকে নিজের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘রোপ’ পরিচালনা করেন ১৯৪৮ সালে। ছবিটি ১৯২৪ সালের অত্যন্ত আলোচিত ‘লিওপোল্ড হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে তৈরি হয়েছিল। বাস্তব কাহিনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি ছবিটি অধিক আলোচিত হয়েছিল হিচককের চতুর ফিল্মিং এর জন্য। আশি মিনিটের পুরো ছবিটি দেখলে মনে হবে যেন কেবল একটাই দীর্ঘ শটে পুরো ছবি শেষ করা হয়েছে!

১৯৫০ সালে হিচকক ওয়ার্নার ব্রাদারসের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। শুরুটা ভালো হয়নি মোটেও। প্রথম ছবি ‘স্টেজ ফাইট’ বক্স অফিসে সুবিধা করতে পারেনি। আর সমালোচকরাও হতাশা প্রকাশ করেন একটি ‘হিচককীয়’ মানের ছবি থেকে বঞ্চিত হয়ে। তবে পরের বছরই দুর্দান্তভাবে ফিরে আসেন হিচকক। ‘স্ট্রেঞ্জার অন এ ট্রেন’ ছবিটি ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাসপেন্সে ভরপুর। এরপর ১৯৫৪ সালে মুক্তি পায় হিচককের আরো একটি মাস্টারপিস থ্রিলার ‘ডায়াল এম ফর মার্ডার’। রে মিলান্ড নামক এক ব্যক্তি তার স্ত্রী গ্রেস কেলির প্রতি সন্দেহের জের ধরে তাকে হত্যা করতে গুপ্তঘাতক পাঠায়। কিন্তু ঘটনাক্রমে ঘাতক কেলিকে হত্যা করতে পারে না এবং নিজে মারা যায়। পরে মিলান্ড যে ঘরে ঘাতক ব্যক্তিটির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে সেখানে সবকিছু এমনভাবে সজ্জিত করেন যেন পুলিশের মনে হয় যে কেলিই খুনী। পরে কেলিকে রক্ষা করতে আবির্ভাব হয় তার বন্ধুর। আর এভাবেই এগোতে থাকে ছবির ঘটনাক্রম।

নিজের অনেক ছবিতেই অভিনয় করেন পরিচালক হিচকক, এই দৃশ্যটি ডায়ল এম ফর মার্ডার থেকে; image source: alfredhitchcockgeek.com

প্যারামাউন্টে হিচকক

আলফ্রেড হিচককের ক্যারিয়ারে সবচেয়ে সফল দুটি অধ্যায় হচ্ছে ১৯৩৪-৩৮ এবং ১৯৪০-৪৬ সাল পর্যন্ত সময়কাল। এ সময় তার ছবিগুলো শুধু ব্যবসায়িকভাবে সফলই হয়নি, কুড়িয়েছিল সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা। তবে প্যারামাউন্ট পিকচার্সে যোগ দিয়ে হিচকক যে সব ছবি তৈরি করলেন তা তার আগের সকল সাফল্যকে ছাড়িয়ে গেল। তিনি সাফল্যের ও শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় উঠেছিলেন এই প্যারামাউন্টে এসেই। প্যারামাউন্টের সাথে হিচককের প্রথম ছবি ‘রিয়ার উইন্ডো’ (১৯৫৪) তাকে এনে দিয়েছিল তার চতুর্থ অস্কার মনোনয়ন। পরের বছর আলফ্রেড হিচকক নিজের উদ্ভাবিত রোমান্টিক থ্রিলার জনরাতে আরো একবার ঘুরে আসেন ‘টু ক্যাচ এ থিফ’ ছবি পরিচালনা করে। তবে একই বছর তার পরিচালিত ছবি ‘ট্রাবল উইথ হ্যারি’ বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। আর রিয়ার উইন্ডোর মতো চমৎকার ছবির পর এরকম ছবি বানানোয় সমালোচকরা তো একেবারে ধুয়েই দিয়েছিল হিচকককে।

image source: dvd.netflix.com

১৯৫৫-৬২ সাল পর্যন্ত অধিক পরিমাণ দর্শকের নিকট পৌঁছাবার লক্ষ্যে তিনি নাটক/সাহিত্য/থ্রিলার/রহস্য ইত্যাদির সংকলন নিয়ে একটি টিভি-শো সঞ্চালনা শুরু করেন যার পরিচালক এবং পরিকল্পনাকারীও তিনি নিজেই ছিলেন। ‘আলফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস’ নামের এই অনুষ্ঠানটি নিউইয়র্ক টাইমসের সেরা ১০০ টিভি-শো এর একটি হবার সম্মান লাভ করে। ১৯৬২-৬৫ সালে এই অনুষ্ঠানের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘আলফ্রেড হিচকক আওয়ারস’ হয়। এই টিভি-শো তখনকার সময়ে আলফ্রেড হিচকককে করে তোলে সমসাময়িক পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পরিচিত চলচ্চিত্র পরিচালক। ১৯৫৬ সালে হিচকক তার ১৯৩৪ সালের মুক ছবি ‘দ্য ম্যান হু নিউ টু মাচ’ এর রিমেক তৈরি করেন। একই বছর তার পরিচালিত ‘দ্য রঙ ম্যান’ ছবিটিও বেশ জনপ্রিয়তা পায়।

কেউ বলেন আলফ্রেড হিচককের সেরা মাস্টারপিসগুলোর একটি, আবার কেউ বলে থাকেন ইতিহাসেরই অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি ১৯৫৮ সালে মুক্তি পাওয়া সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘ভার্টিগো’। স্টুয়ার্ট নামক এক পুলিশ অফিসারের ভয়, প্রেম এবং মানসিক যন্ত্রণা ঘিরে আবর্তিত হয় ছবির গল্প। উচ্চতায় ভীতি থাকার কারণে বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হয় স্টুয়ার্টকে। তখন তার এক ধনী বন্ধু স্টুয়ার্টকে ঐ ব্যক্তির স্ত্রীর উপর নজরদারি করার কাজ দেয়। স্টুয়ার্ট সে কাজ করতে গিয়ে একসময় ঐ নারীর প্রেমে পড়ে যায় এবং পরবর্তীতে একপ্রকার মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে। যা-ই হোক, হিচককের এই অসাধারণ ছবিটি অবিশ্বাস্যভাবে বক্স অফিসে কোনোরূপ সাড়া ফেলতে পারেনি। এমনকি সে বছর অস্কারেও কোনো মনোয়ন পায়নি!

image source: dvd.netflix.com

ভার্টিগোর ব্যর্থতা দ্রুত পাশ কাটিয়ে ১৯৫৯ সালে হিচকক পরিচালনা করলেন রোমান্টিক থ্রিলার ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’। ছবিটিকে তার ‘দ্য ৩৯ স্টেপস’ এবং ‘সাবোটিয়ার’ এর মিশ্রণ বলা যেতে পারে। ছবিটি ব্যবসাসফল হয়েছিল।

১৯৬০ সালে আলফ্রেড হিচকক পরিচালনা করলেন তার সবচেয়ে আলোচিত বিস্ময়কর ছবি ‘সাইকো’। এই ছবি মুক্তির পর সিনেমা পাড়ায় সাড়া পড়ে যায়। এমন ছবিও বানানো সম্ভব! সমালোচকরা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। আর দর্শকরা ভীত বিহ্বল কিন্তু ছবির জন্য পাগল! হ্যাঁ, থ্রিলার জনরার ছবিকে অনন্য এক উচ্চতায় স্থাপন করে সাইকো। সাসপেন্সের সুদক্ষ প্রদর্শনীতে দর্শকের কপালে ঘাম জমাতে বাধ্য করে সাইকো।

সাইকো ছবির বিখ্যাত শাওয়ারের দৃশ্য; image source: moviemadness.com

ছবির প্রথমে আপনি যাকে নায়িকা ভাববেন, সেই সুন্দরী ম্যারিয়ন ক্রেন যখন আবার টাকা আত্মসাৎ করে পলায়নরত, তখন আপনি তাকে ভাববেন প্রধান খল চরিত্র। তবে এরপরই দৃশ্যপটে আবির্ভাব হবে শান্তশিষ্ট এবং তলে তলে বাতুলতার লেজ বিশিষ্ট জনাব নরম্যান বেটসের। অতি বিখ্যাত এবং পিলে চমকানো শাওয়ারের দৃশ্যে যখন ম্যারিয়নকে খুন করা হবে, তখন আপনি ঘুণাক্ষরেও টের পাবেন না আসল সাইকো কে। আর এভাবেই সাইকোর সাইকোপনায় আপনার কপালে ঘাম জমা হতে থাকবে এবং হৃৎপিণ্ডের গতি একেবারে ছবির শেষ পর্যন্ত অস্বাভাবিক থাকবে। এবং শেষতক যখন আপনি সাইকো মহদোয়কে খুঁজে পাবেন, তখন আপনি গাল হাত দিয়ে ভাবতে বসবেন সে কথা, “এমন ছবিও বানানো সম্ভব!” সাইকোর জন্য আলফ্রেড হিচকক শেষবারের মতো অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিলেন।

সাইকোর পর আলফ্রেড হিচককের উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছে ‘দ্য বার্ডস’ এবং ‘মার্নি’। এ সময় তার সিনেমাগুলোতে বার্ধক্যের ছাপ স্পষ্ট হতে থাকে। তিনি ছবি পরিচালনা অনেক কমিয়ে দেন। ১৯৭৬ সালে তিনি তার জীবনের শেষ ছবিটি পরিচালনা করেন। আর্নেস্ট লেহমানের গল্পে নির্মিত ‘ফ্যামিলি প্লট’ ছবিটি কমেডি ড্রামা ঘরনার। ছবিটি বক্স অফিসে সাফল্যের মুখ দেখে। চার বছর পর ১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল বেল এয়ারে নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন কিংবদন্তী চলচ্চিত্র এ নির্মাতা।

সম্মাননা

আলফ্রেড হিচকককে অনেকে বলে থাকেন চলচ্চিত্রের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ পরিচালক। যারা তা বলেন না, তার অন্তত হিচকককে রাখেন সর্বকালের সেরা পাঁচজন পরিচালকের ছোট্ট তালিকায়। দ্য ৩৯ স্টেপস, লেডি ভ্যানিশেস, রিয়ার উইন্ডো, ভার্টিগো, নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট, সাইকো, বার্ডস সহ বেশ কিছু অসাধারণ ক্লাসিক ছবি উপহার দিয়েছেন এই কিংবদন্তী। তিনি অমর হয়ে আছেন তার নির্মাণ কৌশল এবং অনুপম বর্ণনাভঙ্গির জন্য। খুন, গুপ্তচরবৃত্তি, ধোকা আর মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার মতো গম্ভীর বিষয়গুলোই তার সিনেমার প্রধান দিক যেগুলো অত্যন্ত প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি।

image source: indiewire.com

সিনেমাজগতকে আলফ্রেড হিচককের দেয়া সবচেয়ে বড় উপহার ছিল বড় পর্দায় প্রতিটি দৃশ্যকে এমনভাবে ধারণ করা যেন তা দর্শকের মনে সাসপেন্স বা উদ্বেগ সৃষ্টি করে। তার সৃজনশীল ক্যামেরার কাজ ও দৃষ্টিকোণ, এডিটিং এর নিত্যনতুন তরিকা তার ছবিগুলোকে করেছে অনন্য। আর হারমান বার্নার্ডের মিউজিক হিচককের সেরা ছবিগুলোকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। আলফ্রেড হিচকক ‘অ্যাকাডেমি অব মোশন পিকচার্স’ এর আর্ভিং জি থালবার্গ মেমোরিয়াল পুরস্কার পান। আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউট তাকে ‘লাইফ অ্যাচিভম্যান্ট’ সম্মাননায় ভূষিত করে। ১৯৮০ সালে তিনি নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে এই কিংবদন্তী পরিচালক কখনো অস্কার পুরস্কার জেতেননি! অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এক ডজনের অধিক কালজয়ী ক্লাসিক চলচ্চিত্র উপহার দেয়া আলফ্রেড হিচকক কখনো অস্কার পুরস্কার জেতেননি। তবে হিচকক এর ছবিপ্রেমীরা বলবেন, তাতে কী? হিচকক অস্কার না পাওয়ায় তার কিছু হয়নি, বরং অস্কারই বঞ্চিত হয়েছে একজন কিংবদন্তীকে সম্মানিত করার গৌরব থেকে!

ফিচার ইমেজ- EskiPaper.com

Related Articles