এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

যত দূরেই ভ্রমণ কর না কেন, নিজের কাছ থেকে কখনোই দূরে যেতে পারবে না।

হারুকি মুরাকামি একজন জনপ্রিয় জাপানি লেখক, যিনি বর্তমান বিশ্ব সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদেরও একজন। তার নতুন বই বের হওয়া মানেই জাপানে, বিশেষ করে টোকিওর বইয়ের দোকানগুলোতে মানুষের ভীড়। শুধু জাপানে নয়, হারুকি মুরাকামির বই আন্তর্জাতিকভাবে বেস্ট সেলার হচ্ছে বহু বছর ধরে। এখন পর্যন্ত তার বই ৫০টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। সাহিত্যে অবদানের জন্য বিভিন্ন সময় তিনি বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিশ্ব ফ্যান্টাসি পুরস্কার, ফ্র্যাঙ্ক ও'কনোর আন্তর্জাতিক ছোট গল্প পুরস্কার, ফ্রান্‌ৎস কাফকা পুরস্কার প্রভৃতি। 

মুরাকামি যেমন আড়াল থেকে গল্প বলতে ভালবাসেন, তেমনি নিজেকেও আড়াল রাখতে ভালবাসেন। তারপরও তার বইগুলোর তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে সেটা সবসময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। তার জনপ্রিয়তার মূল কারণ বলা যায়, মানুষ জীবনের যে ক্ষতগুলো আড়াল করতে চায়, মুরাকামি তার লেখায় সেসবই তুলে আনেন। যেন আমাদের ভেতরের কেউ আমাদের গল্পগুলো শুনিয়ে যায়, যা আমরা কখনোই বলতে চাই না! নিজেদের যে হাহাকার চেপে যেতে চাই, মুরাকামি যেন সেসব হাহাকারের দীর্ঘশ্বাস আমাদের কানে পৌঁছে দেন। যেমনটি মুরাকামি বলেছিলেন,

তুমি স্মৃতি গোপন করতে পারবে। কিন্তু যেখান থেকে স্মৃতির জন্ম হয়েছিল, সেটা কখনোই মুছতে পারবে না।

Image Credit: Corbis via Getty Images

মুরাকামির সাহিত্য যেভাবে বিষণ্ণতা বর্ণনা করে

সাহিত্যের কাজ শুধু আনন্দ-বেদনা নিয়ে নয়। আবার এটাও না যে, সাহিত্য শুধু আশার কথা বলবে, আলোর রাস্তা দেখাবে। সাহিত্য মানে আমাদের গোটা জীবন, তাই সেখানে আশা-নিরাশা-হতাশা-হাসি-কান্না সব কিছুরই উপস্থিতি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সাহিত্য আমাদের অন্ধকার দেখালেও এটা জানাবে যে, এটা অন্ধকার। ঠিক তেমনই বিষণ্ণতাও মানুষের জীবনের এক অনস্বীকার্য অধ্যায়। আমরা চাইলেও একে অস্বীকার করতে পারব না। তাই সাহিত্যে বিষণ্ণতার অংশ না থাকা মানে হলো সাহিত্য জীবনের একটা মাধ্যমকে অস্বীকার করলো। তাই নানা সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও বিষণ্ণতা সাহিত্যের অংশ হয়েছে।

বলা যাক ফ্রান্‌ৎস কাফকার কথা। একাকিত্ব-শূন্যতা-বিষণ্নতা তার সাহিত্যে দৃশ্যমান। তাই বলে কিন্তু পাঠকের দূরের কেউ নন কাফকা। তিনি দুনিয়ার সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় লেখকদের একজন। লেখক হিসেবে নিজে সাহিত্যে নোবেল না পেলেও বহু নোবেল জয়ী সাহিত্যিক স্বীকার করেন, তাদের অনেক লেখাই কাফকার থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা, এবং বহু প্রতিষ্ঠিত লেখকের লেখালেখির আদর্শ জানতে চাইলেও উঠে আসে তার নাম।

আসলে সাহিত্যে বিষণ্ণতা উঠে আসা মানেই বিষণ্ন সাহিত্য নয়, মানুষের জীবনের অংশ হিসেবেই মুরাকামির সাহিত্যেও উঠে আসে বিষণ্ণতার কথা। মানুষের পাওয়া-না পাওয়া বিষণ্ণতা নিয়েই যেন মুরাকামির পথচলা।

হারুকি মুরাকামির বইগুলো; Image Credit: Treerex/Reddit

জাপানের অনেক সাহিত্য সমালোচক অবশ্য মুরাকামির লেখালেখির এই দিকটি নিয়ে বেশ সমালোচনা করেন। অধিকাংশ সমালোচনাই হয় গল্পের চরিত্রগুলো নিয়ে। যেমন ধরা যাক, প্রায় অধিকাংশ গল্পের চরিত্র একাকিত্ব অনুভব করে। তাদের এই একাকিত্ব লেখক নিজে ভাঙার চেষ্টা করেন উপন্যাসজুড়ে, কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায় কেমন অচেনা একটা একাকিত্ব নিয়েই গল্প শেষ হয়।

'Men Without Women' বইটির কথাই ধরা যাক। এই বইয়ের একটি গল্পের নাম ‘কিনো’ (Kino), কিনো নামের এক ছেলেকে নিয়ে গল্পটি। সে একটি বার চালায়, শহর থেকে দূরে খুব নিরিবিলি এক এলাকায়। ফাঁকা জায়গা, নিশ্চুপ পরিবেশের ভেতরই কেমন একটা বিষণ্নতা ছড়িয়ে পড়ে। এর চেয়েও বিশাল বিষণ্নতা কিনোর ভেতরেই বসবাস করে। যদিও এ ব্যাপারে সে উদাসীন, তার স্ত্রী এবং সংসার হারানোর কষ্ট সে অনুভব করে না। কিন্তু তার বিষণ্নতা লেখক বারবার পাঠকের সামনে নিয়ে আসেন, এমনকি সে যে তার অজান্তেই একাকিত্ব থেকে মুক্তি চাইতে শুরু করে, তা-ও পাঠকের সামনে মেলে ধরেন লেখক। কী অদ্ভুত এক খেলা শুরু হয়, গল্পের মূল চরিত্রের সাথে পাঠকের যেন সরাসরি দেখা হয়ে যায়, লেখক আড়াল থেকে বিষণ্নতাগুলো ফুটিয়ে তোলেন। এর চেয়েও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, পাঠকও একাকিত্ব অনুভব করতে শুরু করে!

Image source: wbur.org

'Men Without Women' আসলে এমনই একটি গল্পগ্রন্থ। মানুষের মানসিক এমন সব আলোচনা, যা মানুষ আসলে বলতে চায় না, কিন্তু পুষে রাখে। কেমন হয় একজন মানুষের নিঃসঙ্গ জীবন? মানুষের বিষণ্নতা কেমন করে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, যখন কেউ তার নিজের ভালবাসার নারীকে হারিয়ে ফেলে? এসবের মনস্তাত্ত্বিক দিক আর সে সময়ের বিষণ্ণতা নিয়েই আসলে এই গল্পগ্রন্থ।  

এভাবেই মানুষে জীবনের গভীরতা উঠে আসে মুরাকামির লেখায়। বিষণ্নতা যে গভীর, সে কথাই নানাভাবে বলেন তিনি।

এবার বলা যাক নরওয়েজিয়ান উড (Norwegian Wood) উপন্যাসের কথা। পৃথিবীর বেস্টসেলার বইগুলোর একটি এই বই। বলা হয়ে থাকে, জাপানে এমন মানুষ খুব কম পাওয়া যাবে, যে এই বইটি পড়েনি। তবে এই বই নিয়েও আছে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা। অনেক সমালোচকের চোখে বইটি বিষণ্নতার ফেরিওয়ালা। কিন্তু তাই বলে পাঠক থেমে থাকেনি। বইটি পড়েছে পৃথিবীর লাখ লাখ পাঠক। প্রশংসাও কম হয়নি। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছিল,

নরওয়েজিয়ান উড শিল্প সৌকর্যের এক অনন্য উপন্যাস, যার পাতায় পাতায় মুরাকামির দক্ষ লেখনীর ছোঁয়া বিদ্যমান।

উপন্যাসের কাহিনী ষাটের শেষদিকের টোকিওকে ঘিরে। বিষণ্ন আর গম্ভীর প্রকৃতির তরু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবনের নিঃসঙ্গতা একাকিত্বের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যস্ত। তার জীবনের নিঃসঙ্গতার দেয়াল ভেঙে দিতে চায় দুই বিপরীতধর্মী মেয়ে। একজন তার মৃত বন্ধুর প্রেমিকা, সুন্দরী কিন্তু মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। অন্যজন বন্ধুসুলভ আর স্বাধীনচেতা। তরু তার নিজস্ব নিঃসঙ্গতার দেয়াল ভাঙতে কার দিকে এগিয়ে যাবে?

নরওয়েজিয়ান উডের প্রধান তিন চরিত্রের ভেতরেই দেখা মেলে এক অন্যরকম নীরবতার। তরু, যে কি না তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশে নিজেকে খুঁজে পেতে ব্যস্ত। অন্যদিকে তার মৃত বন্ধুর প্রেমিকা নাওকো, যার মানসিক অসুস্থতা আরও বেড়ে যায় তার প্রেমিকের মৃত্যুর পর। আর একজন স্বাধীনচেতা মেয়ে মিদোরি, যার জীবন-ভাবনাগুলো বড্ড রঙিন। কিন্তু সে-ও যেন হারাতে শুরু করে বিষণ্নতায়। তাদের একেকজনের শূন্যতা অন্যজনের ভালোবাসার মধ্যে বিলীন হয়ে হারিয়ে যেতে চায়। কিন্তু বিষণ্নতার বিদায় কি এত সহজ? জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অংশ যেমন ভালোবাসা, একইসাথে জটিল অংশও বটে। সেসব জটিলতা আর বিষণ্নতা ফুটে উঠে এই উপন্যাসে।

মুরাকামির লেখালেখির সবচেয়ে বড় দিকও এটি, গভীর বর্ণনা দিয়ে লেখেন তিনি। প্রতিটি বিষয় বর্ণনায় নিয়ে আসেন, যেন পাঠক সব নিজের চোখের সামনে দেখতে পারে। মানুষ আর পরিবেশের সব বিষণ্নতা জীবন্ত হয়ে ওঠে মুরাকামির হাতের ছোঁয়ায়।

Image Source: vocal.media

এবার বলা যাক ‘আফটার ডার্ক’ (After Dark)-এর কথা । এই গল্পে বাস্তব-পরাবাস্তব একইসাথে এগিয়ে গিয়েছে। একটা রহস্যময় সময় নিয়ে মুরাকামি গল্প বলে গিয়েছেন, সেই সাথে বলেছেন নানা মানুষের নানা গল্প, যা একই সুতোয় বাঁধা।

প্রত্যেকের জীবনের একটি গল্প থাকে। আর যেহেতু মুরাকামি লিখছেন, তাই দেখা যায়, সেই গল্পের কেউ বিষণ্ণ জীবন পার করছে, কেউ হয়তো সুখী হতে চেয়েও নিজের সুখটুকু নিজের মতো করে সাজাতে পারছে না। মানুষের জীবন মানেই যে নানা রকম অনুভব, রহস্য, চাওয়া, পাওয়া, না পাওয়া- সেসব মুরাকামি ফুটিয়ে তুলেছেন একটু অন্যভাবে।  

Image source: Allegro

শেষের কথা

সাহিত্য আসলে মানুষের জীবনকেই প্রকাশ করে। মানুষের পথচলার শুরু থেকেই বিষণ্ণতা-একাকিত্ব মানুষের জীবনেরই অংশ। আজ যে সবচেয়ে সুখী, তার জীবনের ভেতর প্রবেশ করলেও দেখা যাবে, জীবনের কোনো এক অধ্যায়ে বিষণ্নতা আর একাকিত্ব তাকে ঘিরে ধরেছিল, এবং সেই ক্ষত এখনও সে নীরবে বয়ে চলেছে। হারুকি মুরাকামি কখনও কখনও খুব আয়োজন করেই আমাদের সেসব কথা শোনান, কারণ আমরা চাইলেও জীবনকে অস্বীকার করতে পারি না। তেমনি পারি না জীবনের বিষণ্ণতা আর একাকিত্বকে অস্বীকার করতে।

This article is in Bangla language. It is about Haruki Murakami's Literary Discussion and Observations on the Depression of Literature. 
Featured Image: Mail Today