এই লেখাটি লিখেছেন একজন কন্ট্রিবিউটর।চাইলে আপনিও লিখতে পারেন আমাদের কন্ট্রিবিউটর প্ল্যাটফর্মে।

এই পৃথিবীকে যদি সমুদ্রের সাথে তুলনা করা যায় তবে সমুদ্রের জল হচ্ছে শব্দ, আর এতে অবস্থানরত প্রাণীকূল হচ্ছে পৃথিবীতে অবস্থানরত প্রাণীকূলসদৃশ। অর্থাৎ আমরা শব্দের মাঝে ডুবে আছি। উক্ত সিনেমায় একটি সংলাপ আছে এরকম, "পৃথিবীতে নৈঃশব্দ বলে কিছু নেই।" অর্থাৎ, নৈঃশব্দ নিজেও শব্দের একধরনের অনুরণন মাত্র। আমরা যেসব শব্দ শুনতে পাই, সেসব হচ্ছে শব্দতরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি, যার প্রতি সেকেন্ডে কম্পনের পরিমাণ থাকে ২০ থেকে ২০০০০ হার্জের মধ্যে। এই পাল্লাটি বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হতে পারে। জ্ঞাতার্থে, যেসব শব্দতরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি শোনার যোগ্য তরঙ্গের থেকে কম হয়, সেগুলোকে বলা হয় সাবসোনিক, আর যেগুলোর ফ্রিকোয়েন্সি শোনার যোগ্য তরঙ্গের থেকে বেশি হয়, সেগুলোকে বলা হয় আল্ট্রাসোনিক।

কিছুক্ষণের জন্য কল্পনা করুন যে, আপনি কোনো শব্দ শুনতে পারছেন না। এরপর একটু সময় নিয়ে কল্পনা করুন, আপনি শুধু মানুষের কথা শুনতে পারছেন, কিন্তু অন্য কোনো শব্দ, যেমন- আশেপাশের যানবাহন থেকে শুরু করে ছোট ছোট বিষয়, চলার বা ধরার বা রাখার কোনো কিছুই শুনতে পারছেন না। এবার কল্পনা করুন, আপনি আশেপাশে বেজে ওঠে, যেমন- বাস বা গাড়ির হর্ন, ঘড়ির টিক টিক শব্দ, অ্যালার্ম, চায়ের কাপে চা ঢালা, চামচ নাড়া, পদধ্বনি ইত্যাদি সবকিছুর শব্দই শুনতে পারছেন, কিন্তু মানুষের কথা খুব একটা শুনতে পারছেন না।

কৌশিক গাঙ্গুলি নির্মিত 'শব্দ' সিনেমায় এরকম কল্পনাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে। ২০১৩ সালে সিনেমাটি ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারে সেরা বাংলা চলচ্চিত্রের স্বীকৃতি অর্জন করে। সেই সময় সিনেমাটি নিয়ে আলোচনার ঝড় ওঠে এবং বেশ প্রশংসিত হয়। কেননা, এই সিনেমা দেখার পর শব্দ শোনা এবং শব্দ সম্পর্কে আপনার আলাদা একধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হতে বাধ্য। 

সিনেমার একদম শুরুতে জানানো হয় যে, সিনেমাটি ফোলি আর্টিস্ট, অর্থাৎ যারা শব্দ সংযোজনে সহায়তা করেন তাদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। ফোলি শব্দ হচ্ছে সিনেমার জন্য কৃত্রিমভাবে শব্দ তৈরি করা, যা প্রায় বাস্তব শব্দের মতোই। আর ফোলি আর্টিস্টরা এই শব্দ তৈরি করে থাকেন, যারা সবসময় ক্যামেরার পেছনে থাকে। মানুষ তাদের কখনো দেখে না, কখনো চেনে না। মানুষ হয়তো বুঝতেই পারে না তার যা শুনছে তা আসল নয়, বরং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা।

সিনেজগতের এই প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে সিনেমা সচরাচর দেখা যায় না। আর ফোলি আর্টিস্টদের নিয়ে ভারতবর্ষে এর আগে কোনো সিনেমা নির্মিত হয়নি। এমনকি গোটা বিশ্বেও এর সংখ্যা নেই বললেই চলে। তবে তাদের কথা বলতে গিয়ে নির্মাতা শুধু ফোলি আর্টিস্টদের কাহিনীই নিয়ে আসেননি, বরং গল্পের সীমা ছাড়িয়ে শব্দময় এক জগতে প্রবেশ করেছেন।

'শব্দ' সিনেমার পোস্টার

এই সিনেমার প্রধান চরিত্র তারক। আর এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। তারক চরিত্রে সে দিনের বেলায় একটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে কাজ করে, আর রাতভর ছবির কাজে ব্যস্ত থাকে। সিনেমায় বিভিন্ন শব্দ সে সংযোজন করে। তারক এই কৌশল নিখুঁতভাবে জানে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় সিনেমার এক দৃশ্যে, একঝাঁক পায়রার ওড়ার শব্দে তারক তার হাতে কিছু মরা পাতা সাজিয়ে নিয়ে  মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে অবিকল পায়রাদের ওড়ার শব্দ তৈরি করে। সে জানে খালি চায়ের কাপ পাথরের টেবিলে রাখলে কেমন শব্দ হবে আর চা ভর্তি কাপ রাখার শব্দ কেমন হবে। তারক এসব করে মূল দৃশ্যের সাথে মিল রেখে।

ঋত্বিক চক্রবর্তী পাতা দিয়ে পায়রার ওড়ার শব্দ তৈরি করছেন

তারক দত্তের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তী অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ধরুন, আপনি কারো সাথে কথা বলছেন, কিন্তু তার কথা শুনছেন না বা তাকে পাত্তা দিচ্ছন না। এমতাবস্থায় ইচ্ছা করে অন্যমনস্ক হওয়ার অভিনয় করা প্রচণ্ড কষ্টসাধ্য ব্যপার। এটি ঋত্বিক চক্রবর্তী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করতে পেরেছেন। তার চরিত্রের মধ্যে মিশে যাওয়ার গুণ নিশ্চিতভাবে মুগ্ধ করবে দর্শককে। তার স্ত্রী রত্নার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাইমা সেন। সাবলীল অভিনয় করেছেন তিনিও। তিনি একসময় অনুধাবন করেন, তার স্বামী ঠিকমতো কানে শুনছেন না। তাই স্বামীকে নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি ভাবতে থাকেন, তার স্বামী হয়তো মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাই রত্না একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ স্বাতীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন চূর্ণি গাঙ্গুলি। তিনি পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারেন, তারক তার আশেপাশে বেজে ওঠে, যেমন- বাস বা গাড়ির হর্ন, ঘড়ির টিক টিক শব্দ, অ্যালার্ম, চায়ের কাপে চা ঢালা, চামচ নাড়ার শব্দ, পদধ্বনি ইত্যাদি সবকিছুই শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু মানুষের কথা খুব একটা শুনতে পাচ্ছেন না। এই সমস্যার রহস্য ও সমাধান খোঁজার মধ্য দিয়ে সিনেমার কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকে। নির্মাতা কৌশিক গাঙ্গুলী নিজেও একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে অভিনয় করেছেন। তার অভিনয় প্রশংসার দাবিদার। এছাড়া সিনেমায় তারকের সাউন্ড রেকর্ডিস্ট দিব্বেন্দুর চরিত্রে অভিনয় করেন সৃজিত মুখার্জি, এবং প্রফেসর চরিত্রে ভিক্টর ব্যানার্জি। তারা প্রত্যেকে স্ব-স্ব চরিত্রে নিজেদের অনবদ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন।

ফিল্মের কাস্টিং কস্টিউমও যথার্থ। কোনো কিছুতেই বাড়াবাড়ি মনে হয়নি। বরং সবকিছুতেই বাস্তবতার ছাপ ছিল। এর প্রমাণ মিলবে তারক দত্তের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তীর লুক ও কস্টিউমে। তারকের চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে তাকে প্যান্ট-শার্ট খুলে কাজ করতে হয়, যা নির্মাতা যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।

নির্মাতা পুরো সিনেমা জুড়ে অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ সংলাপ ব্যবহার করেছেন। একটি দৃশ্যে স্বাতী প্রফেসরকে বলেন,

তারক কথা শুনছে না। কিন্তু শোনার মতো কথা আর বলার মতো কথা ক’জন বলছি অ্যাকচুয়ালি? সেসব কথার কোনো অর্থ তৈরি করছি আমরা? ফ্যাশন, গসিপ, ফ্রি মার্কেট, গাড়ি, রিয়েল এস্টেট, প্রপার্টি– এসবই কি জীবন? আর কিছু কি নেই? শুধু একটা পারফরমেন্স? একটা শো?

তারক তাহলে কী মিস করছে? শুনছে না বেশ করেছে। তার সব শোনার দরকার নেই। মানুষের অবান্তর প্রলাপ যে শুনছে সে স্বাভাবিক, আর স্বাভাবিক শব্দ যে শুনছে সে অস্বাভাবিক? কে এটা সিদ্ধান্ত করছে? আমরা কে সিদ্ধান্ত নেয়ার, হোয়াট ইজ নরমাল অ্যান্ড হোয়াট ইজ অ্যাবনরমাল?

ছবির মূল কথাগুলো যেন পরিচালক এখানে স্পষ্ট করে দর্শককে জানিয়ে । বুঝিয়ে দেন, পাগল আসলে আমরা কাকে বলছি? এই সংলাপের মধ্য দিয়ে নির্মাতার দর্শন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আমরা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রয়োজনীয় কথা বেশি বলি। অথচ, আমরা যে ভার্চুয়াল জগতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অর্থহীন শব্দ ব্যবহার করছি তা কতটাই বা আমাদের জন্য অর্থপূর্ণ! মানুষ তার কথার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে কত শত শব্দ দূষণ করছে তা আমরা খেয়ালই করি না। নির্মাতা তারকের এই অপ্রয়োজনীয় শব্দ না শোনার মধ্য দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন প্রয়োজনীয় ছোট ছোট শব্দগুলোও কত প্রয়োজন।

এই সিনেমায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাউন্ডের ব্যবহার। যেহেতু শব্দই এই সিনেমার মূল উপাদান, কাজেই ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ডের যথাযথ প্রয়োগ না হলে পুরো সিনেমাটিই ব্যর্থ হয়ে যেত। কিন্তু নির্মাতা এই কাজে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তা বোঝা যায় একটি দৃশ্যে তারক যখন ঝর্নার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে মুগ্ধ হয়ে ঝর্নার শব্দ শুনছে। এই শটে ঝর্নার শব্দ এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেন মনে হবে ঝর্নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে খোদ দর্শকই। এছাড়া পুরো সিনেমাতেই ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড যেখানে যেমন রাখা উচিত তেমনই রাখা হয়েছে। এই ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফার ছিলেন শীর্ষ রায়। শুধুমাত্র ভিজ্যুয়াল দিয়ে আবহসংগীতের অভাব যে অনেকটা আড়াল করা যায়, সেটি তিনি সম্মানের সাথে করতে পেরেছেন। এছাড়া এডিটিং , ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট সবই প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ মনে হয়েছে।

এই সিনেমায় কোনো গান নেই, কোনো অ্যাকশন নেই। কাজেই আর সব সিনেমার মতো করে দেখতে বসলে দর্শক হতাশ হবেন। তবে সিনেমাটির কিছু শট প্রয়োজনের তুলনায় বেশি দীর্ঘ ছিলো। সর্বোপরি এই সিনেমাটি নিশ্চিতভাবেই শব্দ নিয়ে নতুন করে উপলব্ধি করতে, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে এর দর্শককে।