দ্য হার্ডার দে কাম: জ্যামাইকার উত্তর-ঔপনিবেশিক সমাজের পরিবর্তিত সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি

Well, they tell me of a pie up in the sky
Waiting for me when I die
But between the day you’re born and when you die
They never seem to hear even your cry

গানের কথাগুলো দিয়ে যেন স্রষ্টাকেই কটাক্ষ করছেন শিল্পী! আরো ভালোভাবে বললে- কথাগুলো আসলে জ্যামাইকার খ্রিস্টান মিশনারিগুলোকে কটাক্ষ করে গাওয়া।

গানটি জ্যামাইকার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত অন্যতম সেরা মুভি ‘The Harder They Come‘ এর। খুবই দ্রুত গল্পের নাতিদীর্ঘ এই ছবিতে দেখা যায় গ্রামের সাধারণ এক যুবকের গায়ক হবার একবুক স্বপ্ন নিয়ে শহরে আসা। আমেরিকান ড্রিমের মতো পুঁজিবাদের এই যুগে এটি দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তের সমস্ত সাধারণ যুবকেরই স্বপ্ন। অর্থ, খ্যাতি আর নিজের ভাগ্যের পরিবর্তনের স্বপ্ন। এরপর বাস্তবতায় ধাক্কা খেয়ে বিভিন্ন অড জব করে শেষে সে জড়িয়ে পড়ে জ্যামাইকার মাদক ব্যাবসার চক্রে। এরপর কয়েক মুহূর্তের জন্য স্বপ্ন হাতে পাওয়া আর সেই সাথে তার সমাপ্তিও স্বপ্নের মাধ্যমেই। আধুনিক শোষণের মডেলে সে অতি সাধারণ এক উপলক্ষ মাত্র। মুভির কাহিনী না হয় দর্শকের নিজের ওপরই ছেড়ে দিলাম, তবে মুভিতে ছোট্ট এই ক্যারিবিয়ান দেশটির মানুষের আর্থ-সামাজিক চিত্র এতটা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, এই মুভির ওপর ভিত্তি করে পরে উপন্যাস লেখা হয়েছে। সাধারণত যেটার উল্টোটা হয়। তবে এককথায় পুরো ছবির ক্যামেরার কাজ যেমন অসাধারণ, তেমনই অ্যান্টি-হিরো হিসেবে জিমি ক্লিফের অভিনয়ও অতুলনীয়। সেই সাথে অসাধারণ মিউজিক কম্বিনেশন তো আছেই।

The Harder They Come এর একটি পোস্টার; Image Courtesy: IMDB

সাম্রাজ্যবাদ একটি দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ইতিহাস কীভাবে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে, তার একেবারে বাস্তব আদর্শ উদাহরণ জ্যামাইকা। প্রথমে স্প্যানিশ ও পরে ব্রিটিশ উপনিবেশ এবং দাসপ্রথার শিকার জ্যামাইকা প্রথম স্বাধীনতা পায় ১৯৬২ সালে। অবশ্য এখনও এটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। ১৯৭২ সালে বানানো এই ছবিটি স্বাধীনতার ঠিক এক দশক পরের অবস্থা নিয়ে। এতকালের দাসত্বের পর সেই দেশের অধিবাসীদের নিজস্ব ভাষা বলে আর কিছু নেই। জ্যামাইকার সাধারণ মানুষের ভাষাকে বলা হয় ‘জ্যামাইকানপ্যাটোইস‘। এটি ইংরেজি থেকে উদ্ভূত একটি ক্রেওল (Creole) ভাষা।

শুনতে অনেকটা ইংরেজির মতো লাগলেও ঠিকমতো না জানলে একেবারেই উল্টো অর্থ হয়ে যাবে। জ্যামাইকান ভাষায় এর অর্থ “প্রিয়তমা, আর কেঁদো না।”

মোটা দাগে উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্তে ভাগ হওয়া জ্যামাইকান সমাজের উচ্চবিত্তরা অবশ্য পরিষ্কার ইংরেজিতে কথা বলে। পুরো ছবিতে সময় এগোবার সাথে সাথে নায়কের ভাষার পরিবর্তনও দেখা যায়। অর্থাৎ স্বাধীনতার এক দশক পরেও শুদ্ধভাবে সাবেক মনিবের ভাষা আয়ত্ত করতে পারা ক্লাস আর স্ট্যাটাসের পরিচয়। আমাদের দেশেও এতকাল পর সাহেবদের চেয়েও সাহেব হবার এই প্রবণতা এতটুকুও কমেনি। সেই সাথে পুরো ছবিতে বিভিন্ন সময় রং ফর্সা করা থেকে শুরু করে অন্যান্য ইউরোপীয় এবং আমেরিকান প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনগুলো কৌশলে দেখিয়ে ডিরেক্টর নাগরিকদের মানসিক অবস্থারও উদাহরণ দিয়েছেন।

বৈধ-অবৈধ যেটাই হোক, জ্যামাইকার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি গাঁজা চাষ। আর এই গাঁজাও কিন্তু জ্যামাইকাতে গিয়েছে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে আমাদের ভারতবর্ষ থেকে। সেই সময় ব্রিটিশটা বিভিন্ন দেশ থেকে আনা দাসদের একসাথে কাজ করানোয় এমন সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে।

তবে জ্যামাইকানরা এই মনিবদের ভাষা দিয়েই তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়েছে, শিল্পী বব মার্লে কিংবা এই ছবির নায়ক বিখ্যাত গায়ক জিমি ক্লিফের মতো শিল্পীরা তাদের নিজস্ব এই ক্রেওল ভাষায় যে গানের ধারা সৃষ্টি করেছেন, তা সারা দুনিয়ায় পরিচিতি পেয়েছে Reggae ধারার গান হিসেবে, বর্তমানে যা ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত। এই গানগুলোতে কথায় কথায় দুঃশাসন, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে করা প্রতিবাদের গানগুলো জনপ্রিয় হয়েছে সমস্ত দুনিয়াজুড়ে। আগের গানটিরই কয়েকটি লাইন,

Well, the oppressors are trying to keep me down
Trying to drive me underground
And they think that they have got the battle won
I say forgive them Lord, they know not what they’ve done.

সিনেমার শুটিং এ গায়ক এবং অভিনেতা জিমি ক্লিফ
সিনেমার শুটিংয়ে গায়ক এবং অভিনেতা জিমি ক্লিফ; Image Courtesy: Art Journal

সাম্রাজ্যবাদীদের অন্যতম একটি যুক্তি হলো উপনিবেশের অধিবাসীরা নিজেরা নিজেদের শাসন করতে পারে না। জ্যামাইকার ইতিহাস কিন্তু তাদের এই কথা কিছুটা সমর্থন করে। যেমন, স্বাধীনতার পর পরই অপরাধের হার বিবেচনায় জ্যামাইকা ছিলো পৃথিবীর অন্যতম কম অপরাধপ্রবণ দেশ। কিন্তু বর্তমানে এটি অন্যতম অপরাধপ্রবণ দেশ! আফ্রিকা-ক্যারিবিয়ার অনেক দেশেই এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। তবে এর পেছনের কারণ এই সাবেক মনিবেরাই কি না তা কে জানে!

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঠিক কীভাবে করা উচিত, সেটা নিয়ে অনেকেই বেশ দ্বিধান্বিত। অনেকেই মতামত দেন সাম্রাজ্যবাদের পূর্বের সময়ের সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবনের কিংবা শুধু নিজের দেশের অংশটুকুই ধারণ করতে, বিশ্বায়নের ছোঁয়া না লাগাতে। আমাদের উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই প্রবণতা আরো বেশি। দেশ, জীবনযাপনের ধারা, প্রযুক্তি সব কিছু বদলালে সেই সংস্কৃতিও না বদলালে যে তা মানুষের রুচির চাহিদা মেটাতে পারবে না, সেটি তারা মানতে নারাজ। অন্যদিকে অন্যান্য ধনী রাষ্ট্রও বিশ্বায়নকে স্বীকার করে নিজেদের সংস্কৃতিও সেটির মতো করেই বদলে নিয়েছে। সেজন্যই আমেরিকার নাগরিকেরা ইংরেজি রক বা পপ গান শোনে, আবার কোরিয়া-জাপান-চীন-ফ্রান্সের নাগরিকেরাও ইংরেজি রক বা পপ গান শোনে, তবে সেই সাথে তাদের নিজেদের ভাষার রক বা পপ গান সৃষ্টি করে সেগুলোও শোনে।

বিশ্বায়নের যুগে এই প্রাচীন অস্ত্র নিয়েই অন্যদের যৌবনের তেজের সাথে যুদ্ধ করায় ফলাফলটা কিন্তু হচ্ছে ভয়াবহ। অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের, অনুকরণপ্রিয় স্থূল রুচির সংস্কৃতি। দিন শেষে মানুষের যেটা ভালো লাগে, সেটাই গ্রহণ করে, গেলানোর বস্তু সংস্কৃতি না।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো পরিচালক এই ছবিতে আরেকবার উপলব্ধি করিয়েছেন যে, যৌনতার বিকল্প কোনোকিছুই নয়। পরিবার, ভালোবাসা, ভয়, ধর্ম- কোনোকিছুই মানুষের যৌনতা আর প্রেমকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। তবে মানুষের ক্ষুধা আবার নিমেষেই এই ভালোবাসা আর যৌনতাকে পরাজিত করে ফেলে।

পরিচালক পেরি হেনজেল তার এই ছবিটি নিয়ে ভেনিস চলচিত্র উৎসবে যান। তখন এই নতুন পরিচালক আর তার বিদেশী ছবিকে কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। তবে সেখানে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া করে ছবিটি প্রদর্শন শুরুর পর থেকেই ঘটনা বদলে যায়, আর এটি লাভ করে অন্যতম ক্লাসিক ক্যারিবিয়ান চলচিত্রের মর্যাদা।

Related Articles