মানুষ কমেডি ধাঁচের সিনেমা দেখে চিত্তবিনোদনের জন্য। বিশেষ করে দৈনন্দিন জীবনের যাঁতাকল থেকে এক মুহূর্তের মুক্তি যারা খুঁজছেন তাদের জন্য কমেডি ধারার সিনেমা থেকে উত্তম দ্বিতীয় কিছু নেই। কিন্তু একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা আর কত বড় হতে পারে? দেড় ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা? বড়জোর আড়াই ঘণ্টা।

তাই কমেডিপ্রেমী দর্শকদের জন্য তৈরি হয় কয়েক পর্বের বিশেষ এক ধারার কমেডি ড্রামা, যার নাম সিচুয়েশন কমেডি বা সংক্ষেপে সিটকম। সেগুলোতে বেশ ক’টি প্রধান চরিত্র থাকে এবং সেই চরিত্রগুলোর মজার সব কাণ্ডকারখানা নিয়েই আবর্তিত হয় মূল গল্প।

মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ

নিত্যনতুন সব সিরিজের ভিড়ে আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে ক্লাসিক কিছু সিচুয়েশন কমেডি। অবশ্য এর পেছনে মূল কারণ হলো, সিরিজ মুক্তির তারিখ দেখেই অনেকে নাক সিটকান, “১৯৭০! এত পুরনো শো! কেমন আর হবে! থাক এটা না দেখলেও হবে/পরে দেখবো”।

অথচ ঘুণাক্ষরেও যদি টের পেতেন, মিস হয়ে যাচ্ছে অসাধারণ কিছু! শুধু সিটকম না, এমনটা আরও অনেক সিরিয়ালের ক্ষেত্রেই হয়; যেমন কোজাক, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান অথবা দ্য স্ট্রিট অফ সান ফ্রান্সিসকো।

প্রসঙ্গে ফিরি; সত্তরের দশকে নির্মিত চমৎকার একটি কমেডি ধাঁচের সিরিজ মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ; যেখানে জেরেমি ব্রাউন (ব্যারি ইভান্স) নামের এক ইংরেজি ভাষার শিক্ষককে কিছু প্রবাসীদেরকে ইংরেজি শেখাতে গিয়ে হতে হয় নানা ধরনের বিড়ম্বনার সম্মুখীন। বিদেশী এই শিক্ষার্থীদের অদ্ভুত ও মজার সব কর্মকাণ্ড দিয়ে সাজানো হয়েছে সিরিজের প্রত্যেকটি এপিসোড।

মাইন্ড ইউর ল্যাঙ্গুয়েজ © Cinema Paradiso

অন্যান্য সিরিজের ক্ষেত্রে যেটা হয়, কিছু চরিত্র ভালো লাগে আর কিছু লাগে না। কিন্তু এই সিরিজের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়তো হবে না। সিরিজের প্রত্যেকটি চরিত্রকেই আপনার ভালো লাগবে, বিশেষ করে হুয়ান আর আলি নাদিম। তারা মুখ খুললেই আপনি হো হো করে হেসে উঠবেন। কখনো কখনো তাদের হাস্যরসগুলো কিছুটা সস্তা মনে হতে পারে, তবে সেটাও মুগ্ধতা ছড়াতে ভুল করে না। আর মজার ব্যাপার হলো, এই সিরিজের সবচেয়ে হাস্যকর চরিত্রে (আলি নাদিম) অভিনয় করেছেন আমাদের বাংলাদেশী একজন অভিনেতা দিনো শাফিক।

IMDb রেটিং: ৯/১০
সিজন সংখ্যা: ৪
পর্ব সংখ্যা: ৪২
নির্মাতা: ভিন্স পাওয়েল
মুক্তিকাল: ১৯৭৭ – ১৯৮৬

ফ্রে.ন্ড.স

So no one told you, life was gonna be this way
Your job’s a joke, you’re broke
Your love life’s D.O.A.
It’s like you’re always stuck in second gear
Oh, when it hasn’t been your day
Your week, your month, or even your year

সবার প্রথমে ফ্রেন্ডস সিটকমটির যে জিনিসটি আপনার নজর কাড়বে, তা হলো এর ইন্ট্রো মিউজিক। গানটির কথাগুলোর সাথে হয়তো অদ্ভুত মিল খুঁজে পাবেন নিজেরই জীবনের।

নিউইয়র্কের এক পুরনো দালানের পাশাপাশি দুই অ্যাপার্টমেন্ট, একটি কফি হাউজ এবং ছয় বন্ধু- মনিকা গেলার, চ্যান্ডলার বিং, জোয়ি ট্রিবিয়ানি, ফিবি বুফে আর রস-র‍্যাচেল; এদেরই জীবনের আনন্দ-উচ্ছ্বাস, সুখ-দুঃখ নিয়ে সাজানো প্রায় পাঁচ হাজার মিনিটের এক গল্পের নাম ফ্রেন্ডস

ফ্রেন্ডস সিরিজের অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা © Warner Bros.

প্রায় রোজই সময়-অসময়ে নিউ ইয়র্কের ‘সেন্ট্রাল পার্ক’ কফি হাউজে বসে ছয় বন্ধুর আড্ডা। সিরিজটির কাহিনী আবর্তিত হয় এই ছয়জনের পাশাপাশি তাদের আশেপাশের অন্যান্য মানুষের জীবন নিয়ে। ফ্রেন্ডস হতে পারে আপনার জন্যে ২৩৬ পর্বের দীর্ঘ কিন্তু উপভোগ্য যাত্রা; কেননা এর প্রত্যেকটি চরিত্র রচনা করা হয়েছে অত্যন্ত যত্ন করে এবং খানিকটা চতুরতার সাথে। যতই সামনে এগোবেন, সিরিজের চরিত্রগুলোর প্রতি আপনার ভেতর ভালোবাসা জন্মাতে শুরু করবে। প্রতিটি চরিত্রের রয়েছে আলাদা আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য এবং সেই নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণেই আপনি নিজেও চরিত্রগুলোকে ভালোবাসবেন আলাদা আলাদা ভাবে।

বিশেষ করে জোয়ি আর চ্যান্ডলারের ব্রোমান্স! একা এই দুজন মানুষই পারবে আপনার মুখে হাসি ফোটাতে, আবার পরক্ষণেই চোখে জল নিয়ে আসতে। মনিকার মাত্রাছাড়া আচরণ, চ্যান্ডলারের বিদ্রূপমাখা কথাবার্তা, সকল বিষয়ে জোয়ির নিজস্ব বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, ফিবির উদ্ভট সব মন্তব্যের পাশাপাশি রস আর র‍্যাচেলের সম্পর্কের টানাপোড়ন এবং তাদের গৎবাঁধা জীবনের বিভিন্ন হাসিঠাট্টা দিয়ে পূর্ণ মুহূর্তগুলো আপনার জীবনের একঘেঁয়েমি দূর করে দেবে অতি সহজেই।

IMDb রেটিং: ৮.৯/১০
সিজন সংখ্যা: ১০
পর্ব সংখ্যা: ২৩৬
নির্মাতা: ডেভিড ক্রেইন ও মার্তা কাফম্যান
মুক্তিকাল: ১৯৯৪ – ২০০৪

হাও আই মেট ইয়োর মাদার

টেড মসবি, নিউইয়র্ক শহরের প্রতিভাবান একজন আর্কিটেক্ট। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব সবই আছে তার, শুধু অভাব একজন জীবনসঙ্গিনীর। আর সেই সঙ্গিনীর খোঁজ পেতে যেসব চরাই-উতরাই তাকে পার হতে হয়, সেই গল্প নিয়েই সাজানো ‘হাও আই মেট ইয়োর মাদার’।

নির্মাতা কার্টার বেইস ও ক্রেইগ থমাস মিলে এই সিরিজের ফিকশনাল জগতেই ফুটিয়ে তুলেছেন অবিবাহিতদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব চিত্র। অনেকেই টেডের সাথে, আর কেউ কেউ রবিনের সাথে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পেতে পারেন। তবে তাদের সবাইকে রেখে যে চরিত্রটি আপনার মন কেড়ে নেবে সেটি হলো, বার্নি স্টিনসন।

হাও আই মেট ইয়োর মাদার © CBS

‘হাও আই মেট ইয়োর মাদার’ দেখেছেন অথচ বার্নিকে পছন্দ করেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। মাঝে মধ্যে মার্শাল আর লিলির আদিখ্যেতা দেখে হয়তো বিরক্তি লাগতে পারে, তবে গল্পের সাথে সেগুলো মানিয়ে গেছে সাবলীলভাবেই। একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজের যে গুণগুলো থাকা প্রয়োজন, সবই এর রয়েছে। জীবনধর্মী চিত্রনাট্য, সাথে আকর্ষণীয় কাস্টিং এবং তাদের চমৎকার অভিনয়; সবকিছু মিলে আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য।

IMDb রেটিং: ৮,৪/১০
সিজন সংখ্যা: ৯
পর্ব সংখ্যা: ২০৮
নির্মাতা:
বেইস ও ক্রেইগ থমাস

দ্য বিগ ব্যাং থিওরি

সায়েন্স কিংবা গেমার গিক যারা আছেন, এবারে একটু নড়েচড়ে বসুন। বলতে পারেন অনেকটা আপনাদের কথা মাথা রেখেই ওয়ার্নার ব্রস ২০০৭ সালে শুরু করে নতুন এক সিটকম ‘দ্য বিগ ব্যাং থিওরি’। নার্ডদের নিয়ে এতো নিখুঁত টিভি ড্রামা আগে কখনও নির্মাণ হয়নি।

সিরিজের মূল কাহিনী ক্যালিফোর্নিয়ার পাসাডেনা শহরের মেধাবী কিন্তু বোকাসোকা দুই পদার্থবিজ্ঞানী লিওনার্দ হফস্টেডার ও শেল্ডন কুপার আর তাদের সামনের ফ্ল্যাটের এক রূপসী ওয়েট্রেস পেনিকে নিয়ে। প্রথম সাক্ষাতেই যার প্রেমে পড়ে যায় দুই বিজ্ঞানীর একজন, লিওনার্দ হফস্টেডার। সিরিজের একটা অংশজুড়ে চলে তার পেনির মন জয় করার প্রচেষ্টা। তবে প্রথম এপিসোডেই দেখা মেলে দুই বিজ্ঞানীর অন্য দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রকৌশলী হাওয়ার্ড ওয়ালোউইত্জ ও জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী রাজেশ কুত্রপালির। এই চারজনই অত্যন্ত প্রতিভাধর হওয়া সত্ত্বেও, সমাজের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সাথে তারা বেশ অপরিচিত ও বেমানান। তাই পেনির সাধারণ জীবনযাত্রার সাথে তারাও যখন পাল্লা দিতে চেষ্টা করে তখন সৃষ্টি হয় এক হাস্যকর পরিস্থিতির।

দ্য বিগ ব্যাং থিওরি © CBS

চিরাচরিত কমেডি আর রোমান্স ধারার হলেও অন্যান্য সিটকম থেকে একে খানিকটা ভিন্নই বলা যায়। প্রথমত, এই সিরিজের প্রত্যেকটি পর্ব লেখার পরপরই ক্যামেরাবন্দী করা হয়। তাছাড়া সম্পূর্ণ সিরিজটি নির্মাণ করা হয়েছে সরাসরি দর্শকদের সামনে।

এই সিরিজের সবচেয়ে মজা বিষয় হলো, এর বিভিন্ন পর্বে দেখা মেলে বাস্তব জীবনের কিছু মহান মানুষদের। স্বয়ং স্টিফেন হকিং, হাউয়ি মেন্ডেল, ইলন মাস্ক, বিল নায়ে, বাজ অল্ড্রিন, স্টিভ ওয়াজনিয়াক, নিল ডিগ্রেস টাইসন, বব নিউহার্ট, জেমস আর্ল জোন্স, ক্যারি ফিশারসের মতো ব্যক্তিবর্গ হাজির হয়েছেন বিগ ব্যাং থিওরির পর্দায়। তাছাড়া প্রায়ই দেখা মেলে উইল উইটন, ব্রায়ান গ্রিন, স্ট্যান লি ছাড়াও আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রের তারকাদের।

IMDb রেটিং: ৮,৪/১০
সিজন সংখ্যা: ১১ (চলমান)
পর্ব সংখ্যা: ২৩৯
নির্মাতা:
চাক লোর ও বিল প্র্যাডি
মুক্তিকাল: ২০০৫-২০১৪

আজ রবিবার

বাংলাদেশ টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে কম ধারাবাহিক নাটক তৈরি হয়নি আমাদের দেশে। কিন্তু এতো এতো নাটকের ভিড়ে হুমায়ূন আহমেদ রচিত এইসব দিনরাত্রি, বহুব্রীহি কিংবা কোথাও কেই নেই ধারাবাহিকগুলো আজও আমাদের দর্শক ভুলতে পারেনি, হয়তো পারবেও না। আর সবকিছু ছাড়িয়ে বিংশ শতাব্দীর শেষদিকে তার আরও একটি নাটক আমাদের দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে সক্ষম হয়েছিল, নাম আজ রবিবার। শুধু হুমায়ূন আহমেদের নাটক বলেই নয়। এই নাটকটি আরও জনপ্রিয়তা পেয়েছিল আমাদের অতি পরিচিত সব তারকাদের অসাধারণ অভিনয়ের কারণে।

হুমায়ূন আহমেদের গল্প বলার নিজস্ব অদ্ভুত ধরনের সাথে আবুল খায়ের, আলী যাকের, আবুল হায়াত, জাহিদ হাসান, আসাদুজ্জামান নূর, মেহের আফরোজ শাওন, শিলা আহমেদ ও ফারুক আহমেদের চমৎকার অভিনয়শৈলী নাটকের গল্পে যোগ করেছিল ভিন্ন এক মাত্রা।

আজ রবিবার; Source: YouTube

এর গল্প ঢাকার ছোট্ট এক দোতলা বাড়ির একটি একান্নবর্তী পরিবারকে ঘিরে। যে বাড়িতে আছে কংকা, তিতলি, তাদের বাবা, মিরা, বড় চাচা, ছোট চাচা, দাদু, আনিস ভাই, কাজের লোক মতি এবং ফুলি। তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ-দুঃখ মেশানো মজার সব ঘটনাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় ‘আজ রবিবার’ নাটকের কাহিনী। কংকা-তিতলির দুষ্টুমি, ছোট চাচার হিমুর মত হেয়ালিপনা, মনস্তত্ত্ববিদ বড় চাচার অদ্ভুত কাজকারবার, আনিস ভাইয়ের বোকার মতো আচরণ, জামিল সাহেবের মধুর কণ্ঠের গান, মতি আর ফুলির প্রেম সহ আরও ছোটখাটো যত মজার সব ঘটনা দূর করে দেবে আপনার বিষণ্ণতা।

আজ রবিবার সম্পর্কে এর থেকে বেশি বলা ঠিক হবে না। কেননা মতি মিয়ার ভাষ্যে, “অধিক কথার কোনো সার্থকতা নাই”।

IMDb রেটিং: ৮.৯/১০
এপিসোড সংখ্যা: ৭
নির্মাতা: হুমায়ূন আহমেদ
মুক্তিকাল: ১৯৯৯ 

ফিচার ইমেজ © Warner Bros.