আন্ডারস্ট্যান্ডিং জেন্ডার: কেন জেন্ডার ও সেক্স আলাদা

ইংরেজি জেন্ডার (gender) শব্দের বাংলা পরিভাষা লিঙ্গ। আবার ইংরেজি সেক্স (sex) শব্দের বাংলা পরিভাষাও লিঙ্গ। তার মানে কি, যে লাউ সেই কদুর মতো, জেন্ডার ও সেক্স একই জিনিস? অনেকের ধারণা সেরকমই। কিন্তু আসলে তা নয়।

জেন্ডার ও সেক্সের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। এবং এই পার্থক্য না জানলে, সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে যে অসমতা বিরাজমান, সেটির তল পাওয়া অসম্ভব। তাই জেন্ডার ও সেক্সের পার্থক্য জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সহায়ক গ্রন্থ হতে পারে কমলা ভাসিনের ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং জেন্ডার’

দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে জেন্ডার স্টাডিজের জন্য এই বইটি অতুলনীয়। এখানে প্রশ্নোত্তর বা কথোপকথনের ভঙ্গিমায় চমৎকারভাবে জেন্ডার সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়েছে, এবং সেটি শুরুই হয়েছে জেন্ডার ও সেক্সের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণের মাধ্যমে।

চলুন তাহলে, কমলা ভাসিনের লেখার আলোকে জেনে নেয়া যাক জেন্ডার ও সেক্সের পার্থক্য, এবং কেন তা জেন্ডার স্টাডিজে এতটা তাৎপর্যপূর্ণ।

কমলা ভাসিন; Image Source: The Daily Star

যদিও আমরা ইংরেজি ব্যাকরণে জেন্ডার শব্দটির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, নিঃসন্দেহে এটি বর্তমানে ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আপনি কি এই নতুন অর্থের ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারেন?

জেন্ডার শব্দটি বর্তমানে সমাজতাত্ত্বিকভাবে কিংবা একটি ধারণাগত বর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এবং সে কারণে এর একদমই নির্দিষ্ট একটি অর্থ সৃষ্টি হয়েছে। এই নব-অবতারে জেন্ডার দ্বারা বোঝানো হচ্ছে নারী ও পুরুষের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংজ্ঞায়ন এবং কীভাবে সমাজ নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রভেদ করে ও তাদের উপর স্ব স্ব সামাজিক ভূমিকা আরোপ করে। ফলে এটি এখন নারী ও পুরুষের সমাজবাস্তবতা বোঝার জন্য বিশ্লেষণী যন্ত্র হিসেবে কাজ করছে।

সেক্স ও জেন্ডারের মধ্যে পার্থক্য করা হয়েছে মূলত নারীদেরকে তাদের দেহের গঠনতন্ত্রের উপর ভিত্তি করে যে পরাধীনতা বা অধীনস্থতার সম্মুখীন হতে হয় সে বিষয় মোকাবিলার লক্ষ্যে। যুগ যুগ ধরে বিশ্বাস করে আসা হয়েছে যে সমাজে নারী ও পুরুষকে যে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য, ভূমিকা ও মর্যাদা দেয়া হয়, তা করা হয় মূলত তাদের শারীরিক বিশিষ্টতার উপর ভিত্তি করে, এবং এ ব্যাপারটি এতটাই প্রাকৃতিক যে তা অপরিবর্তনযোগ্য।

এক অর্থে, নারী ও নারীদের শরীরকেই, সমাজে তাদের অধস্তন অবস্থানের জন্য দায়ী করা হতো, এবং এখনো তাই হয়। একবার যদি এই বিষয়কে প্রাকৃতিক হিসেবে কবুল করে নেয়া যায়, তাহলে আর সমাজে বিদ্যমান জেন্ডার অসমতা ও অন্যায্যতা নিয়ে আলাপের কোনো প্রয়োজনই পড়ে না।

কিন্তু জেন্ডারের ধারণার ফলে আমরা বলার সুযোগ পাই যে সেক্স এক জিনিস, এবং জেন্ডার একদমই ভিন্ন জিনিস।

প্রত্যেকেই ছেলে বা মেয়ে শিশু হিসেবে জন্মগ্রহণ করে, এবং আমাদের সেক্স নির্ধারিত হয় কেবলই আমাদের জননাঙ্গের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু প্রতিটি সংস্কৃতিতেই ছেলে ও মেয়ে শিশুকে স্বতন্ত্র উপায়ে মূল্যায়নের এবং তাদেরকে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা, দায়িত্ব ও চরিত্র প্রদানের প্রচলন রয়েছে। এই যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ছেলে ও মেয়ে শিশুদেরকে সেই জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন করণীয় ও বর্জনীয়ের তালিকায় মুড়ে দেয়া হয়, সেটিই হলো জেন্ডারিং।

প্রতিটি সমাজই খুব ধীরে ধীরে একটি ছেলে বা মেয়ে শিশুকে একজন পুরুষ বা নারীতে রূপান্তরিত করে। তার মধ্যে বিভিন্ন পুরুষালি (masculine) বা মেয়েলি (feminine) বৈশিষ্ট্য সন্নিবিষ্ট করে, তার বিভিন্ন গুণাবলী, আচরণিক ধরন, ভূমিকা, দায়িত্ব, অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে।

সেক্স একটি জৈবিক বিষয় হলেও, নারী ও পুরুষের জেন্ডার পরিচয় নির্ধারিত হয় মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিকভাবে, অর্থাৎ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে।

অ্যান ওকলে ছিলেন প্রথম দিককার নারীবাদী স্কলারদের মধ্যে একজন, যিনি এই ধারণা নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেছেন, “জেন্ডার হলো একটি সংস্কৃতি-সম্বন্ধীয় বিষয়। এর মাধ্যমে পুরুষালি ও মেয়েলি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে পুরুষ ও নারীর সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস করা হয়।”

এখানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন: একজন ব্যক্তি জৈবিকভাবে পুরুষ না নারী তা কিছু জৈবিক চিহ্নের মাধ্যমে বিচার করা যায়। কিন্তু একজন মানুষের মধ্যকার বৈশিষ্ট্যগুলো পুরুষালি না মেয়েলি তা ঠিক একইভাবে বিচার করা যায় না। এক্ষেত্রে বিচার্য ক্ষেত্রগুলো (criteria) সাংস্কৃতিক, এবং সেগুলো স্থান ও সময়ভেদেও ভিন্ন। সেক্সের স্থিরতা যেমন স্বীকার না করে উপায় নেই, তেমনই জেন্ডারের পরিবর্তনশীলতাও অনস্বীকার্য।

ওকলে এই বলে শেষ করেছেন যে, জেন্ডারের কোনো জৈবিক উৎপত্তিস্থল নেই, ফলে সেক্স ও জেন্ডারের মধ্যে যে যোগাযোগ তা মোটেই ‘প্রাকৃতিক’ নয়।

চলুন দেখা যাক এই দুটি পরিভাষায় প্রধান পার্থক্যগুলো কী।

  • সেক্স হলো প্রাকৃতিক। জেন্ডার হলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং এটি মানবসৃষ্ট।
  • সেক্স হলো জৈবিক। এর মাধ্যমে জননাঙ্গের দৃশ্যমান পার্থক্য এবং সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে অন্যান্য কার্যকলাপের পার্থক্যসমূহ নির্দেশ করা হয়। অন্যদিকে জেন্ডার হলো সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং এটি নির্দেশ করে পুরুষালি ও মেয়েলি চরিত্র, আচরণিক ধরন, ভূমিকা, দায়িত্ব ইত্যাদি।
  • সেক্স ধ্রুব, এটি সর্বত্র অপরিবর্তনীয়। জেন্ডার পরিবর্তনশীল, এটি একসময় থেকে অন্য সময়ে, এক সংস্কৃতি থেকে অন্য সংস্কৃতিতে, এমনকি এক পরিবার থেকে অন্য পরিবারেও পরিবর্তনশীল।
  • সেক্স ঐচ্ছিকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। জেন্ডারকে ঐচ্ছিকভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব।
দক্ষিণ এশিয়ায় নারীরা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী; Image Source: AP/World Bank

দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলোয় জেন্ডার শব্দটি কীভাবে অনূদিত হয়?

এটি প্রকৃতপক্ষেই একটি বড় সমস্যা। ইংরেজিতে দুটি আলাদা শব্দ, সেক্স ও জেন্ডার থাকলেও, অধিকাংশ দক্ষিণ এশীয় ভাষাতেই কেবল একটি শব্দ বিদ্যমান। ‘লিঙ্গ’ শব্দের মাধ্যমেই সেক্স ও জেন্ডার উভয়কে নির্দেশ করা হয়। তাই এই দুইয়ের মধ্যে প্রভেদ সৃষ্টির জন্য আমরা দুটি পৃথক বিশেষণ খুঁজে পেয়েছি, যার মাধ্যমে দুই লিঙ্গকে আলাদা করা সম্ভব। সেক্সের জন্য আমরা বলতে পারি ‘প্রাকৃতিক লিঙ্গ’, এবং জেন্ডারের জন্য ‘সামাজিক লিঙ্গ’। এমনকি, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই দুই পরিভাষা সেক্স ও জেন্ডারের চেয়েও ভালোভাবে কাজ করতে পারে, কেননা এদের নিজেদের মধ্যেই নিজেদের সংজ্ঞা প্রতিস্থাপিত হয়েছে, ফলে আলাদা করে কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অপ্রয়োজনীয়।

কিন্তু জেন্ডার কি খুব ঘনিষ্ঠভাবে আমাদের সেক্সের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়? নারী ও পুরুষদের উপর যে ধরনের ভূমিকা ও আচরণ আরোপ করা হয়, সেগুলো কি তাদের সেক্সের পার্থক্যের ভিত্তিতেই করা হয় না?

কেবল কিছু ক্ষেত্রে এ কথা সত্য। নিজেদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসূচক শরীরের কারণে অনেক নারীই (সকল নারী নয়) গর্ভে সন্তান ধারণ করে, সন্তানকে বুকের দুধ পান করায়, এবং প্রতিমাসে ঋতুস্রাবের অভিজ্ঞতা লাভ করে। কিন্তু এই বিষয়গুলো বাদে আর কিছুই নেই, যেগুলো নারীরা করে কিন্তু পুরুষরা করতে পারে না, কিংবা পুরুষরা করে কিন্তু নারীরা করতে পারে না। নারীরা তাদের গর্ভে সন্তান ধারণ করে মানে এই নয় যে কেবল নারীরাই ওই সন্তান প্রতিপালন ও দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে পারে, কিংবা তাদেরকেই তা করতে হবে। পুরুষরাও সমানভাবে সন্তান প্রতিপালন করতে পারে। ফলে শুধু একটি পুরুষের বা নারীর শরীর থাকার কারণেই আমাদের বৈশিষ্ট্য, ভূমিকা বা নিয়তি পূর্ব-নির্ধারিত হতে পারে না।

কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে, কোনটি প্রাকৃতিক এবং কোনটি সামাজিকভাবে সৃষ্ট তা প্রতিষ্ঠা করা খুবই কঠিন, কেননা একটি বাচ্চা জন্মগ্রহণের পর থেকেই তার পরিবার ও সমাজ তার জেন্ডারিংয়ের প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। অনেক দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিতেই পুত্রসন্তানের জন্মগ্রহণ সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়, অথচ কন্যাসন্তানের জন্মগ্রহণে হা-হুতাশ করা হয়। পুত্রসন্তানকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, ভালো খাবার ও ভালো স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। তাকে শক্তপোক্ত ও বহির্মুখী হতে উৎসাহী করা হয়। অন্যদিকে কন্যাসন্তানকে বলা হয় শান্তশিষ্ট, সংযমী ও সংসারী হতে। একটি মেয়ের শরীরে এমন কিছুই নেই, যার ফলে তাকে শর্টস পরা, গাছে চড়া বা সাইকেল চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে; এবং একটি ছেলের শরীরেও এমন কিছুই নেই যে-কারণে সে পুতুল খেলতে, ছোট ভাই-বোনের দেখভাল করতে অথবা রান্না ও ঘর পরিষ্কারের কাজে সাহায্য করতে পারবে না।

এই সকল পার্থক্যই হলো জেন্ডারগত পার্থক্য, এবং এগুলো সৃষ্টি হয়েছে সমাজ কর্তৃক। জেন্ডার যে প্রাকৃতিক নয় বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে সৃষ্ট, তার একটি প্রমাণ হলো- এটি নিয়ত পরিবর্তনশীল। সময়ের সাথে সাথে, স্থানভেদে, কিংবা বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীতে জেন্ডারের রূপ ভিন্ন। যেমন ধরুন, একটি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেয়ের জীবন হয়তো নিজের বাড়িতে ও স্কুলেই সীমাবদ্ধ; অথচ একটি আদিবাসী মেয়ে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারছে জঙ্গলে, যেতে পারছে পশু চরাতে, গাছে চড়তে পারছে ফল-পাতা-ডালপালা সংগ্রহের লক্ষ্যে। এখানে তারা উভয়ই কিন্তু মেয়ে, তাদের উভয়ের শরীরই একই রকম, কিন্তু তারপরও তাদের মাঝে গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী সক্ষমতা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন।

একইভাবে, অনেক পরিবারেই মেয়েদেরকে ‘পারিবারিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্কুলে পাঠানো হতো না, বয়স ১০-১১ হওয়ার পর ঘরের বাইরে এক পা-ও রাখতে দেয়া হতো না, এবং অনেকক্ষেত্রে, বয়ঃসন্ধিকালেই বিয়ে দিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। ঠিক সেভাবে বদলেছে পুরুষদের শিক্ষা, ভূমিকা ও দায়িত্বের ধরনও, যদিও সেই পরিমাণ হয়তো খুব বেশি নয়। তো, জেন্ডার পরিবর্তনশীল বলতে আমরা এই বিষয়গুলোই বুঝিয়ে থাকি। এর স্বরূপ একেক পরিবারে বা সম্প্রদায়ে একেক রকম। আবার একই পরিবারেও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এর স্বরূপ হতে পারে ভিন্ন ভিন্ন।

এমনকি আমাদের শরীরকেও আমরা নিজেরাই কিংবা আমাদের সমাজ বা সংস্কৃতি পরিবর্তন করতে বা আকৃতি ও কাঠামো প্রদান করতে সক্ষম। আমরা প্রশিক্ষণ, ব্যবহার, অব্যবহার, অপব্যবহার কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে আমাদের শারীরিক আকার-আকৃতি, কাঠামো ও শক্তিমত্তায় পরিবর্তন আনতে পারি। নারী ও পুরুষ কুস্তিগীর, বডি-বিল্ডার, অ্যাথলেট, নৃত্যশিল্পী, যোগী প্রমুখ এই শারীরিক পরিবর্তনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আবার, নারীদের শরীর সন্তান জন্মদানে সক্ষম হলেও, আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারি যে সন্তান জন্ম দেব কিনা, দিলেও কয়টি সন্তান জন্ম দেব, এবং প্রতিটি সন্তান জন্মদানের মাঝে কতটুকু বিরতি নেব। বিভিন্ন নারী-পশুদের জন্য প্রজনন যেমন অনিবার্য, মানব-নারীদের জন্য তা নয়।

একজন নারী যদি রান্না করতে পারে
তবে একজন পুরুষও পারবে
কেননা একজন নারী তো আর আর জরায়ু দিয়ে রান্না করে না!

এ কথাটি বলার কারণ, সমাজে নারী ও পুরুষ কেমন পদমর্যাদা উপভোগ করবে, তা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবেই নির্ধারিত হয়। এটি মানবসৃষ্ট, এখানে প্রকৃতির দায় খুব কমই রয়েছে। এটি অবশ্যই জেন্ডার, এবং সেক্স নয়, যা নির্ধারণ করে দিয়েছে যে (প্রায়) সকল সম্প্রদায়েই নারীরা পুরুষদের চেয়ে হীনতর হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে পুরুষদের তুলনায় নারীরা প্রায়ই কম অধিকার, কম সংস্থানের নিয়ন্ত্রণ পায়। তারা দৈনিক পুরুষদের চেয়ে বেশি কর্মঘণ্টা অতিবাহিত করলেও, তাদের সেই কাজের অবমূল্যায়ন করা হয়, অথবা কোনো মূল্যায়ন বা মজুরিই তাদের কপালে জোটে না। তারা পুরুষ ও সমাজের হাতে নিয়মতান্ত্রিক সহিংসতার শিকার হয়। সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের সিদ্ধান্ত-গ্রহণের ক্ষমতা নেই বললেই চলে।

“আমাদের মতো এতটা নির্মম ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইতিহাসের আর কোনো সামাজিক ক্রমই বিভিন্ন সেক্সের মধ্যকার প্রাকৃতিক পার্থক্যকে সম্প্রসারিত ও বিকৃত করে ব্যবহার করেনি। এই ক্রম প্রথমে প্রাকৃতিক সেক্সকে একটি সামাজিক কৃত্রিম জেন্ডারে রূপান্তরিত করেছে, পুরুষের মধ্য থেকে নতুন ‘পুরুষ’ সৃষ্টি করেছে, নারীর মধ্য থেকে নতুন ‘নারী’ সৃষ্টি করেছে, এমনকি প্রকৃতপক্ষে পুরুষকে ‘মানবজাতি’তে রূপ দিয়ে, নারীকে নিছকই একটি সেক্স বানিয়ে রেখেছে… এবং শেষমেশ, এসব পার্থক্য তৈরির পর, সেই ক্রম নিজেকে পুনরায় ‘প্রাকৃতিক’ বলে ঘোষণা করেছে, যেন বিভিন্ন সেক্সকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করতে পারে।” — ক্লডিয়া ভন ওয়ের্লহোফ

প্রতিটি সমাজই মেয়ে ও ছেলের জন্য, নারী ও পুরুষের জন্য, আলাদা আলাদা নিয়ম বিধান করে দেয়, যেগুলো তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকেই, এবং তাদের ভবিষ্যতকে, নির্ধারণ করে দেয়। চলুন তাকানো যাক সর্বাধিক দৃশ্যমান বিষয়গুলোর দিকে।

পোশাক

প্রায় সকল সমাজেই, মেয়ে ও ছেলেরা, নারী ও পুরুষরা, ভিন্ন ভিন্ন পোশাক পরে থাকে। কোনো কোনো জায়গায় হয়তো এই ভিন্নতার পরিমাণ খুবই কম। তবে অন্য অনেক জায়গায় আবার সেই ভিন্নতা খুবই প্রকট। পোশাক পরিধানের ধরন মানুষের বিচরণ ক্ষমতা, স্বাধীনতার অনুভূতি এবং সম্ভ্রমকে প্রভাবিত করতে পারে, করেও থাকে।

মেয়ে ও ছেলেশিশুদের পোশাক-পরিচ্ছদে কিছু স্পষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। যেমন মেয়েদের পরানো হয় গোলাপি, ছেলেদের পরানো হয় নীল; Image Source: Live Science

গুণাবলি

অধিকাংশ সমাজেই নারীদের কাছ থেকে আশা করা হয় যে, তারা হবে নম্র-ভদ্র, স্নেহশীল, যত্নশীল ও অনুগত। আর পুরুষদের কাছ থেকে আশা করা হয় তারা হবে শক্তিশালী, আত্মপ্রত্যয়ী, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও যুক্তিবাদী। বসন্ত কান্নাবিরান নামের একজন ভারতীয় নারীবাদী এক জেন্ডার কর্মশালায় বলেছিলেন,

“সন্তান প্রতিপালনকে নারীদের জন্য এতটাই প্রাকৃতিক বলে বিবেচনা করা হয়, ঠিক যেভাবে তাদের মাঝে অন্তর্নিহিত রয়েছে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা… এবং এই প্রতিপালনের গুণ শুধু নারী নিজে যে সন্তানকে জন্ম দিচ্ছে তার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। ধারণা করা হয় যে ভালোবাসা বা মাতৃত্ব আমাদের মাঝে বসে আছে, অপেক্ষা করছে যে কারো প্রয়োজন হলেই সে ফল্গুধারার মতো বইতে শুরু করবে। এভাবে আমরা হয়ে উঠি চিরন্তন মা। তাই আমি আমার নিজের সন্তানকে লালন করি, অন্যের সন্তানকে লালন করি, এমনকি লালন করি আমার স্বামীকে, আমার ভাইদের, আমার বোনদের, আমার বাবাকেও, যে আমাকে ডাকে ‘আমার ছোট মা’ বলে। সবার কাছে আমি হয়ে যাই মাতৃত্বের সম্প্রসারিত স্বরূপ। তখন আমার কাছে আশা করা হয় যে গোটা মহাজগতের প্রতিই আমার মনে প্রবাহিত হবে মাতৃত্বের অনুভূতি। এবং এটি নাকি প্রাকৃতিক! এটি নাকি কোনো স্বতন্ত্র কাজ নয়। এটি নাকি ঠিক তেমনই সহজসাধ্য কাজ, যেভাবে আমরা শ্বাস নিচ্ছি, খাচ্ছি কিংবা ঘুমাচ্ছি।”

ভূমিকা ও দায়িত্ব-কর্তব্য

পুরুষরা বিবেচিত হয় পরিবারের মাথা হিসেবে। তারাই হবে প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, এবং সম্পদের নিয়ন্ত্রক। তারা রাজনীতি, ধর্মপালন, ব্যবসা ও নিজস্ব পেশায় পালন করবে সক্রিয় ভূমিকা। অন্যদিকে নারীদের কাছ থেকে আশা করা হয়, তারা সন্তান জন্ম দেবে, প্রতিপালন করবে, বয়োজ্যেষ্ঠ কিংবা অশক্তদের সেবা করবে, সংসারের সব কাজ করবে, এবং আরো কত কী! এসব কাজকর্মই নির্ধারণ করে দেয় পুরুষ ও নারী কতটুকু শিক্ষার্জন করবে অথবা করবে না, তাদের কাজের প্রশিক্ষণ কেমন হবে, অর্থসংস্থানের জন্য তাদের কাজের ধরন কেমন হবে, ইত্যাদি। নারী ও পুরুষের ভূমিকা পৃথকীকরণের মাত্রা হয় ব্যাপক। কখনো কখনো নিয়মগুলো পক্ষপাতমূলক বা পছন্দের উপর নির্ভরশীল, এবং সাময়িক ভূমিকার অদলবদলের ক্ষেত্রে কোনো সেক্সের মাঝেই খুব একটা উদ্বেগ দৃশ্যমান হয় না।

“কোরা ডু বোইসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যালোরে যদিও দুই সেক্সের মধ্যে অর্থনৈতিক ভূমিকার ব্যবধান রয়েছে, তারপরও কারো জন্যই বিপরীত সেক্সের কর্ম সম্পাদন করাকে অস্বাস্থ্যকর কোনো বিষয় হিসেবে চিন্তা করা হয় না। বরং এই সম্পূরক দক্ষতার জন্য তারা প্রশংসিত হয়। সেখানে নারীরা জীবিকানির্ভর অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, এবং পুরুষদের কাঁধে থাকে বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের দায়ভার। কিন্তু তা সত্ত্বেও, অনেক পুরুষই কৃষিকাজের ব্যাপারে আগ্রহী, আবার অনেক নারীরই রয়েছে বাণিজ্যিক দক্ষতা। কিন্তু কোনো কোনো সংস্কৃতিতে আবার কৃষিকাজকে একেবারেই নারীসুলভ কাজ হিসেবে দেখা হয়, এবং কোনো পুরুষের এ কাজের প্রতি ঝোঁককে তার সেক্সের বিচ্যুতি হিসেবে গণ্য করা হয়। আবার অন্য অনেক জায়গায়, একটি বিশেষ বর্গও তৈরি হতে পারে সেসব নারীদের জন্য, যারা উভয় সেক্সের জন্য নির্ধারিত কাজেই সমান দক্ষতার পরিচয় দেয়।” — অ্যান ওকলে

অনেক সমাজে আবার প্রতিটি সেক্সের জন্য কঠোর ভূমিকা জারি করা হয়। অ্যান ওকলের থেকেই আমরা জানতে পারি,

“সেন্ট্রাল ব্রাজিলের মুনডুরুকু ইন্ডিয়ানরা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যেখানে তারা প্রতিটি সেক্সের জন্য পৃথক ভূমিকা ও গোষ্ঠীর মেরুকরণকে তাদের একটি প্রাথমিক সামাজিক উপাদানে পরিণত করেছে। সেখানে এক সেক্সের মানুষেরা অন্য সেক্সের মানুষের থেকে শারীরিক ও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। পুরুষ ও ছেলেরা থাকে নারী ও মেয়েদের থেকে পৃথক ঘরে। তাদের নিজ নিজ সেক্সের ভেতর গোষ্ঠী তৈরি হয়, এবং প্রত্যেকের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া কেবল নিজ সেক্সের মানুষের সঙ্গেই হয় (শুধু ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে)। বিভিন্ন উৎসব উদযাপন বা রীতি মেনে চলার ক্ষেত্রের দুই সেক্সের মধ্যে বৈরিতা বজায় থাকে। এই মেরুকরণের বিস্তার কেবল অর্থনৈতিক কাজ ও সামাজিক ভূমিকা পালনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং ব্যাপ্ত হয় ব্যক্তিত্বের গঠন ও বিকাশেও। আধিপত্য ও নমনীয়তার দ্বিমুখিতা এখানে বাস্তব রূপ ধারণ করে। নিজ সেক্সের জন্য নির্ধারিত ভূমিকা পালন ও ব্যক্তিত্বের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকা নিয়ে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করে, আবার এই সীমানা অতিক্রমের বাস্তব ও কাল্পনিক ব্যাকুলতাও অনেকের মাঝে দেখা যায়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিভিন্ন লোকসংস্কৃতির উপাদান ও আচার-অনুষ্ঠানে।”

বাইরের মানুষদের কাছে হয়তো মনে হয়, পশ্চিমা সমাজে বুঝি জেন্ডারভিত্তিক পার্থক্যের পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু অ্যান ওকলের মতে,

“আজ পশ্চিমা সমাজে সেক্স (প্রাকৃতিক লিঙ্গ) হলো সামাজিক কাঠামো সৃষ্টির একটি সাংগঠনিক মূলনীতি। যদিও জনপ্রিয় অভিমত ভিন্ন, তবু আসলে ব্যক্তিবিশেষের সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে এটি একটি বিশাল ভূমিকা পালন করে। তাই এটি মোটেই বিস্ময়কর ব্যাপার নয় যে মুনডুরুকুর মতো, পশ্চিমা সমাজের উদ্বেগেরও শেকড় প্রোথিত রয়েছে জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকা (gender role) থেকে উদ্ভূত চাহিদায়। মনস্তত্ত্ববিদরা আমাদেরকে বলেন যে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আমাদের নিরাপত্তাবোধের অনেকটাই আসে এসব জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকার গণ্ডির মধ্যে থাকার মাধ্যমে। তারা বলেন, আমাদেরকে অবশ্যই এই গণ্ডির মধ্যেই থাকতে হবে, যদি আমরা চাই আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে সুস্থিত রাখতে।”

জেন্ডার ভূমিকার এই পার্থক্যগুলোর উত্থানের পেছনে একটি কারণ কি হতে পারে মেয়ে ও নারীদের জৈবিকভাবে পুরুষের তুলনায় দুর্বল হওয়া?

আসলে, জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে, পুরুষরাই হলো দুর্বলতর সেক্স, এবং Y ক্রোমোসোম (যেটি কেবল পুরুষদের থাকে) অনেক শারীরিক প্রতিবন্ধকতার জন্য দায়ী।

অ্যাশলে মন্টাগু তার ‘দ্য ন্যাচারাল সুপেরিয়রিটি অভ উইমেন’ বইয়ে একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন, যেখানে নির্দিষ্ট ৬২টি ডিজঅর্ডারের পেছনে প্রায় সম্পূর্ণরূপে দায়ী সেক্স-লিঙ্কড জিন, এবং সেগুলোর অধিকাংশ পুরুষদের মাঝেই দেখা যায়।

“তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বেশ গুরুতর, যেমন হেমোফিলিয়া (এই রোগে রক্ত তঞ্চনে সমস্যা হয় তাই একবার রক্তনালী কেটে গেলে আর রক্তপাত বন্ধ হয় না), মাইট্রাল স্টেনোসিস (হৃদপিণ্ডের এক ধরনের জটিলতা), এবং নানা ধরনের মানসিক সমস্যা… জীবনের একদম গোড়ার দিকেই, অর্থাৎ গর্ভধারণের শুরু থেকে, জিনগত নারীর চেয়ে অনেক বেশি জিনগত পুরুষের মৃত্যু হয়। জিনগত পুরুষের জন্মহার ও মৃত্যুহার উভয়ই যে বেশি, এ বিষয়টি যেন পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চলে।

“যদিও X ও Y ক্রোমোসোম সমান সংখ্যায় উৎপাদিত হয়, প্রতি ১০০টি জিনগত নারীর বিপরীতে ১২০ থেকে ১৫০টি জিনগত পুরুষ গর্ভে আসে। সেখান থেকে জন্মের সময় ছেলেশিশু ও মেয়েশিশুর অনুপাত দাঁড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে ১০৬:১০০ (শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে) এবং ব্রিটেনে ৯৮:১০০। মেয়েশিশুদের চেয়ে ছেলেশিশুরা গর্ভপাতে বা জন্মলগ্নে বেশি মারা যায়, এবং বার্থ ট্রমার কারণেও ছেলেশিশুদেরই মৃত্যু বেশি হয়; মেয়েশিশুদের চেয়ে ৫৪% বেশি ছেলেশিশু মারা যায় বার্থ ইনজুরির কারণে, এবং ১৮% বেশি ছেলেশিশু মারা যায় কনজেনিটাল ম্যালফরমেশনে। তাছাড়া জন্মলগ্নে পুরুষের চেয়ে নারীদের প্রত্যাশিত আয়ুষ্কালও গোটা বিশ্বব্যাপীই অধিক।” [এগুলো সাম্প্রতিক তথ্য নয়]

অ্যান ওকলে আমাদের সামনে প্রচুর গবেষণালব্ধ তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন যেখান থেকে দেখা যায় যে পুরুষদের সংক্রামক অসুখ ও মৃত্যুর প্রবণতা বেশি। তার মতে, এই অধিক প্রবণতার পেছনে সরাসরি নারী-পুরুষের ‘ক্রোমোসোমাল মেক-আপ’-এর যোগসাজশ রয়েছে। মানুষের শরীর যেন সংক্রমণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে সেক্ষেত্রে শরীরের কলকব্জাকে যেসব জিন নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো পরিবাহিত হয় X ক্রোমোসোম দ্বারা। এজন্যই জৈবরাসায়নিক ভিত্তি অনুসারে পুরুষের অসুস্থতার প্রবণতা বেশি।

অবশ্য দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের জৈব শ্রেষ্ঠত্ব ঢাকা পড়ে গেছে তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধীনস্থতার নিচে। সে-কারণে আজ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই নারীরা পিছিয়ে রয়েছে।

অ্যারিস্টটল বলেছেন পুরুষের নীতি হলো সক্রিয়, এবং নারীর নিষ্ক্রিয়। তার কাছে, নারী হলো ‘বিকৃত পুরুষ’, এমন কেউ যার আত্মা নেই। তার মতে, জৈব হীনতার কারণে একজন নারী সক্ষমতার দিক থেকে, কিংবা তার বিচার-বিবেচনা ও সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও হীনতর। যেহেতু পুরুষরা শ্রেয়তর এবং নারীরা হীনতর, তাই পুরুষরা জন্মেছেই শাসন করতে, এবং নারীরা জন্মেছে শাসিত হতে। অ্যারিস্টটলের মতে, “পুরুষের বীরত্ব সন্নিহিত আছে আদেশ প্রদানে, আর নারীর সেই আদেশ মান্যতায়।”

এদিকে সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছেন, নারীদের জন্য “দেহসংস্থানই হলো নিয়তি”। ফ্রয়েডের মতে স্বাভাবিক মানুষ হলো পুরুষ, এবং নারী হলো মানুষের স্বাভাবিকতা-বিচ্যুত রূপ, কেননা তার একটি শিশ্ন নেই, এবং তার যাবতীয় মনস্তত্ত্বই নাকি আবর্তিত হয় এই অভাব মোচনের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে।

ফ্রয়েডের মতে নারীদের জন্য দেহসংস্থানই নিয়তি; Image Source: Quote Fancy

এবং ডারউইন নারীদের সম্পর্কে বলেছেন,

“একজন নারীকে পুরুষের থেকে আলাদা মনে হয় মূলত মানসিক স্বভাবের কারণে, প্রধানত তার অধিক আবেগপ্রবণতা ও কম স্বার্থপরতার কারণে… এটি সাধারণভাবে স্বীকৃত যে প্রখর অনুমানশক্তি কিংবা দ্রুত উপলব্ধিশক্তির দিক থেকে নারীরা পুরুষদের চেয়ে শক্তভাবে চিহ্নিত হয়; তবে এসব ক্ষমতার মধ্যে অন্তত কয়েকটি মূলত নিম্নবর্গীয় জাতির বৈশিষ্ট্য, এবং সে-কারণেই এগুলো সভ্যতার অতীত ও নিম্নতর রূপ।”

তার মানে আপনারা বলতে চাইছেন, নারী ও পুরুষের জৈবিক পার্থক্যের কোনো প্রভাবই নেই? নারীরা যে সন্তান জন্ম দেয়, এই বিষয়টির সাথে সমাজ-কর্তৃক নির্ধারিত ভূমিকার কোনো সম্পর্ক নেই?

আমরা এ কথা অস্বীকার করছি না যে নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু জৈবিক পার্থক্য বিদ্যমান। কিন্তু এই যে সংস্কৃতিভেদে বিভিন্ন জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকা এত বেশি পরিবর্তিত হয়, এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে এগুলো কেবল সেক্সের উপর ভিত্তি বা নির্ভর করে না। আমাদেরকে বিজ্ঞানের একটি সহজ নিয়ম মনে রাখতে হবে: চলককে (জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকা) ধ্রুবক (জননাঙ্গ বা ক্রোমোসোম বা সেক্স) দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় না। যদি কেবল জীববিজ্ঞানই এককভাবে আমাদের ভূমিকা ও কার্যকলাপ নির্ধারণ করে দিত, তাহলে জগতের সকল নারীই রান্না করত, কাপড় কাচত, সেলাই করত। কিন্তু স্পষ্টতই বিষয়টি তেমন নয়। কেননা অধিকাংশ পেশাদার রাঁধুনি, ধোপা কিংবা দর্জিই পুরুষ।

আমরা যা বলতে চাইছি তা হলো, সেক্স বা প্রকৃতি কোনোভাবেই সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অন্যায্য অসমতার পেছনে দায়ী নয়। বিভিন্ন বর্ণ, শ্রেণি, জাতি ইত্যাদির মধ্যে বিদ্যমান অসমতার মতোই, নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসমতাও মানবসৃষ্ট; এদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, তাই এদেরকে প্রশ্ন করা, চ্যালেঞ্জ জানানো কিংবা পরিবর্তন করা সম্ভব। একজন নারী তার গর্ভে সন্তান ধারণ করতেই পারে, তার মানে এই নয় যে সে কারো অধস্তন বা অনুগত হতে বাধ্য। তাছাড়া এই বিষয়টি দ্বারা তার শিক্ষা, প্রশিক্ষণ বা চাকরির সুযোগকেও প্রভাবিত করা অনুচিত। কেন ভিন্ন ভিন্ন শরীর ও শারীরবৃত্তিক কার্যকলাপ থেকে অসমতা সৃষ্টি হবে? দুজন মানুষকে সমান হতে, সমানাধিকার লাভ করতে, এবং সমান সুযোগ পেতে তো পরস্পর অভিন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

নারীবাদী আন্দোলনে সক্রিয় ও স্কলার মারিয়া মিস তার ‘দ্য সোশ্যাল অরিজিনস অভ দ্য সেক্সুয়াল ডিভিশন অভ লেবার’ গ্রন্থে লিখেছেন,

“…পুরুষত্ব বা নারীত্ব জৈবিকভাবে প্রদত্ত নয়, বরং এগুলো দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফসল। ইতিহাসের প্রতিটি পর্বে পুরুষত্ব ও নারীত্বকে নতুন নতুন রূপে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এবং প্রতিটি সংজ্ঞায়নই নির্ভর করেছে ওই নির্দিষ্ট কালের উৎপাদন ব্যবস্থার মূলনীতির উপর ভিত্তি করে… তাই নিজেদের শরীরের সঙ্গে নারী-পুরুষের গুণগতভাবে ভিন্ন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সে-কারণেই, মাতৃতান্ত্রিক সমাজগুলোতে নারীত্বকে দেখা হতো যাবতীয় উৎপাদনের দৃষ্টান্ত হিসেবে, এবং সেখানে পুরুষ ছিল জীবন উৎপাদনের সক্রিয় প্রভাবক। সকল নারীকেই সংজ্ঞায়িত করা হতো ‘মা’ হিসেবে। কিন্তু তখন ‘মা’-এর ছিল এক ভিন্ন অর্থ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আওতায় সামাজিকভাবে সকল নারীই সংজ্ঞায়িত হয় গৃহবধূ হিসেবে (এবং পুরুষরা উপার্জনক্ষম হিসেবে)। এবং এই ব্যবস্থায় মাতৃত্ব পরিণত হয়েছে ‘হাউজওয়াইফ-সিন্ড্রোম’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশে। নারীত্বের ব্যাপারে অতীতের মাতৃতান্ত্রিক সংজ্ঞায়নের সঙ্গে আধুনিক সময়ের সংজ্ঞায়নের তফাৎ এই যে, দ্বিতীয়টিতে নারীর যাবতীয় সক্রিয়তা, সৃজনশীলতা ও উৎপাদনক্ষমতা তথা মানবিক গুণাবলিকে কেড়ে নেয়া হয়েছে।”

এমনটিই যদি হয়ে থাকে, তাহলে কি আপনি বলতে পারেন পুরুষ ও নারীরা কীভাবে পুরুষালি ও মেয়েলি মানুষে পরিণত হয়?

এটি ঘটে থাকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া কিংবা জেন্ডারিংয়ের মাধ্যমে, যা পরিবার ও সমাজে প্রতিনিয়ত চলতে থাকে।

আমরা সকলেই জানি, একটি নবজাতক শিশুকে তাৎক্ষণিকভাবে কেবল একটি নির্দিষ্ট সেক্সেরই শ্রেণিভুক্ত করা হয় না, বরং তাকে একটি নির্দিষ্ট জেন্ডারও গছিয়ে দেয়া হয়। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি, কীভাবে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে দুই সেক্সের নবজাতক শিশুকে ভিন্নভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। তবে এ তো কেবল শুরু। এরপর একটি শিশুকে কীভাবে ডাকা হবে, তার সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হবে, তাকে কীভাবে পোশাক পরানো হবে, এই সকল ক্ষেত্রেই ছেলেশিশু ও মেয়েশিশুতে উল্লেখযোগ্য তফাৎ দেখা যায়। সমাজে তাদের কেমন আচরণ হবে, তা-ও শেখানো হয়, যার নাম সামাজিকীকরণ। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার যে নির্দিষ্ট অংশে শিশুদেরকে তাদের জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকা ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে শেখানো হয়, সেটিকে বলে জেন্ডারিং বা জেন্ডার ইনডক্ট্রিনেশন (indoctrination বা দীক্ষাদান)। সামাজিকীকরণের এই ধাপেই শিশুদেরকে ব্যক্তিত্বের পুরুষালি বা মেয়েলি দিকগুলো শেখানো হয়, এবং তাদেরকে সেই নির্দিষ্ট আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও ভূমিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়।

জন্মের সাথে সাথেই নবজাতক শিশুকে সেক্সের পাশাপাশি দেয়া হয় একটি জেন্ডার; Image Source: Korea Bizwire

রুথ হার্টলির মতে, সামাজিকীকরণ সংঘটিত হয় চারটি প্রক্রিয়ায়। সেগুলো হলো ম্যানিপুলেশন (manipulation), ক্যানেলাইজেশন (canalisation), ভার্বাল অ্যাপেলেশন (verbal appellation) ও অ্যাক্টিভিটি এক্সপোজার (activity exposure)।

ম্যানিপুলেশন হলো কৌশলগত পরিচালনা। আপনি একটি শিশুর সাথে কী করছেন বা কেমন ব্যবহার করছেন, তা তার মনস্তত্ত্বে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। একদম শুরু থেকেই ছেলেশিশুদেরকে শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা হিসেবে গণ্য করা হয়। আবার অনেকক্ষেত্রে মায়েরা তাদের মেয়েশিশুর চুল নিয়ে নানাবিধ আদিখ্যেতা করে, তাকে মেয়েলি সাজে সজ্জিত করে, বারবার বলতে থাকে সে কত সুন্দর। এভাবেই শৈশবের শুরুতেই শিশুরা তাদের চেহারা বা গুণাবলি সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা লাভ করে, তা তাদের অবচেতন মনে গেঁথে যায়, এবং নিজেদের ব্যাপারে তারা এই ধারণাগুলো আঁকড়ে ধরে।

দ্বিতীয় প্রক্রিয়া তথা ক্যানেলাইজেশন হলো নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত করা। অনেকসময় কোনো জলাশয়কে এমনভাবে কাটা হয় ও তার দুই ধারে প্রকৌশলের সাহায্য নেয়া হয় যেন তার একটি নির্দিষ্ট গতিপথ তৈরি হয়, এবং জল ওই নির্দিষ্ট পথ ধরেই প্রবাহিত হয়ে বৃহৎ কোনো জলাশয় বা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। অনুরূপভাবে, শিশুদের সঙ্গেও একই কাজ করা হয়। বাবা-মায়েরা নিজে থেকেই মেয়েশিশুদের হাতে খেলনা পুতুল বা হাঁড়িপাতিল ধরিয়ে দেয়, কিংবা ছেলেশিশুদের হাতে বন্দুক, খেলনা গাড়ি, বিমান ইত্যাদি; যেন তারা ঐসব খেলনা দিয়ে খেলতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং বড় হয়ে একই ধরনের কাজকে আপন করে নেয়। শৈশবের এসব খেলনা দিয়ে খেলার অভিজ্ঞতা শিশুদের ভবিষ্যৎ বিনোদন বা কাজের কাঠামো গড়ে দেয়, এবং যখন তাদের নিজেদের স্বাধীনভাবে পছন্দ করার সুযোগ আসে, তখনো তারা এগুলোকেই বেছে নেয়। অর্থাৎ, শৈশবে কোনো জিনিসের সঙ্গে শিশুর পরোক্ষ ইচ্ছায় পরিচয় ঘটলেও, পরবর্তীতে সেগুলো তাদের প্রত্যক্ষ ইচ্ছাতেই রূপান্তরিত হয়। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ায় অবশ্য মেয়েশিশুদের খুব বেশিদিন খেলনা হাঁড়িপাতিল কিংবা পুতুল নিয়ে খেলতে হয় না। খুব কম বয়সেই তাদেরকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সত্যিকারের রান্না করতে। কিংবা তাদের দায়িত্ব দেয়া হয় ছোট ভাই-বোন দেখভালের। এদিকে ছেলেশিশুদের স্কুলে পাঠিয়ে বা বাইরে খেলতে বা অন্য কোনো কাজ করতে দিয়ে তাদেরকে বহির্জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়।

ভার্বাল অ্যাপেলেশন বা বাচনিক স্তুতিও ছেলেশিশু ও মেয়েশিশুর ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। আমরা প্রায়ই ছেলেশিশুদের বলি, “তুমি কত লম্বা হয়ে গেছ,” আবার মেয়েশিশুদের বলি, “তুমি দেখতে কত সুন্দর।” গবেষণার ফলাফল থেকে জানা গেছে, এই ধরনের বাচনিক স্তুতিও ছেলে ও মেয়ে শিশুদের নির্দিষ্ট আত্মপরিচয় গঠনে সাহায্য করে। এসব স্তুতিবাক্য বা বিশেষণ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শিশুরা নিজেদেরকে পুরুষ বা নারী ভাবতে শুরু করে, এবং অন্যান্য নারী-পুরুষের সঙ্গেও নিজেদের মিল-অমিল খুঁজতে থাকে। পরিবারের সদস্যরাও ক্রমাগত শিশুদেরকে তাদের জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যাকে শিশুরা একপর্যায়ে পরম সত্য হিসেবে ধরে নেয়।

সর্বশেষ প্রক্রিয়াটি হলো অ্যাক্টিভিটি এক্সপোজার তথা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচয়দান। ছেলেশিশু ও মেয়েশিশু উভয়ই শৈশবের একদম শুরু থেকেই চিরাচরিত পুরুষালি ও মেয়েলি কাজকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়। মেয়েশিশুকে বলা হয় তার মাকে গৃহস্থালির কাজে সাহায্য করতে, এবং ছেলেশিশুকে বাবা সঙ্গে করে নিয়ে যায় বাজারে বা অন্য কোথাও। এভাবে ছেলে ও মেয়ে শিশুরা নতুন নতুন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং নিজেরাও সেগুলোতে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। যেসব সম্প্রদায়ে নারী ও পুরুষদের বিচরণক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়, সেখানে ছেলে ও মেয়ে শিশুরা নিজ সেক্স ভিন্ন অন্য সেক্সের কাজকর্মের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানতে পারে না। তারা কেবল নিজস্ব সেক্সের উপর আরোপিত কাজগুলোই জানে ও শেখে, এবং সে অনুযায়ী তাদের মাঝে নিজেদের অজ্ঞাতেই তথাকথিত পুরুষালি বা মেয়েলি কাজের প্রতি অভ্যস্ততা গড়ে ওঠে।

সামাজিকীকরণের এই প্রক্রিয়া যদি চলমান হয়ে থাকে, তাহলে ‘প্রকৃতি’ ও ‘প্রতিপালন’-এর মধ্যকার বিতর্কও কেন এখনো জারি রয়েছে? এটি কি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় না যে প্রতিপালনের ধরনই ছেলে ও মেয়ে শিশুদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টির জন্য দায়ী?

মজার ব্যাপার হলো, আমরা অনেকে অনেক সময় জানি না যে আমরা শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি। বস্তুত, আমরা হয়তো এ কথা বিশ্বাস করি যে আমরা ছেলে ও মেয়ে শিশুদের সঙ্গে আলাদা ব্যবহার করি কারণ তারা আসলেই আলাদা। আমরা হয়তো স্বীকার করি না যে আমাদের পুত্র ও কন্যারা ভিন্নভাবে বেড়ে ওঠে মূলত স্কুল, সমাজ কিংবা আমাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত শিক্ষার কারণে।

শিশুরা এসব জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকায় আরো অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এ কথা না জেনেই যে তাদেরকে নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে তোলা হচ্ছে। যদি ছেলে ও মেয়ে শিশুদের মাঝে কোনো পার্থক্য না থাকত, এবং পৃথিবীর সর্বত্রই ছেলে ও মেয়ে শিশুরা কমবেশি একই ধরনের আচরণ করত, তাহলে কেউ হয়তো দাবি করতে পারত যে জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকাগুলোর মূল ভিত্তি আদতে সেক্স। কিন্তু আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি, আসল ঘটনা তা নয়।

অনেক সময় কোনো শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে যখন তার উপর আরোপিত জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকা থেকে বিচ্যুতি দেখা দেয়, তখন তাকে যেভাবে সাজা বা অননুমোদন দেয়া হয়, সেটি আরেকটি শক্তিশালী উপায় কারো কাছ থেকে প্রত্যাশিত পুরুষসুলভ বা নারীসুলভ আচরণ বের করে আনার। এক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রচলিত সাজা হলো ওই ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে হেনস্থা করা।

এ ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বাজে উদাহরণটি দেখেছিলাম কেরালার এক গ্রামে। সেখানে তিনজন তরুণী কর্মী একবার ঠিক করেছিল, তাদের পুরুষ সহকর্মীরা যেমন লোকাল পাবে যায়, তারাও একদিন যাবে নিছকই মজা করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার ফলে তাদের জীবনে নরক নেমে আসে। সব ধরনের পুরুষ তাদের পিছু ধাওয়া করে এবং তাদের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হতে চায়। যেহেতু ওই তিন তরুণী এমন এক স্থানে গিয়েছে, যেখানে ‘ভালো’ নারীরা যায় না, তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের নামের পাশে ‘খারাপ’ তকমা জুটে যায়। যুক্তিটি ছিল এমন যে, ”তুমি যদি পাবে যেতে পারো, তাহলে তোমার সবাইকে যৌনতৃপ্তি প্রদানেও লভ্য হওয়া উচিত।” এই ধরনের সামাজিক হেনস্থা সহ্য করতে না পারে শেষমেশ ওই তিন তরুণীর মধ্যে দুজন আত্মহত্যা করে বসে।

সামাজিক সাজার পাশাপাশি আরো একটি জিনিস হলো ‘অর্থনৈতিক সাজা’। অ্যান ওকলের মতে, যেসব নারী সিঙ্গেল মাদার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, সমাজে তাদেরকে পদে পদে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়, এবং এর মাধ্যমে সমাজ মূলত এই বার্তাই দেয় যে ওই নারীদেরকে সমাজ অনুমোদন দিচ্ছে না। আবার অনেক সময় কেউ যদি নিজের জেন্ডারভিত্তিক ভূমিকা পালন থেকে সরে আসে, তখন তার পরিবার থেকেও তাকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য বন্ধ করে দেয়া হয়, কিংবা বন্ধের হুমকি দেয়া হয়।

এই যে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণকে পুরুষালি, আবার কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণকে মেয়েলি আখ্যা দেয়া, এ ব্যাপারে কি আরেকটু বিশদে বলতে পারবেন?

কিছু নির্দিষ্ট দ্বৈততার মধ্যে একটিকে পুরুষালি, অন্যটিকে মেয়েলি খেতাব দেয়ার প্রচলন রয়েছে, যদিও আদতে হয়তো সেখানে পুরুষালি-মেয়েলি ব্যাপারটি একদমই অপ্রাসঙ্গিক। উদাহরণস্বরূপ :

শরীর — মন
প্রকৃতি — সংস্কৃতি
আবেগ — যুক্তি
পরাধীন — স্বাধীন
ব্যক্তিগত — প্রকাশ্য

এখানে বাঁয়ের বিষয়গুলোকে বলা হয় মেয়েলি, এবং ডানেরগুলোকে পুরুষালি।

এখানে প্রতিটি দ্বৈতের একটিকে অপরটির সম্পূর্ণ বিপরীত হিসেবেই শুধু দেখানো হয়নি, এক্ষেত্রে ক্রমিক শ্রেণিবিভাজনও হয়েছে। মনকে ভাবা হয়ে থাকে শরীরের চেয়ে শ্রেয়, এবং সংস্কৃতিকে বলা হয় প্রকৃতির উন্নত রূপ। যারা যুক্তিবাদী ও স্বাধীন, তাদেরকে আবেগি ও পরাধীনদের চেয়ে উঁচুদরে মূল্যায়ন করা হয়। এবং বলাই বাহুল্য, এখানে নারীরা হলো শরীর, ঠিক যেমন প্রকৃতি (কারণ তারা পশুর মতো বংশবৃদ্ধি করে)। অন্যদিকে পুরুষরা হলো মন; তারা চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, সক্রিয়। তারা প্রকৃতি নিয়ে কাজ করে, এবং একে সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত করে। তাই পুরুষরা বিবেচিত হয় প্রকৃতির চেয়ে শ্রেয় হিসেবে, এবং তারা প্রকৃতির সঙ্গে যা-ইচ্ছা-তাই করতে পারে।

নারী ও প্রকৃতিকে অনেক সংস্কৃতিতেই এক করে দেখা হয়; Image Source: Systemic Alternatives

শুধু নারীরাই যে উপরের দ্বৈততার তালিকায় বাঁ দিকে থাকে তা কিন্তু নয়, একই বর্গে জায়গা হয় আদিবাসী ও গরিবদেরও। এ কারণেই পাহাড়ি, জঙ্গলবাসী, কৃষক কিংবা জেলেদের মতো পশ্চাৎপদ সম্প্রদায়ের মানুষদেরকে অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে পারে উন্নয়ন পরিকল্পকরা, ঠিক যেভাবে নারীদেরকে অসম্মানের দৃষ্টিতে দেখে পুরুষরা। এ কারণেই, জঙ্গলবাসীদের না জানিয়েই, তাদের সম্মতি ছাড়াই কেটে নেয়া যায় গাছ, দখল করা যায় ভূমি। এভাবেই লক্ষ লক্ষ জঙ্গলবাসী পরিণত হয় ‘উন্নয়ন শরণার্থী’তে। শেষ পর্যন্ত তাদের ঠাঁই হয় কোনো শহুরে বস্তিতে, যাপন করতে হয় মানবেতর জীবন।

বৈশ্বিক পর্যায়েও, তৃতীয় বিশ্ব বা দক্ষিণ বিবেচিত হয় শরীর হিসেবে, যেখানে প্রথম বিশ্ব হলো মন; তৃতীয় বিশ্ব হলো প্রকৃতি, প্রথম বিশ্ব হলো সংস্কৃতি; তৃতীয় বিশ্ব হলো আবেগি ও যুক্তিহীন, প্রথম বিশ্ব হলো যুক্তিবাদী, বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক।

জেন্ডারের সঙ্গে শ্রেণি, বর্ণ, জাতি, প্রথম বিশ্ব ও তৃতীয় বিশ্বের ক্রমিক শ্রেণিবিভাজনের এই যোগসূত্র উপলব্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ।

“তিনশো বছর বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ সৃষ্টির মতোই একই সমান্তরালে চলেছে ডাইনি নিধন, আর এভাবেই তৃতীয় বিশ্ব ও নারীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো—ক্ষমতা, অর্থনীতি ও জ্ঞান। এরপর তাদেরকে এমনভাবে সামাজিকীকরণ করা হয়েছে, যার ফলে তারা আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে—অনুন্নত কিংবা গৃহবধূ। এই গৃহবধূ কিংবা অনুন্নত অবস্থান একটি কৃত্রিম পণ্য, যার জন্ম হয়েছে কল্পনাতীত সহিংস উন্নয়ন হতে; এবং এরই উপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সমগ্র অর্থনীতি, আইন, রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিজ্ঞান, শিল্প, রাজনীতি, পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং সকল আধুনিক প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় বিশ্ব হলো ডাইনি নিধনের ‘ডাইনি’। সেই সঙ্গে তারা হলো ‘সাধারণ গৃহবধূ’, কিংবা ‘বিশ্ব গৃহবধূ’, যার অন্তর্ভুক্ত তৃতীয় বিশ্বের পুরুষরাও। স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর যে সম্পর্ক, প্রথম বিশ্বের সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বেরও ঠিক তেমনই সম্পর্ক।” — ক্লডিয়া ভন ওয়ের্লহোফ

গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি পরিসরও হয়ে উঠেছে জেন্ডারভিত্তিক। পাব, ফুটবল স্টেডিয়াম, নির্জন রাস্তা, চায়ের দোকান, পানের দোকান, সিনেমা হল ইত্যাদি সবই পুরুষ অধ্যুষিত পরিসর। নারীরা মাঝেমধ্যে এসব পরিসরে পা রাখে, তবে তখন তাদের সঙ্গী হিসেবে থাকে কোনো পুরুষ। যদি তারা একান্তই বাধ্য হয় এসব পরিসরে একাকী যেতে, তাহলে তাদের কাছে আশা করা হয় যেন তারা যত দ্রুত সম্ভব এসব পরিসর ত্যাগ করে। আর যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা বিপদে পড়তে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই তাদেরকে অনুমোদন দেয়া হয় না যে পুরুষদের মতো তারাও অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারবে এসব পরিসরে।

একইভাবে, রান্নাঘর বা নলকূপ হলো সম্পূর্ণরূপে নারীদের পরিসর। আমি মাথা কুটে মরেও এমন কোনো সামাজিক পরিসর খুঁজে পাই না, যেটি শুধু নারীদের। তাদের বিনোদন বা কাজের জন্য এমন কোনো পরিসর নেই, যেখানে তারা শুধু নিজেরা সময় কাটাতে পারবে। ঢাকায় অবশ্য কয়েকজন নারী মিলে আয়োজন করেছে একটি সাপ্তাহিক ‘আড্ডা’ — এ শব্দটি দিয়ে মূলত এমন এক আয়োজনের কথা বোঝানো হয়, যেখানে সমবেত হয়ে পুরুষরা গল্পগুজব করে, খায়, পান করে, নিজেদের মধ্যে উপভোগ্য সময় কাটায়। অনেক পুরুষই, এবং কিছু নারী, নারীদের এই ‘আড্ডা’-র বিরোধিতা করেছে, কারণ ‘আড্ডা’ ধারণাটি নাকি পুরোদস্তুর পুরুষালি, এবং নারীদের জন্য ‘সম্মানজনক’ নয়। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যেসব শব্দ ও কর্মকাণ্ড পুরুষদের জন্য ‘সম্মানজনক’, সেগুলো নারীদের জন্য যথেষ্ট ‘সম্মানজনক’ নয়। এটিই হলো পুরুষতান্ত্রিক যুক্তি।

এমনকি বাড়িতেও, একটি নিরিবিলি ঘর বা পরিসর সংরক্ষিত থাকতে পারে পরিবারের কর্তা বা কোনো পুরুষের জন্য, যেন সে সাংসারিক কুটকাচালির শব্দে বিরক্ত না হয়। ওয়ার্কশপগুলোতে গিয়ে আমি জানতে পেরেছি, ঘরের নানা সরঞ্জামও জেন্ডারিত (gendered) হয়ে থাকে। যেমন ধরুন, বড় গ্লাস, চেয়ার কিংবা বিছানা সংরক্ষিত থাকে পরিবারের কর্তার জন্য। কর্মজীবী শ্রেণির বাড়িতেও বাইসাইকেল, রেডিও বা রিস্ট-ওয়াচের মালিক হয় পুরুষরাই।

ভাষাও কি জেন্ডারিত নয়?

অবশ্যই। ভাষা হলো পুরুষতান্ত্রিক, তাই এখানে জেন্ডার পক্ষপাত ও অসমতার প্রতিফলন ঘটে। অনেক সময় পুরুষদের এমন কিছু শব্দগুচ্ছ থাকে, যেগুলো নারীরা খুব কমই ব্যবহার করে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জেন্ডারিত শব্দগুচ্ছ হচ্ছে যেখানে পুরুষরা যৌনতা বা নারীর যৌনাঙ্গ বিষয়ক গালি দিয়ে থাকে। যদিও পুরুষরা নির্দ্বিধায় সেগুলো ব্যবহার করতে পারে, নারীরাও সেগুলো ব্যবহার করলেই তারা হকচকিয়ে যায়।

দক্ষিণ এশীয় ভাষাগুলোতে অনেক প্রবাদ-প্রবচনও রয়েছে, যেগুলোতে নারীকে পুরুষের চেয়ে খাটো করে, কিংবা তাকে পাপিষ্ঠ, নীচ মনের কিংবা ঝগড়ুটে হিসেবে দেখানো হয়। হিন্দিতে একটি জনপ্রিয় শ্লোক আছে যার মূলবক্তব্য হলো: ঢাক, অশিক্ষিত বা নীচ বর্ণের ব্যক্তি এবং নারীকে সবসময় মারের উপর রাখতে হয়। “স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত” কথাটি তো মৌলভিরা প্রায়ই ব্যবহার করেন। আবার বাংলায় একটি প্রবচন রয়েছে, “অভাগার গরু মরে, ভাগ্যবানের বউ মরে।”

ভাষারও রয়েছে জেন্ডার; Image Source: Future Learn

এরপর আবার পুরুষালি শব্দকেই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি বা নিয়ম মানারও প্রচলন হয়েছে। ইংরেজিতে ‘mankind’, ‘he’ ও ‘his’ শব্দগুলো এমনকি নারীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও ‘chairman’, ‘newsman’, ‘sportsman’, ‘one-man-show’ প্রভৃতিও নারীদের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় — যদিও এখন ক্রমশ এগুলোর চর্চা হ্রাস পাচ্ছে।

“সমাজবিজ্ঞান, দর্শনসহ শিক্ষার অন্যান্য ধারা আজো পুরুষতান্ত্রিক রয়ে গেছে, এবং তারা নারীদেরকে এখনো অগ্রাহ্য করে, একঘরে করে রাখে কিংবা ভুলভাবে উপস্থাপন করে। যেভাবে ও যে ভাষায় বিমূর্ত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো হয়, তাতে নারীদের প্রান্তিকতাকেই যেন টিকিয়ে রাখা হয়। আমাদেরকেও (নারীদের) আমাদের নিজেদের চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে হয়েছে সেই ভাষাতেই, যা অতিমাত্রায় পুরুষতান্ত্রিক। এটি হলো সেই ভাষা, যেখানে আমাদেরকে পুরুষবাচক সর্বনামের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়, এমনকি ‘human’ এর মতো সর্বজনীন পরিভাষাগুলোও মূলত পুরুষকেই নির্দেশ করে। নিজেদের শারীরিক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেও নারীদেরকে ‘অশ্লীল শব্দ’ বা ‘গুপ্ত ভাষা’র আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রতিটি ভাষারই সবচেয়ে নিকৃষ্ট গালিগুলোতেও ব্যবহৃত হয় নারীর শরীরের বিভিন্ন অংশের নাম অথবা নারীর যৌনতা।” — গের্ডা লার্নার

এছাড়াও এখানে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই যে, আমাদের প্রচলিত ভাষার কিছু নির্দিষ্ট পরিভাষা, সম্বোধন বা পদবিও হয়ে থাকে জেন্ডার-আরোপিত (gender ascriptive), অর্থাৎ যেখানে শব্দ থেকেই নির্দিষ্ট জেন্ডারকে নির্দেশের প্রবণতা থাকে। যেমন, চাচা-ফুপু, ভাই-বোন, মা-বাবা ইত্যাদি জেন্ডার-আরোপিত শব্দ, কারণ এখানে সম্বোধন থেকেই বোঝা যায় কে কোন জেন্ডারের মানুষ। কিন্তু সমস্যার জায়গাটি হলো, এমন অনেক পরিভাষা, সম্বোধন বা পদবি আছে যেগুলো জেন্ডার-আরোপিত না হলেও সাধারণভাবে তা-ই ধরে নেয়া হয়। যেমন ধরুন, সেক্রেটারি, নার্স, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক ইত্যাদি শুনলে অনেকেই ধরে নেয় তারা সকলে বুঝি নারী। আবার বস, পাইলট, ম্যানেজার, রাজনীতিবিদ, সার্জন বা কৃষক শুনলেই ধরে নেয়া হয় তারা সকলে বুঝি পুরুষ। এই পূর্বানুমানগুলো থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে এখনো আমাদের সমাজের জনপরিসর ও চাকরির ক্ষেত্রগুলোতে পুরুষের আধিপত্য বিদ্যমান। নারীদের উপস্থিতি খুবই কম ও কদাচিৎ, বিশেষত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জায়গায়।

This article is in Bengali language. It is a partial translation of Kamala Bhasin's book 'Understanding Gender' where the difference between gender and sex has been discussed. Necessary references have been hyperlinked inside. 

Featured Image © Alamy/The Guardian

Related Articles