অস্কারের ইতিহাসে আলোচিত-সমালোচিত নানা ঘটনা

প্রতিবারই অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বা অস্কার আসর হাজির হয় নানা চমকপ্রদ ঘটনা নিয়ে। আলোচিত এসকল ঘটনার কোনোটি বিস্ময়কর, অপ্রত্যাশিত, আবার কোনোটি বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। তবে এসব নিয়ে অমীমাংসিত বিতর্কও আছে। কেউ কেউ বলেন- এসব পূর্বপরিকল্পিত তথা সাজানো স্ক্রিপ্ট, আবার কেউ সত্যিই দুর্ঘটনা মনে করেন। এমন বিশেষ স্মরণীয় কিছু আলোচিত-সমালোচিত ঘটনার উল্লেখ থাকছে এ লেখায়।

অস্কারমঞ্চে নগ্ন আগন্তুক

১৯৭৪ সালের ৪৬ তম আসর চলাকালে হোস্ট ডেভিড নিভেন যখন এলিজাবেথ টেলরকে স্টেজে আমন্ত্রণ জানাতে বিভিন্ন বিশেষণের আশ্রয় নিচ্ছেন, ঐ মুহূর্তে তার পেছন দিয়ে এক নগ্ন লোক হঠাৎ উদয় হয়ে ভিক্টরি সাইন দেখাতে দেখাতে দৌড়ে স্টেজ অতিক্রম করে। তবে নিভেন অত্যন্ত কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তার কথা শেষ করে টেলরকে আমন্ত্রণ জানান। পরে ঐ আগন্তুকের পরিচয় জানা যায়। তার নাম রবার্ট অপেল, একজন ফটোগ্রাফার ও আর্ট গ্যালারির স্বত্বাধিকারী। তবে বিশ্লেষকদের মতে- পুরো ঘটনাটি আসলে প্রোগ্রাম প্রডিউসারের টিআরপি স্ট্যান্ট

বেস্ট পিকচার ক্যাটাগরিতে ভুল নাম ঘোষণা

২০১৭ সালের অস্কারে একটি মহা অনাকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত রয়েছে! কমেডিয়ান হিসেবে বেশ ভালো সুনাম অস্কার উপস্থাপক জিমি কিমেলের। নামজাদা এ কমেডিয়ান স্বভাবসুলভ রসিকতার মধ্য দিয়েই শুরু করেন অস্কারের নাম ঘোষণা। তিনি মাইক হাতে পেয়ে বলতে শুরু করছিলেন, আমি আজ গাইতেও আসিনি, নাচতেও আসিনি, হাসাতেও আসিনি। এই বলে বেস্ট পিকচার ক্যাটাগরিতে অস্কারজয়ী হিসেবে লা লা ল্যান্ড-চলচ্চিত্রের নাম ঘোষণা করেন তিনি। ঘোষণা শুনে বিজয়ীর হাসি হাসতে হাসতে লা লা ল্যান্ড-এর কলাকুশলীরা মঞ্চে উঠে সবাইকে ধন্যবাদ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর মধ্যেই উপস্থাপক জিমি কিমেল ফের মঞ্চে এসে জানান, এই ক্যাটাগরিতে ভুল করে লা লা ল্যান্ড ছবির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এরপর দর্শক সারিতে অপেক্ষামান সকলের সামনে হাতে থাকা খামটি খুলে দেখানো হয় বেস্ট পিকচার টাইটেল, যাতে লেখা ছিল বেরি জেনকিন্স পরিচালিত ‘মুনলাইট’-এর নাম।

শেইম অন ইউ মিস্টার বুশ

একাধারে রাজনৈতিক বক্তা এবং প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর এবং মাইকেল ডনোভান ২০০৩ সালে Bowling for columbine এর জন্য বেস্ট ডকুমেন্টারি ফিচার ফিল্মে অস্কার লাভ করেন। মুর তার বক্তব্য অ্যাকাডেমিকে ধন্যবাদ দিয়ে শুরু করলেও খানিকটা সময় পরে তত্‍কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ইরাক আক্রমণের তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করে যুক্তরাষ্ট্রের সাজানো নির্বাচনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেন। মুর তার অস্কার বক্তব্য শেষে চিত্‍কার দিয়ে শেইম অন ইউ মিস্টার বুশ বলে স্টেজ ত্যাগ করেন। এ ঘটনায় উপস্থিত সবার মুহুর্মুহু করতালি পান তিনি।

নাম বিভ্রাট

নাম নিয়ে অস্কারে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি ঘটে ১৯৩৩ সালে ৬ষ্ঠ আসরে। শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাটাগরিতে দুজন ফ্রাংক নমিনেশন পেয়েছিলেন। একজন ফ্রাংক কাপরা, এবং অপরজন ফ্রাংক লয়েড। উপস্থাপক উইল রর্জাস ভুলবশত বিজয়ীর নাম ঘোষণায় শুধু ফ্রাংক শব্দটি ব্যবহার করেন। ফলে স্টেজে দুজন ফ্রাংকই প্রায় চলে আসেন। ফ্রাংক কাপরাকে একই সময়ে স্টেজে উঠতে দেখে ফ্রাংক লয়েড পরে স্টেজ থেকে নেমে যান। কিন্তু শেষ চমকটি যে বাকি! ঠিক তখনই ফ্রাংক কাপরাকে জানানো হয়, দুর্ভাগ্যবশত এ বছরের পুরস্কারের প্রকৃত বিজয়ী ফ্রাংক লয়েড!

ফ্রাংক লয়েড ও ফ্রাংক কাপরা ঘটনার পরে হাসিমুখে একসাথে ছবি তোলেন; Image source: একাডেমির ইন্সটাগ্রাম আইডি

স্বল্পতম দৈর্ঘ্যের অস্কার বক্তব্য

১৯৯১ সালে জ্যঁ পেশি ৬৩ তম অস্কারে Good Fellas মুভিতে অভিনয় করে সেরা পার্শ্বচরিত্র (পুরুষ) ক্যাটাগরিতে অস্কার পান। বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণার পর মূলমঞ্চে এসে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তার Acceptance speech-এ মাত্র দুটি লাইনে পাঁচটি শব্দ উচ্চারণ করেন,

It’s my privilege. Thank you.

তবে তার থেকেও সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রেখেছেন তিনজন। অভিনেতা ক্লার্ক গেবল, প্যাটি ডিউক এবং পরিচালক আলফ্রেড হিচকক। সবাইকে অবাক করে দিয়ে তারা শুধু দুই শব্দে “Thank you” বলেই আনুষ্ঠানিকতার ইতি টেনেছেন। ইতিহাসে যা ক্ষুদ্রতম অস্কার স্মারক বক্তৃতা হিসেবে অভিহিত।

প্রথম অস্কার প্রত্যাখান

চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকারদের সর্বোচ্চ সংস্থার নাম ‘স্ক্রিন রাইটার্স গিল্ড’ । ১৯৩৬ সালে অস্কার ঘোষণার সময়ে সংস্থাটির দাবি-দাওয়া নিয়ে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই The Informer ছবির চিত্রনাট্যের জন্য অস্কার মনোনয়ন পান ডাডলি নিকলস। কিন্তু ডাডলি স্ক্রিন রাইটার্স গিল্ডের সক্রিয় কর্মী হওয়ায় এ পুরস্কারের লোভে আন্দোলন থামাননি। বরং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অস্কার মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করেন। একইভাবে বিশ্বখ্যাত দ্য গডফাদার ছবিতে ভিটো করলিওনি চরিত্রের জন্য মার্লোন ব্রান্ডো সেরা অভিনেতার পুরস্কার অর্জন করলেও তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। তিনি অস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ‘নেটিভ আমেরিকান রাইটস’ এর আন্দোলনকারী কর্মী সাচিন লিটলফেদ্যারকে নেটিভ আমেরিকান পোশাকে তার একটি লিখিত বার্তাসহ প্রেরণ করেন।

মার্লোন ব্রান্ডোর চিঠি হাতে আমেরিকান মডেল অ্যাক্টিভিস্ট সাচিন লিটলফেদ্যার; Image source: The Guardian

সাচিন মঞ্চে আসেন ঠিকই, কিন্তু ব্রান্ডোর পক্ষ থেকে পুরস্কার নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনাতে চান। যদিও দীর্ঘ বার্তাটি পড়ে শোনানোর অনুমতি তাকে দেয়া হয়নি। তবে চিঠিতে যা লেখা ছিল তার সারসংক্ষেপ হলো,

নেটিভ আমেরিকানদের অধিকার খর্ব এবং তাদের হাসির পাত্র বানানো হচ্ছে! যেখানে পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষ চিকিত্‍সার অভাবে ভুগছে, সেখানে আমি কী করে এ পুরস্কারের এতগুলো টাকা গ্রহণ করি?

ব্রান্ডোই প্রথম ব্যক্তি যিনি নেতিবাচক কোনো চরিত্রে অভিনয় করেও তার চমকপ্রদ অভিনয়শৈলীর জন্য অস্কার পান।

চরম প্রতিশোধ

৮২ তম অস্কার আসরটি চলচ্চিত্রপ্রেমী ও বোদ্ধাদের কাছে স্মরণীয় অধ্যায় হয়েই থাকবে। অস্কার ইতিহাসে সে বছরই (২০১০ সালে) প্রথমবারের মতো শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাটাগরির পুরস্কারটি কোনো নারী নির্মাতার হাতে ওঠে। সেই সাথে নির্মাতার দ্য হার্ট লকার বেস্ট পিকচার/ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডটিও অর্জন করে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ঐ অস্কার আসর চলচ্চিত্রানুরাগীদের মনে বিশেষ জায়গা করে নেবে অন্য আরেকটি কারণে। সেবারের অস্কারজয়ী শ্রেষ্ঠ পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো যাদের পরাজিত করে বেস্ট ডিরেক্টর অ্যাওয়ার্ড পান তাদের মধ্যে যে তার প্রাক্তন স্বামী জেমস ক্যামেরনও ছিলেন! বিগেলোর একসময়ের সহযোদ্ধা এবং অনুপ্রেরণাও ছিলেন Avatar নির্মাতা! এদিক থেকে প্রাক্তন স্বামীকে পেছনে ফেলে জুরি বোর্ডের বিচারে বিগেলোর শ্রেষ্ঠত্ব যেন এক অঘোষিত প্রতিশোধ

অস্কারজয়ী প্রথম নারী পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলো; Image source: Sunday world

অস্কার মঞ্চে উপস্থাপককে চড়

সর্বশেষ ৯৪ তম অস্কারে ঘটল অনাকাঙ্ক্ষিত আরেক ঘটনা। মঞ্চে মার্কিন কমেডিয়ান ক্রিস রকের গালে কষে চড় মারলেন অস্কারজয়ী অভিনেতা উইল স্মিথ। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক পুরো বিশ্ব। অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে পুরস্কার দিতে মঞ্চে আসেন ক্রিস রক। মঞ্চে দাঁড়িয়ে উইল স্মিথের স্ত্রীকে নিয়ে কিঞ্চিৎ ঠাট্টা করেন ক্রিস। চুল পড়ার সমস্যার কারণে টাক মাথায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন জাডা পিংকেট স্মিথ। ক্রিসের এ রসিকতায় শুরুতে হাসতে দেখা যায় দর্শকসারিতে বসা উইল স্মিথকে, কিন্তু বিরক্ত হন তার স্ত্রী জাডা। উইল স্মিথ তখন আসন ছেড়ে মঞ্চে গিয়ে সজোরে থাপ্পড় মেরে বসেন ক্রিসকে। পরে বিষয়টিকে হালকা করতে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন ক্রিস। আসনে ফিরে চিৎকার করে স্মিথ তাঁর উদ্দেশে বলেন, ‘তোমার নোংরা মুখে আমার স্ত্রীর নাম নেবে না।’  একইদিনে প্রথমবার অস্কার স্মারক হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত স্মিথ বলেন, শিল্প জীবনেরই অনুকরণ। আমি রিচার্ড উইলিয়ামসকে অভিনয়ের মাধ্যমে অনুকরণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ভালোবাসাই তো মানুষকে দিয়ে নানা পাগলামি করিয়ে নেয়। অবশ্য উইল স্মিথ এমন ঘটনার জন্য একাডেমির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেও মঞ্চে দাঁড়িয়ে ক্রিস রকের কাছে কোনো রকম ক্ষমা চাননি।

Related Articles