মেসুত কার্তিস: সুর যার ইসলামের প্রতিধ্বনি

বর্তমান সময়ে ইসলামী সঙ্গীতের জগতে সফল পদচারণা যাদের তাদের তালিকার প্রথম দিকেই রাখা যায় মেসুত কার্তিসের নাম। মেসুত কার্তিস তার চমৎকার কন্ঠের সুরমাধূর্য্য দিয়ে ইসলামী সঙ্গীতের শ্রোতাদের হৃদয়ে নিজের নামটি সযত্মে খোদাই করে নিয়েছেন। মাহের জেইন, সামি ইউসুফের মতো মেসুত কার্তিসের গাওয়া গানগুলোও বিশ্বব্যাপী সমান জনপ্রিয়।

মেসুত কার্তিসের গানকে বলা যায় আল্লাহ এবং প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (স.) এর প্রতি প্রগাঢ় ভাসবাসার মহিমান্বিত প্রকাশ। ইসলামের আলোয় আলোকিত পরিবেশে লালিত হওয়া কার্তিসের গানে ইসলামের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামী সঙ্গীতের সুপরিচিত এই শিল্পীকে নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন।

জন্ম ও শৈশব

বলকান উপদ্বীপের দেশ মেসিডোনিয়া। মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কপিয়েতে ১৯৮১ সালের জুলাই মাসে জন্ম নেন তুর্কি বংশোদ্ভুত শিল্পী মেসুত কার্তিস। তার পরিবারের পরিবেশ ছিল ধর্মীয় ভাবগাম্ভীযপূর্ণ। তার দাদা ও বাবা ছিলেন ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত জ্ঞানীজন। তার পারিবারিক ঐতিহ্যও বেশ সমৃদ্ধ। মেসুত কার্তিসের শরীরে একইসাথে বইছে আলবেনিয়ান ও তুর্কি রক্ত। তার মা আলবেনিয়ান পরিবারের মেয়ে। কিন্ত তিনি পড়াশোনা করেছেন তুর্কি স্কুলে। তার বাবার রক্তেও রয়েছে বিচিত্র সংমিশ্রণ। তার দাদা আলবেনিয়ান বংশোদ্ভুত হলেও পড়াশোনা করেছেন তুরস্কে। সেই সময়ে অটোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত এক মাদ্রাসায়। তিনি মেসিডোনিয়ার প্রাণকেন্দ্র স্কপিয়েতে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

একনজরে মেসিডোনিয়ার রাজধানী স্কপিয়ে; Image Source:Ewallpapers.eu

এদিকে তার দাদী আবার ছিলেন তুর্কি পরিবারের। মেসিডোনিয়ায় আলবেনিয়ান ও তুর্কিদের সহাবস্থান খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এখানে জাতীয়তাবাদ কখনো তাদের পারস্পারিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ান।

তারা কে কোন দেশী তা না ভেবে বরং তারা সকলে যে মুসলিম এই চিন্তাটাকেই প্রাধান্য দিতেন। কার্তিস ছোটবেলায় বেশ মিশুক ছিলেন। তিনি তার বন্ধুবান্ধবের ভাল আর ইতিবাচক দিকটাই দেখার চেষ্টা করতেন সবসময়। এই স্বভাবের ছাপ পরবর্তীতে তার গানেও পাওয়া যায়।

গানের পথে প্রথম পদক্ষেপ

মেসুত কার্তিস সেই ছোটবেলাতেই চমৎকার গাইতে পারতেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি বন্ধুদের সাথে মিশতেন, খেলতেন, গান গাইতেন। তার আশেপাশের লোকেরা জানত যে তার গানের গলা দারুণ ভাল। তুর্কি ঐতিহ্যের একটা অংশ হলো বিশেষ কোন ধর্মীয় দিবস (যেমন- লাইলাতুল ক্বদর) হৈ চৈ করে উৎযাপন করে সেটাকে উৎসবে রুপ দেয়া হয়। মসজিদে শাইখদের খুৎবার পরে ইসলামী গানের আয়োজন থাকে। একবার এমনি এক অনুষ্ঠানে সাত-আট বছরের ছোট্ট কার্তিস মজলিসের পিছনের দিকে দাড়িয়ে ছিলেন। তার এক চাচা এসে তার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন মজলিসের একেবারে সামনে। তাকে বললেন একটা নাশীদ (ইসলামী গান) গেয়ে শোনাতে। তিনি গাইলেন। সেই শুরু। তারপর থেকে নানান দলের সাথে বিভিন্ন মসজিদে নাশীদ গেয়ে বেড়াতেন তিনি। মেসিডোনিয়ার বাইরে আশেপাশের দেশগুলোতেও বিভিন্ন নাশীদ গ্রুপের সাথে নাশীদ গাইতে যেতেন তিনি। তার মাতৃভূমি তুরস্কেও গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছিল কার্তিসের।

ইসলামে উচ্চ শিক্ষা

মেসুত কার্তিস যখন বালক, তখন তিনি বিভিন্ন দলের সাথে গান করতেন। দলের সদস্যরা সকলেই ছিল তার থেকে বয়সে বড়। তিনি অবলীলায় তাদের সাথে মিশতেন যেন কোন বন্ধুর সাথে কথা বলছেন। পরে যখন ফিরে যেতেন তার সমবয়সী বন্ধুবান্ধবদের কাছে, তাদেরকে নিজের তুলনায় অপরিপক্ক মনে হতো। তিনি এমন কারো সাথে মিশতে চাইতেন যার থেকে তিনি কিছু শিখতে পারবেন। সবসময় নতুন কিছু শেখার জন্য উন্মুখ থাকতেন তিনি। তার পরিবারের পরিবেশও ছিল তার আগ্রহের পক্ষে। তার বাবা ও দাদা ছিলেন পন্ডিত মানুষ। ক্ল্যাসিক্যাল আরবীতে তাদের দারুণ দখল ছিল। কার্তিসের আরবী ভাষার প্রতি ভালবাসা এভাবে পরিবার থেকেই পেয়েছেন। তার বাবা ও দাদা ক্লাসিক আরবি শিল্পী উম্মে কুলসুম ও আব্দেল হালিম হাফিজ শুনতেন।

 আব্দেল হালিম হাফিজ; Image source:SBS

সাইয়্যেদ নকশবন্দীর নাশীদ ও কবিতাও তারা পছন্দ করতেন। ছোটবেলায় কার্তিস কিছু না বুঝেই সেইসব গুরুগম্ভীর কথাগুলো মুখস্ত করতেন। কলেজ পাশ করার পর পড়াশোনা করতে তিনি পাড়ী জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস থেকে ইসলামী আইনশাস্ত্রে (শরীআহ) ডিগ্রী নেন। এছাড়া ভাষা শেখায় তার দারুণ দক্ষতা আছে। তিনি পাঁচটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন।

সুরের আলো ছড়িয়ে যাক

তিনি যখন ওয়েলস ইউনিভার্সিটির ছাত্র, তখন বিখ্যাত নাশীদ রেকর্ড কোম্পানী ‘Awakening recods’ এর নজরে পড়ে তার সঙ্গীত প্রতিভা। তিনি Awakening record এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হন। ২০০৪ সালে Awakening records এর ব্যানারে প্রকাশিত হয় তার প্রথম অ্যালবাম ‘salawat’ ।

‘Salawat’ অ্যালবামের প্রচ্ছদ; Image Source:music.bazar.com

এই অ্যালবামের সঙ্গীত আয়োজন করেছিলেন বিখ্যাত নাশীদ শিল্পী সামি ইউসুফ। এমনকী এই অ্যালবামের একটা গানে সামি ইউসুফকে ফিচার করা হয়। ‘O Allah’ নামের এই গানটিতে একসাথে গেয়েছেন সামি ইউসুফ ও মেসুত কার্তিস। অভিষেক অ্যালবাম শ্রোতামহলে বেশ ভালই জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই অ্যালবামে রাখা হয়েছে সুফী ইমাম বুসাইরির বিখ্যাত Qasidat Al Burdah। মেসুত কার্তিসের প্রথম মিউজিক ভিডিও Al burdah এর শ্যুটিং হয়েছিল তুরস্কের উপকূলে।

অসাধারণ দর্শকপ্রিয়তা পায়

‘Buradah’ গানে মেসুত; Image Source:youtube

এই মিউজিক ভিডিও। এই মিউজিক ভিডিওকে বলা হয় আধুনিক সময়ের সেরা ক্লাসিক। মেসুত কার্তিস যুক্তরাজ্যভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল ‘Islam channel’ এর প্রোগ্রাম ‘Saturday Night’ এ একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ এই নাশীদ এমনকী আমার চেয়েও বেশী জনপ্রিয়’।

এরপর ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘Beloved’। এরপর ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় তার তৃতীয় এবং সর্বশেষ অ্যালবাম ‘Tabassam’।

 

হাসির মাহাত্ম্য নিয়ে ‘Tabassam’ গানটি; Image Source:youtube

আরবী ‘তাবাসসাম অর্থ ‘হাসি’ । হতাশা আর দুশ্চিন্তাকে ঝেড়ে ফেলে রাসূল (স.) এর সুন্নাত অনুসারে সবসময় হাসার কথার বলা হয়েছে নাশীদটিতে। দ্য ন্যাশনাল পত্রিকায় দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ আমি সাধারণত ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি দেখেছি আজকালকার মুসলিম সমাজে অনেক সুন্নাহই অবহেলিত যার মধ্যে বড় একটি হচ্ছে হাসি। অথচ রাসূল (স.) সবসময় হাসিমুখে থাকতেন। তিনি এও বলে গেছেন যে, মুসলিম ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলাও সাদাক্বা। আমি এই অ্যালবামে এই শিক্ষাটির প্রতি গুরুত্বারোপের চেষ্টা করেছি। মেসুত কার্তিসের গানের কথা সাধারণত তিনি না লিখে পেশাদার গীতিকারকে দিয়ে লিখিয়ে নেন। তবে সুর এবং গানের আইডিয়া হয় তার নিজের। কিন্তু ‘Tabassam’ অ্যালবামের ১২ টি গানের ছয়টি তিনি নিজেই লিখেছেন। এই অ্যালবামে তাই গীতিকার হিসেবে তার অভিষেক ঘটে। বিখ্যাত ইসলামী সঙ্গীতশিল্পী মাহের জেইনের অভিষেক অ্যালবাম Thank you allah। তে ‘Subhanallah’ শিরোনামের গানে গলা মিলিয়েছেন কার্তিস।

মাহের জেইনের সাথে মেসুত কার্তিস; Image Source:  youtube

 আরবী, মেসিডোনিয়ান এবং তুর্কি ভাষায় গান করেন। গত রমাযানে প্রকাশিত হয়েছে আরবী ভাষায় গাওয়া আধ্যাত্মিক আবহ সম্বলিত তার একক নাশীদ ‘ilahi’। Awakening Records শিল্পীদের সাথে এবং একা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কনসার্টে দেখা যায় তাকে।

ব্রিসবেনে  কনসার্টে গান গাইছেন মেসুত কার্তিস; Image Source: youtube

বিভিন্ন সেবামূলক কাজে ফান্ড সংগ্রহ করার জন্য কনসার্ট করেন তিনি।

কার্তিসের শিল্পভাবনা

আরব আমিরাতের প্রভাবশালী পত্রিকা ‘ দ্য ন্যাশনাল’ এর একটি সাক্ষাৎকারে মেসুত কার্তিস তার সঙ্গীত ও শিল্পভাবনার কথা বলেছেন। কিভাবে একজন ভাল শিল্পী হয়ে উঠলেন এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ আমি মনে করি শিল্পী হতে হলে প্রথমে আপনার নিজের সম্পর্কে জানতে হবে। শুধু গলা সুন্দর হলেই মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে স্টেজে উঠে গান গেয়ে ফেলা ব্যাপারটি আসলে এতটা সহজ নয়। আপনার অবশ্যই নিজের চিন্তাভাবনা নিরীক্ষণ করার মতো অন্তর্দৃষ্টি থাকতে হবে। এটা বিশেষ করে নাশীদ লেখার ক্ষেত্রে কাজে দেয়।’
ভাল নাশীদের জন্য কথা ভাল হওয়া জরুরি নাকি সুর সেই প্রসঙ্গ তিনি বলেন, ‘ নাশীদ সাধারণত কথা দিয়েই বিচার করা হয়। তারমানে এই না যে, সুর ভাবার মতো বিষয় না। সুন্দর বার্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্ত সুর ও ছন্দও আকর্ষণীয় হওয়া চাই। ‘

মেসুত কার্তিসের এমন ভক্তও রয়েছে যারা গানে মিউজিক পছন্দ করেন না, তাদের সম্মানে তিনি রেখেছেন তার গানের Vocals Only ভার্সন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,’ আমার এমন অনেক ভক্ত আছে যারা আমি গানে যে মেসেজ দিতে চাই তা পছন্দ করেন কিন্তু মিউজিকের ব্যবহার তারা মানতে পারেন না। একজন মুসলিম হিসেবে আমি জানি, কোন কোন স্কলারের মতে গানে মিউজিক ব্যবহার নিষিদ্ধ। আমি সবসময় মানুষের ইচ্ছাকে সম্মান করি। ‘

ইসলামে শিল্পের স্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ যদি নিয়্যাত সঠিক থাকে এবং সঠিকভাবে করা হয়, তাহলে শিল্প আধ্যাত্মিক উন্নতির মাধ্যম হতে পারে। ‘ তিনি আরও বলেন, ‘ ইসলামের সাথে শিল্পের কোন সংঘর্ষ নেই। কারণ ইসলাম নিজেই একটি শিল্প। আপনি কুরআন ও কুরআনের সুরে তার প্রমাণ দেখতে পাবেন’। ‘ আল্লাহ আমাদের সৃষ্টিকর্তা। তিনিই সেরা শিল্পী। তার সৃষ্টিতে সেই শিল্পের কারুকার্যের দেখা মেলে। আমাদের কাজ হচ্ছে তার সৃষ্টিকে আবিষ্কার করা এবং এর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হওয়া। ‘

মেসুত কার্তিসের গানে ইসলামের শিক্ষা আছে, রাসূল (স.) এর প্রতি ভালবাসা আছে, হতাশার বিপরীতে আশার কথা আছে। আর আছে মোহনীয় সুর আর ছন্দ। মেসুত কার্তিসের কন্ঠে ইসলামী সঙ্গীতের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।

ফিচার ইমেজ- muslimfest.com

 

Related Articles