বহমান পৃথিবীর দুরন্ত পথচলায় বিভিন্ন জায়গার কিছু গড়ে উঠেছে ঝড়ের বেগে, আবার কোনোটি বিলীন হয়েছে কালের বিবর্তনে। তাদের মধ্যে এমন কিছু জায়গা এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে যেখানে একসময়ে ছিলো মানুষজনের আনাগোনা। সেসব পরিত্যক্ত জায়গা নিয়েই কথা হোক আজ।

আর্জেন্টিনা, ইতালি

আর্জেন্টিনা হলো সাবেক খনিকেন্দ্রিক শহর। আর্জেন্টিনা নামটি মূলত এসেছে ‘আর্জেন্টো’ শব্দটি থেকে যার অর্থ ‘রূপা’। রূপার খনি খননের কাজ সেখানে প্রথমবারের মতো চালু হয় রোমান ও ফিনিশিয়ো যুগে। ১৯৪০ সালের দিকে আর্জেন্টিনা বেশ সমৃদ্ধশালী দেশ ছিলো। ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হয়ে ১৯৬৩ সালে পুরোপুরিভাবে এই খনিটি বন্ধ হয়ে যায়।

১৯৬৩ সালে পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যায়; Image Source: Neettin.com

ভারোশা, সাইপ্রাস

ভারোশা হলো ফার্মাগুস্তার (সাইপ্রাসের উত্তরের উপকূলীয় শহর) সিপ্রিয়ট শহরের দক্ষিণে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত শহর। ভারোশা শহরটি সাইপ্রাসের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। ১৯৭৪ সালে তুর্কি সেনাবাহিনী যখন সাইপ্রাস আক্রমণ করে, তার আগে ফার্মাগুস্তার এক-চতুর্থাংশ পর্যটকদের বেশ আকর্ষণ করতো। সেখানকার অধিবাসীরা আক্রমণের সময় পালিয়ে গিয়েছিলো এবং তখন থেকে এই জায়গাটি আজও পর্যন্ত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ১৯৭০-৭৪ সালের মাঝামাঝি সময়টিতে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় এই জায়গাটি প্রথম সারিতে ছিলো। এমনকি বিশ্বের জনপ্রিয় সব তারকা, যেমন- এলিজাবেথ টেইলর, রিচার্ড বার্টন, র‍্যাকুয়েল ওয়েলচ্‌ ছুটির দিনে সেখানে ভ্রমণে যেতে পছন্দ করতেন। ১৯৮৪ সালে গৃহীত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশন ৫৫০ এর কারণেই ভারোশা এখনও পরিত্যক্ত শহর হয়েই রয়েছে। এই রেজল্যুশনের বিবেচনা অনুযায়ী, ভারোশার বাসিন্দারা ছাড়া অন্যদের সেখানকার বাসিন্দা হিসেবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

জায়গাটি আজও পর্যন্ত পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে; Image Source: lovethesepics

কিন্টা দ্য রেগুলেইরা, পর্তুগাল

পর্তুগালের ছবির মতো শহর সিন্টারের ঐতিহাসিক কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থিত কিন্টা দ্য রেগুলেইরা শহরটি সেখানকার সবচেয়ে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। আর কিন্টা দ্য রেগুলেইরা হলো সিন্টারের বিস্ময়কর ও অসাধারণ স্মৃতিস্তম্ভগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা ইউনেস্কোর ওয়ার্ড হেরিটেজ সাইটে জায়গা করে নিয়েছে।

এখানে রয়েছে একটি কল্পনাবিলাসী প্রাসাদ, খ্রিস্টীয় ভজনালয়, বিলাসবহুল পার্ক, যাতে রয়েছে হ্রদ, গুহা, ঝর্ণা, কুয়া এবং অদ্ভুত সব নিখুঁত নির্মাণশৈলী। এই প্রাসাদটি ‘দ্য প্যালেস অব মন্টেরিও দ্য মিলিয়নিয়ার’ নামেও পরিচিত, যা মূলত এর প্রাক্তন স্বত্ত্বাধিকারীর ডাকনাম অনুযায়ী নামকরণ করা হয়েছে। যে জায়গাটিতে এখন কিন্টা দ্য রেগুলেইরা রয়েছে তার মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে বহুবার। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সংস্কার কাজ চালানো হয়েছে এখানে। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে এটি জনসাধারণের উদ্দেশ্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং সেখানে প্রায়ই আয়োজন করা হতো নানা রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঠিক একই বছর আগস্ট মাসে পর্তুগালের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একে ‘জনস্বার্থের সম্পত্তি’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিংবদন্তী আছে, সেখানকার কুয়ার ৯টি স্তর জাহান্নামের ৯টি পরিমণ্ডলকে উপস্থাপন করে।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সংস্কার কাজ চালানো হয়েছে এখানে; Image Source: The Apricity

গ্রিতভিকেন, দক্ষিণ জর্জিয়া ও দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জ

গ্রিতভিকেন হলো দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ জর্জিয়ার প্রধান বসতি। ১৯০৪ সালের ১৬ নভেম্বরে নরওয়ের সমুদ্র অধিনায়ক কার্ল এন্টন লারসেন তার আর্জেন্টিনার মাছ শিকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য তিমি মাছ শিকারের ঘাঁটি তৈরির উদ্দেশ্যে গ্রিতভিকেনের নিস্পত্তি করেন। প্রথম ঋতুতেই ১৯৫টি তিমি মাছ শিকার করে তা ব্যপক সফলতা লাভ করে। ১৯৬৬ সালে তিমি মাছ সঙ্কটের আশংকায় এই ঘাঁটিটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি এখন পর্যন্ত গ্রিতভিকেনের উপকূলবর্তী এলাকা তিমির হাড়, তিমি মাছের তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের মরিচা ধরা অবশিষ্টাংশ এবং তিমি শিকারে ব্যবহৃত জাহাজগুলো সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এই ঘাঁটিটিতে একটি গির্জা রয়েছে, যা এখানকার একমাত্র সরব জায়গা। তবুও বেশ কিছুদিন পর পর লোকজনের অস্তিত্ব দেখা যায় এখানে। শেষ ২০০৯ সালের ১৮ই নভেম্বর এই গির্জায় বিয়ের আয়োজন করা হয়।

তিমি শিকারে ব্যবহৃত জাহাজগুলো সেখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে; Image Source: Artificial Owl

ওরাডুয়োর-সুয়ার-গ্লেন, ফ্রান্স

১৯৪৪ সালের জুন মাসে জার্মানির ওয়াফেন-এসএস কোম্পানি (নাৎসি বাহিনীর সশস্ত্র দল) ওরাডুয়োর-সুয়ার-গ্লেন গ্রামকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। যার কারণে সেখানকার ৬৪২ জন গ্রামবাসী প্রাণ হারায়। সেই ভয়াবহ যুদ্ধের পর ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, সেই গ্রামটি যেন কখনোই আবার পুনঃনির্মাণ করা না হয়। জায়গাটি যুদ্ধ-বিগ্রহের ফলে যে অবস্থায় ছিলো ঠিক সে অবস্থায় তিনি রেখে দিতে চেয়েছেন। এতে করে বছরের পর বছর এই জায়গাটি নাৎসি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার একটি স্মৃতিচিহ্ন হয়ে আছে।

কেপ রোমানো, যুক্তরাষ্ট্র

১৯৮০ সালে অনেকগুলো গম্বুজ বিশিষ্ট একটি দালান নির্মাণ করা হয়েছিলো। কিন্তু এই দালানের নিচে বালু থাকায় তা নির্মাণের কিছুদিন পরই উত্থাপন বা সচল হতে শুরু করে। ২০০৫ সালে এই দালানের নতুন মালিক নতুনভাবে সংস্করণের পরিকল্পনায় দ্বীপটির কর্তৃপক্ষের জারি করা নতুন সংকল্পের কারণে কাজটি আগাতে পারেননি। বর্তমানে এই দালানটিতে কেউ থাকে না এবং ধীরে ধীরে সমুদ্রের সাথে তা মিশে যেতে শুরু করেছে।

ধীরে ধীরে এটি সমুদ্রের সাথে মিশে যেতে শুরু করেছে; Image Source: Toronto Sun

 প্লেমাউথ, মনসেরাত

১৯৯৫ সালের জুলাই মাসে সুফ্রিয়া হিলস্‌ আগ্নেয়গিরিতে পরপর কয়েকটি শক্তিশালী অগ্ন্যুৎপাতে প্লেমাউথ (মনসেরাত দ্বীপের রাজধানী) সহ দক্ষিণ মনসেরাতের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছাই ও লাভা ছড়িয়ে পড়ে। ওই একই বছর ১৯৯৫ সালের আগস্ট মাসে ৪,০০০ মানুষের সহায়তায় সেখান থেকে ছাইগুলো সরিয়ে নেয়া হয় এবং কাজ শেষে তাদেরকে ডিসেম্বর মাসে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়।

বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছাই ও লাভা ছড়িয়ে পড়ে; Image Source: Wikimedia Commons

স্পিনালঙ্গা, গ্রিস

স্পিনালঙ্গা হলো গ্রিসের একটি দ্বীপ, যা ক্রিট (গ্রিক দ্বীপগুলোর মধ্যে সবচাইতে বড় ও ঘন বসতিপূর্ণ) এর উত্তর দিকে অবস্থিত। ১৬৯৯ সালে এই ক্রিট ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে। তুর্কিদের বিতাড়িত করার জন্য গ্রিসের লোকেরা সেখানকার সব কুষ্ঠ রোগীদের জড়ো করে এই দ্বীপে পাঠিয়ে দিতো। সংক্রমণ ছড়িয়ে যাওয়ার ভয়ে তুরস্কের লোকেরা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে শুরু করে। আজ অবধি এই দ্বীপের যে জিনিসটি সকল পর্যটককে আকর্ষণ করে তা হলো এখানকার একসময়কার অভিশপ্ত দুর্গের অবশিষ্টাংশ।

আগদাম, নাগোরনো-কারাবাখ রিপাবলিক, আজারবাইজান

আগদাম হলো আজারবাইজানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি পরিত্যক্ত শহর। ১৯৯৩ সালে নাগোরনো-কারাবাখ এর যুদ্ধের সময় এই জায়গাটি তছনছ করে দেয়া হয়েছিলো। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর মতে, আগদাম অবরুদ্ধ করার পর সেখানকার সবকিছু লুট ও পুড়িয়ে দেয়া হয়। বলা হয়ে থাকে, এই তাণ্ডবটি ছিলো কারাবাখ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা।

আগদাম আটক করার পর সেখানকার সবকিছু লুট ও পুড়িয়ে দেয়া হয়; Image Source: Kathmandu & Beyond

হাশিমা, জাপান

হাশিমা হলো পূর্ব চীনা সাগরের একটি দ্বীপ। এটি বিশেষ করে পরিচিত এর কয়লা খনির খাদ ৬০০ মিটার গভীর পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য। ১৯৪০ সালের দিকে মিতশুবিশি কর্পোরেশন চীন ও কোরিয়ার শ্রমিকদের দিয়ে সেখানে জোরপূর্বক কাজ করাতো। বেশ অনেক বছর ধরে ৬.৩ হেক্টর (১৬ একর) এর এই দ্বীপটি পৃথিবীর সর্বাধিক জনবহুল এলাকা ছিলো। প্রতি হেক্টরে সেখানে ৮৩৫ জন মানুষ বসবাস করতো। এই জায়গাটি সমুদ্রের নিচের কয়লা খনি হিসেবে পরিচিত ছিলো, যা ১৮৮৭ সালে তৈরি করা হয়েছিলো জাপানের শিল্পায়নের সময়। ১৯৫৯ সালে সেখানকার সর্বোচ্চ জনসংখ্যা ৫,২৫৯ জনে গিয়ে পৌঁছে। ১৯৭৪ সালে কয়লা উত্তোলনের অবসান ঘটিয়ে কয়লা খনিটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায় এবং পর্যায়ক্রমে সেখানে জনবসতিও উধাও হয়ে যায়।

প্রতি হেক্টরে সেখানে ৮৩৫ জন মানুষ বসবাস করতো; Image Source: zalajkowane.pl

ফিচার ইমেজ: SFW