সারাটা জীবন বহু ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগে এসেছেন? সবসময় নিজেকে খাটো করে দেখা, কিছুতেই সফল হতে পারবেন না এমনটা ভাবা- এগুলো কি আপনার বৈশিষ্ট্য? মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই নিজেকে অহেতুক ছোট করে দেখার এই জটিলতার নামই হচ্ছে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স

লক্ষণ

  • নিজের যোগ্যতা বা সম্পর্কে তীব্র সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা।
  • বারবার অন্যের সাথে নিজের তুলনা করা এবং সবসময়ই নেতিবাচক ফলাফল অনুভব করা।
  • নিজের ইতিবাচক দিকগুলো চোখে না পড়া বা সেগুলোকে যথাযথ মূল্য না দেয়া।
  • সবসময় নিজের দোষগুলো নিয়ে ভাবা এবং কখনো কখনো এর অতিরঞ্জন করা।
  • “আমি তো কিছুই পারি না”- এমন একটা ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যাওয়া।
  • নিজের সকল প্রকার অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে বাড়িয়ে ভাবা এবং বলা। বিদ্যমান গুণগুলো চর্চার অভাবে তাই হয়ে ওঠে প্রায় বিলুপ্ত।
  • অতি সংবেদনশীলতা। কেউ ছোটখাটো কোনো বিরূপ মন্তব্য করলেই তা মনে গেঁথে নেয়া এবং তা বিশ্বাস করা। এভাবে নিজের প্রতি সম্মান হারিয়ে ফেলাটাও অস্বাভাবিক নয়।

সবসময় অন্যের সাথে নিজের তুলনা; source: psychology.spot

  • সবকিছুতেই খুঁতখুঁত করা। নিজের কোনো কাজই পছন্দ না হওয়া। সবসময়ই “আরো ভালো হতে পারতো” দুশ্চিন্তায় ভোগা। এরকম মানুষ নিজের সাফল্য ভালো করে কখনোই উপভোগ করতে পারে না এবং এভাবেই তাদের সুখী হবার পথে বাধা পড়ে।
  • সামাজিক মাধ্যমে কিংবা প্রত্যক্ষভাবে অন্যের সাফল্যে ঈর্ষা অনুভব করা। আস্তে আস্তে অন্যের সাফল্যে খুশি হতেও ভুলে যাওয়া এবং একসময়ের কাছের মানুষদের সাথে ভাবনায় ও আচরণে কৃত্রিম হয়ে পড়া। এর ফলে অনেক সম্পর্কেই দেখা দেয় ফাটল।
  • অন্যের প্রায় সব কাজ নিয়েই অকারণে যাচাই-বাছাই। তারা যা পারে না বা পারে না বলে ভাবে, তা অন্য কেউ পারলে প্রচন্ড ঈর্ষান্বিত হওয়া এবং কখনো কখনো কটু মন্তব্য করে ফেলা।
  • নিজের অনুমিত ‘খুঁত’ ঢাকার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা। খাটো মেয়েদের হিল পরতে চাওয়া বা কালোদের মাত্রাতিরিক্ত মেকআপ পরিধান করা। এরা নিজেরা যেমন, তা নিয়ে সন্তুষ্ট নয় এবং অন্যের সব নেতিবাচক মন্তব্যকে বেদবাক্য ভেবে নেয়। আঞ্চলিক ভাষায় স্বচ্ছন্দ মানুষগুলো শহুরে অঞ্চলে গিয়ে অনেক বেশি অন্তর্মুখী হয়ে পড়াও হীনম্মন্যতারই লক্ষণ।

ব্যক্তিকে গ্রাস করে আত্মবিশ্বাসের প্রচন্ড অভাব; Source: fasterreft.com

প্রকারভেদ

সাধারণত দু’ধরনের ইনফিরিওরিটি দেখা যায়।

প্রথমত, তারা জানেন তারা অনেক যোগ্য ও দক্ষ, কিন্তু কখনোই নিজের তাগিদে সেগুলোকে ভালো করে কাজে লাগাতে চান না। একধরনের অনীহা কাজ করে সবসময়ই। তারা ‘পারে কিন্তু করে না’ দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান পরিচিতদের মধ্যে।

অন্যরা যতই তাদের কাজের মূল্যায়ন করুক, যতই প্রশংসায় পঞ্চমুখ হোক, এই মানুষগুলো নিজেদেরকে সেগুলোর যোগ্য দাবিদার বলে ভাবতে পারে না, যদিও তারা ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল নিজের সকল গুণ সম্পর্কে!

এদের ধারণাটি অনেকটা এরকম- “আমি জানি আমি সুন্দর, সবাই বলে আমি সুন্দর। কিন্তু আমার নিজেকে কুৎসিত মনে হয়”।

এক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের অনুপস্থিতি এবং কিছু করার তাগিদের অভাবই প্রধান। এটি বেশ রহস্যময় ইনফিরিওরিটি, বলা যায় অনেকটা অবাস্তব বা কল্পনাপ্রসূত।

অন্যের যেকোনো বিরূপ মন্তব্য মনে গেঁথে নিয়ে নিজেকে অযোগ্য ভাবা; Source: elliotchan.com

দ্বিতীয়ত, তারা জানে যে তারা তুলনামূলক কম যোগ্যতা রাখে কিংবা তাদের মধ্যে অন্যের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে কম কর্মক্ষমতা রয়েছে। এরা এই বিষয়গুলোকে এতটাই বেশি ভাবে যে অনেকসময়ই এর অতিরঞ্জন করে ফেলে। তিলকে তাল বানানোর প্রবণতা এদের মধ্যে প্রবল। তারা সমস্যা সমাধানের চাইতে সমস্যায় ডুবে থাকাটাই বেছে নেয়। কোনোপ্রকার লড়াইয়ের পূর্বেই হার মেনে নেয়া এদের অনেক পরিচিত একটি বৈশিষ্ট্য। তারা প্রথমেই হার মেনে নেয় এবং পরাজয়ে ভুগতে থাকে। “আমাকে দিয়ে কিছু হবে না” বা “অন্য সবাই আমার চেয়ে সবদিক দিয়েই ভালো”- এ ধরনের ভাবনায় তারা সবসময় নিমজ্জিত থাকে।

এরা নিজেদের যেকোনো একটি দুর্বলতাকে জীবন সব কমতি বা সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু ভেবে বসে থাকে। তারা মনে করে এই জায়গাটি ঠিক হয়ে গেলেই জীবনের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এবং অদ্ভুত ব্যাপার এই যে, তারা এর সমাধানের পথে কোনো পদক্ষেপই গ্রহণ করে না।

এর কি কোনো ভালো দিক আছে?

এই জটিলতাটির অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কোনোভাবেই সন্তুষ্ট না হওয়া বা খুঁতখুঁত করা। এই অভ্যাস থেকে নিখুঁত হবার দিকে অনেকটাই এগিয়ে যাওয়া যেতে পারে। যাদেরকে আমরা ‘পারফেকশনিস্ট’ বলি, তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও ইনফিরিওর ভাব বিদ্যমান এবং এই আরো ভালো করতে চাওয়ার প্রবণতা তদেরকে ধীরে ধীরে আরো উন্নত করে তোলে। কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো এই দিকটিকে কাজে লাগিয়ে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভোগা ব্যক্তিরা অনেক বেশি সফল হতে পারেন তাদের প্রত্যাশিত ক্ষেত্রগুলোয়। অর্থাৎ, ‘ইনফিরিওর’ অনুভব করা আর ‘ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স’ এ ভোগা এক নয়। প্রথমটি আপনাকে ক্ষেত্রবিশেষে সাহায্য করবে, কিন্তু দ্বিতীয়টি আপনাকে এমনভাবে গ্রাস করবে যে আপনার নিজেকে অসম্পূর্ণ লাগবে।

কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে ইনফিরিওরিটি এত প্রবল আকার ধারণ করে যে একে আর ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করার পথ খোলা থাকে না। এটি ব্যক্তিকে তখন মানসিকভাবে সম্পূর্ণরূপে অসাড় করে দেয়। অনীহা এত বেশি বেড়ে যায় যার ফলাফল হিসেবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বা মাত্রাতিরিক্ত অন্তর্মুখিতার উদ্ভব ঘটে। তখন ব্যক্তি নিজের ব্যর্থতার পাল্লা হালকা করতে গিয়ে যেকোনো বিষয়ে চেষ্টা করাই ছেড়ে দেয়।

নিজেকে ছোট করে দেখা; Source: itfotolia.com

কেন হয় এবং কী এর উপায়?

আরোপিত কিংবা স্বয়ংক্রিয়- দু’ভাবেই আসতে পারে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স। ছোটবেলা থেকে আশপাশের মানুষজনের কটু মন্তব্য, নিরুৎসাহিত করা, পরিবারের কাছ থেকে যথেষ্ট মনোবল না পাওয়া, উৎসাহ যোগাবার মতো কাউকে না পাওয়া, চেহারাজনিত কোনো ব্যাপারে বারবার অপমানের শিকার হওয়া, কোনো একটি দুর্বলতা নিয়ে সবার প্রচন্ড হাসাহাসি- এ সবকিছুই জন্ম দিতে পারে একটি শিশু বা কিশোরমনে এই জটিলতার। এর বীজ জীবনের শুরুতে বপন করা হলেও বয়ে চলতে হয় বহুকাল, যদি না উপযুক্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়। একটি সম্ভাবনাময় জীবনের ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক ভূমিকা রাখে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স। অনেক প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও বহু ব্যক্তি দীর্ঘকাল ভোগে হীনম্মন্যতায় এবং তাদের প্রতিভাও আর বিকশিত হবার সুযোগ পায় না। তাই এই জটিলতা প্রতিরোধে সামাজিকভাবে, পারিবারিকভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সকলেরই দায়িত্ব রয়েছে পাশের মানুষটির সাথে এমন কিছু না করা বা এমন কিছু না বলা, যাতে করে তার মধ্যে জন্ম নিতে পারে ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স।

একাকিত্ব কিংবা বিচ্ছিন্নতাও আসতে পারে এই জটিলতার ফলে; source: leftfieldwander.blogspot.com

যেকোনো সম্পর্কে একজন সঙ্গী যদি এই জটিলতার শিকার হয়ে থাকেন, তবে অপর সঙ্গীর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হচ্ছে তাকে এ থেকে বের হয়ে আসতে সাহায্য করা। তবে প্রায়ই দেখা যায় ইনফিরিওরিটি কমপ্লক্সে ভোগা সঙ্গীটিকে আরো হীনম্মন্যতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। এটি অবশ্যই কাম্য নয় এবং পুরোপুরি অনুচিত। কখনো কখনো নিজের সঙ্গীর বিভিন্ন কটু মন্তব্য বা নিরুৎসাহের ফলেও একজন পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তির মধ্যে চলে আসতে পারে এই জটিলতা। কারণ সে হয়তো তার সঙ্গীর প্রতিটি কথা এতটাই বিশ্বাস করে এবং মূল্য দেয় যে একসময় নিজের মূল্য হারিয়ে ফেলতেও দ্বিধা করে না।

স্বয়ংক্রিয়ভাবে যে ইনফিরিওরিটির জন্ম, তাও কখনও না কখনও কোনো না কোনো ঘটনা বা বক্তব্য থেকেই অনুপ্রাণিত। নিজের ক্ষেত্রে এই জটিলতা এড়িয়ে চলতে হলে অবশ্যই আত্মবিশ্বাসের চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। অন্ধভাবে কাউকে অনুকরণ বা অনুসরণ না করে নিজের যৌক্তিক সত্ত্বাকে সক্রিয়তর করতে হবে।

ভয়কে জয় করবার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে সেই ভয়ের মুখোমুখি হওয়া। যত বেশি পালিয়ে বেড়ানো হবে, ততই সমস্যা বাড়বে। তাই এক্ষেত্রেও মুখোমুখি হবে নিজের ভেতরকার এই জটিল জটিলতার যা দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছে নিজের মূল্য নিজের কাছেই!

প্রথমেই নিজের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ভাবুন। এই জটিলতাটির সাথে লড়াই করতে হলে আপনাকে আপনার মূল শক্তি সম্পর্কে জানতে হবে। কোন কোন ক্ষেত্রে আপনার দক্ষতা আছে, খুঁজে বের করুন। কোন ভালো দিকটা আপনাকে ও অন্যদের একটু ভালো রাখতে পারে? যারা আপনাকে পছন্দ করে, প্রশংসা করে, কীসের জন্য করে? সবকিছুর একটি তালিকা তৈরি করুন।

“সবার মধ্যেই কিছু না কিছু ভালো দিক আছে”- এই মূলমন্ত্র মাথায় রেখে শুরু করুন আপনার যাত্রাটি। আপনার সেই ভালো দিকটিকে কাজে লাগান, দিন দিন নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করুন।

ফিচার ইমেজ- Tenessean.com