‘ইউথেনেশিয়া’ শব্দটি গ্রিক শব্দ ‘ইউ' (eu) এবং ‘থানাতোস' (thanatos) থেকে এসেছে। ‘ইউ' অর্থ ভালো বা সহজ এবং ‘থানাতোস' মানে মৃত্যু । অর্থাৎ ‘ইউথেনেশিয়া’ এর মানে সহজ মৃত্যু । কোনো ব্যক্তি অত্যন্ত অসুস্থ কিংবা কঠিন কোনো রোগে আক্রান্ত হলে তাকে অসহনীয় কষ্ট ও ব্যথা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রাণনাশে সহায়তা করাকেই ইউথেনেশিয়া বা আরামের/সহজ মৃত্যু বলে।

সাধারণত তিন ধরনের ইউথেনেশিয়া রয়েছে। যেমন- ভলান্টারি বা স্বেচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়া, যেখানে রোগী নিজ ইচ্ছায় মৃত্যুগ্রহণ করতে চায়। নন-ভলান্টারি বা অস্বেচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়ায় রোগী কোমায় বা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় থাকে, যার দরুন এটি সম্পাদনে রোগীর অনুমতি বা মতামত নেওয়া সম্ভব হয় না। আর ইনভলান্টারি বা অনিচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়া রোগীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পাদন করা হয়।

ইউথেনেশিয়া কি বৈধ হওয়া উচিত? Image source: pulzo.com

চারটি দেশে ইউথেনেশিয়ার বৈধতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো-

১) নেদারল্যান্ড

২০০২ সালের এপ্রিলে নেদারল্যান্ড পৃথিবীর প্রথম দেশ হিসেবে ইউথেনেশিয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। তবে এক্ষেত্রে যথাযথ শর্ত পূরণ করলেই তা বাস্তবায়িত হবে, যেমন- রোগী যদি অসহনীয় ব্যথায় ভুগতে থাকে, অসুখটির চিকিৎসা সম্ভবপর না হলে এবং রোগী যদি সজ্ঞানে থাকা অবস্থায় এই ইউথেনেশিয়া দাবি করে, শুধুমাত্র তখনই এটি কার্যকর করা যাবে। ২০১০ সালে ৩,১৩৬ জন নেদারল্যান্ড অধিবাসীকে চিকিৎসকদের রক্ষণাবেক্ষণে প্রাণনাশক ঔষধ পান করানোর মাধ্যমে আত্মহত্যায় সহায়তা করা হয়।

‘নিউ ইংল্যান্ড অফ জার্নাল'-এ নেদারল্যান্ডসের ২৫ বছরে ইউথেনেশিয়ার অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়। সেই রিপোর্টে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে ইউথেনেশিয়া বৈধ হওয়ার আগে শতকরা ১.৭ ভাগ এ ধরনের মৃত্যু গ্রহণ করত, যা ২০১৫ সালে শতকরা ৪.৫ ভাগ হয়। এর মধ্যে মাত্র ৯২ ভাগ মানুষ আসলেই মারাত্মকভাবে অসুস্থ ছিল, আর বাকিরা বৃদ্ধাবস্থার বিভিন্ন অসুস্থতা এবং মানসিক সমস্যায় ভুগছিল।

বৃদ্ধাবস্থায় ইউথেনেশিয়া; Image source: elespectador.com

ভেন ডের হেইডি বলেন,

“যখন ইউথেনেশিয়া জীবননাশের একটি সাধারণ পথ হয়ে দাঁড়ায়, তখন এই পথ সহজেই বেছে নেওয়ার মানুষও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।”

বায়োএথিসিস্ট (Bioethicist) স্কট কিম বলেন,

“বয়সগত রোগের কারণে অনেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে চায়, তবে তাদের মধ্যে কেউ মারাত্মক কোনো রোগে আক্রান্ত নয়। তারা বৃদ্ধ, তাদের বন্ধুরা মারা গেছে, সন্তানেরা সময় দেয় না, একাকিত্ব ভালো লাগে না- এসকল কারণে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে চান।"

২) বেলজিয়াম

বেলজিয়ামেও ২০০২ সালে ইউথেনেশিয়াকে বৈধ করার জন্য একটি আইন পাশ করা হয়। নেদারল্যান্ডসের পর বেলজিয়াম দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এই কার্যক্রমকে আইনগত সম্মতি প্রদান করে। তবে এই আইনে উক্ত ইউথেনেশিয়া ভলান্টারি, নন-ভলান্টারি নাকি ইনভলান্টারি, তা সম্পর্কে বিশেষভাবে কিছু বলা নেই, যার কারণে কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা বোঝা যায় না। ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য রাইট টু ডাই উইথ ডিগনিটি'-এর প্রেসিডেন্ট জ্যাকুলিন হেরেমেনস বলেন, “আমরা ইউথেনেশিয়ার ক্ষেত্রে শাব্দিক কোনো পার্থক্য করি না।”  অর্থাৎ কোন ধরনের ইউথেনেশিয়া কার্যকর করা হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই। তবে তা বাস্তবায়নের সময় অবশ্যই একজন চিকিৎসককে উপস্থিত থাকতে হবে। বেলজিয়ামে ২০০৩ সালে ২৩৫টি, ২০০৮ এ ৭০৮টি ২০১২ তে ১৪৩২টি এবং ২০১৩ সালে ১৮০৭টি ইউথেনেশিয়ার ঘটনা ঘটে। দরখাস্তকারীদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ ডাচভাষী।

২০১৪ সালে বিশ্বে প্রথমবার বেলজিয়াম শিশুদের জন্য ইউথেনেশিয়া বৈধ ঘোষণা করে। প্রাণনাশী ঔষধ কিংবা ইনজেকশনের মাধ্যমে যেকোনো বয়সের মানুষ স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে পারেন।

বেলজিয়ামে শিশুদের জন্য ইউথেনেশিয়া বৈধ; Image source: cultureamotiva.com

কিন্তু সেই ব্যক্তির বয়স যা-ই হোক না কেন, তার সাথে কী হতে যাচ্ছে সেই বিষয়ে তাকে পরিজ্ঞাত থাকতে হবে। তবে নাবালকের ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি আবশ্যক। কিন্তু এখন পর্যন্ত এরকম ইউথেনেশিয়ার ঘটনা ঘটেনি।

৩) আমেরিকা

আমেরিকার শুধুমাত্র ছয়টি প্রদেশে এটা আইনসম্মত; বাকি প্রদেশে অবৈধ। তবে কলম্বিয়া প্রদেশে শুধু ওয়াশিংটন ডিসি, অর্থাৎ আমেরিকার রাজধানীতে এটি বৈধ। অরিগন প্রদেশে সর্বপ্রথম ভলান্টারি বা স্বেচ্ছাকৃত ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু শুধুমাত্র সেইসব রোগীরাই এজন্য দরখাস্ত করতে পারবে, যারা মারাত্মক অসুস্থ এবং ছয় মাসের চেয়েও কম সময় বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে। এর প্রায় এক যুগ পরে ওয়াশিংটন অরিগনের মতোই একটি আইন পাশ করে এ বিষয়ে। ২০১৩ সালে ভারমন্টেও এটা বৈধ করা হয়। পরবর্তীতে মন্টানার কোর্ট ইউথেনেশিয়াকে বৈধতা প্রদান করে। এছাড়া ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, হাওয়াইতেও এটা স্বীকৃতি পায়। আমেরিকায় ২০১৩ সালে প্রায় ৩০০ জন ইউথেনেশিয়ার জন্য সম্মতি পায়। এর মধ্যে ২৩০ জন প্রাণনাশক ঔষধ গ্রহণে মারা যায়। আর বাকিরা অনুমোদনের পরে আত্মহত্যার এই সিদ্ধান্ত বাদ দেন।

৪) কানাডা

কানাডায় ২০১৬ সালে ‘বিল সি-১৪' এর মাধ্যমে ইউথেনেশিয়াকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে আবেদনকারীকে অবশ্যই প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে, অর্থাৎ ১৮ বছর বা এর উর্ধ্ববয়সী হতে হবে এবং ‘কানাডিয়ান হেলথকেয়ার কাভারেজ’ -এর অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। কোনো নাবালক যদি মারাত্মক কোনো রোগে আক্রান্তও হয় কিংবা বাঁচার সম্ভাবনাও খুব বেশি একটা না থাকে, তবুও তাকে ইউথেনেশিয়ার স্বীকৃতি দেওয়ার নিয়ম নেই। রোগী মানসিকভাবে অসুস্থ হলে কিংবা মানসিক চাপে থাকলে সে এই স্বেচ্ছা মৃত্যুর স্বীকৃতি পাবে না। এক পরিসংখ্যান অনুসারে, যারা মৃত্যুর এই পন্থা বেছে নেয়, তারা মূলত বৃদ্ধ, উচ্চশিক্ষিত, স্বাধীন এবং অত্যন্ত অসুস্থ। ২০১৬ সালের ‘আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ জার্নালের এক জরিপ অনুসারে, কানাডায় ইউথেনেশিয়ার আবেদনকারীদের মধ্যে শতকরা ৭০ ভাগই ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি।

বাংলাদেশে ইউথেনেশিয়ার অবস্থা

বাংলাদেশে ইউথেনেশিয়া অবৈধ। এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম যেখানে প্রায় ৬ লাখ মানুষ এমন রোগে আক্রান্ত, যার প্রতিরোধ বা প্রতিকার সম্ভব নয়। তবুও এদেশে এসকল বিষয় তদারকি করার জন্য শুধুমাত্র একটি কেয়ার সেন্টার রয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এ বিষয়ে নতুন করে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়, যখন এক পিতা তার দুই ছেলে ও এক নাতির জন্য ইউথেনেশিয়ার আবেদন করে। মেহেরপুরের এই ফল বিক্রেতা তোফাজ্জল হোসেন অনেক বছর পরিবারের এই তিন সদস্যের ভরণপোষণের সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। ২৪ এবং ১৩ বছর বয়সী দুই ছেলে ও ৮ বছর বয়সী নাতি ডাচেন মাস্কুলার ডিস্ট্রফিতে আক্রান্ত। এটা মূলত জিনগত সমস্যা, যার কারণে দেহের মাংসপেশী বয়সের সাথে না বেড়ে উল্টো কমতে থাকে এবং এই রোগে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচতে পারে। জনাব হোসেন তাদের চিকিৎসা করানোর জন্য নিজের শেষ সম্বল দোকান বিক্রি করে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে যান; তবে কোনো কিছুই ফলপ্রসূ হয় না। অবশেষে আর কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে তাকে ইউথেনেশিয়ার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

তেফাজ্জল হোসেন,তার দুই ছেলে ও এক নাতি; Image source: theguardian.com

তিনি বলেন,

“সরকারকে ভাবতে দেন তারা আমার নাতি ও সন্তানদের সাথে কী করবে। তারা অনেক কষ্টে ভুগছে এবং এ থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় নাই। আমার পক্ষেও তাদের এই ভোগান্তি দেখার আর ধৈর্য নেই”।

তার ভাষ্যমতে, ছেলেদেরকে তিনি যখন তার দরখাস্ত (ইউথেনেশিয়া জন্য) সম্পর্কে বলেন ,তখন তাদের তা নিয়ে বেশি একটা আপত্তি বা রাগও ছিল না। অবশ্য শেষপর্যন্ত তাদেরকে ইউথেনেশিয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সোস্যাল মিডিয়ায় এই ঘটনাটি বেশ সাড়া পায় যার দরুন সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। ঘটনাটির প্রেক্ষিতে ইসলাম বিষয়ক গবেষক ফরিদুদ্দীন মাসুদ বলেন,“ইউথেনেশিয়া ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব সরকারের অবশ্যই নিতে হবে।" আইন ও শালিস কেন্দ্রের প্রধান নূর খান লিটন বলেন, “বাংলাদেশে অধিকাংশ জনগণ একে হত্যা মনে করে। এ বিষয়ে সরকার ও সমাজকেই রোগীদের দায়িত্ব নিতে হবে।"

ইউথেনেশিয়া বা সহজ মৃত্যুর অনুমতি দেওয়া উচিত নাকি অনুচিত, তা নিয়ে সবার আলাদা আলাদা মত থাকতেই পারে। তবে কথা হলো, জীবন যখন মৃত্যুর চেয়েও বেশি কষ্টকর হয়ে পড়ে তখন তা বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং এজন্যই হয়তো 'ইউথেনেশিয়া'র মতো ধারণার উৎপত্তি।

ফিচার ইমেজ: noticiasaominoto.com