চিকিৎসাবিজ্ঞানের অতীত থেকে (পর্ব- ৩): প্রোটোমেডিকাস এবং মধ্যযুগীয় মহামারী ঠেকানোর নির্দেশিকা

নভেম্বর, ১৫৮২। 

ইতালির সার্ডিনিয়ার অন্তর্গত ছোট্ট বন্দর নগরী আলঘেরো’তে (Alghero) নেমেছে নিস্তব্ধ এক রাত্রি। বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়া মানুষেরা তখনো জানে না তাদের এই রাত্রি হবে দীর্ঘস্থায়ী, শিগগিরই শহরে উঠবে মৃত্যুর ঢেউ।

সমুদ্রের মৃদুমন্দ ঢেউতে দুলছে একটি বাণিজ্য জাহাজ। বার্সেলোনা (মতান্তরে মার্সেই) থেকে রওনা দিয়ে একটু আগেই ক্যাপ্টেন নোঙ্গর ফেলেছেন এখানে। তখন প্লেগের প্রকোপ চলছে অনেক জায়গায়। জাহাজের এক নাবিক বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ, সকলের অগোচরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে প্লেগের ক্ষত। অসুস্থ নাবিককে নিয়ে জাহাজের আলঘেরো নগরীতে প্রবেশ করবারই কথা ছিল না। কিন্তু রক্ষীদের নজর গলে ঠিকই জাহাজ ঘাটে এসে পড়েছে।

বহুদিন ধরে ডাঙা থেকে দূরে থেকে নাবিকের মনও আনচান করছে একটিবারের জন্য হলেও লোকালয়ে নামা। কাজেই সবাইকে ফাঁকি দিয়ে জাহাজ থেকে বন্দরে নেমে গেল অসুস্থ নাবিক। প্রচণ্ড দুর্বল শরীর নিয়েই দৃষ্টি দিল শহরের দিকে। তার সাথে সাথে মরণেরও চোখ পড়ল আলঘেরোর ছোট্ট জনবসতিতে। অসুস্থ নাবিক ঠিকই আলঘেরোতে জায়গা করে নেয়। কয়েকদিন পর তার মৃত্যুর সাথে সাথেই আলঘেরোতে হানা দিল কুখ্যাত ব্ল্যাক ডেথ।

আলঘেরোর দিকে যাচ্ছে বাণিজ্য জাহাজ; Image Source: artuk.org

ব্ল্যাক ডেথ

ব্ল্যাক ডেথ ঠিক কী কারণে হয়েছিল তা নিয়ে কিছুটা মতভেদ আছে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের ধারণা— এই মহামারীর মূল কারণ প্লেগের জীবাণু। প্লেগ ব্যাকটেরিয়া ঘটিত একটি রোগ, যা একটি জুনোটিক (zoonotic disease) রোগ। এর মানে প্লেগ প্রধানত পশুদের একটি ব্যাধি। রোডেন্ট জাতীয় প্রাণিদের মধ্যে ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis) নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে এই রোগ হয়ে থাকে। রোডেন্টের অন্তর্ভুক্ত ইঁদুর, বিভার, সজারু, গিনিপিগ, হ্যামস্টার, কাঠবিড়ালি প্রভৃতি প্রাণী। এদের দেহ থেকে প্লেগের জীবাণু মাছির মাধ্যমে মানুষ এবং অন্যান্য পশুর দেহে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

রক্তে প্লেগের জীবাণু; Source: Getty Images

ব্ল্যাক ডেথ প্লেগের মহামারী বলেই মনে করা হয়। এর সূচনা হয় ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে, যখন ইউরোপ আর এশিয়া প্রায় সাফ হয়ে যায় প্লেগের তোড়ে। ১৩৫৩ সাল পর্যন্ত ব্ল্যাক ডেথের আঘাতে সারা বিশ্বে প্রায় পঞ্চাশ মিলিয়ন মানুষ মারা গিয়েছিল। এরপর সপ্তদশ শতক অবধি থেমে থেমে এর প্রকোপ চলতে থাকে ইউরোপ জুড়ে। অনেকেই মনে করেন, এই মহামারীর উৎপত্তিস্থল রাশিয়ার দক্ষিণে কাস্পিয়ান সাগরের উত্তর-পূর্ব উপকূলের অঞ্চল থেকে। তৎকালীন রাশিয়ান ও বাইজান্টাইন ঐতিহাসিকেরা ১৩৪৬ সালের বসন্তে এখানে ভয়াবহ এক রোগের মহামারীর উল্লেখ করেছেন। চীন ও এশিয়ার মধ্যভাগ থেকে নাকি এই রোগ সেখানে এসে বাসা বেঁধেছিল।

১৩৪৭ সালে বর্তমান তুরস্কের অঞ্চল থেকে কিপচাক জাতির খান (কিপচাক শাসকের উপাধি) জানিবেগ কাস্পিয়ানের তীরে ইতালির জেনোয়া নগর রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক কেন্দ্র কাফফা (Kaffa) অবরোধ করেছিলেন। এই এলাকা বর্তমানে ফিওডোসিয়া নামে ক্রিমিয়ার অন্তর্গত। প্লেগের ছোবলে জানিবেগের বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। জানিবেগ আক্রান্তদের মৃতদেহ নগরপ্রাচীরের উপর দিয়ে ভেতরে ছুঁড়ে ফেলেন। উদ্দেশ্য ছিল শহরবাসীকে একইভাবে আক্রান্ত করা। তার আক্রমণে অনেক জাহাজই কাফফা ত্যাগ করে ইতালিতে ফিরে যায়। তাদের অনেকেই বহন করছিল প্লেগের জীবাণু। তারা প্রথমে কন্সট্যান্টিনোপোলে প্লেগ ছড়িয়ে দেয়। এরপর ভূমধ্যসাগরীয় অন্যান্য অঞ্চলও আক্রান্ত হয়। ১৩৪৭ সালেই সিসিলিতে ঢুকে পড়ে ব্ল্যাক ডেথ। ১৩৪৮ সালে আক্রান্ত হলো উত্তর আফ্রিকা, ইতালির মূল ভূখণ্ড, স্পেন আর ফ্রান্স। ১৩৪৯ সালে প্লেগের ছোঁয়া লাগল অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, হাঙ্গেরি আর নেদারল্যান্ডসে।

ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ব্রিটিশরা দিন কাটাচ্ছিল ভয়ে ভয়ে। ১৩৪৮ সালের অগাস্টে তাদের ভয় সত্যিতে পরিণত হল। ইতোমধ্যে আক্রান্ত ফ্রান্সের ক্যালাইস বন্দর থেকে একটি জাহাজে করে প্লেগ এসে হাজির হয় ডর্সেটের উপকূলে। সেখানে থেকে দ্রুতই চলে যায় ব্রিস্টলে। এরপর একটার পর একটা শহরে মৃত্যুর মিছিল আরম্ভ হয়। ১৩৪৯ সালের মে থেকে ফেব্রুয়ারির ভেতরে লন্ডন প্লেগের আক্রমণে ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৩৫০ সালে দেখা গেল স্কটল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া আর বাল্টিকের রাষ্ট্রগুলোও অক্ষত নেই। এরপর ধীরে ধীরে প্রকোপ কমে এলেও ১৩৬১-৬৩, ১৩৬৯-৭১, ১৩৭৪-৭৫, ১৩৯০ আর ১৪০০ সালে আবারো মহামারীর পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল।

লন্ডনে ব্ল্যাক ডেথের করাল থাবায় মৃত্যু ঘটে বহু মানুষের; Image Source: history.com

প্লেগের বিস্তৃতি ঠেকাতে ১৩৭৭ সালে ইতালির ভেনেশিয়ার বাণিজ্যকেন্দ্র রাগুসা (Ragusa; বর্তমান ক্রোয়েশিয়ার দুব্রোভনিক) চালু করে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা। প্লেগের অঞ্চল থেকে আসা যেকোন জাহাজ ৩০ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হত। পদব্রজে আসা অতিথিদের জন্য নিয়ম ছিল ৪০ দিন।পঞ্চদশ আর ষোড়শ শতকে কোয়ারেন্টাইন ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়, এর সাথে সাথে স্যানিটেশনের নানা পদ্ধতি প্রবর্তিত হচ্ছিল। প্লেগের মহামারীর খবর পেলেই শহরের দরজা বাইরে থেকে আসা সমস্ত লোকের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। 

প্লেগের জন্য আলাদা করে প্রথম হাসপাতাল তৈরি হয় ইতালিতে। একে বলা হতো লাযারেটো (lazaretto)। ভেনিসে ১৪২৩ সালে লাযারেটো প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়, তাদের দেখাদেখি অন্যান্য অঞ্চলও প্লেগ রোগীদের জন্য হাসপাতাল বানাতে শুরু করে।

লাযারেটোতে প্লেগ রোগীদের আর্তনাদ; Image Source: maltaramc.com

সার্ডিনিয়া

আলঘেরোর অবস্থান ছিল সার্ডিনিয়াতে। মহামারী প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সার্ডিনিয়া ইতালির অন্যান্য এলাকার চেয়ে কিছুটা পিছিয়েই ছিল। ১৩৪৮ সালে প্রথম ব্ল্যাক ডেথের স্বাদ পেলেও সার্ডিনিয়ার সমন্বিত কোন মহামারী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। অনেকটা ‘দিন আনি দিন খাই’ তালে দৈনিক ভিত্তিতে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আগে থেকে পরিকল্পনা করে প্রস্ততি নেওয়ার গরজ বহুদিন তাদের ভেতর দেখা যায়নি। অবশেষে আরাগনের রাজা পঞ্চম আলফনসো ১৪৫৫ সালের দিকে আইন জারি করে সার্ডিনিয়ার মহামারী প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করার পদক্ষেপ নিলেন। তিনি এজন্য সার্ডিনিয়াতে একটি পদ সৃষ্টি করলেন, প্রোটোমেডিকাস (Protomedicus)। প্রোটোমেডিকাসের পদ কাটালান আর আরাগোনিয়ান অঞ্চলে আগে থেকেই ছিল, কিন্তু সার্ডিনিয়ার জন্য এই পদ ছিল সম্পূর্ণ নতুন।

বর্তমান আলঘেরো; Image Source: hoteldeipini.com

প্রোটোমেডিকাস হতেন চিকিৎসা বিষয়ে ডিগ্রিধারী কেউ, যিনি বংশের দিক থেকে অভিজাত। তার কাজ ছিল সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মহামারী ঠেকাতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারের সকল অঙ্গ তাকে সহায়তা করতো। প্রোটোমেডিকাসের সাথে আরো কিছু পদের চলন হয় সার্ডিনিয়াতে, যার সবগুলোই ব্ল্যাক ডেথের  কথা মাথায় রেখে করা। এর মাঝে একটি পদ ছিল মর্বার (Morber)। ইতালিতে পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকেই মর্বার বহুল প্রচলিত হয়ে উঠেছিল। এরা ছিল রক্ষী, যাদের কাজই হলো বন্দরে আগত সব জাহাজ তদারকি করা। তারা যতক্ষণ কোনো জাহাজ নিরাপদ বলে প্রত্যয়ন না করছে, ততক্ষণ সেই জাহাজের কাউকেই তীরে নামার অনুমতি দেয়া হত না। মহামারী দেখা দিলে তারা প্রোটোমেডিকাসের সহকারী হিসেবেও কাজ করত।

আলঘেরোর দুর্গতি

১৫২৮-২৯ সালে ইতালিতে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আলঘেরোর বহু বাসিন্দাই এ সময় প্রাণ হারান। এরপর প্রায় ষাট বছর এই নগরী মোটামুটিভাবে প্লেগ মুক্ত ছিল। সম্ভবত সেই কারণেই মর্বাররাও একটু ঢিলেমি দিয়েছিলেন। ফলে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আক্রান্ত জাহাজের এক নাবিক ১৫৮২ সালের নভেম্বরে নগরে প্রবেশ করেন। জাহাজটি কোত্থেকে এসেছিল তা নিয়ে দুই রকম মত আছে। কেউ বলেন বার্সেলোনা, কেউ বলেন মার্সেই। তবে স্পেনে তখন মহামারী ছিল না, কিন্তু ফ্রান্সের মার্সেইতে কাতারে কাতারে মরছিল মানুষ। এই বিবেচনায় মার্সেইকেই সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মার্সেই থেকে বয়ে আনা নতুন এই মহামারী আলঘেরোর অনেক লোককেই কবরে পাঠিয়ে দেয়, তবে এক চিকিৎসকের উছিলায় বাকিরা বেঁচে যেতে সমর্থ হয়। নাহলে হয়তো পুরো আলঘেরোই মৃত্যুপুরীতে পরিণত হত। এই চিকিৎসকের নাম কুইন্টো টিবেরিও অ্যাঞ্জেলেরিও (Quinto Tiberio Angelerio)।

টিবেরিও অ্যাঞ্জেলেরিও

অ্যাঞ্জেলেরিওর বয়স প্রায় পঞ্চাশ। তিনি এর আগে কাজ করেছেন সিসিলির মেসানাতে। ১৫৭৫-৭৬ সালে ব্ল্যাক ডেথের থাবা সিসিলিতে পড়লে সেখানকার প্রোটোমেডিকাস জিওভান্নি ফিলিপ্পো ইংগ্রাশিয়া সফলভাবে এর মোকাবেলা করতে সক্ষম হন। তার পাশে থেকে অ্যাঞ্জেলেরিও প্রোটোমেডিকাসের কার্যকলাপ তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ইংগ্রাশিয়া প্লেগের রোগী সন্দেহ হলেই আইসোলেশনে পাঠিয়ে দিতেন, এজন্য তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সেন্টার তৈরি করা হয়েছিল। আক্রান্ত রোগীর ঘরবাড়ি আর ব্যবহৃত সব সামগ্রী জীবাণুমুক্ত করতেও তিনি পদক্ষেপ নেন। এজন্য তিনি তাপ ব্যবহার করতেন। পরবর্তীকালে দেখা যায় নির্দিষ্ট তাপে প্লেগের জীবাণু ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব।

১৫৮২ সালের সেই নভেম্বর মাসে নাবিকের মৃত্যুর পর প্লেগের প্রথম শিকার হন দুজন নারী, এক বিধবা সিফ্রা আর তার মা গ্রাযিয়া। দুজন একই ঘরে থাকতেন। সিফ্রা রোগাক্রান্ত হলে তাকে ভর্তি করা হয়েছিল আলঘেরোর সেইন্ট অ্যান্টোনিও হাসপাতালে। তবে চিকিৎসকেরা তার রোগকে প্লেগ বলে সন্দেহ করেননি। অসুস্থ মেয়ের সেবা করতে গিয়ে গ্রাযিয়াও মারা যান। অ্যাঞ্জেলেরিও তখন আলঘেরোতে প্র্যাকটিস করেন। মেসানার অভিজ্ঞতা তাকে সতর্ক হতে শিখিয়েছে।

মৃত দুই নারীর শরীরে তিনি প্লেগের ক্ষত দেখতে পেলেন। অ্যাঞ্জেলেরিও অবিলম্বে এক পাদ্রির সহায়তায় নগরীর বিশপ আন্দ্রে ব্যাকালারের (Andrea Baccallar) সাথে দেখা করেন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেইন এই মৃত্যুগুলো প্লেগের সূচনা নির্দেশ করছে, অবিলিম্বে ব্যবস্থা না নিলে আরো মানুষ মারা যাবে। শহরের ম্যাজিস্ট্রেটকেও তিনি তার মতামত জানান। ম্যাজিস্ট্রেট সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগতে লাগলেন। শহরের আর কোনো ডাক্তার প্লেগ সন্দেহ করছে না, কেবল একজনের কথায় পুরো শহরে তালা লাগানো কি ঠিক হবে?

এর মাঝে আরো লোক রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। নভেম্বরের ২০ তারিখে বিশপ আলঘেরোর শহর পরিচালনা কমিটিকে অনুরোধ করলেন আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু অ্যাঞ্জেলেরিওর মতামতের ভিত্তিতে করা এই অনুরোধ শহর কমিটি কানেই তুলল না। উল্টো অ্যাঞ্জেলেরিওকে তারা গুজব ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করে বসে। এর ভেতরেই সিফ্রার ছেলে মারা গেল। তার সঙ্গী হলো এক পঙ্গু নারী, এক বয়স্ক নারী আর এক তরুণী। এরপরেও কমিটি আর ম্যাজিস্ট্রেটের বিকার নেই দেখে অ্যাঞ্জেলেরিও এবার সাহসী এক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সার্ডিনিয়ার আঞ্চলিক ভাইসরয়ের সাথে দেখা করেন। তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন যে ভাইসরয় যদি তার কথা বিশ্বাস না করেন, তাহলে তার বিরাট ক্ষতি হতে পারে।

সৌভাগ্যের ব্যাপার যে, ভাইসরয় ডন মাইকেল ডি মনকাডা শহর কমিটি আর ম্যাজিস্ট্রেটের মতো মাথামোটা ছিলেন না। অ্যাঞ্জেলেরিও তাকে বোঝাতে সক্ষম হলেন প্লেগের মহামারী এগিয়ে আসছে, এবং এখনি প্রস্তুতি না নিলে আলঘেরোর ধ্বংস অনিবার্য। তিনি মেসিনাতে ইংগ্রাশিয়ার থেকে শেখা কায়দাকানুনের বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। মনকাডা তার কথায় প্রভাবিত হন। অ্যাঞ্জেলেরিও নিযুক্ত হলেন প্রোটোমেডিকাস। আলঘেরোর চারদিক বন্ধ করে দেওয়া হলো। শহরে সকল যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

শহরবাসীর প্রতিক্রিয়া

শহর বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য মাথায় উঠল। প্রোটোমেডিকাসের পরামর্শে দোকানপাটের ঝাঁপি ফেলে লোকজনকে ঘরে বসে থাকতে নির্দেশ দিল শহর কমিটি। ঠিক আজকের দিনের মতো তখনকার সময়েই প্রথমদিকে মানুষ প্রচণ্ডভাবে বিরক্ত হল। কোথায় প্লেগ? এদিক সেদিক দুই তিনজন মরলেই প্লেগ প্লেগ করে চিৎকার করতে হবে নাকি? ভয় দেখানোর জন্য তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হলেন অ্যাঞ্জেলেরিও। নিজেদের জীবন জীবিকা স্থবির হয়ে যাবার জন্য আলঘেরোর অধিবাসীরা একদল হয়ে তার পেছনে লাগল। অনেক জায়গায় উত্তেজিত অধিবাসীরা জমায়েত হয়ে বাসা থেকে তাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে ঝুলিয়ে দিতে চাচ্ছিল। কিন্তু খুব শীঘ্রই ঘরে ঘরে মানুষ মরতে আরম্ভ করলে সবার টনক এবার নড়ল। ডাক্তার সাহেব তো ঠিকই বলেছিলেন! নগরের বাসিন্দারা এবার অ্যাঞ্জেলেরিওর কথা শুনতে শুরু করল।

আলঘেরোতে মৃত্যুর মিছিল; Image Source: cbc.ca

অ্যাঞ্জেলেরিওর গৃহীত পদক্ষেপসমূহ

ষোড়শ শতাব্দীর সার্ডিনিয়াতে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নমূলক ব্যবস্থার প্রবর্তক হিসেবে যদি কারো নাম নিতে হয়, তা অ্যাঞ্জেলেরিওর। তার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার একটি অংশ ছিল দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যার বিচারে প্রণীত বিভিন্ন পদ্ধতির সক্ষমতা যাচাই এবং পরিশীলিতকরণ। অ্যাঞ্জেলেরিও মহামারীর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার তাগিদে আলঘেরোকে দশটি ওয়ার্ডে ভাগ করেন। প্রতিটি ওয়ার্ডের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় একজন করে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বা হেলথ ডেপুটি। এই কর্মকর্তারা নিজ নিজ ওয়ার্ডে প্রোটোমেডিকাসের আদেশ পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের তত্ত্বাবধান করতেন। এছাড়া প্লেগ গার্ড নামে একদল লোককে পদায়ন করা হয়। এরা মাঠপর্যায়ে মহামারী বিষয়ক আইন যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে কিনা তা দেখভাল করত। প্রতিদিন অন্তত দুইবার করে মর্বার আর হেলথ ডেপুটিরা মিটিং করতেন, যেখানে বিদ্যমান পরিস্থিতির আপডেট আলোচনা হতো। এই মিটিংয়ের সারসংক্ষেপ আবার প্রেরিত হত প্রোটোমেডিকাস আর শহর কমিটির কাছে।

অ্যাঞ্জেলেরিও পুরো আলঘেরোতে লকডাউন জারি করেন। সবাইকে ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়। তবে বাজার সদাই করার জন্য প্রতি বাড়ি থেকে একজন করে মানুষের বের হবার অনুমতি ছিল। বন্ধ করে দেওয়া হয় বিনোদনের বিভিন্ন স্থান। সভা সমাবেশ কঠিনভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়। এ ধরনের লকডাউন ইতালিতে এর পরেও বেশ কয়েকবার প্রবর্তিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেন্ডারসনের মতে ১৬৩১ সালের বসন্তে ফ্লোরেন্সে মহামারী ছড়িয়ে পড়লে তারা আলঘেরোর মতো লকডাউন ঘোষণা করে।

তবে আজকের মতো সেই সময়েও হঠকারী লোকের অভাব ছিল না। তারা অনেকেই নানা কায়দাকানুন করতো প্লেগ গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে লকডাউন ভাঙ্গার জন্য। অনেকেই ছাদের উপর দিয়ে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে চলে যেত। সেখানে বন্ধুবান্ধবেরা মিলে মেতে উঠত পানাহার আর আমোদপ্রমোদে। আবার কেউ কেউ সত্যিকারেই দুর্ভাগা ছিল। এক মহিলার গল্প বলা যায়। তার পালিত মুরগি ছুটে রাস্তায় বেরিয়ে গেলে মহিলাও পিছ পিছ দৌঁড় দিলেন। মুরগি কব্জা করে তিনি যখন ঘরে ফিরে আসছিলেন তখনই স্বাস্থ্য কমিটির লোক এসে তাকে ধরল। লকডাউন ভঙ্গ করার দায়ে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সৌভাগ্যবশত আদালতে তোলা হলে সহৃদয় বিচারক সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে তাকে খালাস দেন।

আরেক দুর্ভাগা মহিলা বাস করতেন তার ছেলের অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক উপরে। ছেলে তার কাপড়-চোপড় সেলাই করতে মায়ের কাছে সাহায্য চাইলে মহিলা উপরতলা থেকে এক ঝুড়ি দড়িতে বেঁধে নামিয়ে দিলেন। ছেলে তাতে কাপড় ভর্তি করে দিলে মা টেনে ঝুড়ি তুলতে শুরু করেন। পড়বি তো পর মালির ঘাড়ের মতো করে ঠিক তখনই স্বাস্থ্য কমিটির লোক রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। লকডাউন অমান্যের দায়ে মহিলাকে তারা গ্রেপ্তার করে। 

অ্যাঞ্জেলেরিওর আরেকটি নিয়ম করোনার মহামারীর সাথে খুব মিলে যায়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। অ্যাঞ্জেলেরিওর পরামর্শ ছিল রাস্তাঘাটে বের হলে দুইজন মানুষের মধ্যে অবশ্যই অন্ততপক্ষে ছয় ফুট দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। এজন্য সবাইকে পরামর্শ দেওয়া হয় ছয় ফুটি একটি লাঠি সাথে বহনের, যাতে নিকটবর্তী ব্যক্তির সাথে নির্ধারিত সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়।

অ্যাঞ্জেলেরিওর নিয়মে কারো প্লেগ সন্দেহ হলেই তার ঠিকানা হতো টাঙ্কাট (tancat) নামে সরকারি কেন্দ্র। আর প্লেগ নিশ্চিত হলে সোজা লাযারেটো। নগরীর প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র সেইন্ট অ্যান্টোনিও হাসপাতালেও লাযারেটোর জন্য আলাদা স্থান করা ছিল। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়িঘর জীবাণুমুক্ত করতে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। প্লেগ রোগীর ব্যবহৃত বিছানা, গদি, বালিশ ইত্যাদি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হতো। তার কাপড়-চোপড়ের থেকে যাওয়া জীবাণু মেরে ফেলতে অ্যাঞ্জেলেরিও এক অভিনব ব্যবস্থা প্রণয়ন করেন। টাইলস বানানোর জন্য ব্যবহৃত বিশাল বিশাল চুল্লির উত্তাপে এইসব কাপড় জীবাণুমুক্ত করা হতো। পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছিল, এইসব চুল্লি যে তাপ উৎপন্ন করে তা প্লেগের ব্যাকটেরিয়ার জন্য প্রাণঘাতী।

মৃতদেহের সৎকারের জন্যও অনেক নিয়মকানুন জারি হয়েছিল। কেউ মারা গেলে চিকিৎসক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হতেন মৃত্যুর কারণ প্লেগ কিনা। তার সন্দেহ সত্যি হলে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন বাদে আর কাউকে মৃতদেহের সংস্পর্শে আসার অনুমতি দেওয়া হতো না। মৃত ব্যক্তির পরিবার তার দেহ উঠানে রেখে দিত, সেখান থেকে প্লেগ গার্ডরা কফিন নিয়ে যেত শহর থেকে বিচ্ছিন্ন এক কবরস্থানে। অ্যাঞ্জেলেরিও নিয়ম করে দিয়েছিলেন প্লেগে মৃত ব্যক্তির দাফন শেষ করতে হবে মৃত্যুর ছয় ঘণ্টার ভেতরেই। কবর খনন করা হতো গভীর করে। গোরখোদক হিসেবে থাকত তারাই যারা প্লেগ থেকে সেরে ওঠার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এরা শহরের বাইরে বাস করত, এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অনুমতি ছাড়া কারো সাথে মেলামেশা করতে পারত না।

তবে তৎকালীন কুসংস্কার থেকে অ্যাঞ্জেলেরিও মুক্ত ছিলেন না। তিনি সমস্ত টার্কি আর বিড়াল হত্যা করে ফেলতে নির্দেশ দেন। মৃত পশু ছুঁড়ে ফেলা হয় পার্শ্ববর্তী সাগরে। অদ্ভুত শোনালেও একই কাজ মহামারীতে আরো অনেক জায়গাতে এর আগে-পরেও করা হয়েছিল। রবিনসন ক্রুসোর রচয়িতা ড্যানিয়েল ডিফো লিখে গেছেন, ১৬৬৫ সালে লন্ডন শহরে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হলে মেয়রের আদেশে প্রায় চল্লিশ হাজার কুকুর আর দুই লাখ বিড়াল মেরে ফেলা হয়। এর পেছনে ছিল বদ্ধমূল ধারণা যে, বিড়াল-কুকুর থেকে প্লেগ ছড়ায়। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো। কারণ বিড়াল ইঁদুর মারে, আর প্লেগের জীবাণু সাধারণত ইঁদুরের থেকেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করতো।

আলঘেরোতে আট মাস চলেছিল এই প্লেগ মহামারী। আঞ্জেলেরিওর কাজকর্মে আলঘেরো রক্ষা পেয়েছিল নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া থেকে। শহরের বাসিন্দা ছিল কয়েক হাজারের মতো, তাদের মধ্যে মারা গিয়েছিল হাজারের কম। তখনকার দিনে ব্ল্যাক ডেথে শহর সাফ হয়ে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ঘটনা, সেখানে আলঘেরোর মৃতের সংখ্যা অনেক কমই বলতে হবে। তবে শহর কমিটি রাজার কাছে প্রতিবেদন পাঠানোর সময় মৃতের সংখ্যা হাজারের উপর বলে দাবি করেছিল। এর কারণ হলো শহরের জনসংখ্যা অনুযায়ী কেন্দ্রকে রাজস্ব দিতে হতো, লোক কম তো রাজস্ব কম দিতে হবে। ফলে প্লেগের ধুয়ো তুলে তারা রাজস্ব ফাঁকি দিতে চাইছিল।

মহামারী ঠেকানোর নির্দেশিকা  

অ্যাঞ্জেলেরিও কেবল মহামারী নিয়ন্ত্রণ করেই ক্ষান্ত হননি, এর জন্য যে নিয়মকানুন ব্যবহার করেছিলেন তা লিপিবদ্ধ করে তৈরি করলেন একটি নির্দেশিকা বা ম্যানুয়াল। এর নাম দেন সার্ডিনিয়ার আলঘেরোতে প্লেগ মহামারী ঠেকানোর পদ্ধতিসমূহ (Ectypa Pestilentis Status Algheriae Sardiniae /Instructions on the Alghero, Sardinia, Plague Epidemic)। ১৫৮৮ সালে প্রকাশিত এই ম্যানুয়ালটি অ্যাঞ্জেলেরিও উৎসর্গ করেন ডন মনকাডাকে, যার প্রত্যুৎপন্নমতিতায় অ্যাঞ্জেলেরিও আলঘেরোকে বাঁচানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। এখানে নথিবদ্ধ ছিল সাতান্নটি নিয়ম, যা সফলভাবে প্রয়োগ করে অ্যাঞ্জেলেরিও আলঘেরোতে প্লেগ দমিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।

দশ বছর পরে মাদ্রিদ থেকে প্রকাশিত হয় এই পুস্তিকার দ্বিতীয় সংস্করণ (Epidemiologìa sive Tractatus de Peste/Epidemiology or Treatise on Plague), যেখানে সাতান্নটি নিয়মকে কেটেছেটে ত্রিশটিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল। দুই সংস্করণই ক্যাগলিয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত। পাশাপাশি প্রথম সংস্করণের একটি কপি আলঘেরোর মিউনিসিপ্যাল লাইব্রেরিতেও রাখা আছে। প্রায় সত্তর বছর পর ১৬৫২-১৬৫৭ সালে সার্ডিনিয়াতে আবার প্লেগ দেখা দিলে অ্যাঞ্জেলেরিওর ম্যানুয়াল রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রধান অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অ্যাঞ্জেলেরিওর পুস্তিকা; Image Source: researchgate.net

আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে এই দূরদর্শী চিকিৎসকের লিপিবদ্ধ করা বিস্তারিত নীতিমালার অনেককিছুই কিন্তু আধুনিক পৃথিবী অনুসরণ করছে। লকডাউন, কোয়ারেন্টাইন, সামাজিক দূরত্ব, জীবাণুমুক্তকরণ ইত্যাদি একসাথে এবং সুসংগঠিতভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে মহামারী নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন ইতালির সেই চিকিৎসক, কুইন্টো টিবেরিও অ্যাঞ্জেলেরিও।

Related Articles