দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১১টি রাষ্ট্র দখল করে নেয়ার পেছনে হিটলারের কলাকৌশল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নির্দেশে জার্মান বাহিনী ২০টিরও বেশি দেশ নিজেদের দখলে নিয়ে এসেছিলো। এর বেশিরভাগই ছিল ইউরোপ জুড়ে এবং কয়েকটি রাষ্ট্র ছিলো আফ্রিকা মহাদেশে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরোটা সময় জার্মানিসহ অক্ষশক্তির অন্যান্য দেশগুলো সমগ্র পৃথিবীজুড়ে যে ধ্বংসলীলা চালায়, তা কারোরই এখন আর অজানা নয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর মূল পরিকল্পনা বলা চলে জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জার্মানির উপর যে অসামান্য শাস্তির বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিলো, তা জাতি হিসেবে যে কারো জন্যই ছিলো চরম অপমানজনক। এই অপমানের বোঝা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন করে জার্মানিকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটান অ্যাডলফ হিটলার।

হিটলারের বিশ্বাস ছিলো, বিশুদ্ধ জার্মান জাতিকে রক্ষার জন্য এবং টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন অনেক পরিমাণে বসবাসযোগ্য জায়গা। এই বিশুদ্ধ জার্মান জাতিকে হিটলার ‘আর্য’ জাতি বলে সম্বোধন করতেন। তার ধারণা ছিলো, আর্যরাই একমাত্র জাতি, যারা পুরো পৃথিবীকে সঠিক শাসন করতে ও নেতৃত্ব দিতে পারে। এজন্য তাকে অবশ্যই রাষ্ট্রের আয়তন বাড়াতে হবে। এই কাজের জন্য যুদ্ধ ছাড়া তার আর কোনো বিকল্প নেই। এই সকল কথারই প্রমাণ মেলে হিটলারের আত্মজীবনী ‘মাইন ক্যাম্ফ’ বইটিতে। ১৯২৩ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হওয়ার পর জেল খাটতে হয় তাকে। তখনই কারাগারে বসে রচনা করেন তার এই আত্মজীবনীমূলক বই।

এই লেখায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান বাহিনীর দখল করে নেয়া ২০টিরও অধিক রাষ্ট্রের মধ্যে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র দখলের পেছনে হিটলারের রাজনৈতিক চাল এবং এর কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।

অস্ট্রিয়া

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির প্রথম বলি ছিলো এই অস্ট্রিয়া। একসময়ের প্রাসিয়ান রাজ্যের এই দেশটিকে বৃহত্তর জার্মানির সাথে সংযুক্ত করানোর জন্য এর আগে ১৯১৮ সালেও চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তখন অন্য সকল রাষ্ট্র এই কাজে বাধা প্রদান করে। কিন্তু ১৯৩৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে এই কাজ করেই ছাড়ে জার্মানি এবং অস্ট্রিয়াতে তখন জার্মানদের একাংশ বসবাস করে। সেখানে অবস্থিত জার্মান নাৎসিদের আইনি বৈধতা দানের জন্য অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর শুসনিগের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন হিটলার। কিন্তু তার এই দাবি সরাসরি মেনে না নিলে, জার্মান নাগরিকদের সাথে দুর্ব্যবহার এবং তাদের অপমান করা হয়েছে- এই অজুহাতে অস্ট্রিয়া আক্রমণ করে বসে হিটলারের জার্মান বাহিনী। ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেও তারা কিছুই করতে পারেনি। ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অচলাবস্থা এবং লিগ অফ নেশনসের ভাঙনের কারণে জার্মানদের সাথে নতুন করে ঝামেলায় জড়ানো মানে আরেকটি যুদ্ধের সূচনা করা। আরেকটি মহাযুদ্ধ শুরুর ভয়েই ব্রিটেন এবং ফ্রান্স তখন অনেকটা চুপ করে বসে ছিলো।

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় নাৎসি বাহিনীর উদযাপন, ১৯৩৮; Image Source: Bundesarchiv – CC BY-SA 3.0 de

চেকোস্লোভাকিয়া

অস্ট্রিয়ার সাথে একই সময়ে বলির পাঁঠা হয় চেকোস্লোভাকিয়া। হিটলার দাবি করেন, চেকোস্লোভাকিয়ার সরকার সুদেতান অঞ্চলে বাসরত জার্মানদের যথাযথ সুরক্ষা দিতে পারছিলো না। এজন্য তিনি পুরো সুদেতান অঞ্চলের অধিকার দাবি করে বসেন। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এখানে নীরব ছিলো। যুদ্ধ এড়ানোর জন্য তারা এসব ব্যাপারে কিছুই করছিলো না। আর এদিকে হিটলার একের পর এক অঞ্চল দখল করে যাচ্ছেন।

পোল্যান্ড

পোল্যান্ডের আক্রমণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানদের জন্য বসবাসযোগ্য জায়গা বৃদ্ধির জন্য পার্শ্ববর্তী দেশ পোল্যান্ড ছিলো একদম উপযুক্ত। ভালো চাষযোগ্য জমি এবং সুন্দর পরিবেশ। আর কী চাই! আবার এদিকে পোল্যান্ডের সাথ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের চুক্তি ছিলো, কোনো সময় যদি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে, তাহলে পোল্যান্ডকে সামরিক সহায়তা দেবে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স। আর হিটলারও চাচ্ছিলেন, এই দু’পক্ষ যুদ্ধে আসুক।

পোল্যান্ড আক্রমণ কালে জার্মানি, ১৯৩৯; Image Source: Bundesarchiv – CC BY-SA 3.0 de

ডেনমার্ক

ডেনমার্কে বসবাসরত জার্মান নাগরিকরা আশা করছিলো, খুব দ্রুতই ডেনমার্ক দখল করে নেবে হিটলার বাহিনী। হিটলার ১৯৪০ এ ডেনমার্ক দখল করে নিলেও জার্মানদের জন্য আবাসস্থল তৈরির উদ্দেশ্য তা ছিলো না। ডেনমার্ক আয়তনে জার্মানির থেকেও ছোট রাষ্ট্র। হিটলার ডেনমার্ক দখল করেছিলেন নরওয়ে দখলে সুবিধা তৈরির জন্য। ডেনমার্কের দ্বীপ জুটল্যান্ডের উত্তরাংশ ছিলো জার্মানদের জন্য ঘাঁটি তৈরির একটি আদর্শ জায়গা। সেখান থেকে নরওয়ে আক্রমণ করা তুলনামূলক সহজ এবং ফলপ্রসূ। মূলত এই উদ্দেশ্যেই ডেনমার্ক দখল করে নেন হিটলার।

নরওয়ে

আটলান্টিক মহাসাগর ব্যবহার করে গড়ে ওঠা সমুদ্রবন্দর বিশিষ্ট নরওয়ে ছিলো ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য একদম উপযুক্ত। নরওয়ের এই বন্দর দিয়ে গোটা উত্তরেই ছড়িয়ে পড়া যায় পানিপথের মাধ্যমে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তারের জন্য এই সমুদ্র বন্দর হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর নরওয়েকে দখল করে নিতে পারলে খনিজ সম্পদে ভরপুর সুইডেনকেও চাপে ফেলা সহজ হয়ে যাবে। নরওয়ে চাচ্ছিলো, যুদ্ধে না জড়িয়ে নিরপেক্ষ থেকে ব্যাপারটা সমাধান করার। এদিকে ব্রিটিশরাও চাচ্ছিলো, জার্মানরা কিছু করে ফেলার আগে নরওয়েকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কিন্তু জার্মানরা তা আর হতে দেয়নি। দখল করে নেয় গোটা নরওয়ে।

নরওয়ের সমুদ্রবন্দর, ১৯৪০; Image Source: Bundesarchiv – CC BY-SA 3.0 de

বেলজিয়াম

বেলজিয়াম দখল ছিলো ফ্রান্সে ঢোকার জন্য জার্মানদের একটি প্রবেশপথ তৈরির উপায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স এবং জার্মানির সীমানা বরাবর ফ্রান্স একটি বিশাল দেয়াল তুলে দেয়। এটিকে ম্যানো লাইন বলা হয়। বেলজিয়ামের সাথে ফ্রান্সের সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য এই ম্যাজিনো লাইন কেবল জার্মানি-ফ্রান্স সীমান্ত অংশ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। বেলজিয়াম-ফ্রান্স সীমান্তে আর তোলা হয়নি। এখন এই দেয়াল ভেঙে ফ্রান্স আক্রমণ করতে গেলে জার্মানি বড় রকমের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। তার চেয়ে বেলজিয়ামকে পথ হিসেবে ব্যবহার করা ছিলো হিটলারের জন্য তুলনামূলক সহজ।

নেদারল্যান্ড

বেলজিয়াম দখল করে নেয়ার মানে হলো ডাচ সীমানার আওতায় চলে আসা। জার্মানি ভয় করছিলো, ডাচরা যেকোনো সময় ব্রিটিশদের অনুমতি দিতে পারে তাদের উপর এয়ার স্ট্রাইক করার জন্য। সেই কাজ করলে জার্মান বাহিনী এককথায় মিশে যাবে। তাই সেই সন্দেহ না রাখার জন্য ডাচদেরকেও হিটলারের আওতায় নিয়ে আসা হয়।

ফ্রান্স

ফ্রান্সের সাথে জার্মানির শত্রুতা আছে নেপোলিয়ানের আমল থেকেই। এমনকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধেও ফ্রান্সের কাছে জার্মানির পরাজয় হয়েছিলো। তাই ফ্রান্সের উপর প্রতিশোধ নেয়াটা ছিলো হিটলারের একটি এজেন্ডা। সেই সাথে পোল্যান্ডকে যুদ্ধে সহায়তা করায় ফ্রান্স আক্রমণে তার আর কোনো অজুহাতের দরকার ছিলো না।

প্যারিসে হিটলার বাহিনী, ১৯৪০; Image Source: Bundesarchiv – CC BY-SA 3.0 de

ব্রিটিশ চ্যানেল দ্বীপপুঞ্জ

ব্রিটেনের মূল ভূখণ্ডে কোনো দাগ ফেলতে পারেনি হিটলার বাহিনী। বরং লন্ডন আক্রমণ করতে গিয়ে তারা উল্টো ধরা খেয়ে এসেছে। কিন্তু ব্রিটেনের চ্যানেল দ্বীপগুলো ছিলো ফ্রান্সের নিকটবর্তী। ফ্রান্স দখল করে ফেলায় সেই দ্বীপগুলো দখল করে নিতে হিটলারের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। আর ব্রিটেন যেহেতু ফ্রান্সের সাথে জোট হয়ে জার্মানির বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তাই তাদের প্রতিও ছিলো হিটলারের ক্ষোভ।

সোভিয়েত ইউনিয়ন

যুদ্ধের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো জার্মানদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একইসাথে পোল্যান্ড দখল করে নেয়। কিন্তু সমস্যা বাঁধে অন্য জায়গায়। সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সাথে জার্মানির একনায়কতন্ত্র এবং পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা ঠিক যাচ্ছিলো না। অপরদিকে, জার্মানরা ভয় পাচ্ছিলো, সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ হয়তো জার্মানির শাসন ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলবে। তাই হিটলার স্ট্যালিনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং সোভিয়েত দখলের পরিকল্পনা করে। প্রথম আক্রমণেই তারা মস্কো থেকে ২০০ মাইল এলাকার মধ্যে প্রবেশ করে ফেলে।

সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মান বাহিনী, ১৯৪১; Image Source: Bundesarchiv – CC BY-SA 3.0 de

ইতালি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির সবচেয়ে কাছের বন্ধুরাষ্ট্র হলো ইতালি। কিন্তু ১৯৪৩ সালে মিত্রশক্তির হাতে মুসোলিনীর পতন হলে যুদ্ধ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে শান্তি ঘোষণা করতে চায় ইতালি। কিন্তু এ কাজ করলে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে হিটলারের জার্মানি। কারণ তাহলে ইউরোপে যুদ্ধ একপ্রকার শেষ হয়ে যাবে। ইউরোপে এক জার্মানি এবং এশিয়ায় জাপান ছাড়া আর কেউ নেই মিত্রশক্তির বিপক্ষে ঘুরে দাঁড়ানোর। তাই জার্মান নাৎসি বাহিনী মুসোলিনীকে উদ্ধার করে এবং রোম দখল করে নেয়। ইতালি তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তবে তা হিটলারের নির্দেশে। মুসোলিনী সেখানে পুতুল সরকার।

রোম দখলে জার্মানরা, ১৯৪৩; Image Source: Bundesarchiv – CC BY-SA 3.0 de

এগুলো ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র আক্রমণ এবং দখলের পেছনে তার কলাকৌশল। ১৯৪৫-এ সবদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পতন ঘটে হিটলারের জার্মানির এবং জাপানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

This is a Bengali article based on Hitlar's strategies on invading several countries. 

All the references are hyperlinked.

Feature image - The National Interest

Related Articles