১২৯৭ থেকে ১২৯৯ সালের মধ্যে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলরা ভারতবর্ষে তিনবার আক্রমণ চালায়। প্রতিবারই দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে সক্ষম হন। কিন্তু বার বার পরাজয়ের পরও মোঙ্গলদের ভারতবর্ষ জয়ের অভিলাষ দূরীভূত হয়নি। ফলশ্রুতিতে ভারতীয় উপমহাদেশ আরো তিনবার মোঙ্গল আক্রমণের সম্মুখীন হয়।

চতুর্থ মোঙ্গল আক্রমণ (১৩০৩)

১২৯৯ সালের আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর প্রায় তিন বছর পর চাঘাতাই খানাত আবার দিল্লি সালতানাতের ওপর আক্রমণ চালায়। সুলতান আলাউদ্দিন ১৩০২–০৩ সালের শীতকালে তার সেনাবাহিনীর একটি অংশকে দক্ষিণ ভারতের কাকাতিয়া রাজবংশের রাজধানী বরাঙ্গল আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন এবং ১৩০৩ সালের জানুয়ারিতে আরেকটি সৈন্যদল নিয়ে চিতোর আক্রমণ করেন। দিল্লির সেনাবাহিনীর সিংহভাগ রাজধানীর বাইরে রয়েছে, এই সংবাদ জানতে পেরে মোঙ্গলরা দিল্লি দখলের উদ্দেশ্যে দ্বিতীয়বারের মতো আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণে প্রায় ১,২০,০০০ মোঙ্গল সৈন্য অংশগ্রহণ করে এবং বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মোঙ্গল সেনানায়ক তারাঘাই, যিনি ১২৯৯ সালের যুদ্ধেও অংশ নেন।

মুলতান, দিপালপুর এবং সামানায় মোতায়েনকৃত দিল্লির সৈন্যরা মোঙ্গলদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়। মোঙ্গলরা পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে দিল্লি অভিমুখে অগ্রসর হয়। এদিকে দীর্ঘ ৮ মাসব্যাপী অবরোধের পর ১৩০৩ সালের আগস্টে আলাউদ্দিন চিতোর দখল করতে সক্ষম হন এবং সেখানে নিজস্ব শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ইতোমধ্যে তিনি মোঙ্গল আক্রমণের খবর জানতে পারেন এবং দ্রুত চিতোর ত্যাগ করে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন। দিল্লিতে পৌঁছানোর পর তিনি মোঙ্গল আক্রমণ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে মাসখানেক সময় পান। কিন্তু চিতোর অবরোধের সময় তার সেনাবাহিনী প্রচুর সামরিক সরঞ্জাম হারায় এবং সেই ক্ষতিপূরণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আলাউদ্দিন দিল্লির সকল প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে সহায়তা প্রেরণের নির্দেশ দেন এবং বরাঙ্গল আক্রমণে নিয়োজিত সৈন্যদলটিকেও ফিরে আসার নির্দেশ দেন। কিন্তু এর আগেই মোঙ্গলরা দিল্লি অবরোধ করে এবং দিল্লিতে আসা-যাওয়ার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেয়।

আলাউদ্দিন খিলজি কর্তৃক নির্মিত সিরির দুর্গ; Source: Wikimedia Commons

এমতাবস্থায় আলাউদ্দিন আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ না করে প্রতিরক্ষামূলক নীতি গ্রহণ করেন এবং দিল্লির নিকটবর্তী সিরি সমভূমিতে সৈন্য মোতায়েন করেন। সিরির পূর্বে ছিল যমুনা নদী, দক্ষিণ–পশ্চিমে ছিল দিল্লির পুরনো দুর্গ এবং দক্ষিণে ছিল ঘন জঙ্গল; এই তিন দিক থেকে সেখানে অবস্থানরত দিল্লির সৈন্যদের আক্রমণ করা মোঙ্গলদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। কেবল উত্তর দিক থেকে মোঙ্গলরা আক্রমণ চালাতে পারত। আলাউদ্দিনের নির্দেশে সিরির চারপাশে পরিখা খনন করা হয় এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নির্মাণ করা হয়।

দুই মাসব্যাপী মোঙ্গলরা দিল্লি অবরোধ করে রাখে এবং দিল্লির সৈন্যদের সঙ্গে তাদের বেশ কয়েকটি খণ্ডযুদ্ধও হয়, কিন্তু এগুলোতে কোনো পক্ষই বিশেষ সুবিধা কর‍তে পারেনি। ইতোমধ্যে মোঙ্গলরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলছিল এবং তাদের রসদপত্রের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। তদুপরি, চাঘাতাই খানাতে খান দুয়ার সঙ্গে তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সংঘাত শুরু হয়েছিল এবং দুয়ার সৈন্যের প্রয়োজন ছিল। এমতাবস্থায় মোঙ্গলরা দিল্লির অবরোধ উঠিয়ে নেয় এবং লুণ্ঠিত সামগ্রী নিয়ে দ্রুত চাঘাতাই খানাতের উদ্দেশ্যে পশ্চাৎপসরণ করে। এর মধ্য দিয়ে মোঙ্গলদের দিল্লি দখলের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়

১৩০৩ সালের মোঙ্গল আক্রমণটি ছিল আলাউদ্দিনের জন্য বিশেষভাবে বিপজ্জনক, কারণ এই আক্রমণে মোঙ্গলরা দিল্লি প্রায় দখল করে নিয়েছিল, এবং ধারণা করা হয়, আরো কিছুদিন এই অবরোধ অব্যাহত থাকলে মোঙ্গলদের কাছে দিল্লির পতন ঘটত। এজন্য এই আক্রমণের পর আলাউদ্দিন সতর্ক হয়ে যান। ইতোপূর্বে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে প্রেরিত অভিযানের অনেকগুলোতে আলাউদ্দিন নিজেই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩০৩ সালের মোঙ্গল আক্রমণের পর তিনি রাজধানীতে অবস্থানের গুরুত্ব অনুধাবন করেন এবং পরবর্তী অভিযানগুলোতে নিজে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ভারতবর্ষের ইতিহাসের অন্যতম সেরা 'যোদ্ধা শাসক' ছিলেন; Source: StarsUnfolded

মোঙ্গলরা যে পথে ভারতবর্ষে আক্রমণ চালাত সেই পথ বরাবর আলাউদ্দিন অনেকগুলো দুর্গ নির্মাণ করেন, এই দুর্গগুলোতে প্রচুর সৈন্যসামন্ত, অস্ত্রশস্ত্র ও রসদপত্র মোতায়েন করেন এবং দিপালপুর ও সামানায় দুটি বৃহৎ সৈন্যদল মোতায়েন করেন। তদুপরি, সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে তিনি তার সবচেয়ে দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন এবং পরবর্তীতে সফলভাবে যুদ্ধ পরিচালনার খরচ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সালতানাত জুড়ে বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তন করেন।

পঞ্চম মোঙ্গল আক্রমণ (১৩০৫)

১৩০৫ সালে চাঘাতাই খানাতের শাসক দুয়া পূর্ববর্তী পরাজয়গুলোর প্রতিশোধ নেয়ার উদ্দেশ্যে আবার দিল্লি সালতানাত আক্রমণের জন্য একটি সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। এই বাহিনীতে প্রায় ৫০,০০০ অশ্বারোহী ছিল এবং বাহিনীটির নেতৃত্বে ছিলেন মোঙ্গল সেনানায়ক তারাঘাই, আলী বেগ ও তারতাক। তারাঘাই ইতোপূর্বে ভারতবর্ষ অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু দিল্লি সালতানাতের সীমান্তে প্রবেশের পরই তিনি মোঙ্গলদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে নিহত হন। আলী বেগ এবং তারতাক সসৈন্যে পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে থাকেন।

মানচিত্রে আমরোহা জেলা (কালো চিহ্নিত অংশ), যেখানে ১৩০৫ সালের ২০ ডিসেম্বর দিল্লির সৈন্যরা মোঙ্গলদের পরাজিত করেছিল; Source: iJunoon

এসময় পাঞ্জাব মোতায়েনকৃত দিল্লির সৈন্যবাহিনীর সেনাধ্যক্ষ ছিলেন আলাউদ্দিনের সেনাপতি মালিক নায়েক। তিনি পাঞ্জাবের স্থানে স্থানে সম্ভাব্য মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেন, কিন্তু ১২৯৯ সালের মতো এবারও মোঙ্গলরা এই ঘাঁটিগুলোকে পাশ কাটিয়ে সালতানাতের অভ্যন্তরের দিকে অগ্রসর হয়। মালিক নায়েকের ধারণা ছিল, আগের মতো এবারেও মোঙ্গলরা দিল্লি আক্রমণ করতে যাচ্ছে, তাই তিনি তার সৈন্যদল নিয়ে দিল্লিতে পৌঁছেন। কিন্তু মোঙ্গলরা জানত যে, দিল্লি তখন অত্যন্ত সুরক্ষিত। এজন্য তারা এবার দিল্লি আক্রমণ থেকে বিরত থাকে। এর পরিবর্তে তারা শিবালিক পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ভূমিতে লুণ্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায় এবং এরপর দক্ষিণ–পূর্ব দিকে হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশ বরাবর গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে অগ্রসর হয়।

মোঙ্গলদের গতিরোধ করার জন্য আলাউদ্দিন মালিক নায়েকের নেতৃত্বে ৩০,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। ১৩০৫ সালের ২০ ডিসেম্বর বাহিনীদ্বয় বর্তমান উত্তর প্রদেশের আমরোহা জেলায় একে অপরের মুখোমুখি হয়। মোঙ্গলরা দিল্লির সৈন্যবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়, কিন্তু শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। প্রায় ২০,০০০ মোঙ্গল সৈন্য আমরোহার যুদ্ধে নিহত হয় এবং দুই মোঙ্গল সেনাপতি আলী বেগ ও তারতাকসহ আরো প্রায় ৮,০০০ থেকে ৯,০০০ মোঙ্গল সৈন্য বন্দি হয়। এছাড়া, মোঙ্গল বাহিনীর প্রায় ২০,০০০ ঘোড়া দিল্লির সৈন্যদের হস্তগত হয়। বন্দি সৈন্যদের দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে আলাউদ্দিনের নির্দেশে তাদেরকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট করে হত্যা করা হয়।

ষষ্ঠ মোঙ্গল আক্রমণ (১৩০৬)

১৩০৬ সালে চাঘাতাই খানাত পুনরায় দিল্লি সালতানাত আক্রমণের জন্য ৬০,০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করে। মোঙ্গল সেনানায়ক কোবেক, ইকবালমান্দ এবং তাইবু এই বাহিনীর অধিনায়কত্বে ছিলেন। ভারতবর্ষে প্রবেশের পর কোবেকের নেতৃত্বাধীন একটি মোঙ্গল বাহিনী পাঞ্জাবের ইরাবতী/রাভি নদী বরাবর অগ্রসর হয় এবং ইকবালমান্দ ও তাইবুর নেতৃত্বে অপর একটি মোঙ্গল সৈন্যদল বর্তমান রাজস্থানের নাগৌর অভিমুখে ধাবিত হয়। উভয় অঞ্চলেই মোঙ্গলরা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে।

এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য আলাউদ্দিন তার প্রিয় সেনাপতি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে একটি সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন। আলাউদ্দিন তার সৈন্যদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এবারের যুদ্ধে তারা যদি মোঙ্গলদের পরাজিত করতে পারে, তাহলে তাদের পুরস্কার হিসেবে এক বছরের বেতন প্রদান করা হবে। এরপর দিল্লির সৈন্যরা দ্রুতগতিতে আক্রান্ত অঞ্চল অভিমুখে অগ্রসরহয় এবং রাভি নদীর তীরে আক্রমণকারী মোঙ্গলদের মুখোমুখি হয়। প্রথমে উভয় বাহিনীই একে অপরকে আক্রমণ করা থেকে বিরত ছিল। দিল্লির সৈন্যরা তখনও মোঙ্গলদের ভয় পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি, অন্যদিকে মোঙ্গলরাও এতদিনে অনুধাবন করেছিল যে, দিল্লির সৈন্যদের পরাজিত করা সহজ নয়।

১৩০৬ সালে ইরাবতী/রাভি নদীর তীরে সংঘটিত এক তীব্র যুদ্ধে মোঙ্গলরা দিল্লির সৈন্যদের কাছে পরাজিত হয়েছিল; Source: Firstpost

শেষ পর্যন্ত মোঙ্গলরাই অগ্রসর হয় এবং দিল্লির সৈন্যদের ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের ফলে দিল্লির সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। কিন্তু মালিক কাফুর তাদের পুনরায় সংগঠিত করেন এবং মোঙ্গলদের পাল্টা আক্রমণ করেন। এই প্রতি আক্রমণে মোঙ্গলদের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং মোঙ্গল সেনাপতি কোবেক স্বয়ং বন্দি হন। অবশিষ্ট মোঙ্গল সৈন্যরা দক্ষিণ দিকে পশ্চাৎপসরণ করে এবং ইকবালমান্দ ও তাইবুর নেতৃত্বাধীন সৈন্যদলের সঙ্গে মিলিত হয়। কোবেককে বন্দি অবস্থায় দিল্লিতে প্রেরণ করা হয় এবং সেখানে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।

মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দিল্লির সৈন্যরাও নাগৌরের দিকে অগ্রসর হয় এবং সেখানে অবস্থানরত মোঙ্গলদের ওপর অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণ মোকাবেলা করতে না পেরে মোঙ্গলরা পশ্চাৎপসরণ করে। প্রথমবারের মতো দিল্লির সৈন্যরা পলায়নরত মোঙ্গলদের পশ্চাদ্ধাবন করে এবং বহুসংখ্যক মোঙ্গল সৈন্যকে হত্যা অথবা বন্দি করতে সক্ষম হয়। এই অভিযানে অংশগ্রহণকারী মোঙ্গলদের মধ্যে মাত্র ৩,০০০ থেকে ৪,০০০ জন জীবন্ত অবস্থায় চাঘাতাই খানাতে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল।

এটি ছিল আলাউদ্দিনের শাসনকালে মোঙ্গলদের সর্বশেষ ভারত আক্রমণ। আলাউদ্দিন আরো প্রায় ১০ বছর দিল্লি সালতানাত শাসন করেছিলেন, কিন্তু এসময় মোঙ্গলরা আর ভারতবর্ষে কোনো আক্রমণ চালায়নি। উল্টো এসময় দিল্লির সৈন্যরাই মোঙ্গল–অধিকৃত আফগানিস্তানে নিয়মিত আক্রমণ চালাতে শুরু করেছিল, যেগুলো মোঙ্গলরা প্রতিরোধ করতে পারেনি। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৩০৬ সালে মোঙ্গলদের পরাজয়ের পর আলাউদ্দিনের নির্দেশে নিহত মোঙ্গল সৈন্যদের মাথার খুলি দিয়ে দিল্লির বাদায়ুন দরজার সামনে একটি 'টাওয়ার' নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে ভবিষ্যৎ আক্রমণকারীরা সতর্ক হয়! বলাই বাহুল্য, মোঙ্গলরা ত্রয়োদশ শতাব্দী জুড়ে কোরিয়া থেকে হাঙ্গেরি পর্যন্ত যে বর্বরতা প্রদর্শন করেছিল, দিল্লিতে তারা সেই একই ধরনের আচরণের ভুক্তভোগী হয়েছিল।

ফলাফল

আলাউদ্দিন খিলজির শাসনাধীন দিল্লি সালতানাতের নিকট মোঙ্গলদের পরাজয় ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে চেঙ্গিস খানে বিজয়যাত্রা আরম্ভ হওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন যাবৎ মোঙ্গলদের সামরিক ইতিহাস ছিল প্রায় নিরবচ্ছিন্ন বিজয়ের ইতিহাস। ১২২১ সালে মোঙ্গলরা পারওয়ানের যুদ্ধে খোরেজমের কাছে পরাজিত হয়েছিল এবং ১২২৯–১২৩১ সালে চীনের জিন রাজবংশের সঙ্গে কয়েকটি যুদ্ধেও তারা পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু এই পরাজয়গুলো তাদের বিজয়যাত্রা রোধ করতে পারেনি, এবং মোঙ্গলরা খোরেজম ও জিন সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ১২৬০ সালে মোঙ্গলরা আইন জালুতের যুদ্ধে মিসরের মামলুক সালতানাতের কাছে পরাজিত হয়েছিল, কিন্তু এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মোঙ্গল বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ১০,০০০ থেকে ২০,০০০।

অন্যদিকে, ১২৯৭ থেকে ১৩০৬ সালের মধ্যে মোঙ্গলরা পর পর ছয়বার ভারতবর্ষ আক্রমণ করে এবং প্রতিবারই তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল আইন জালুতের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মোঙ্গল বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু আলাউদ্দিন খিলজির ব্যক্তিগত সাহস ও রণনৈপুণ্য, তার সেনাপতিদের বীরত্ব ও সমরকুশল, তার সেনাবাহিনীর দক্ষতা এবং তার প্রবর্তিত অর্থনৈতিক সংস্কারসমূহের কার্যকারিতা– এগুলোর কারণে ভারতবর্ষ মোঙ্গল আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। যেসময় রাশিয়া, চীন এবং ইরানের মতো রাষ্ট্রগুলো মোঙ্গলদের আধিপত্য স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছিল, সেখানে ভারতবর্ষের এই বিজয়কে বহু ইতিহাসবিদ একটি বিরাট অর্জন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

যদি আলাউদ্দিন পরাজিত হতেন এবং মোঙ্গলরা দিল্লি সালতানাত দখল করে নিতে সক্ষম হত, সেক্ষেত্রে কী হতো?

প্রথমত, দিল্লি সালতানাত ছিল সেসময় ভারতবর্ষে অবস্থিত সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। মোঙ্গলদের হাতে দিল্লি সালতানাতের পতন ঘটলে তাদের জন্য ভারতবর্ষের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত হয়ে যেত। কারণ ভারতবর্ষ সেসময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহুসংখ্যক রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল এবং এই রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব হত না।

দ্বিতীয়ত, যেকোনো ভূখণ্ড দখলের পর সেখানে মারাত্মক ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ছিল মোঙ্গলদের যুদ্ধের রীতি। সেক্ষেত্রে মোঙ্গলরা ভারতবর্ষ দখল করতে পারলে উপমহাদেশের বড় বড় শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হত, এবং ভারতবর্ষের জনসাধারণ ধর্ম–বর্ণ নির্বিশেষে বড় মাত্রার একটি গণহত্যার শিকার হতো।

মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকালে আলাউদ্দিন খিলজি। ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'পদ্মাবত' চলচ্চিত্রে ভারতীয় তারকা রণবীর সিং আলাউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেন; Source: Zee News

তৃতীয়ত, কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন, মোঙ্গলরা ভারত দখল করতে পারলে ভারতবর্ষের হিন্দু সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটত। কিন্তু কোনো সভ্যতা বা সংস্কৃতিকে পুরোপুরিভাবে ধ্বংস করে দেয়া মোঙ্গলদের শাসনরীতির বৈশিষ্ট্য ছিল না। মোঙ্গলরা চীন, রাশিয়া, ইরান, মধ্য এশিয়া প্রভৃতি স্থানে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে নিজস্ব সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়া তাদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায়নি।

সর্বোপরি, মোঙ্গল আক্রমণ সফল হলে ভারতীয় অর্থনীতি অন্তত স্বল্পমেয়াদের জন্য হলেও মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হত। এবং দীর্ঘস্থায়ী মোঙ্গল শাসন ভারতের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাবও ফেলতে পারত, যেমনটি রাশিয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল বলে রুশ ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন।

বলাই বাহুল্য, মোঙ্গল আক্রমণ প্রতিহত করার পিছনে আলাউদ্দিন খিলজির মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের সাম্রাজ্য এবং জীবন রক্ষা করা। কিন্তু মোঙ্গল আক্রমণ থেকে ভারতবর্ষকে রক্ষা করার মধ্য দিয়ে তিনি বড় ধরনের একটি বিপর্যয় থেকে উপমহাদেশের অধিবাসীদের রক্ষা করেছিলেন, এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

এই লেখাটির প্রথম পর্ব পড়তে, এখানে ক্লিক করুন!

This is a Bengali article about the Mongol invasions of India in 1297–1306. Necessary sources are hyperlinked within the article.

Source of the featured image: War History Online