আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৫৮৭ দুর্ঘটনা

২০০১ সালের নভেম্বরের ১২ তারিখ। নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে বিমান নিয়ে সন্ত্রাসী হামলার ঠিক দু’মাস পরে নিউ ইয়র্কের কুইন্সে হঠাৎ আরো একটি বিমান দুর্ঘটনা ঘটে। স্বাভাবিকভাবেই অন্য যেকোনো সম্ভাবনার চেয়ে আরেকটি সন্ত্রাসী হামলার ব্যাপারেই সবাই বেশি সন্দেহ করছিল। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায় এফবিআই। তবে বিমান সম্পর্কিত দুর্ঘটনা হবার কারণে দুর্ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পায় এনটিএসবি (National Transportation and Safety Board)। তাদের তদন্তে উঠে আসে বেশ চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। সেসব জানার আগে চোখ ফেরানো উচিত এ দুর্ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল তার উপর।

ফ্লাইট ৫৮৭

নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে ২৫১ জন যাত্রী আর ৯ জন ক্রু নিয়ে আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ৫৮৭ এর যাবার কথা ছিল ডমিনিকান রিপাবলিকে। বিমানটি ছিল এয়ারবাসের A300B400-605R মডেলের। এর পাইলট ছিলেন ক্যাপ্টেন এড স্ট্যাটস এবং ফার্স্ট অফিসার স্টেন মলিন। সকাল ৯টা ১৩ মিনিটে ফ্লাইট ৫৮৭-কে টেকঅফ করার জন্য ক্লিয়ারেন্স দেয় এটিসি। কিন্তু একই পথে মাত্র দেড় মিনিট আগে জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান যাওয়ায় ওয়েইক টার্বুলেন্স-এর ভয় পাচ্ছিলেন ফার্স্ট অফিসার স্টেন মলিন। তবে ক্যাপ্টেন স্ট্যাটস তাকে অভয় দিলে টেকঅফ করেন মলিন।

দুর্ঘটনার শিকার বিমানটি (১৯৮৯); Source: Jettypic

ওয়েইক টার্বুলেন্স সৃষ্টি হয় বিমানের পাখা থেকে, বিশেষ করে বড় বিমানের ক্ষেত্রে। যখন বিমান আকাশে উড়ে, তখন এর পেছনে একধরনের বায়ুশূন্যতা সৃষ্টি হয়। ফলে ছোটখাটো টর্নেডোর সৃষ্টি হয় আকাশে। অন্য কোনো বিমান যদি সেই টার্বুলেন্সের মধ্যে পড়ে, তাহলে বিমান নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে কোনো বিমানের পেছনে নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব রেখে আরেকটি বিমান চলে, যেন ওয়েইক টার্বুলেন্সের কবলে না পড়তে হয়।

ভালোভাবে টেকঅফের পর ফ্লাইট ৫৮৭ একটু এগিয়েই পরিকল্পনামাফিক টেকঅফের পরে বামে মোড় নেয় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাবার জন্য। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি সামান্য আগে যাওয়া বিমানের ওয়েইক টার্বুলেন্সের শিকার হয়। তবে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ভালোই সামলাচ্ছিলেন ফার্স্ট অফিসার মলিন। কিন্তু হঠাৎ একটি বিস্ফোরণের শব্দ পান পাইলটরা এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমানটি আছড়ে পড়ে নিউ ইয়র্কের কুইন্স এলাকায়। আর এসব ঘটে টেকঅফের মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই।

আবাসিক এলাকা হওয়াতে বিমানটি আছড়ে পড়ে স্থানীয় ঘরবাড়ির উপরে। বিমানের ধাক্কায় ধ্বংস হয় বেশ কয়েকটি বাড়ি। কেবল মাত্র যাত্রা শুরু করেছে এমন অবস্থায় থাকার কারণে বিমানের জ্বালানির পুরোটাই ছিল অব্যবহৃত। ফলে দ্রুত আগুন ধরে যায় ধ্বংসস্তুপে। এছাড়া ঘরবাড়িতে থাকা দাহ্য পদার্থগুলোও আগুনকে আরো তাতিয়ে করে। ফলে বিমানে থাকা ২৬০ জনের কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এদের পাশাপাশি বিধ্বস্ত অঞ্চলের বাসায় থাকা আরো ৫ জন নিহত হয়।

বিমানটি যেখানে বিধ্বস্ত হয়েছিল; Source: Getty Image

তদন্ত

মাত্র দুই মাস আগে টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনার কারণে সবাই এটিকেও সন্ত্রাসী হামলা হিসেবেই ধারণা করে। আবাসিক এলাকায় বিমানটি ধ্বংস হবার কারণে বিমানের ধ্বংসাবশেষ আর ঘরবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আলাদা করাও কঠিন ছিল। এনটিএসবি ও এফবিআই এর মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুতই বিমানের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় আর বিস্ফোরণের আলামত খোঁজার জন্য গবেষণাগারে নমুনা পাঠানো হয়। তবে দুর্ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক মাইল উত্তরে হাডসন উপসাগরে প্লেনের লেজের ‘ভার্টিকেল স্ট্যাবিলাইজার’ পাওয়া যায় এবং এতে তদন্তকারীরা অনেকটাই নিশ্চিত হন যে এটি সন্ত্রাসী হামলা হবার সম্ভাবনা খুবই কম। কেননা সন্ত্রাসীদের পক্ষে একটি চলন্ত বিমানের লেজের অংশ আলাদা করে বিমান ভূপতিত করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।

হাডসন উপসাগর থেকে উদ্ধার করা ভার্টিকেল স্ট্যাবিলাইজার; Source: Wikimedia Commons

তবে তদন্তকারীরা বসে থাকেনি। দ্রুতই ব্ল্যাক বক্স পাওয়া যায় এবং তদন্তকারীরা দ্রুতই বিমানের শেষ মুহূর্তের তথ্য আর পাইলটদের কথোপকথন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। যদি সন্ত্রাসী হামলা হয়, তবে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার থেকে তার আলামত পাওয়া যাবে। তদন্তকারীরার বিমানের ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডারের তথ্য থেকে একটি অস্বাভাবিক ব্যাপার লক্ষ্য করেন- বিমানটির শেষ মুহূর্তে পাইলট বিমানের ভার্টিকেল স্ট্যাবিলাইজার খুব দ্রুত নড়াচড়া করাচ্ছিলেন।

ততদিনে এফবিআই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল, ভেতর থেকে কোনো ধরনের বিস্ফোরণ ঘটেনি, যান্ত্রিক কারণ কিংবা পাইলটের ভুলের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে এ ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত হয়ে যায়। ফলে তদন্ত পুরোটাই চলে যায় এনটিএসবির দায়িত্বে। তদন্তকারীরা বিমানের গতিপথ আর বিমানবন্দর থেকে প্রাপ্ত তথ্য দিয়ে যাচাই করে দেখেন জাপান এয়ারলাইন্সের বিমানের কারণে ফ্লাইট ৫৮৭ কোনো টার্বুলেন্সের শিকার হয়েছিল কিনা। কিন্তু তাদের সিমুলেশন আর হিসেব-নিকেশ বড় ধরনের টার্বুলেন্সের সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়।

নাসার করা একটি পরীক্ষায় ওয়েইক টার্বুলেন্স; Source: Wikimedia Commons

যান্ত্রিক সমস্যার সম্ভাবনা তদন্তকারীদের ভাবিয়ে তোলে, কেননা একই মডেলের আরো অনেক বিমান তখনও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের অধীনে চলছিল। যদি সেই মডেলেরই সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে তা সবার জন্যই বিপজ্জনক। তাই তারা এয়ারবাসের কারখানায় লেজের সক্ষমতা পরীক্ষা করেন। নাসার সাহায্যে তদন্তকারীরা প্রমাণ পান, বিমান চালানোর জন্য যতটা সক্ষমতা থাকা উচিত, তার থেকে প্রায় দ্বিগুণ সক্ষমতা থাকে ভার্টিকেল স্ট্যাবিলাইজারের। ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনাও অনেকটাই কমে যায়।

সক্ষমতার পরীক্ষার পর তদন্তকারীরা নজর দেন বিমান তৈরির উপাদানের দিকে। বর্তমানে বিমান তৈরির অন্যতম উপাদান আধুনিক কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল, যা তৈরি হয় গ্লাস ফাইবার আর কার্বনের  সমন্বয়ে। যদি উপাদানেই সমস্যা থেকে থাকে, তাহলেও সেটি সবার জন্য বিপজ্জনক। কিন্তু উপাদান পরীক্ষা করেও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি। ঠিক সেসময় তদন্তকারীদের নজর কাড়ে বিমানের শেষ মুহূর্তে ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজের উপর অতিরিক্ত নড়াচড়া।

মূলত ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজার বিমানকে বামে বা ডানে ঘোরাতে সাহায্য করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজারে অতিরিক্ত নড়াচড়া সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এ নড়াচড়া করানোর জন্য পাইলটরা তাদের পায়ের সাহায্যে রাডারে চাপ সৃষ্টি করতেন। দুর্ঘটনার সময় পাইলট মলিন এই রাডারের উপরেই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।

বিমান ও বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ; Source: Monica Graff/UPI

ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার থেকে প্রাপ্ত তথ্য থেকে তদন্তকারীরা একটি সিমুলেশন তৈরি করেন। সিমুলেশনে দেখা যায়, রাডারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির ফলে ভার্টিকাল স্ট্যাবিলাইজারেও অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হয়। সেটি সক্ষমতার থেকেও কয়েকগুণ বেশি হওয়াতে লেজ থেকে ভেঙে পড়ে। এটি ভেঙে যাওয়ায় পাইলটদের পক্ষে বিমানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পাইলটের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেলেও পাইলট কেন এত বড় ভুল করলেন, তা তদন্তকারীদের অবাক করে। তদন্তকারীরা ফার্স্ট অফিসার স্টেন মলিনের রেকর্ড দেখা শুরু করেন। তার সাথে আগে কাজ করা এক পাইলট মলিনের একইরকম আচরণের কথা তদন্তকারীদের জানান। এ দুর্ঘটনার সাত বছর আগেও মলিন প্রায় একইরকম পরিস্থিতিতে রাডারের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে সেবার কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। পরবর্তীতে তিনি মলিনকে এরকম করার কারণ কী জিজ্ঞেস করলে মলিন তার ট্রেনিংয়ে সেরকমই শেখানো হয়েছিল বলে জানান। ট্রেনিং আর সাত বছর আগের অভিজ্ঞতার কারণেই মলিন সেদিন রাডারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছিল বলে নিশ্চিত হন তদন্তকারীরা।

এ ব্যাপারে আরো নিশ্চিত হবার জন্য মলিন যেখানে ট্রেনিং নিয়েছিলেন, সেখানে খোঁজ নেয় তদন্তকারীরা। সেখানেই তারা আবিষ্কার করেন মলিন সেদিন ভুল করলেও সেটি তার ইচ্ছাকৃত কোনো ভুল ছিল না। বরং গলদ ছিল গোড়াতেই, ট্রেনিংয়ে! ট্রেনিংয়ে ফ্লাইট সিমুলেটরে পাইলটদেরকে কৃত্রিমভাবে তৈরি এমন কিছু পরিস্থিতির সম্মুখীন করানো হয় আর সেগুলো থেকে উত্তরণের জন্য শেখানো হয় রাডারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে বিমানকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা। আর এর ফলে ফ্লাইট সিমুলেটরে ভার্টিক্যাল স্ট্যাবিলাইজারে যে সমস্যা হতে পারে, সেরকম কোনো প্রোগ্রাম করা ছিল না! ফলে সেই ট্রেনিংয়ে ভুলের মাশুল দিতে হয় ২৬৫ জন মানুষকে। সেইসাথে ঘরবাড়ি হারায় কয়েকটি পরিবার।

নিহতদের স্মরণে তৈরি সৌধ; Source: Jim Henderson

তদন্ত শেষে এনটিএসবি ফ্লাইট সিমুলেটরের ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। পাইলটদের ট্রেনিংয়েও উন্নতি করা হয়, যেন এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। স্থানীয়রা নিহতের উদ্দেশ্যে একটি সৌধ নির্মাণ করেন। প্রতি বছর ১২ নভেম্বর সেখানে নিহতের স্মরণ করা হয়। একেকটি বিমান দুর্ঘটনার পরে ভুলগুলো ঠিকই শুধরে নেয়া হয় কিন্তু সেই শোধরানোর মূল্য দিতে হয় নির্দোষ কিছু মানুষকে জীবন দিয়ে।

তথ্যসূত্র

  1. Air Crash Investigations, National Geographic Channel, Season 13 Episode 5
  2. In-Flight Separation of Vertical Stabilizer, American Airlines Flight 587, Airbus Industrie A300-605R, N14053, Belle Harbor, New York, November 12 2001, National Transportation Safety Board.

ফিচার ইমেজ- Tony Gutierrez/AP

Related Articles