আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণের প্রেক্ষাপট এবং অন্তর্নিহিত কারণসমূহ

গত কয়েক শতক থেকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে আফগানিস্তান সবসময়ই একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান হিসেবে বিবেচিত। উনিশ শতকের শুরু থেকে এই অঞ্চল রুশ সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাঝে ভূরাজনীতিতে ‘দাবার গুটি’ হিসেবে তুলনীয় হয়, এবং দুটো পরাশক্তির মধ্যকার আধিপত্যবাদের এই প্রতিযোগিতা ‘দ্য গ্রেট গেম’ নামে পরিচিত। মধ্য এশিয়া অঞ্চলে তৎকালীন জারশাসিত রুশ সাম্রাজ্যের ক্রমশ সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ার কারণে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বজায় ধরে রাখতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্য সবসময়ই তৎপর ছিল। এ সময় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের তিনটি যুদ্ধ হয়। এমনকি, ১৯১৭ সালে সংঘটিত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, এবং ১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পরও আফগানিস্তানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বজায় থাকে, এবং স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে দেশটিতে প্রভাব ধরে রাখতে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর তৎপরতাও বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

ভূরাজনীতিতে কৌশলগত কারণে রুশ সাম্রাজ্য এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাঝে আফগানিস্তানের গুরুত্বের বিষয়টি ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে; চিত্রসূত্র: Photo12/Universal Images Group/Getty Images

১৯১৯ সালের ১৯ আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে আফগানিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করে। দেশটির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম দিককার রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন অন্যতম। অন্যদিকে, ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক সরকারকে সর্বপ্রথম স্বীকৃতি প্রদানকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আফগানিস্তান একটি। ১৯২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি মিত্রতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে পরবর্তী দশকগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক, সামরিক এবং অন্যান্য খাতে বিভিন্ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান, এবং পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান স্নায়ুযুদ্ধের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।

রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে মোহাম্মদ দাউদ খান আফগানিস্তানে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন; চিত্রসূত্র: R. Satakopan/AP Photo

১৯৭৩ সালের ১৭ জুলাই এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আফগানিস্তানের সর্বশেষ বাদশাহ মোহাম্মদ জহির শাহ্ ক্ষমতাচ্যুত হন। এই সামরিক অভ্যুত্থানের পর জহির শাহের চাচাতো ভাই এবং শ্যালক মোহাম্মদ দাউদ খান দেশের শাসনভার গ্রহণ করে দেশটিকে একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করেন। দাউদ খানের শাসনামলে দেশটিতে শিক্ষাখাতে অগ্রগতি এবং বেশ কিছু সামাজিক সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হলেও মোটাদাগে তার শাসনামলকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়ে থাকে।

দাউদ খানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রাথমিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও পরবর্তীতে তিনি স্নায়ুযুদ্ধকালীন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক নীতি নির্ধারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। ১৯৭৭ সালের ১৪ এপ্রিল দাউদ খান সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরে পৌঁছান। সেই সফরে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা লিওনার্ড ব্রেজনেভের সাথে বৈঠক করেন। উক্ত বৈঠকে দাউদ খান দেশটির বৈদেশিক নীতিনির্ধারণী বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

আফগানিস্তানের সমাজতান্ত্রিক নেতা নূর মোহাম্মদ তারেকি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা লিওনার্ড ব্রেজনেভ; চিত্রসূত্র: Vladimir Musaelyan, Alexey Stuzhin/TASS

একপর্যায়ে, সোভিয়েত প্রভাব বলয়ের বাইরে গিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টার ফলে প্রেসিডেন্ট দাউদ খানের সরকারের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের কূটনৈতিক সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। ১৯৭৮ সালের ২৭–২৮ এপ্রিল আফগানিস্তানের একটি বামপন্থী সংগঠন ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তান’ (পিডিপিএ) এর নেতৃত্বে দাউদ খানের সরকারের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটে। নূর মোহাম্মদ তারেকির নেতৃত্বে সংঘটিত এই অভ্যুত্থানের ফলে দাউদ খান এবং তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে হত্যা করা হয়। এটিসাউর বিপ্লব’ নামে পরিচিত। এই বিপ্লবের ফলে দেশটিতে একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই বিপ্লবের ঘটনায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন ছিল, এবং এর মধ্য দিয়ে দেশটি কার্যত সোভিয়েত বলয়ে প্রবেশ করে। ১৯৭৮ সালের ৫ ডিসেম্বর আফগানিস্তানের নেতা তারেকি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা ব্রেজনেভ দুটো রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ বছর মেয়াদী একটি সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের সামরিক খাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র দুটোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আবারও জোরদার হয়। এই সমাজতান্ত্রিক সরকারের প্রবর্তিত বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি আফগানিস্তানের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, এবং দেশটির রক্ষণশীল সমাজের প্রতিনিধিদের প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এছাড়াও, ‘পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তান’ এর নেতৃবৃন্দের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে সংগঠনটি বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে দেশজুড়ে একধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। ১৯৭৯ সালে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে তারেকিকে সরিয়ে সংগঠনটির অপর নেতা হাফিজুল্লাহ আমিন ক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত হন।

১৯৮০ সালের ৭ জানুয়ারি আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলের চারপাশ ঘিরে ট্যাংকবহর নিয়ে সোভিয়েত বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করে; চিত্রসূত্র: AP Photo

হাফিজুল্লাহ আমিন ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানে খানিকটা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি চালুর ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছিল। অন্যদিকে, স্নায়ুযুদ্ধকালীন দেশটির প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের  সুযোগ নিয়ে দেশটিতে প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠে। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে খানিকটা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টার ফলে দেশটির নিকটবর্তী তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, এবং তাজিকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে, এবং করণীয় নির্ধারণে ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্যরা দেশটির নেতা লিওনার্ড ব্রেজনেভের সাথে আলোচনা করেন।

১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে আফগানিস্তানে অবস্থানরত সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাসদস্যরা; চিত্রসূত্র: Alain Mingam/Gamma-Rapho/Getty Images

এমতাঅবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি-র তৎকালীন প্রধান ইউরি আন্দ্রোপভ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো, এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী দিমিত্রি ইউস্টিনোভ সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব খর্ব করার চেষ্টা না-ও করে, তারপরও দেশটিতে হাফিজুল্লাহ আমিনের শাসন দীর্ঘ হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে যাতে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে দেশটিতে শোষণ চালাতে পারে, এবং এমন পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৬৮ সালের ১৩ নভেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা লিওনার্ড ব্রেজনেভ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি বৈদেশিক নীতি ঘোষণা করেন, যাব্রেজনেভ ডকট্রিন’ নামে পরিচিত। সাধারণভাবে এই মতবাদ অনুযায়ী, যখন কোনো বিরুদ্ধশক্তির প্রভাবে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুঁজিবাদ অভিমুখে ধাবিত হয়, তখন সেটা সকল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ হয়। এই মতবাদ একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক হস্তক্ষেপের সুযোগ সৃষ্টি করে।

দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় অবস্থানের পর আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার করা হয়; চিত্রসূত্র: Vitaly Zaporozhchenko/AP Photo

এই ব্রেজনেভ ডকট্রিন’ অনুসরণ করে ১৯৭৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে আক্রমণ শুরু করে, এবং এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে সোভিয়েত আগ্রাসন শুরু হয়। একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর সোভিয়েত বাহিনী কাবুলের তাজবেগ প্রাসাদেঅপারেশন স্টর্ম–৩৩৩’ নামে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করে দেশটির নেতা হাফিজুল্লাহ আমিনকে আটক করে। পরবর্তীতে তাকে হত্যা করা হয়, এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত আরেক বামপন্থী নেতা বাবরাক কারমালকে দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের এই অভিযানের কারণে আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। একইসাথে, এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব তৈরি হয়। দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় অবস্থানের পর ১৯৮৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তান থেকে সব সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার করা হয়। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘটনা এবং অর্থনৈতিক দুরবস্থা পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

Related Articles